somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

খুজি ফিরি সিথানের বালিশ

০২ রা জুলাই, ২০০৭ রাত ১১:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মানব জীবনের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বালিশ একটি অতি প্রয়োজনীয় অথচ স্বল্প আলোচিত উপাদান, যা সাধারণত ঘুমানোর সময় মাথায় সাপোর্ট দিতে ব্যবহৃত হয়। অবশ্য অলঙ্করণময় বালিশ কমফোর্ট বা সাপোর্টের জন্য নয়, ঘরের ভেতরের শোভা বাড়ানোই এটার উদ্দেশ্য। কিন্তু স্বস্তিদায়ক ঘুম পেতে হলে যে বালিশ চাই।
ধারণা করা হয়, সভ্যতার ঊষালগ্নেই বালিশের প্রয়োজনীয়তা মানুষ উপলব্ধি করতে পেরেছিল। প্রাচীন বালিশ সাধারণত খড় বা পাথর দিয়ে তৈরি হতো। এটা অস্বস্তিকর হলেও মানুষ দীর্ঘকাল তা-ই ব্যবহার করেছে। বর্তমানে খড় বা পাথরের বালিশ আর নেই। তুলার তৈরি বালিশের প্রাধান্য এখন বেশি। অবশ্য আর্থিক সঙ্গতিপন্নরা পাখির গরম পালক বা রোম দিয়ে তৈরি বালিশ ব্যবহার করেন। কৃত্রিম আশের তৈরি বালিশের প্রচলনও বেড়ে গেছে। কারণ এটা পাখির পালকের তৈরি বালিশের চেয়েও নরম। এশিয়ার অনেক অঞ্চলে গমের তুষের তৈরি বালিশের প্রচলন রয়েছে। আকারে গমের তুষের তৈরি বালিশ বেশ ছোটই হয়ে থাকে।
বালিশের ভেতরের উপাদান যা-ই হোক না কেন, বাইরের আবরণ সাধারণ কাপড় বা রেশম দিয়েই তৈরি হয়। আবার বালিশ ঢেকে দেয়ার জন্য থাকে পিলো কেইস বা পিলো স্লিপ। এটা মূলত একটি কভার। এটার তিন প্রান্ত সেলাই করা থাকে। বাকি প্রান্ত খোলা বা জিপার লাগানো থাকে।
বালিশ ধোয়া যায় না। কিন্তু বালিশের কভার ধোয়া যায়। তবে শুধু কভার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমে বালিশকে নিরাপদ বা স্বাস্থ্যসম্মত রাখা যায় না। গবেষকরা বলেন, বালিশের দুটি সাধারণ সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, বালিশে প্রচুর ধূলিকণা জমে। দ্বিতীয়ত, বালিশে বাস করে কোটি কোটি অণুজীব। তাই প্রতি দুই বছর পরপর বালিশ পাল্টে ফেলা উচিত। বিশেষত যাদের অ্যালার্জি রয়েছে তাদের বেশি পুরনো বালিশ ব্যবহার ঠিক নয়।
বালিশের প্রকারভেদ
বালিশের উদ্দেশ্য ঘুমানো বা বিশ্রামকালে দেহের সাপোর্ট ও কমফোর্ট। সাধারণভাবে বালিশকে মোট তিন ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন বেড পিলো বা বেড বালিশ, অর্থপেডিক বালিশ ও আলঙ্কারিক বালিশ।
বেড বালিশ সাধারণত আয়তন ক্ষেত্রাকার হয়। এ বালিশের তিনটি সাইজ হচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড (২০ ইঞ্চি ´ ২৬ ইঞ্চি), কুইন (২০ ইঞ্চি ´ ৩০ ইঞ্চি) ও কিং (২০ ইঞ্চি ´ ৩৬ ইঞ্চি)। এ বালিশে সাধারণত খুলে ফেলা যায়, এমন ধরনের কভার লাগানো থাকে। এতে বালিশ কভার প্রায় যেমন আয়রন করা যায়, তেমনি বিছানাও সতেজ থাকে।
