somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শিব লিঙ্গ নিয়ে মুসলিম দের প্রশ্নের উত্তর ।

২৫ শে জুলাই, ২০১৬ বিকাল ৩:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অনেকের মনেই প্রশ্ন আছে অন্যান্য সকল পূজায় দেব দেবির প্রতিমা স্থাপন করে পূজা হয় কিন্তু শিব পূজা কেন শিবলিঙ্গ স্থাপন করে পূজা করা হয়। আবার এটা নিয়ে অনেকে হাসাহাসি করেন বিশেষ করে মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকজন, তারা শিব লিঙ্গকে পুরুষাঙ্গের অনুকল্প বলে মনে করে জাগতিক ভোগ-বাসনার সাথে মিশিয়ে ফেলে ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এ নিয়ে উসকানি দিতে পিছপা হয় না । অনেক সময় তারা শিবলিঙ্গ পূজা করা নিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ক্ষ্যপাতে চায়। অনেক হিন্দু ছেলে-মেয়েই এ বিষয়টা জানে কিন্তু ঐ সময়ে তাদেরকে সঠিকভাবে যথাযথ উত্তর দেয়া অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখেই এই পোষ্টটি লেখা, আশা করছি মনোযোগ সহকারে পড়বেন, বুঝবেন ও নিজের সুবিধামত সংগ্রহ করে রাখবেন ।

♦পোষ্টটি নিম্নের বিষয়গুলো নিয়ে ধারণা দেবার চেষ্টা করবে-
1- শিব কে?, শিবের মূর্তির অর্থ কি?শিবপূজার তাৎপর্য কি?

2- শিবলিঙ্গ কি, শিব লিঙ্গ পূজার তাৎপর্য কি?

3- শিবলিঙ্গ সম্পর্কে কিছু উল্টাপাল্টা কথার বিশ্লেষণ

4- অন্যান্য

5- শিবতত্ত্ব

নিচে সবকিছু সম্পর্কে আলোচনা করা হল-

♦শিব কে?, শিবের মূর্তির অর্থ কি?শিবপূজার তাৎপর্য কি?

মহাদেব বা শিব বলতেই আমাদের চিত্তজগৎ একটি মূর্ত্তির উদয় হয় যিনি যোগাসনে উপবিষ্ট, বাঘের ছাল পরিহিত, ত্রিশুল ও ডমরুধারী, গলায় তার সাপ ইত্যাদি। শিব 'হর' এবং 'শম্ভু' নামেও খ্যাত। তিনি জীবের চিত্তকে, তাদের পাপকে হরণ করেন এবং কালপূর্ণ হলে জীবের জীবনকেও হরণ করেন। এসকল হরণ করার কারণে তার নাম 'হর'। আবার তিনিই জীবের যম-ভয় অর্থাৎ শঙ্কা হরণ করে তাদের কল্যাণ সাধন করেন। তার নাম গ্রহণ করলেই আর কোন শঙ্কাই থাকে না। এ কারণে শংকর তার নাম। আবার 'শম্‌' শব্দের অর্থও কল্যাণ। যেহেতু তিনি কল্যাণ দান করেন, সেহেতু 'শম্ভু' নামেও তিনি বিশ্বখ্যাত।শিব শব্দটির উল্লেখ বেদে আছে তবে তা রুদ্রের বিশেষণে। পৌরাণিক শিব এবং বৈদিক রুদ্র অভিন্ন। শিবের আটটি বিশেষ রূপকে একত্রে অষ্টমূর্তি বলে। এঁরা হলেন: ভব (অস্তিত্ব), শর্ভ (ধনুর্ধর), রুদ্র (যিনি দুঃখ ও যন্ত্রণা প্রদান করেন), পশুপতি (পশুপালক), উগ্র (ভয়ংকর), মহান বা মহাদেব (সর্বোচ্চ আত্মা), ভীম (মহাশক্তিধর) ও ঈশান (মহাবিশ্বের দিকপতি)। মহাদেবের গাত্রবর্ণ রজতগিরিনিভ অর্থ্যাৎ রুপালী পর্বতের ন্যায় শ্রভ্রবর্ণের। সাদা কেন? কারণ সাদা হল সমস্ত রঙের সমাহার। সমস্ত বর্ণ সকল বিভিন্নতা তত্ত্ব ও তথ্যের সার্থক সমাহার তিনি। তারই প্রতিক ঐ শ্বেতবর্ণ। মহাদেবের কন্ঠে সাপের মালা, তাই তার আরেক নাম ফণিভূষণ। গলায় ওই সাপের অস্তিত্বকে নানা জনে নানা দিকে দিয়ে ব্যাখা করেছেন। এই সাপ হিংস্র ব্যাক্তিতের প্রতিক। সমাজে সাপের মত চরিত্রের অনেক লোক আছে। মহাদেব তাদের প্রেমে বশীভূত করে কাছে রেখে দেন যাতে তারা বাইরে যেয়ে বৃহত্তর সমাজের ক্ষতি করতে না পারে, এই হল শিবেভাবের বৈশিষ্ট্য। তিনি যে ভূতপতি, ভূতেশ্বর। সমস্ত অসৎকে তিনি সৎ এর এবং সমস্ত অশুভকে শুভে নিয়ন্ত্রিত করেন।

