বাংলাদেশের অর্থনীতির তিনটি খাতে বিগত বছরগুলোয় ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে- তৈরি পোশাক শিল্প, বিদেশে বাংলাদেশীদের জন্য চাকরির সুযোগ এবং রপ্তানির লক্ষ্যে মৎস ও চিংড়ি চাষ। এসব সাফল্যের জন্যে অবশ্য সরকারের বাহবা নেয়ার কোন সুযোগ নেই। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের মাঝ থেকেই জন্ম নিয়েছে এসব উদ্যোগ এবং তারাই সম্ভব করেছে এর অগ্রগতি। দেশের অর্থনীতিতে এদের অবদান বার্ষিক প্রায় ১৭৮০ কোটি মার্কিন ডলার। দেশটাকে টিকিয়ে রেখেছে তারাই এবং লাখ লাখ মানুষের জন্য তৈরি করেছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। বিশেষত তৈরি পোশাক খাতে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে আমাদের প্রায় বিশ লাখ নারী। পরোক্ষভাবে, এর কারণে সম্ভব হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন, নারী শিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা এবং পুষ্টিমানের উন্নয়ন।
দেশের অনেক বিশ্লেষক এবং তথাকথিত বিশেষজ্ঞই গত দুই দশক ধরে তৈরি পোশাক শিল্পখাতের অব্যাহত অগ্রগতি সম্পর্কে ছিলেন সন্দিহান। তাদের পক্ষ থেকে এমএফএ পরবর্তীকালে এ খাতের সাফল্য বিষয়ে উত্থাপিত হয়েছে নানা প্রশ্ন। আজ প্রমাণ হয়েছে তারা ভুল। পরবর্তীতে এ খাতের রপ্তানি সংশ্লিষ্ট কতিপয় শর্ত বিবেচনায় সন্দেহ করা হয়েছে যে নিটওয়্যার এবং উভেন খাত দুটোই আশাপ্রদ ফল দেখাতে পারবে কিনা। ক্যাসান্ড্রা এখন অবধি সঠিক প্রমাণ হয়নি। বিস্তর বিপত্তি সত্ত্বেও এ খাত এখন পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছে তার সমৃদ্ধি।
আগস্ট মাসের শেষ দিকে বিজিএমইএ জানিয়েছে ২০১৩ সাল নাগাদ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে আড়াই হাজার কোটি মার্কিন ডলার। সেখানে আরো বলা হয়, আমাদের পণ্যের গুণগত মান এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের সুবাদে বায়াররা দারুণ খুশি। যদিও পাশাপাশি আমাদের মনে রাখতে হবে এ শিল্পের রুগ্ন অবকাঠামো এবং মাঝারি স্তরের ব্যবস্থাপনায় দুর্বল লোকবলের কথা।
বিজিএমইএ বলতে ভুলে গেছে আরো কয়েকটি বিষয়ের কথা যেগুলো আমাদের এ খাতের অগ্রগতিকে বিঘ্নিত করছে ব্যাপকভাবে- অপর্যাপ্ত গ্যাস এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ, স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চহারে ফ্রেইট চার্জ, সুতার মূল্য বৃদ্ধি, পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির মূল্য বৃদ্ধি।
এসবের ওপর যোগ হয়েছে ওয়াল-মার্টের (বিশ্বের বৃহত্তম খুচরা পোশাক বিক্রেতা এবং বাংলাদেশ থেকে বার্ষিক ১৭০ কোটি মার্কিন ডলারের আমদানিকারক) এক সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। তাদের দাবি, বাংলাদেশে তাদের বর্তমান অর্ডারের ওপর ২ শতাংশ রিবেট দিতে হবে। ওয়ালমার্টের একজন প্রতিনিধি বলেছেন বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অনুমান, এর একটি কারণ হতে পারে আমেরিকার অর্থনীতির সাম্প্রতিক অধঃপতন। আশংকিত হবার কারণ রয়েছে আরো- গত অর্থবছরে রপ্তানিযোগ্য স্থানীয় পোশাকের মূল্যসূচক এক শতাংশের অধিক হ্রাস পেয়েছে। এদিকে, আরইউ মৃধার ভাষ্যে, বাংলাদেশে ব্যবসা করার ব্যয়, বিশেষত তৈরি পোশাক খাতে, বৃদ্ধি পেয়েছে ১৫ শতাংশেরও বেশি।
আরো একটি বিষয় যা বাধাগ্রস্ত করছে আমাদের তৈরি পোশাক খাতের মুনাফা, তা হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে এ খাতে আমাদের স্থানীয় প্রস্তুতকারকদের অনভিজ্ঞতা। ক্রমাগত সাফল্য সত্ত্বেও আজ অবধি আমাদের তৈরি পোশাক খাতের অধিকাংশ ব্যবসাই পরিচালিত হয় মিডলম্যান দিয়ে। বস্তুত প্রকৃত সাফল্য পেতে হলে আমাদের বাজার নেটওয়ার্ককে কাজ করে যেতে হবে আরো বহুদূর।
উপরোল্লিখিত বিষয়সমূহের সঙ্গে এই মুহূর্তে যুক্ত হয়েছে আরো বড় একটি সমস্যা সেটি হলো ধ্বংস আর ভাংচুর। উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে তোলে যে ঘটনাটি তা হচ্ছে, হামলার শিকার হচ্ছে যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠান তারা সবাই ২০০৬ সালে শ্রমিক এবং মালিকসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের মধ্যেকার এক ত্রিপক্ষীয় চুক্তি মেনে চলার পক্ষপাতী। মিডিয়ার খবরে প্রকাশ, ২০০৮ সালের জানুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত কারখানার সংখ্যা দেড় শ। এর ভেতর রয়েছে আগস্ট এবং সেপ্টেম্বরে আরো চব্বিশটি ভাংচুরের ঘটনা। শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরো চার শ কারখানা। পরিসংখ্যানটি উদ্বেগজনক, কারণ এটি গোটা তৈরি পোশাক শিল্পখাতের প্রায় দশ ভাগ। অভিযোগ রয়েছে অগ্নিসংযোগ এবং ভাংচুরের সঙ্গে এমন সমস্ত লোক জড়িত রয়েছে যারা কারখানার মালিক কিংবা নিরাপত্তা রক্ষীদের সম্পূর্ণ অচেনা। এদের বলা হচ্ছে বহিরাগত। আরেকটি হতাশাজনক অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত কারখানার ম্যানেজমেন্ট। তারা বলছেন এসব হামলা এবং ভাংচুরের সময় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মাঝে মধ্যে পাওয়া গেলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা কার্যকর কোন ভূমিকা রাখেনি। এর ফলে যৌক্তিকভাবেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা চেয়ে সরকারের কাছে দাবী উত্থাপন করেছেন কারখানা মালিকরা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