বেড বালিশের আরেকটি বিশেষ রূপ হচ্ছে বডি পিলো বা দেহ বালিশ। এ বালিশ একজন পূর্ণ বয়স্ক ব্যক্তির সমান লম্বা। এ বালিশ ওপরের দিক থেকে মাথা, ঘাড় আর নিচের দিক থেকে হাটু-পা পর্যন্ত সাপোর্ট দেয়। যারা এক পাশে কাত হয়ে ঘুমায়, বিশেষত যারা গর্ভবতী, তাদের জন্য এ বালিশ উপকারী।
চিকি॥তসায়ও রয়েছে বালিশের উপযোগিতা। এসব বালিশ অর্থপেডিক বালিশ নামে পরিচিত। ঘাড় বালিশ (নেক পিলো), ভ্রমণ বালিশ (ট্রাভেল পিলো), ডোনাট পিলো আর লাম্বার পিলো সাধারণত অর্থপেডিক বালিশের পর্যায়ে পড়ে।
অসুস্থ রোগী শিরদাড়া সোজা রেখে যাতে নির্বিঘেœ ঘুমাতে পারে তার জন্য নেক পিলো বা ঘাড় বালিশ তৈরি করা হয়েছে। এ বালিশে রোগী মাথা ও ঘাড়ের সাপোর্ট পায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটা সার্জিকাল বালিশ নামেও পরিচিত।
অন্যদিকে ভ্রমণকালে যাত্রী বসা অবস্থায় তার মাথা ও ঘাড়ের উত্তম সাপোর্ট যাতে পেতে পারে, তার জন্য ট্রাভেল পিলোর উদ্ভব। ইংরেজি বর্ণ ইউ আকৃতির এ বালিশ থেকে মাথাটা এমনভাবে সরে যেতে পারে না, যাতে যাত্রীর মাথা হঠাৎ অস্বাভাবিক পজিশনের জন্য অস্বস্তি বোধ করে। অথবা গভীর ঘুমের সময় যাত্রীর মাথা হঠাত এমন কোনো অবস্থানে চলে গিয়ে ব্যথার সৃষ্টি হতে না পারে। প্লেনের যাত্রীরা সাধারণত এ জাতীয় বালিশ ব্যবহার করেন। তবে এ বালিশ ব্যবহারিক দিক থেকে এখনো পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত নয়।
আর ডোনাট বালিশ ব্যবহার করেন সেসব রোগী, যাদের টেইলবোন এরিয়ায় সমস্যা আছে অথবা যাদের মলাশয়ে সমস্যা বা ব্যথা রয়েছে। এ বালিশ দেখতে ডোনাটের (মাঝখানে ফাকা উপবৃত্তাকার পিঠা) মতো। এ বালিশে বসলে টেইলবোন এরিয়ায় চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে টেইলবোন এরিয়ার ব্যথা কিছুটা কমে যায়।
লাম্বার বালিশ ব্যবহৃত হয় ড্রাইভিং বা অফিসে চেয়ারে বসা অবস্থায়। গাড়ি বা চেয়ারে এ বালিশ সাটানো থাকে। এ বালিশ পিঠের নিচের অংশকে চমৎকারভাবে সাপোর্ট দেয়। এছাড়া হাটুর নিচে বালিশ রেখে পিঠের নিচের অংশের ব্যথা কমানোর উদ্যোগ নেয়া যায়। কারণ হাটুর নিচে এ জাতীয় অর্থপেডিক বালিশ ব্যবহার করলে পিঠের নিচের অংশ খুব একটা বেকে যাওয়ার সুযোগ পায় না। শুধু তাই নয়, ঘুমানোর সময় দুই হাটুর মাঝখানেও রোগীকে বালিশ ব্যবহার করতে দেয়া হয়। পিঠের মেরুদ- যাতে মোচড় না খায়, সেদিকে খেয়াল রাখতেই হাটুর মাঝখানে বালিশ ব্যবহার করতে দেয়া হয়। আবার পেটের নিচে বালিশ রেখে ঘুমানোর জন্য বিশেষ ধরনের বালিশ ব্যবহৃত হয়। এ জাতীয় বালিশ পিঠের ব্যথা কমায়। পিঠের নিচের ভাগের ব্যথা কমাতেও ভূমিকা রাখে।
