৮
চাকরীর খবরটা শুনে শিরিন আর নওরিন দুজনেই বেশ খুশি হল। নওরিন একটু কম। ও চায় না নীরবের সাথে অদিতি আর কোন সম্পর্ক রাখুক। প্রথমে কয়েকদিন বেশ জোরালোভাবেই কথাটা বলেছিল নওরিন। পরে যেখন দেখল, অদিতি মন খারাপ করছে এমন কথা শুনলে, তারপর অদিতির মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা মেনে নিল। শিরিনেরও আপত্তি ছিল, তবে তেমন জোরালো না। ওর যুক্তি অনেকটা ক্ষতিপূরণ আদায় করা টাইপ। শুধু একটা ব্যাপারে দুজনেই একমত, যদি নীরব ফিরে যেতে বলে, তবে তাকে আগে নাকে খত দিতে হবে, স্পষ্ট করে ক্ষমা চাইতে হবে। তারপর কোন কথা।
অদিতি এখনও ঠিক করে উঠতে পারেনি, সে কি চায়। নীরব ফিরে যেতে বললে, সে কি করবে? ফিরে যাবে? তার চেয়েও বড় কথা, যদি ছবিগুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়েই দেয়, তবে সে ও কি ঐ ফ্যামিলিতে আর আগের মত মাথা উঁচু করে গিয়ে দাঁড়াতে পারবে?
শিরিন এর মাঝে ইন্টারভিউ সম্পর্কে বেশ কিছু টিপস দিয়েছে।
— স্মার্টলি আর কনফিডেন্টলি কথা বলবে। তোতলাবা না, আর গলার আওয়াজ স্পষ্ট রাখবা। সম্ভব হলে চোখে চোখ রেখে কথা বলবা।
নওরিন জানতে চাইল,
— তোমার বর আসবে?
ও বাসায় না যেতে বলার কথাটা নওরিনকে বলেনি। জানে, ও কথা বলেই নওরিন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবে। নীরবের ওপর ওরাগ বাড়তে পারে, এমন কথা পারতপক্ষে নওরিনকে জানায় না। ভাল কথাগুলো বলেই যেরকম রেগে ওঠে! এখনও নীরবকে দুলাভাই ডাকতে নারাজ নওরিন। ‘তোমার বর’ আর নয়তো 'নীরব মিয়া’ বলেই সম্বোধন করছে। শুনতে অদিতির খারাপ লাগলেও কিছু বলে না। মেয়েটা এরকমই। অকপট। ভালো লাগা দেখাতেও দেরী করে না, আর খারাপ লাগাটাও লুকিয়ে রাখে না। হোস্টেলের বেশ কয়েকজনের সাথেই ওর সম্পর্ক বেশ শীতল। ‘দেমাগী' হিসেবে পরিচিত। তবে অদিতির তেমনটা মনে হয়নি।
লক্ষ্য করল নওরিন এখনও তাকিয়ে আছে অদিতির দিকে। উত্তর শুনতে চায়। 'আসছে না' বললে রেগে উঠবে। তাই নরম করে বলল
— নাহ। পরিচিত একটা ট্যাক্সি ক্যাব আসবে।
— আমি জানতাম। এই লোক সুবিধার না। আমি ওয়ার্ন করছি। পরে পস্তাবা।
— তুই অযথা রাগ করছিস। ওর অফিস আছে না?
— ওসব গল্প শুনিও না। আসল ব্যাপার তো একটাই, কাল যদি সব জানাজানি হয়, তখন যেন বলতে পারে, এই মেয়ের সাথে সেই কবেই তো সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছি। ওর স্ক্যান্ডালের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।
অদিতি বড় করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে। ব্যাপারটা ওর ও খারাপ লেগেছে। তবে নীরবের ব্যাপারটাও অদিতি বোঝে। দোটানায় আছে। কোনভাবে যদি ছবিগুলো স্প্রেড করা আটকানো যায়, তাহলে ও হয়তো…। সিওর না অদিতি, তবে মন বলছে, এমনটা হবে। আর ছবি ছড়িয়ে পড়লে? নওরিন যা বলল, সেটাই করবে মনে হয়। আর এখন এই দেখা না করা ব্যাপারটা সেটারই প্রস্তুতি। যেন বলতে পারে 'ওর সাথে তো অনেকদিন কোন সম্পর্ক নাই'। কোন সাক্ষীও যেন না পাওয়া যায়, যে ওদেরকে একসাথে দেখেছে। তাই ফোনে কথা বলা ছাড়া আর সত্যিই কোন সম্পর্ক রাখেনি নীরব। এখানেও দেখা করতে আসেনি একদিনও।
সম্পর্ক যে রেখেছে, তা কেবল অদিতি ছাড়া আর কেউ জানে না। অদিতির হোস্টেলে থাকবার ব্যাপারটা বাসায় বাবা মাকে বলা হয়নি। নীরবের মা ও জানেন না ব্যাপারটা। অদিতির ধারণা, ছবিগুলো ছড়ালে, নীরব এই জানাবার কাজগুলো করবে। প্রশ্ন একটাই, না ছড়ালে কি করবে?