মহাদেবের পরিধানে ব্যাঘ্রচর্ম, কারণ ব্যাঘ্র হল সাহসী, বীর্য্যবান অথচ কৌশলী প্রাণী। ব্যাঘ্রের চর্ম ঐ গুণগুলির দ্যোতক প্রয়োজন হয় প্রতিপদে। তাই ঐ গুণগুলি শিব-চরিত্রের সহজ সম্পদ। মহাদেবের মস্তকে চন্দ্রের একটি অংশ অধিষ্ঠান, এই চন্দ্র হল শান্তি ও নির্মলের প্রতিক এবং অর্ধচন্দ্র যা চলমান সময়ের প্রতিক। তাই, তার অপর নাম চন্দ্রেশ্বর। চন্দ্রের স্থান মহাদেবের মস্তকে কারণ পৃথিবীতে জীবনপ্রবাহ সচল রাখতে চন্দ্রের ক্রিয়া অপরিসীম। মহাদেবের জটা থেকে গঙ্গার জলধারা যা জ্ঞান ও পবিত্রতার প্রতিক। আর এটা বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত গঙ্গার জলের জীবানুনাশক গুণ আছে যা গঙ্গার পবিত্রতার প্রতিক। রুদ্রাক্ষ যা শিবের অলঙ্কার যা তিনি সর্বদা পড়ে থাকেন! কিন্তু শুধু একমাত্র এই রুদ্রাক্ষই কেনো? রুদ্রাক্ষ মানে “রুদ্রের অশ্রু” পৌরানিক গাথা অনুসারে ইহা শান্তি ও পবিত্রতার প্রতিক। এর আগে যেমন গঙ্গা জলের বিজ্ঞানসম্বত গুণ বললাম যার জন্য গঙ্গার জলকে পবিত্র মানা হয়, ঠিক তেমনি রুদ্রাক্ষের বিজ্ঞানসম্বত গুণ আছে যা ধ্যানের সময় মনে শান্তি আনতে সহায়ক, যার জন্য যোগীরা তাদের গলাই রুদ্রাক্ষের মালা পড়ে। আধুনিক রিসার্চ বলছে রুদ্রাক্ষে Electromagnetic, Paramagnetic, Diamagnetic and Dynamic Polarity ধর্ম আছে, বিভিন্নমুখী রুদ্রাক্ষের ক্ষেত্রে এর মানগুলো ভিন্ন হয়। হৃৎপিন্ডের চারিদিকে যদি এই আসল রুদ্রাক্ষের মালা পড়া হয় তবে তার দ্বারা মস্তিকের ডোপামিন ক্ষরণকারী নিউরোন থেকে ডোপামিন ক্ষরণ হ্রাস পাই, যার ফলে মনে হালকা শান্তিদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই ডোপামিন মূলত এড্রিনারজিক নিউরোন থেকে এড্রিনালিন ক্ষরণ কে নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া রুদ্রাক্ষ রক্তে সেরোটনিনের মাত্রা হ্রাসে সহায়ক।যার ফলে মনে হালকা শান্তিদায়ক অনুভূতির সৃষ্টি হয়। জীবন বৃদ্ধির অনুপূরক বা সহায়ক যা সব কিছুই শিবের বিভূতির অঙ্গ।

এবং এই বিভূতি মৃত্যু পর জীবদেহের বিনাশের সত্যতা তুলে ধরে।

♦শিবের হাতে ত্রিশূল কেন?

বস্তত শিবের পরিচয় ত্রিশূলেই বিজ্ঞাপিত। ত্রিশূলের তাৎপর্য কি? শাস্ত্র বলে ত্রিশূল হলো কুঞ্চিকা বা চাবি। মানুষ সিন্দুকে ধনরত্ন রেখে প্রয়োজনে চাবি দিয়ে তা উন্মুক্ত করে ধনরত্ন বের করে । শিবের ঐশ্বর্য-ভাণ্ডার তত্ত্বময়। সে তত্ত্বগুণময় ও গুণাতীত। ত্রিশূলের ৩টি ফলক-সত্ত্ব,রজ,তমোগুণের প্রতীক। কিন্তু ঐ তিনটি ফলক একটি মাত্র সোজা দণ্ড দ্বারা গ্রথিত। সোজা দণ্ডটিই গুণাতীত তত্ত্বের প্রকাশক। ৩ টি ফলক সৃষ্টি,স্থিতি ও লয়ের প্রতীক এবং সত্ত্ব গুণময় ফলকে আছেন বিষ্ণু, রজগুণময় ফলকে আছেন ব্রহ্মা এবং তমোগুণময় ফলকে আছেন সংহার দেবতা রুদ্র। শিবের ত্রিশূল এই ত্রিশক্তির আধার স্বরুপ। এক শিব তত্ত্বেই ত্রয়ী তত্ত্বের সমাহার। ত্রিশূলের সঙ্গেই থাকে শিবের নিত্যসাথী ডমরু। এই ডমরুর তাৎপর্য্য কি ? ডমরু হল শব্দের বিভিন্ন নাদ এর প্রতিক, সংস্কৃত ব্যাকরণ-প্রণেতা মহামুনি পানিনি ছি্লেন শিবভক্ত, তিনি মহাদেবের আরাধনা করতেন ৪৫ বার ডমরু ধ্বনি করে, এক একবার এক এক রকম নাদ সৃষ্টি হয়, পরে ঐ নাদগুলো্কে তিনি সুত্রাকারে আবির্ভূত করেন, সুত্রগুলো এই রকম - অইউণ। ঋলৃকৃ। কপয়। হল। পাণিনি সুত্রগুলির নাম রাখেন শিবসুত্র। এই শব্দরাজিই হচ্ছে সমস্ত সংস্কৃত স্বর ও ব্যাঞ্জনবর্নের সমষ্টি রূপ। তারপর সেগুলি সঙ্গতি সহকারে বিন্যস্ত করে তিনি রচনা করলেন তার মৌলিক গ্রন্থ “অষ্টাধ্যায়ী”। কথিত আছে বিষ্ণুর অনুরোধে তিনি পঞ্চমুখীশিব রূপ ধারণ করেন এই পঞ্চমুখ হল পঞ্চভূতের প্রতিক।

♦শিব নীল কণ্ঠ । কীভাবে হলেন?