আলঙ্কারিক বালিশের দুটি উদ্দেশ্য থাকে। প্রথমত, ঘরের শোভাবর্ধন। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনের সময় ব্যবহার। অবশ্য আলঙ্কারিক বালিশ এখন বিছানার পরিবর্তে সোফা, চেয়ার আর উইন্ডো সিটেও ঠাই নিয়েছে।
আলঙ্কারিক বালিশের ব্যবহারিক সীমাও এখন দিন দিন বাড়ছে। রুম বা লাউঞ্জে হাস্যরসের আবহ সৃষ্টি করতে বর্তমানে কলা, পাখি বা মানবাকৃতির বালিশ চোখে পড়ে। এসব বালিশ নোবেলটি পিলো নামে পরিচিত।
আলঙ্কারিক বালিশের আরেকটি সাব-সেট হচ্ছে ফোর পিলো। দেয়ালের পাশ ঘেষে এসব বালিশ চমৎকারভাবে উপস্থাপন করা হয়। আবার বিছানায় কোল বালিশও বেশ সমাদৃত। জাপানিজদের দাবি, কোল বালিশের উদ্ভাবক তারাই।
ইতিহাস
শুনতে বিস্ময়কর মনে হলেও এক সময় বালিশ শুধু ধনীরাই ব্যবহার করতেন। প্রাচীন ইজিপ্টের একাধিক সমাধিতেও বালিশ পাওয়া গেছে। তবে এসব বালিশ পাথরের তৈরি।
সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বালিশ গৃহস্থালি পণ্যের স্বাভাবিক অনুষঙ্গই শুধু হয়ে ওঠেনি, চমৎকার রঙ ও সেলাই টেকনিকের অকল্পনীয় বিকাশের প্রেক্ষাপটে বালিশ নিজেই একটি শিল্পমাধ্যম হয়ে গেছে। আলঙ্কারিক বালিশের যাত্রা শুরু এখান থেকেই।
ইতিহাসে পাওয়া যায়, চায়নায় প্রথম আলঙ্কারিক বা শৈল্পিক কারুকাজের বালিশ একটি মূল্যবান পণ্যে পরিণত হয়। ইওরোপে শৈল্পিক বালিশের কদর শুরু হয় মধ্যযুগে। আর বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ডেকোরেটেড টেক্সটাইল ও ডেকোরেটেড বালিশ উতপাদনের দরজা খুলে দেয় শিল্প বিপ্লব।
এটা ঠিক যে, সময়ের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বালিশের আকার ও উপাদানে তেমন একটা পরিবর্তন আসেনি। প্রাচীন গৃকের ধনী সম্প্রদায় কারুকাজ করা কুশন ও কোল বালিশে মাথা ও পা রেখে বিশ্রাম নিত। অন্য দিকে প্রাচীন ইজিপশিয়ানরা মাথাকে সিট অফ লাইফ বা জীবনের আসন জ্ঞান করতো। এ কারণে তারা মৃত ব্যক্তির মাথার নিচে দামি পাথরের বালিশ স্থাপনে সচেষ্ট থাকতো।
চায়নিজদের অদ্ভুত বিশ্বাস ছিল এ রকম : নরম বালিশ দেহের জীবনীশক্তি কেড়ে নেয়। আর এ বিশ্বাস থেকে তারা প্রাচীনকালে কাঠ, চামড়া, ধাতু ও সিরামিক দিয়ে বালিশ বানাতো। কিছু বালিশের ভেতর তারা ভেষজ লতাপাতাও রেখে দিতো। তাদের বিশ্বাস ছিল, এসব ভেষজ উপাদান নানা রোগ থেকে তাদের মুক্তি দেবে, সাদা চুল কালো বানাবে, পড়ে যাওয়া দাত গজাবে, এমনকি মধুর স্বপ্ন দেখতেও সহায়তা দেবে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ বিছানায় বালিশে মাথা রেখে শুধু চিত হয়ে ঘুমায় না, একপাশে কাত হয়ে শুয়ে সিলেন্ডার আকৃতির কোল বালিশ জড়িয়ে ধরেও ঘুমাচ্ছে। এসব কোল বালিশকে মাঝে মধ্যে বিছানার সমান লম্বা হতেও দেখা যায়।
