আবুল কাশেম বসে বসে বাদাম খোটে। এইখানে আসলে আবুল কাশেমের ভাল লাগে, মন ভাল হয়ে যায়। সামনে সুসজ্জিত কনফারেন্স সেন্টারের লাইটিং, ঝর্ণা, আর রাস্তা উপচে পড়া নিয়নের আলো- কামেশের কাছে কেমন যেন স্বপ্ন স্বপ্ন লাগে। আবার এই যে কনফারেন্স সেন্টারের সামনে এত বড় চওড়া রাস্তা অথচ গাড়ি ঘোড়ার জট নাই। আরো ভাল লাগে একটু পর পর সুন্দরী নারীদের আনাগোনা। যদিও অধিকাংশ নারীদের সাথে থাকে তাদের রক্ষক এবং হয়তবা ভক্ষক পুরুষেরা। তাতে সমস্যা কি? পর পুরুষ হিসেবে সে এইসব নারীদের নিয়ে ভাবতে পারে, ভাবার অধিকার তার আছে। মাঝে মাঝে এইসব নারীদের আনাগোনা অনেক বেড়ে যায়-যেদিন নানা ছুতা-নাতায় এখানে নারী-পুরুষের মেলা বসে। এইরকম একটা মেলায় অবশ্য আবুল কামশমও গিয়েছিল ওর "ফুপু আম্মার" সাথে। সেদিন ছিল কিসের যেন পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠান। কাশেমের ফুপু আম্মা ও একটা পুরস্কার পেয়ছিল্। আলিশান ব্যবস্থা। পুরস্কার বিতরনী, নাস্তা-পানি, এর পরে গান-বাদ্যি। অবশ্্য গানগুলো ওর ভাল লাগেনি। গ্রামে থাকতে এইসব গান শুরু হলে রেডিওটা বন্ধ করে রাখত ও। কি যেন বলে রবীন্দ্রসঙ্গীত না কি? কাশেম বোঝেনা এত কষ্ট করে এইসব গাওয়ার কি মানে? এইগুলা শোনে কেউ? তার চেয়ে ' তুমি দিওনাগো বাসর ঘরের বাতি নিভাইয়া . . . . . . ' কত সুন্দর গান! আর গানের মধ্যে কি রস? কিন্তু কাশেমের ফুপু আম্মা শোনে ঐ টেনে টেনে গাওয়া রবীন্দ্র সঙ্গীত-যার কোন আগামাথা নেই। আবুল কাশেম আরো একটা জিনিস খেয়াল করেছে ঐদিন, অনুষ্ঠানে সব ঠিক আছে কিন্তু মানুষগুলো কেমন যেন পুতুল পুতুল। কিছু মাঝবয়সী লোকজন এসে ফুপু আম্মাকে সালাম দেয়, সম্মান করে কিন্তু সব যেন পাল্লায় মাপা। এমনকি এরা হাতে তালিটা দেয় মেপে মেপে। এইজন্য আবুল কাশেমের কাছে জিনিসটা ভাল লাগেনাই। আর একদিন আসছিল, সেইদিন ছিল তাঁতের বাপড় চোপড়ের মেলা। সেইদিন কাশেমের একটু ভাল লাগছিল। কাপড় চোপড় দেখে তো ভাল রেগেইছিল। আবার একপাশে গান বাজনার আয়োজন ছিল। একটা টগবগে মেয়ে নেচে নেচে গাইছিল" রূপবান নাচে কোমড় দুলাইয়া . . . .. . " কিন্তু 'বুড়ি' আর দাড়ালোই না। কি আর করা । খারাপ মন আর কাপড় বোঝাই একগাদা ব্যাগ নিয়ে আবুল কাশেম 'বুড়ি'র পিছন পিছন হেঁটে গিয়ে গাড়ির পিছনের সিটে বসে থাকে মুখ ভার করে। কিছুক্ষণ পরে ড্রাইভার ব্যাটা বুড়ির মন গলানোর জন্য সেই গায়ে জ্বলা ধরানো আগামাথাহীন গান ছেড়ে দিল। অভিমানে ।আবুল কাশেমের মনে হচ্ছিল, এখনই বুঝি দু'চোখ গড়িয়ে জল নামবে। ( চলবে )