দেবতাগণ অমৃত লাভের আশায় সমুদ্রমন্হন করলেন। সমুদ্র মন্থনে প্রথমেই উত্থিত হলো গরল। এ বিষরাশির তেজে সমগ্র পৃথিবী ধ্বংস হবার আশঙ্কা দেখা দিল। সকল দেবগণ আত্মভোলা শিবকে ধরলেন এর ব্যবস্থা নিতে। শিব বিনা বাক্য ব্যয়ে এই বিষরাশি পান করে স্বীয় কণ্ঠে ধারণ করলেন। ফলে কণ্ঠদেশ নীলবর্ণ হলো, সে থেকেই শিব নীল কণ্ঠ।

♦শিবপূজার তাৎপর্য কি?

শিবপূজা করলে শিবের অভিপ্রেত চলনে চললে মানুষের মৃত্যুভয় থেকে ত্রাণ লাভ করে।মৃত্যুঞ্জয় শিবের আরেক নাম। ঋগ্বেদ ৭.৫৯.১২ - মহামৃত্যুঞ্জয়ী মন্ত্র “ওঁ ত্র্যম্বকম য়যমহে সুগন্ধিম পুষ্টি বর্ধনাম উর্বরুকুম বন্ধনান মৃত্যুর মোক্ষেয়া মমৃতাত(ম অমৃতাত)ওঁ” “হে রুদ্র, আমরা তোমার বন্দনা করি।তুমি জন্ম,জীবন ও মৃত্যুত্রয়ীর জ্ঞানদৃষ্টির অধিকারী।তুমি আমাদের বেঁচে থাকার জন্য সুন্দর পরিবেশ ও পুষ্টিকর খাদ্যের যোগানদাতা।

তুমি সকল ভয়ঙ্করব্যধি হতে ত্রানকারী।আমাদের মৃত্যুর হাত থেকে মুক্তিদান কর,অমৃতত্ত্ব থেকে নয়। *ত্র্যম্বকম- ত্রিনেত্রী, যাহা জন্ম, জীবন ও মৃত্যুর প্রতিক। শিব-উপাসনা যে ঠিকমত করে, তার অন্তর হয়ে ওঠে অভী ভাবনায় উজ্জীবিত। প্রকৃত ধর্মাচরণই মানুষকে অভী বা ভয়শূন্য করে তোলে। তথাকথিত হাজার রকমের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভয় বা আতঙ্ক তাকে সঙ্কুচিত ও ত্রস্ত করে তুলতে পারে না। সে জানে শরীরের বিনাশ হলেও আত্মার বিনাশ হয় না। আত্মা চির-অবিনশ্বর এবং প্রতিটি মানুষই সেই বিশ্বাত্মারই অংশবিশেষ। সদগুরুর উপর গভীর টান মানুষকে এমনতর মৃত্যুভয়-অতিক্রমী সাহসী অথচ কল্যাণপথিক করে তোলে।

♦♦শিবলিঙ্গ কি, শিবলিঙ্গ পূজার তাৎপর্য কি?

শিবলিঙ্গ হল হিন্দু দেবতা শিবের একটি প্রতীকচিহ্ন। ধ্যানমগ্ন শিবকে এই প্রতীকের সাহায্যে প্রকাশ করা হয়। শিব ব্রহ্মের ধ্যানে লীন থাকেন। আর সব মানুষকেও ব্রহ্মের প্রতি ধ্যানমগ্ন হতে উপদেশ দেন। আমরা দেখি যে শিব লিঙ্গের উপরে ৩টি সাদা দাগ থাকে যা শিবের কপালে থাকে। তাই শিবলিঙ্গ যদি কোন জনেন্দ্রিয় বুঝাত তাহলে শিবলিঙ্গের উপরে ঐ ৩টি সাদা তিলক রেখা থাকত না। হিন্দুমন্দিরগুলিতে সাধারণত শিবলিঙ্গে শিবের পূজা হয়। একটি সাধারণ তত্ত্ব অনুযায়ী, শিবলিঙ্গ শিবের আদি-অন্তহীন সত্ত্বার প্রতীক এক আদি ও অন্তহীন স্তম্ভের রূপবিশেষ। শিবলিঙ্গ ৩টি অংশ নিয়ে গঠিত, সবার নিচের অংশকে বলা হয় ব্রহ্ম পিঠ, মাঝখানের অংশ বিষ্ণুপিঠ এবং সবার উপরের অংশ শিব পিঠ । নৃতত্ত্বারোপিত মূর্তি ব্যতিরেকেও শিবলিঙ্গ আকারে শিবের পূজাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। শিব শব্দের অর্থ মঙ্গলময় এবং লিঙ্গ শব্দের অর্থ প্রতীক; এই কারণে শিবলিঙ্গ শব্দটির অর্থ সর্বমঙ্গলময় বিশ্ববিধাতার প্রতীক। ১৯০০ সালে প্যারিস ধর্মীয় ইতিহাস কংগ্রেসে রামকৃষ্ণ পরমহংসের শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ বলেন, শিবলিঙ্গ ধারণাটি এসেছে অথর্ববেদ সংহিতা গ্রন্থে যূপস্তম্ভ বা স্কম্ভ নামে একপ্রকার বলিদান স্তম্ভের স্তোত্র থেকে, কারণ এখানেই প্রথম শিব-লিঙ্গ পূজার কথা জানা যায়।