উনবিংশ ও বিংশ শতকে বিছানায় হঠাৎ করে একটা নতুন ক্রেজ সৃষ্টি হয় পশ্চিমি বিশ্বে। বিছানায় স্লিপিং বালিশের পাশাপাশি একটি চৌকোনাকার বালিশ আলঙ্কারিক কভার দিয়ে ঢেকে দেয়া হতো। এতে নাকি বিছানাকে আধুনিক মনে হতো। অবশ্য ঘুমানোর আগে এ বর্গাকৃতি বালিশ সরিয়ে নেয়া হতো। বর্তমানে এ জাতীয় বালিশ সোফা সেট বা ঘরের মেঝেতে পাতা বিছানায় শোভা পায়।
বালিশের বিবর্তন তেমন বড় মাপের নয়। বর্তমানে বালিশ তৈরির উপাদানে কিছু পরিবর্তন এসেছে। গবেষকদের পরামর্শে এখন হাইপো-অ্যালার্জেনিক ফাইবার দিয়ে বালিশের বাইরের আবরণ তৈরি হচ্ছে। এতে যাদের প্রবল অ্যালার্জি রয়েছে অথবা যাদের ত্বক অত্যন্ত স্পর্শকাতর তারাও এখন ফাইবারের বালিশ ব্যবহার করতে পারছেন।
চায়নিজরা সুখনিদ্রার জন্য এক সময় বালিশের ভেতর ভেষজ লতাপাতা রেখে দিতো। একই চেতনায় উত্তম নাইট রেস্টের জন্য আধুনিক থেরাপিউটিকসরাও নিদ্রাবান্ধব বালিশ উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা করছেন। অন্যদিকে অর্থপেডিক বালিশের প্রসার দিন দিন বাড়ছে। নেক, ব্যাক ও লাম্বার পেইন থেকে স্বস্তি পেতে নিত্য নতুন ধরনের অর্থপেডিক বালিশ উদ্ভাবনের চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে বালিশের ভেতরের ফোমের মধ্যে জেল বা পানি আটকে রাখার পদ্ধতিও উদ্ভাবিত হয়েছে। এসব বালিশ অর্থপেডিক বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। অনেকে ফুসফুস, সাইনাস সমস্যা ও ফোলা চোখের কারণে উচু বালিশে মাথা রেখে ঘুমায় বা বিশ্রাম নেয়। অন্যদিকে হাইটেক বালিশও এখন বাজারজাত হচ্ছে। বালিশে সংযুক্ত হেডফোনের সাহায্যে দিব্যি গানও শোনা যাচ্ছে।
কোল বালিশ
এটা সরু ও লম্বা বালিশ, অনেকে যা জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে ভালোবাসে। বিশ্বের নানা প্রান্তের পাশাপাশি ইনডিয়ান সাব-কন্টিনেন্টে সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে গেছেকোল বালিশ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কথাশিল্পী শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একাধিক নায়কের কোল বালিশ প্রীতি ছিল লক্ষ্যণীয়। মোগল হেরেম থেকে বাংলার জমিদারদের কোল বালিশ আসক্তিও কারো অজানা নয়। জাপান ও ফিলিপিন্সেও কোল বালিশ চর্চা রয়েছে। তবে ধারণা করা হয়, প্রাচ্যে কোল বালিশ প্রীতি যতোটা প্রবল, পশ্চিমি বিশ্বে ততোটা প্রবল নয়। বাংলাদেশের মতো ইন্দোনেশিয়া, মালয়শিয়া, সিঙ্গাপুরেও কোল বালিশ প্রীতি চোখে পড়ার মতো বলে জানা গেছে। এ বালিশ টিউবাকৃতির বা গোলাকার। তাই অনায়াসে একে জড়িয়ে ধরে ঘুমানো যায়।