অচেনা জীবন (২য় কিস্তি)
আবুল কাশেম যখন তার এরকম আনন্দ আর কষ্টের স্মৃতিগুলো খোটাখুটি করছিল, ঠিক তখন, ঠিক ফুটপাতের ধার ঘেষে দাঁড়ায় এক মাইক্রোবাস। আর তার দুচোখের কড়া আলো এসে আছড়ে পড়ে আবুল কাশেমের মুখে। হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে আবুল কাশেমের মাথা ঝিম ঝিম করতে থাকে। অবশ্য কয়েক সেকেন্ড পরে লাইটের তীব্রতা কমে আসে আর তারও কিছু পরে লাইটগুলো নিভে যায়, গাড়ির ইজ্ঞিন বন্ধ হয়। এতক্ষনে আবুল কাশেম গাড়িটার দিকে তাকানোর সুযোগ পায়, এবং সে চোখে প্রচন্ড বিরক্তি মেখে তাকায় গাড়িটার দিকে। কিন্তু, তাকিয়েই চক্ষু ছানাবড়া!
যেন জলজ্যান্ত হুর বসে আছে ড্রাইভারের পাশের সিটটায়-দির্ঘাঙগী, সুন্দরী, শরীরের গড়ন না ভারী, না পাতলা। আর ড্রাইভআরের সিটে বসে এক 'বৈশাখের বলদ'-আবুল কাশেমের তাই মনে হল-মাথায় ফুটবলের মাঠ, কালো, যাচ্ছে-তাই। হতে পারে, বলদটা হয়ত ঐ সুন্দরী'র ড্রাইভার, কেবলমাত্র ড্রাইভার। অন্ততঃ আবুল কাশেম এটা ভেবেই স্বস্তিবোধ করতে লাগল। চোখ একটু এদিক ওদিক ঘুরিয়ে, একটু নৈব্যক্তিকভাবে-যেভাবেই হোক আবুল কাশেম মোটামুটি গাড়িটার উপরই দৃষ্টি ধরে রাখারর চেষ্টা করল। এবং এটা করতে গিয়েই আবুল কাশেম প্রচন্ড দুঃখ পেল। সে যা ভেবেছিল, আসলে তা নয়। ঐ ব্যাটা শুধু ড্রাইভার না-ইতোমধ্যে সে কথাচ্ছলে, মেয়েটার গায়ে মাথায় হাত বুলানোর চেষ্টা করছে। যাক তাও ভাল, শয়তানটা এখনও পুরোটা দখল করতে পারেনি। তারপরও আবুল কাশেমের অন্তর পুড়ে যেতে লাগল ঈর্ষায়,
আবুল কাশেম হায় হায় করতে লাগল, আর গাড়িতে বসে ওরা খুনসুটি চালিয়ে যেতে লাগল। মেয়েটি বেশ কথা বলছে বলদটার সাথে। অবশ্য বলদটা মাঝে মাঝে আড়চোখে দেখছে, আবুল কাশেমকে। হয়ত ও ব্যাটা চাইছে, কাশেম ওখান থেকে সরে যাক। আবুল কাশেম আশে পাশে তাকিয়ে দেখে-ওদের ডিস্টার্ব করার মত ও ছাড়া আর কেই নেইও। কিন্তু তাতে কি? ও চাইলেই তো আর আবুল কাশেম সরবে। এখানে তার বসার অধিকার আছে, সুতরাং সে বসেই থাকবে।
-আবুল কাশেম . . . . .