এই স্তোত্রের আদি ও অন্তহীন এক স্তম্ভ বা স্কম্ভ-এর বর্ণনা পাওয়া যায়। এই স্কম্ভ-টি চিরন্তন ব্রহ্মের স্থলে স্থাপিত। যজ্ঞের আগুন, ধোঁয়া, ছাই, সোম লতা, এবং যজ্ঞকাষ্ঠবাহী ষাঁড়ের ধারণাটির থেকে শিবের উজ্জ্বল দেহ, তাঁর জটাজাল, নীলকণ্ঠ ও বাহন বৃষের একটি ধারণা পাওয়া যায়। তাই মনে করা হয়, উক্ত যূপস্তম্ভই কালক্রমে শিবলিঙ্গের রূপ ধারণ করেছে। লিঙ্গপুরাণ গ্রন্থে এই স্তোত্রটিই উপাখ্যানের আকারে বিবৃত হয়েছে। এই উপাখ্যানে কীর্তিত হয়েছে সেই মহাস্তম্ভ ও মহাদেব রূপে শিবের মাহাত্ম্য। জার্মান প্রাচ্যতত্ত্ববিদ গুস্তাভ ওপার্ট শালগ্রাম শিলা ও শিবলিঙ্গের উৎস সন্ধান করতে গিয়ে তাঁর গবেষণাপত্রে এগুলিকে পুরুষাঙ্গের অনুষঙ্গে সৃষ্ট প্রতীক বলে উল্লেখ করলে, তারই প্রতিক্রিয়ায় বিবেকানন্দ এই কথাগুলো বলেছিলেন। বিবেকানন্দ বলেছিলেন, শালগ্রাম শিলাকে পুরুষাঙ্গের অনুষঙ্গ বলাটা এক কাল্পনিক আবিষ্কার মাত্র। তিনি আরও বলেছিলেন, শিবলিঙ্গর সঙ্গে পুরুষাঙ্গের যোগ বৌদ্ধধর্মের পতনের পর আগত ভারতের অন্ধকার যুগে কিছু অশাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তির মস্তিস্কপ্রসূত গল্প। স্বামী শিবানন্দও শিবলিঙ্গকে যৌনাঙ্গের প্রতীক বলে স্বীকার করেননি। ১৮৪০ সালে এইচ. এইচ. উইলসন একই কথা বলেছিলেন। ঔপন্যাসিক ক্রিস্টোফার ইসারউড লিঙ্গকে যৌন প্রতীক মানতে চাননি। ব্রিটানিকা এনসাইক্লোপিডিয়ায় "Lingham" ভুক্তিতেও শিবলিঙ্গকে যৌন প্রতীক বলা হয়নি। যদিও অধ্যাপক ডনিগার পরবর্তীকালে তাঁর দ্য হিন্দুজ: অ্যান অল্টারনেটিভ হিস্ট্রি বইতে তাঁর বক্তব্য পরিষ্কার করে লিখেছেন। তিনি বলেছেন, কোনো কোনো ধর্মশাস্ত্রে শিবলিঙ্গকে ঈশ্বরের বিমূর্ত প্রতীক বা দিব্য আলোকস্তম্ভ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সব বইতে লিঙ্গের কোনো যৌন অনুষঙ্গমূলক অর্থ নেই। লিঙ্গ শব্দের আমরা শুধু একটি অর্থ জানি তা হলো জননেন্দ্রিয় এবং ব্যকরণগত অর্থ হলো পুংস্তত্ব বা স্ত্রীত্ব জ্ঞাপক অর্থ। লিঙ্গ শব্দের যে আরো অর্থ হতে পারে তার কোন চিন্তা আমরা করি না। লিঙ্গ শব্দের আরেকটি অর্থ হলো সূক্ষ দেহ। এই দেহটিতে যুক্ত আছে পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়,৫টি কর্মেন্দ্রিয় এবং ৫ টি প্রাণ অপান বায়ু ,মন ও বুদ্ধি-মোট ১৭ টি অবয়ব যুক্ত দেহ। সকল সৃষ্টিরই সূক্ষ শরীর আছে। আমাদের যখন মৃত্যু হয় তখন জীবাত্মা সূক্ষ শরীরে বিচরণ করেন এবং পুনরায় দেহ ধারণ করেন। শিব, রুদ্র ও মহাদেব এই তিনটি নামই আমাদের মধ্যে বেশি পরিচিত। যে সূক্ষ শরীরকে আমরা লিঙ্গ বলে পূজা করি তা সৃষ্টির সূক্ষ শরীর প্রকৃতিতে বীজ বপনরূপ সূক্ষ বিষয়টিকে দেখানো হয়েছে। এখানে স্ত্রী-পুরুষের মিলিত অঙ্গ নয়। বিশেষভাবে লক্ষ্য করলে তা অনুধাবন করা যায়। আমাদের প্রচলিত ধারনায় যা আসে তাকে আমরা সহজে ভুলতে পারি না। যে সূক্ষ শরীরে ১৭ টি গুণ নিয়ে অবস্থা করছেন তার পুনরায় স্থুল দেহ ধারণ অন্যদিকে প্রকৃতিতে অর্থাৎ মাটিতে বীজ বপণ কারণে বীজের সেই সূক্ষ এবং সুপ্ত শক্তিই অংকুরিত হয়ে বৃক্ষাদি শস্যাদি রূপ ফল আমাদের দেন। প্রত্যেক দেব-দেবীর বা সৃষ্টির এরূপ সূক্ষ দেহ আছে, সেই দেহের আহ্ববান করি ঘটে, পটে(ছবিতে), মূর্তিতে। শিবলিঙ্গও তদ্রুপ সৃষ্টির সূক্ষ দেহ। শিব শব্দের অপর একটি অর্থ হল যাঁর মধ্যে প্রলয়ের পর বিশ্ব নিদ্রিত থাকে; এবং লিঙ্গ শব্দটির অর্থও একই – যেখানে বিশ্বধ্বংসের পর যেখানে সকল সৃষ্ট বস্তু বিলীন হয়ে যায়। যেহেতু হিন্দুধর্মের মতে, জগতের সৃষ্টি, রক্ষা ও ধ্বংস একই ঈশ্বরের দ্বারা সম্পন্ন হয়, সেই হেতু শিবলিঙ্গ স্বয়ং ঈশ্বরের প্রতীক রূপে পরিগণিত হয়।