ইতিহাসে রয়েছে, প্রাচীনকালে যখন পশ্চিমি বিশ্বের কোনো বিবাহিত ব্যক্তি কাজ উপলক্ষে বাইরে যেতেন, তখন তার স্ত্রী তাকে বাশের তৈরি একটি কোল বালিশ সরবরাহ করতেন, যাতে ওই ব্যক্তি রাতের বেলা একাকিত্ব অনুভব না করে। এ কারণে ইংরেজিতে কোল বালিশের একটি সমার্থক শব্দ হচ্ছে ব্যাম্বু ওয়াইফ। পরবর্তীকালে বাশের কোল বালিশই ধীরে ধীরে বর্তমানের আকার ধারণ করেছে। এটা এখন তুলা, পালক বা আর্টিফিশিয়াল ফাইবার দিয়ে তৈরি হয়।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, এশিয়ান দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে কোল বালিশ প্রীতির হার চায়নিজ ও মালয় পরিবারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এসব পরিবারে শিশুদের ছোটবেলা থেকে বয়োপ্রাপ্তি পর্যন্ত কোল বালিশ জড়িয়ে ঘুমানোর জন্য উৎসাহিত করা হয়। তাদের বিশ্বাস, শিশুরা কোল বালিশ জড়িয়ে ঘুমালে তাদের মনের রাগ পানি হয়ে যায়। তাছাড়া সিঙ্গাপুরি ও মালয়িদের যুক্তি হচ্ছে, যেসব ঘর এয়ারকন্ডিশন্ড নয়, শীতকালে সেসব ঘরে একটি কম্বল দিয়ে শীত ঠেকানো কষ্টকর। এ ক্ষেত্রে কোল বালিশ মানুষকে উষ্ণতা দিতে পারে।
চায়নিজ পরিবারে এখনো ঐতিহ্য অনুসারে বাসরঘরে দুটি বালিশের পাশাপাশি একটি কোল বালিশ রাখার সামাজিক রীতি চালু রয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাদের যুক্তি হচ্ছে, কোনো কারণে মনের মিল না হলে নববধূ যদি আলিঙ্গনে আপত্তি জানায়, তাহলে বর যেন কোল বালিশ জড়িয়ে নিজের রাগটা দমন করতে পারে।
কোল বালিশ প্রীতি ইন্দোনেশিয়ানদের মধ্যেও প্রবল। ওখানকার অনেক হোটেলে বোর্ডারদের জন্য কোল বালিশ সরবরাহ স্বাভাবিক ব্যাপার। পশ্চিমি বিশ্বের হোটেলগুলোতে কোল বালিশ সরবরাহ করা হয় না, তার পরিবর্তে সরবরাহ করা হয় বডি পিলো বা দেহ বালিশ। এ বালিশের দুটো হাত থাকে। ব্যক্তি বালিশের এক হাতের ওপর মাথা রেখে বাকি হাতটি কোল বালিশের মতো বডি পিলোকে অনায়াসে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে পারে।
জাপানিজরা যে কোল বালিশ ব্যবহার করে তা তাদের ভাষায় দেকিমাকুরা। শব্দটির অর্থ হাগিং পিলো। বাংলায় আমরা কোল বালিশ বলতে যা বুঝি, এটা তা-ই। অবশ্য আকারগত দিক থেকে তা পশ্চিমি বিশ্বের বডি পিলোর মতোই, উপমহাদেশের কোল বালিশের মতো নয়। অধিকাংশ দেকিমাকুরার কভারে কার্টুন স্টাইলে নারীর প্রতিকৃতি মুদ্রিত থাকে অথবা এমব্রয়ডারির মাধ্যমে তাতে লাভ পিলোর আবহ ফুটিয়ে তোলা হয়। এ কারণে মাঝে মধ্যে জাপানি দেকিমাকুরাকে ডাচ ওয়াইফ নামেও ডাকা হয়। ফিলিপিন্সে কোল বালিশ আব্রাসাডর নামে পরিচিত।
প্রাচীনকালে কোল বালিশ বানানো বেশ কঠিন ও ব্যয়সাধ্য ছিল। কিন্তু বর্তমানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কোল বালিশ উৎপাদন হচ্ছে। কারণ এটা বেশ সহজলভ্য এবং দামও হাতের নাগালে। সম্ভবত এ কারণে এশিয়ান কোনো কোনো দেশে বেড শিটের সঙ্গে বালিশ ও কোল বালিশের কভারও কিনতে হয়।