পিছনে তাকিয়ে দেখে ফুপু আম্মা দাড়িয়ে আছে মুখে চিকচিক ঘাম নিয়ে।
-চল
কাশেম লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
-জ্বি চলেন।
কিন্তু মন তার গজরাতে থাকে,'বুড়ি আর সময় পেলনা, কেন আরো একটু হাটাহাটি করলে কি হত! শরীরটা আরো ভাল থাকত বুড়ির।'
আবুল কাশেম যখন গাড়িতে উঠছে, শেষবারের মত গাড়িটার দিকে তাকাল, মনে হল বলদটা দাঁত বের করে হাসছে। আবুল কাশেম পুড়তে লাগল। ওর মনে হল, ওকেই বোধহয় ভ্যাংচাচ্ছে শুয়োরটা।
অচেনা জীবন (তৃতীয় কিস্তি)
ফিরোজা বেগমের হাসি পায়, তারও একটি সংসার আছে। সেই সংসারের সদস্য তিনজন -কেয়ার টেকার আবুল কাশেম,; সে আবার দূর সম্পর্কের ভাতিজাও হয়, কাজের বুয়া লাভলী, আর বিনু; বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। ছেলেটা আমেরিকা আর মেঢয়টা অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হয়োর পর এরাই এখন ফিরোজা বেগমের কাছের মানুষ। ছেলে-মেয়েদের অভাব তো এদের দিয়ে পূরণ হয়না, কিন্তু পাশাপাশি থাকলে মানুষের মধ্যে একটা নির্ভরতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই সম্পর্কের সূত্রে এরা সবাই এখন ফিরোজা বেগমের ফ্যামিলি মেম্বার। বিনু মেয়েটা ভাল, কিন্তু কথাবার্তা কম বলে । ফিরোজা বেগমের কাছে থাকছে, পড়ছে; তার প্রতি একটা কৃতজ্ঞতাবোধ, কৃত্রিম হলেও থাকা উচিত, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, ওর তা নেই। বরং পিরোজা বেগমের ভাইয়ের মেয়ে হিসেবে বাসার অন্যদের মানে আবুল কাশেম, লাভলি ওদের ওপর বেশ প্রভাব খাটায় সুযোগ পেলেই। ফিরোজা বেগম ভাবেন, মেয়েটাকে কি শাসন করা উচিত না!
শাসন করবেন, সেরকম অধিকারের সম্পর্কও তৈরি হয়নি ওর সাথে,। খাওয়ার টেবিলে রোজ দু'য়েকবার দেখা হয়, টুকটকি কথা বার্তা হয় এপর্যন্তই।ফিরোজা বেগম লাভলীকে দিয়ে বিনুকে ডেকে পাঠায়।
মেয়েটা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে এসে দরজায় দাঁড়ায়
-ফুপুজান আমাকে ডাকছেন?
-হু আস, তোমার সাথে তেমন দেখা টেকাও হয়না খাওয়ার টেবিল ছাড়া, কথা বার্তাও হয়না। ভাবলাম একটু বসে গল্প টল্প করি, চা খাই।
বিনু সেই নির্লিপ্ত ভঙ্গিতেই এসে বসে, আর ফিরোজা বেগম লাভলীকে চা দিতে বলে ওদের জন্য। বিনুর পড়াশেনার খোঁজ খবর নেন, বিনু সব প্রশ্নের উত্তর সংক্ষেপে দেয় যতটা সম্ভব-
-ভার্সিটি তে তোমার বন্ধু নেই?
-আছে।
- ওদেরকে বাসায নিয়ে এসো মাঝে মাঝে।
-জ্বি আচ্ছা?
-আচ্ছা তোমার কি এখানে থাকতে কোন সমস্যা হচ্ছে?
এই প্রথম একটু হাসি দেখা যায় বিনুর মুখে- মনেহয় সেটা অনেকটা জোর করেই-
-না না কষ্ট হবে কেন? ভালই তো আছি।
না, মেয়েটার সাথে কথা বলে তেমন ভাল লাগছেনা, ফিরোজা বেগমের, নিরবতা, চা আসে, খাওয়া শেষ হলে বিনু যাই' বলে চলে যায়। ফিরোজা বেগম ইজি চেয়ারে মাথাটা এলিয়ে দেন- বেশ ক্লান্তবোধ হচ্ছে।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে মে, ২০০৯ রাত ১২:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