♦♦♦শিবলিঙ্গ সম্পর্কে কিছু উল্টাপাল্টা কথার বিশ্লেষণ-



@@@@♦শিবলিঙ্গ কোন যৌন ইন্দ্রিয়ের পূজা নয়, কেন নয় তাই জানুন—

প্রথমেই দেখা যাক লিঙ্গ শব্দের প্রকৃত অর্থ কি। সংস্কৃত लिङ्गं, লিঙ্গ; শব্দের অর্থ হলো "প্রতীক" বা চিহ্ন। লিঙ্গ অর্থে অনেকে সাধারণত পুরুষের জনেন্দ্রিয় বুঝিয়ে থাকে, কিন্তু এটা ভুল ধারণা। তাহলে আমরা বাংলা ব্যাকরণে পড়েছিলাম পুং লিঙ্গ ও স্ত্রী লিঙ্গ এর কি হবে। আসলে যে চিহ্ন দ্বারা পুরুষ ও স্ত্রী রুপে সনাক্ত করা যায় তাই লিঙ্গ। এবার আসুন, ছোট বেলা আমরা সবাই তো বাংলা ব্যাকরণে লিঙ্গ পরিবর্তন শিখেছি ..... যেমন ধরুন- বাবা (পুং লিঙ্গ)_মা(স্ত্রী লিঙ্গ), বর(পুং লিঙ্গ)_কনে(স্ত্রী লিঙ্গ), স্বামী(পুং লিঙ্গ)_ স্ত্রী(স্ত্রী লিঙ্গ), সিংহ(পুং লিঙ্গ)_ সিংহী(স্ত্রী লিঙ্গ)

বলেন এভাবে শিখেছেন কিনা ....?? তাহলে এখানে লিঙ্গ মানে কি ...?? চিহ্ন না Penis ....?? যদি Penis হয়ে থাকে তাহলে যে মুসলিম ভাই এই ধরনের কথা বলে তার মায়ের একটা Penis আছে। কারন, বাংলা ব্যাকরণ বলছে মা স্ত্রী লিঙ্গ।। তাহলে উনার মা একজন হিজড়া। একইভাবে তাহলে কনের Penis আছে, স্ত্রীরও Penis আছে সিংহীরও Penis আছে। আর একটি যুক্তিতে আসুন, লিঙ্গ শব্দের অর্থ Penis হলে বাংলা ব্যাকরণে লিঙ্গ পরিবর্তন বিষয়টি থাকত না । তাহলে লিঙ্গ পরিবর্তন হতো কিভাবে ....?? এটা কি পরিবর্তন করা সম্ভব ?? সার্জারী করে লিঙ্গ পরিবর্তন ছাড়া আর কোনভাবেই সম্ভব না। বাবার লিঙ্গ কেটে মায়ের মধ্যে লাগানো ছাড়া সম্ভব না। একইভাবে সিংহের Penis খুলে সিংহীর মধ্যে না লাগানো পর্যন্ত সম্ভব না !! তাহলে লিঙ্গ মানে Penis নয়। এর আভিধানিক অর্থ হলো চিহ্ন। সংস্কৃততে লিঙ্গ শব্দের অর্থ ”চিহ্ন” । আর শিশ্ন মানে হচ্ছে পুরুষ যৌনাঙ্গ !!! কেউ মহাদেবের সাকার রুপের পূজা করে আবার কেউ তার অস্তিত্বের চিহ্নের (লিঙ্গ) পূজা করে। বুঝলেন এবার.. ..?? মুর্খদের দাঁতভাঙা জবাব দিন। শিবলিঙ্গ সম্পর্কে এ ধরনের বিভ্রান্তি থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে এবং আমাদের শিবত্বে উন্নীত হতে হবে।

