বাসা থেকে প্রায় ২৯০ কিলোমিটার দূরে পড়াশোনা করি আমি। এখন পর্যন্ত ৩৩ দিনের বেশি একটানা ক্যাম্পাসে থাকা হয়নি আমার। ঘন ঘন বাসায় আসার কারনে যাওয়া আসা মিলে সঞ্চিত হয়েছে একই রুটে প্রায় ২১ টি সুদীর্ঘ বাস জার্নির অভিজ্ঞতা। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়ার কারনে বেশির ভাগ জার্নিই হয়েছে নরমাল কোচে যা প্রকৃতপক্ষে লোকাল বাস। এসব বাসে চলাচলের একমাত্র উদ্দেশ্য হল একটু কম ভাড়ায় যাতায়াত। আর এসব লোকাল বাসে চলাচল করতে গিয়েই আমার সঞ্চিত অভিজ্ঞতার সাথে যুক্ত হয়েছে নানা রকম প্রীতিকর – অপ্রীতিকর ঘটনা। হাজারো মানুষের হরেক রকম আচারন মাঝে মাঝেই চোখ ঝলসে দিয়েছে আমার।
কিন্তু এবারের অভিজ্ঞতাটা ছিল আসলেই অন্যরকম। লোকাল বাসে কিছু বিকৃত মানসিকতার লোক সবসমই চোখে পরে। এসব লোকগুলোর একমাত্র কাজই হয়ত বাসের যেসব সিটগুলোতে কোন মেয়ে বসে থাকে নানা উছিলায় সেসব সিটের পাশে থাকার চেষ্টা করা। এ ধরনের বীরপুরুষ(!!!) আমাদের দেশে কোন আজব চিড়িয়া নয়। একটু অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে তাকালেই এদের দেখা পাওয়া যায়।
আমার সর্বশেষ অভিজ্ঞতাটি ছিল এ কেন্দ্রিক। এবার জার্নিতে আমার সঙ্গী ছিল আমার ছোট বোন এবং তার সাথে আরো কয়েকজন মেয়ে যাত্রী। টানা তিন ঘন্টা একা জার্নি করার পর সহযাত্রী হিসাবে এদের তুলে নেই আমার যাত্রাপথের একটি জেলা থেকে। আমি সহ মোট যাত্রীসংখ্যা ছয় জন। তিনটি টু ছিটে দেয়া হল আমাদের সিট। পেছনের দিকের সিটটিতে বসলাম আমি আর আমার বোন। তারপরের একটি লাইন বাদ রেখে পরপর চারটি আসনে অন্য চারজন সহযাত্রী। বাস চলার কিছুক্ষন পরই সেই বীরপুরুষদের আনাগোনা দেখা যেতে লাগল।
রাস্তাঘাটে সামনাসামনি প্রতিবাদ করার অভ্যাস আমার কখনই ছিল না। ঘৃনার দৃষ্টিতে দেখে যেতে লাগলাম বীরপুরুষদের আনাগোনা।
কিছুক্ষনের মধ্যেই এক চাচা মিয়ার উদ্ভব হল। তার মাথার টাকটি মাল মুহিতের মত চকচকে না হলেও মোটামোটি চলনসই ছিল। চাচা মিয়া আমার সাথে থাকা সবচেয়ে সামনের সারিতে বসা বোনদের সিটের পাশে বীরত্ব প্রদর্শন করতে লাগল। বীরত্ব প্রদর্শনের পরিমানটা সময়ের সমানুপাতিক হারে বাড়তে লাগল। এক সময় চাচা মিয়া সিটের উপর মোটামোটি ঝুকে গেলেন।
পেছনের সিট থেকে পর্যবেক্ষন করছিলাম আমি। প্রতিবাদ করার কোন ইচ্ছা ছিল না প্রথমে। কিন্তু আমার রক্তের উষ্ণতার কাছে সিদ্ধান্ত পরাজিত হল। আর সহ্য করতে পারলাম না।
“Excuse me, uncle আপনি অন্য কোন সিটের সাথে হেলান দেন। উনাদের কষ্ট হচ্ছে দেখছেন না? এটা কোন ধরবের ভদ্রতা?? মন্দ না শোনা পর্যন্ত আপনাদের বিবেক নাড়া দেয় না??” কথাগুলো ধমকের সুরেই বলে ফেললাম।
টাক মাথার সামনের সুবিশাল কপালের চামড়া কিঞ্চিত কুঞ্চিত করে একটু সরে গেলেন চাচা মিয়া। কিন্তু নাছোড়বান্দা ছিলেন চাচা মিয়া। কিন্তু আমার দৃষ্টি চাচার টাক মাথার দিক থেকে না সরানোর ফলে নিজেকে বীরপুরুষ প্রমান করার সুযোগ তিনি পাননি। এখানে নিজেকে জাহির করার কোন ইচ্ছাই নেই। বরং এ ধরনের অভিজ্ঞতা আমার প্রথম প্রতক্ষ বলেই লিখলাম। যদিও বীরপুরুষ(!!!) দেখেছি বহুবার।
আসলে আমাদের সমাজে কিছু মুসলিম(!!) পুরুষ আছে যারা নিজেদের নিয়ন্ত্রন শয়তানের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। মেয়ে দেখলেই শয়তান এদের পুরুষত্ব জাগিয়ে তোলে। আর এদের কাতারেই যখন কোন বাবার বয়সী লোককে দেখি তখন বাঁ হাতের আঙ্গুলগুলি সজোরে বসিয়ে দিতে ইচ্ছে করে তার ভগ্নপ্রায় গালের উপর।
আর এ কারনেই লোকাল বাসে একা চলাচল করা কোন পর্দানশীল বোনের জন্য আমি নিরাপদ মনে করি না। কোন মুহাররম পুরুষ ছাড়া এসব লোকাল বাসে উঠলেই কোন না কোন পর্যায়ে বীরপুরুষদের তীক্ষ্ণ বীরত্বের মোকাবিলা করতেই হবে।
আর একটি বিশ্লেষন বাকি আছে। তা হল এসব বীরপুরুষ(!!) কেন রাস্তাঘাটে নিজেদের বীরত্বপ্রকাশ করার জন্য উঠেপরে লাগে। আমার মতামত হল এর পেছনে শতভাগ দায়ী সমাজের ঐসব নারীরা যারা so called সমানাধিকারের কথা বলে নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করে বেড়ায়। এরা সামান্য অর্থের বিনিময়ে দুই টাকা দামের চকলেটের প্যাকেটের উপর নিজের চিত্রিত করে এক অস্বাভাবিক আনন্দ পায়। তাই আজকের পুরুষ জাতি মেয়েদেরকে চকলেটের প্যাকেটের মতই মূল্যহীন মনে করে আর মাঝে মাঝেই এর ভিকটিম হতে হয় হিজাব পরা বোনদের।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