বালিশ অণুজীবের চিড়িয়াখানা
সারা দিনের কান্তি ছেড়ে ফেলতে আমরা যে বালিশে মাথা রেখে ঘুমের জগতে ঠাই নেই, সে বালিশটি কি পুরোপুরি ঝুকিমুক্ত? বিজ্ঞানীরা বলেছেন, মোটেও নয়। বরং তাদের দাবি, বালিশ হচ্ছে হাজার কোটি অণুজীবের একটি ক্ষুদে চিড়িয়াখানা। এখানে এমন কিছু ফাংগাল স্পোর বা ছত্রাকের বীজগুটি রয়েছে যা শুধু রোগই নয়, মৃত্যুও ডেকে আনতে পারে।
ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির গবেষকরা বালিশে ছত্রাক দূষণ বা ফাংগাল কন্টামিনেশন নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে আবিষ্কার করেছেন, বালিশ হচ্ছে ফাংগাল স্পোরস বা ছত্রাক বীজগুটির একটি অতি উর্বর ক্ষেত্র। কয়েক মাস থেকে ২০ বছরের পুরনো পালক ও সিনথেটিক বালিশ নিয়ে গবেষণার পর তারা দেখতে পেয়েছেন, বালিশের প্রতি গ্রামে কিলবিল করছে লাখো ছত্রাক। প্রতিটি বালিশে তারা ১০ লাখেরও বেশি ছত্রাক শনাক্ত করেছেন।
গবেষকরা বলেছেন, বালিশ হচ্ছে একটি ছোটখাটো জীববৈচিত্র্যের অভয়ারণ্য। গবেষক দলের নেতা অ্যাশালি উডকক বলেছেন, আমরা জানি, বালিশে থাকে ডাস্ট সাইট বা ধূলি কীট, যা ছত্রাক খেয়ে বেচে থাকে। এক তত্ত্বে বলা হয়েছে, এ ছত্রাক আবার হাউস ডাস্ট মাইটের ওপর নির্ভরশীল। তাই বলা যায়, আমাদের বালিশগুলোতে চলছে ক্ষুদে ইকো-সিস্টেমের মিথষ্ক্রিয়া।
উডকক আর তার সহকর্মীরা বালিশে কোন ধরনের অণুজীবের উপস্থিতির প্রমাণ পেয়েছেন, যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর? গবেষকদের ভাষায়, ‘বালিশে যে ছত্রাকটির উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি সেটির নাম অ্যাসপারগিলাস ফুমিবাটাস। ধারণা করা হয়, এ ছত্রাক রোগের কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়। ব্লাড ক্যান্সার ও বোন-মেরো ট্রান্সপ্লান্ট পেশেন্টদের ইনফেকশনের প্রধান কারণ হচ্ছে এ ছত্রাকটি। আবার এ ছত্রাক বৃদ্ধদের অ্যাজমা বা হাপানির প্রকোপও বাড়িয়ে দিতে পারে। বোঝা যাচ্ছে, হসপিটালে বেডে কষ্টকর দিনগুলি কাটানো শেষে ঘরে ফিরেও রোগী নিজেকে নিরাপদ দাবি করতে পারে না। নিজের প্রিয় বিছানার বালিশের ছত্রাকগুলোই তার স্বাস্থ্য ঝুকির কারণ হয়ে দাড়ায়। ডক্টর উডকক বলেছেন, ছত্রাকের উটকো ঝামেলা কমাতে হসপিটালগুলোতে ব্যবহৃত হয় প্লাস্টিকের বালিশ। কিন্তু রোগী ঘরে ফেরার পর সেই নিরাপত্তাটুকু তো আর পায় না।
তাহলে কি ঘরের সব বালিশ ফেলে দিয়ে প্রতিদিন নতুন বালিশ কিনতে হবে? নিউ ইয়র্কের রোচেস্টার ইউনিভার্সিটির এনভায়রনমেন্টাল মেডিসিনের প্রফেসর উইলিয়াম ব্যাকেট জবাবে বলেছেন, ব্যাপারটা এমন নয় যে, আমরা বালিশের এ স্বাস্থ্য ঝুকির কথা এই প্রথম শুনলাম। আসলে আমরা ঘর জুড়েই ছত্রাকের চাষ করি প্রতিদিন। যেদিকে চোখ যায় ওখানেই আছে ছত্রাক।
মানুষের এ ভীতির দিকটি নিয়ে ডক্টর উডককও দিয়েছেন অভয় বাণী। তিনি বলেছেন, আসলে আমাদের গবেষণার এ রেজাল্ট দেখে ঘরের পুরনো সব বালিশ ডাস্টবিনে ফেলে দেয়ার সময় এখনো আসেনি। বরং আমাদের জানা উচিত হবে, বালিশ আর ঘরের যে কোনো জায়গায় এতো
১৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জুলাই: বাঙালি জাতির জন্য এক অভিশাপ ও মূল্যায়ন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:০১