♦♣♦অন্যান্য কিছু নিয়ে আলোচনা-

♦শিব সম্পর্কে আরো অনেক উল্টা পাল্টা কথা শোনা যায় যেমন শিব মদ গাজায় আসক্ত--

সর্বক্ষণের জন্য মহাদেবের কাছে আছে দুটি অনুচর- নন্দী এবং ভৃঙ্গী। এরা কিসের প্রতিক? নন্দী শব্দের উৎপত্তি নন্দ ধাতু থেকে মানে আনন্দ আর ভৃঙ্গী এসেছে ভৃ-ধাতু থেকে মানে ভরণ, পোষণ ও ধারণ করা। আর এটা তো স্বাভাবিক, যে মঙ্গল যাবে সেখানে তার প্রিয় অনুচর আনন্দ, ভরণ, পোষণ ও ধারণ সেখানে চলে যাবে। নন্দীর আগমনের সাথে সাথে পাই প্রেরণা অর্থ্যাৎ মানুষের মধ্যে বেড়ে ওঠা সহ্য, ধৈর্য্য ও অধ্যবসায়ের গুণরাজি। অপরপক্ষে ভৃঙ্গী হল কারক। সংসারে-সমাজে চলতে হলে মানুষের এইসব ব্যাক্তিত্ব থাকা একান্ত প্রয়োজন নইলে তার কপালে সাফল্য জুটবে না। নাটক বা ছবিতে দেখা যায় নন্দী এবং ভৃঙ্গী শিবের কাছে বসে সিদ্ধি ও গাঁজা টানছে, আপনাদের মতে বলে যিনি মঙ্গলের প্রতিক তার দুই অনুচর আনন্দ,ভরণ, পোষণ ও ধারণ করার প্রতিক, তারা কিনা সিদ্ধি ও গাঁজা খাচ্ছে এটা কি বিশ্বাসযোগ্য ? এখানে সিদ্ধি ও গাঁজা হল কর্মের কৃতার্থ হওয়ার পরমান্দ তথা আত্মপ্রসাদের প্রতিক যা কোনো মাদক দ্রব্যে নয়। নন্দী আনন্দদায়ীর কারক ও ভৃঙ্গী যা ভরণ-পোষণের কারক, এই দুই বিহিত ব্যাবহার ও অনুশীলনের ভিতর দিয়েই জেগে ওঠে কার্যসিদ্ধির সৌন্দর্য্য। আর প্রকৃত শিব-ব্যাক্তিত্বই হল কার্যসিদ্ধির উৎস। তাই তো প্রকৃত শিব-ব্যাক্তিত্ব বিশিষ্ট্য ব্যাক্তি কর্মের কৃতার্থ হওয়ার পরমান্দ তথা আত্মপ্রসাদ কে সেবন করে নেশাগ্রস্থ আনন্দ লাভ করে কোনো সিদ্ধি ও গাঁজা টেনে নয়।

♦♦শিবলিঙ্গে দুধ ঢালা হয় কেনো ?

সমুদ্র মন্থনের সময় হলাহল নামক মারাত্মক বিষ উত্থিত হয় যার চারিদিকে ছড়িয়ে পড়া ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল জীবের জীবন বিপন্ন করার ক্ষমতা ছিল অত্যধিক । সকল দেবতাদের অনুরোধে ভগবান শিব সবাইকে রক্ষা করার ঐশ্বরিক দায়িত্ব নেন । তিনি সব বিষ পান করেন এবং তার কন্ঠে এটি সংরক্ষণ করে রেখে দেন ।
হলাহল বিষের বিষাক্ততা মাত্রা ছিল অসীম, যদিও এটি ভগবান শিবের উপর কোন প্রভাব ফেলে নাই। কিন্তু হলাহল বিষের তাপমাত্রা ছিল অস্বাভাবিক, এই তাপমাত্রার প্রভাব শান্ত করার জন্য দেবতারা মহাদেবের জন্য গঙ্গা অভিষেক করেন । এই গঙ্গা অভিষেকে শুধু সাপ এগিয়ে আসে ভগবান শিবের ঐশ্বরিক কারণ সমর্থনের জন্য । তারা নিজেরাও বিষের কিছু অংশ পান করে ও তাদের বিষদাঁতে কিছু বিষ গ্রহণ করে । সেদিন থেকেই কিছু সাপ বেশি বিষাক্ত হয়ে ওঠে । শিবের উপাসকদের দ্বারা শিবলিঙ্গে এই দুধ ঢালার কারণ হচ্ছে সেই গঙ্গা অভিষেকের প্রতীকী উপস্থাপন ,যেটা সমুদ্র মন্থনের সময় করা হয়েছিল । এর মাধ্যমে শিবভক্তরা দেবতাদের মত শিবের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে । এখন অনেকে বলে থাকেন শিবলিঙ্গে দুধ ঢেলে দুধ অপচয় করা হচ্ছে, এটান মোটেও সঠিক কথা নয় । কারণ এই দুধের বেশ খানিকটা অংশ চরণা-অমৃত বানানোর জন্য ব্যবহার করা হয় এবং ভক্তদের ভিতর প্রসাদরূপে বিতরণ করা হয় । তাই দুধ ঢালা কোনক্রমেই অপচয় নয় ।

♣♣শিবতত্ত্বঃ
জ্ঞানের রাজ্য পার হয়েই জানা যায় শিবকে। জ্ঞানদায়িনী দেবী সরস্বতী পূজার পরই আসে শিবরাত্রি। এরও একটি গভীর তাৎপর্য আছে। দেবী সরস্বতী হংসরূঢ়া। হংসটি কিন্তু সাধারণ হংস নয়। মানুষের কূটস্থে যে দ্বিদলপদ্ম আছে, এতে “হং” এবং “সঃ” দুইটি বীজ। এই দুইটি বীজে দৃষ্টি স্থির রাখতে পারলেই জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রজ্ঞানক্ষেত্র খুলে যায়। আবার জ্ঞানক্ষেত্রে চতুর্বেদ রাগিনী সরস্বতী উপবিষ্ট। তাই ইন্দ্রিয়-মন-বুদ্ধিকে সুসংযত করে কুটস্থে রাখতে পারলে সরস্বতীর কৃপা লাভ সম্ভব। জ্ঞানক্ষেত্র পার হলে পৌঁছা যায় ব্যোমক্ষেত্রে আমাদের কূটস্থের পর দহরাকাশ, চিদাকাশ, পরাকাশ, মহাকাশ ও আত্মাকাশ। এই পঞ্চ আকাশেই ব্যোমক্ষেত্র বা শিবক্ষেত্র। এ জন্যই শিবের অপর নাম পঞ্চানন। মানুষ সাধন ক্রিয়া দ্বারা এই ব্যোমক্ষেত্রে পৌছালে শিব শীঘ্র তুষ্ট হন। এ জন্য শিবের আর এক নাম আশুতোষ।

♦এছাড়াও শিব আরও যে যে রূপে মূর্ত হন তা নিম্নরূপ :
০১। চন্দ্রনাথদেবেরই আর এক নাম শিব। শিব অর্থ মঙ্গল বা শুভ। পুনর্জন্ম নিরোধ করে অর্থাৎ মোক্ষ দান করে তিনি জীবের মঙ্গলই করেন। তিনি আবার পঞ্চানন নামেও খ্যাত। পঞ্চ আনন (মুখ) যাঁর তিনিই পঞ্চানন। পঞ্চমুখ দেবতাই শিব।

০২। ‘ওঁ’-তত্ত্বের ত্রিদেবতা- ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর। পঞ্চানন শিবই এই মহেশ্বর। মহেশ্বরী শক্তির অধিকারী তিনি। মহাপ্রলয়ের নটরাজ তিনি। তিনি ঈশান নামেও খ্যাত। ঈশান-ই বিষাণে অর্থাৎ শিঙ্গায় ফুঁ দিয়ে তিনি মহাপ্রলয় ঘোষণা করবেন।

০৩। মহাশক্তির দেবতা মহেশ্বর। সকল দেবতা ঐক্যশক্তি দিয়ে যা করতে পারেননা, মহেশ্বর একাকী তা সম্পন্ন করতে সমর্থ। দেবতার মাঝে বিচিত্র অদ্ভূতকর্মা দেবতা তিনি।

০৪। মৃত্যুকে জয় করেছেন বলে তিনি মৃত্যুঞ্জয়। তাইতো তিনি অকাতরে সমুদ্র মন্থনের হলাহল অর্থাৎ বিষ কণ্ঠে ধারণ করেছেন। বিষের ক্রিয়ায় তার কণ্ঠদেশ হয়েছে নীল। সে কারণে তার নাম নীলকণ্ঠ।

০৫। বাঘের চামড়াকে বলে কৃত্তি। কৃত্তি পরিধান করে নাম ধরেছেন কৃত্তিবাস।

০৬। বিচিত্রকর্মা মহেশ্বর। অর্থাৎ তার সকল কর্মই অদ্ভূত ও বৈচিত্র্যময়। গঙ্গার ধারা ধারণকালে ত্রিশূল হাতে তিনি হিমালয়ের পাদদেশে থমকে দাঁড়িয়েছেন এবং মস্তকের জটাজুটকে উত্থিত করে দিয়েছেন ব্যোমে অর্থাৎ আকাশের দিকে এবং নাম ধরেছেন ব্যোম্‌কেশ। তার সেই উত্থিত জটাজুটের মাধ্যমে গঙ্গার ধারা পৃথিবীতে নেমে আসে। তবেই না মর্ত্যের মানুষ গঙ্গার পূত-পবিত্র সলিলে অবগাহন করে নিষ্পাপ হচ্ছে এবং মরণের পরে স্বর্গবাসী হচ্ছে।

০৭। ‘ধূর’ শব্দের অর্থ জটাভার বা ত্রিলোকের চিন্তাভার। মহাদেব চন্দ্রনাথই শিরে জটাভার ধারণ করেন অথবা ত্রিলোকের চিন্তাভার ধারণ ও বহন করেন। এসকল ভার বহন ও ধারণের কারণে তারই নাম ধূর্জটি।

০৮। ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যে বলা হয়েছে-‘কোন গুণ নাই তার কপালে আগুন’। এখানে ‘গুণ নাই’-এর অর্থ সত্ত্বঃ, রজ ও তম গুণের অতীত। মহাদেব ত্রিগুণাতীত। তিনটি নেত্র বা লোচন তার। একারণে দেব ত্রিলোচনও বলা হয় তাকে। তার ললাটের তৃতীয় নয়ন দিয়ে সর্বদাই ধক্‌ ধক্‌ করে আগুন জ্বলতে থাকে। ‘কপালে আগুন’ বলতে অন্নপূর্ণা দেবী ইঙ্গিতে মহাদেবের ললাট নেত্রের কথাই বলেছেন। আগুন আলোর প্রতীক। অন্ধকার দূর করতে আলোরই প্রয়োজন। তার ত্রিনেত্রের অগ্নি জ্ঞানরূপে আলো জ্বালানোর প্রতীক। অর্থাৎ মানুষকে জ্ঞান-চর্চা করতে হবে।