জুলাই: বাঙালি জাতির জন্য এক অভিশাপ ও মূল্যায়ন

আমাদের দৃষ্টিতে, তথাকথিত "জুলাই" বাংলাদেশের জন্য কোনো গৌরবের অধ্যায় নয়; বরং এটি জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা, অর্থনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাপান যেভাবে মাত্র ৭ বছরে অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭



জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হায়াতো ইকেদা ১৯৬০ সালের শেষভাগে তাঁর বিখ্যাত "ইনকাম ডাবলিং প্ল্যান" বা "আয় দ্বিগুণকরণ পরিকল্পনা" চালু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জাপানের অর্থনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে হেরে যাচ্ছি ০২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৪


কাহিনীটা ৯০ এর দশকের শুরুতে। বুশ তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট- মার্কিনিদের আগ্রাসন চলছে তখন ইরাক জুড়ে। হাটে মাঠে ঘাটে আড্ডায় গল্প আলোচনা মিডিয়ায় এমনকি বাসর ঘরেও তখন নব পরিণীতার সাথে তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাংগুক অচলায়তন

লিখেছেন মাসুদ রানা শাহীন, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৯


ভয় পাবেন না
আশার পিদিম জ্বালিয়ে রাখুন
প্রাণের ধুকপুকি জাগিয়ে রাখুন
হেরে যাবেন না।

ঘাবড়াবেন না
নতুন স্বর ও সাহসী উচ্চারণে অনবদ্য হোন
ক্ষুরধার সৃষ্টির ঔজ্জ্বল্যে উদ্ভাসিত হোন
থামবেন না।

নগদমূল্যে বিকোবেন না
ক্লান্ত শিরায় নতুন রক্ত বইয়ে দিন
তাতিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাতিসত্তার পরিচয়ের বাজার

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:২১

ইতিহাসে কোনো আদর্শ সত্যিকার অর্থে মরে না। সে শুধু নাম বদলায়, পরাজিত আদর্শেরও পুনর্জন্ম হয়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ একটি আসনও পায়নি। কিন্তু সেই রাতে মুসলিম লীগ মরেনি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×