০৯। ত্রিগুণাতীত বলে শিব সর্বদাই নির্বিকার নির্বিকল্প। তাই শবরূপে তিনি শ্রীকালী মাতার চরণতলে শায়িত। শবরূপে শিব মানুষকেও বিকার রহিত হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। কারণ শবেরইতো কোন বিকার নেই। তার ত্রিশূলও ত্রিগুণের প্রতীক। তিনি নিজে ত্রিগুণাতীত হয়ে মানুষকেও তার হস্তধৃত ত্রিশূল দেখিয়ে ত্রিগুণাতীত হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন।

১০। শিব ‘হর’ এবং ‘শম্ভু’ নামেও খ্যাত। তিনি জীবের চিত্তকে, তাদের পাপকে হরণ করেন এবং কালপূর্ণ হলে জীবের জীবনকেও হরণ করেন। এসকল হরণ করার কারণে তার নাম ‘হর’। আবার তিনিই জীবের যম-ভয় অর্থাৎ শঙ্কা হরণ করে তাদের কল্যাণ সাধন করেন। তার নাম গ্রহণ করলেই আর কোন শঙ্কাই থাকে না। এ কারণে শংকর তার নাম। আবার ‘শম্‌’ শব্দের অর্থও কল্যাণ। যেহেতু তিনি কল্যাণ দান করেন, সেহেতু ‘শম্ভু’ নামেও তিনি বিশ্বখ্যাত।

১১। ত্রিপুর নামক অসুরের অত্যাচারে ত্রিপুরাবাসী অর্থাৎ স্বর্গ-মর্ত্য-পাতালবাসী দেবতা, মানব এবং যক্ষকুল অতীষ্ট হয়ে উঠেছিলেন তখন শিব শরাসন থেকে শর নিক্ষেপ করে ত্রিপুরাসুরকে নিধন করেন। আর এই ত্রিপুরাসুরকে নাশ করে নাম ধরেছেন দেব ত্রিপুরারি।

১২। শিব অল্পেই বা শীঘ্রই সন্তুষ্ট হন। এ কারণে তাঁর এক নাম আশুতোষ।

১৩। শিব দেবগণ কতৃক বন্দিত, তাই তাঁর নাম মহাদেব।

১৪। শিব সকল জীবের প্রভু, তাই তিনি ঈশান।

১৫। শিবের জন্মদাতা বা জন্মদাত্রী কেউ নেই, তাই তিনি স্বয়ম্ভু।

১৬। প্রতিকল্পে আপন লীলা মহিমায় তিনি ব্রহ্মাণ্ডের ধ্বংস সাধন করেন, তাই তিনি মহাকাল।

সত্যই জগতের প্রতিটি বস্তুকণায় শিবের অস্তিত্ব বর্তমান। “যত্র জীব-তত্র শিব”-পরমপুরূষ শ্রীরামকৃষ্ণ কঠোর সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে এ সত্যই উপলব্ধি করেছেন। সুতরাং আমাদের সকলের উচিৎ জীব সেবার মাধ্যমে শিব সেবায় ব্রতী

WRITTEN by : Pronob Sarkar
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জুলাই, ২০১৬ বিকাল ৩:৩৫
১০টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চিরবিদায়ে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় শায়িত ডা. খায়রুল ইসলাম – Regional Director for South Asian Countries, WaterAid UK

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৫৪




২০ অগাস্ট ২০২৬, বৃহস্পতিবার রাতে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে ফিরে ঘুমাতে ঘুমাতে কিছুটা দেরি হয়ে গিয়েছিল। ফলে সকালে উঠতেও দেরি। আগের দিন দুপুরে বিদ্যুৎ এক ঘণ্টার জন্য চলে যাবার পর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আন্দোলনের সময় বেকারদের দরকার ছিল, এখন কি আর নেই?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:২০


সারজিস আলমকে দেখে একসময় মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের রাজনীতিতে হয়তো সত্যিই নতুন কিছু আসতে যাচ্ছে। কোটা আন্দোলনের আইকনিক মুখ, গর্বিত ঢাবিয়ান, এনসিপির বড় নেতা। শেখ হাসিনার আমলে সকাল বিকাল... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হবে?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৩২

বাংলাদেশ কি মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হবে?

প্রশ্নটি এখন আর নিছক কল্পনা নয়।
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান Makkah Joint Defence Agreement-এ স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা জানেন না তাদের জন্য! কফি এনিমা (Coffee Enema)!

লিখেছেন সাহাদাত উদরাজী, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৩

কফি এনিমা হলো মলদ্বার দিয়ে কোলন বা বৃহদন্ত্রে তরল কফি প্রবেশ করিয়ে পেট পরিষ্কার করার একটি বিকল্প পদ্ধতি। নিচে এটি শরীরে দেওয়ার সাধারণ প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে উল্লেখ করা হলোঃ

প্রয়োজনীয় উপকরণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×