আর এখানে, হোস্টেলে, জানে শুধু নওরিন আর শিরিন।
কিন্তু একটা বুঝতে পারে না অদিতি। এভাবে কতদিন চলবে? মাঝে মাঝে ভাবে, কথাটা জিজ্ঞেস করবে। ছবিটা ফয়সাল ছড়াবে কি না তা দেখার জন্য কতদিন অপেক্ষা করবে? জিজ্ঞেস করা হয়ে ওঠে না। ভাবে, উত্তরটা হয়তো নীরব নিজেও জানে না।
নওরিন তাকিয়ে আছে অদিতির দিকে। উত্তর দিতে হবে। বলে
— সমস্যা হবে না। জায়গাটা তো চিনি।
নওরিনও বোঝে, অদিতি অস্বস্তি ফিল করছে। তাই সে আলোচনার টপিক পাল্টায়।
— ঐ হারামজাদার খবর কি? ফোন করে না কেন আর? তোমার মত মক্কেল আরও আছে নাকি? মিউজিক্যাল চেয়ার খেলছে?
— হতে পারে। আমার মত গাধার তো অভাব নাই দেশে।
হঠাৎ শিরিনের দিকে চোখ পড়ে অদিতির ওপর। অদিতির দিকে তাকিয়ে আছে। অদিতির মনে হল, কিছু বলতে চায় শিরিন। একবার তাকাচ্ছে, আবার চোখ নামিয়ে নিচ্ছে। অদিতির সন্দেহ হয়, নীরবের কন্টাক্টস ব্যাবহার করে হয়তো শিহাবের জন্য একটা চাকরী জোগাড় করে দেয়ার কথা বলতে চায় বোধহয়। বলবে কি না সেটা নিয়ে ইতস্ততঃ করছে। কিছুটা লজ্জায় আর কিছুটা সম্ভবতঃ নওরিন সামনে থাকবার জন্য। ব্যাপারটা বুঝতে পারে অদিতি। ঠিক করে পরে কোন এক সময় একা পেলে জিজ্ঞেস করবে।
অদিতি চুপচাপ বসে আছে। নওরিনের দিকে ইশারায় জানতে চায়, শিরিনের কিছু হয়েছে কি না। নওরিন ইশারায় বোঝায়, জানে না। তখন অদিতি নিজেই জিজ্ঞেস করে
— শিহাবের কিছু ব্যাবস্থা হল?
শিরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে
— কয়দিন ফোন করে না।
হঠাৎ করেই পরিস্থিতি বেশ পাল্টে যায়। অদিতি উঠে গিয়ে শিরিনের পাশে বসে। ওর কাঁধে হাত রাখে।
— সব ঠিক হয়ে যাবে।
শিরিনও নিজেকে সামলে নেয়। পরিবেশ হালকা করতে নওরিন হঠাৎ বলে ওঠে
— আজকে মজার একটা ঘটনা ঘটেছে। আমার এক ডিরেক্টার আমাকে প্রপোজ করেছে।
শিরিন আর অদিতির চোখ ঘুরে যায়। চোখে আগ্রহ। অদিতিই বলে ওঠে
—এর মধ্যে মজার কি আছে? প্রথম প্রস্তাব পেলি নাকি?
— কি বল? এসময়ের অন্যতম হিট ডিরেক্টর। যে কোনদিন ফিল্ম শুরু করবে। হি প্রপোজড মি। এতো হিরোইন থাকতে, আমাকে। ক্যান ইউ ইম্যাজিন?
— তুই কি বললি?
— এখনও কিছু বলিনি। ‘ভেবে দেখি’ বলে ঝুলিয়ে রেখেছি।
এতক্ষণ কথাবার্তা হাসিখুশি ভাবে চললেও এবার অদিতি বেশ সিরিয়াস হয়ে ওঠে। ওদের প্রফেশান সম্পর্কে যতটুকু শুনেছে, তাতে মনে হয়েছে, এসব আসলে বিছানায় নেয়ার ফন্দি। তাই অদিতি মুখ শক্ত করে জানতে চায়
— তোর ইচ্ছা কি?
— সেটা এখনও ভেবে দেখিনি।
— ভাবতে হচ্ছে কেন? সমস্যা আছে কিছু?
— ছোট্ট একটা।
বলে দুজনের দিকেই তাকায় নওরিন। দুজনেই অবাক চোখে তাকায়। ইশারায় জানতে চায়, কি সে সমস্যা। নওরিন বেশ মজার কোন খবর দিচ্ছে এমন ভাব করে বলে
— এর আগে একবার বিয়ে হয়েছিল।
অদিতি বেশ রেগে গিয়ে বলে
— এটা ছোট সমস্যা?
— ঠিক ছোট না। মাঝারি। বিয়েটা টিকেছিল মাস ছয়েক। অ্যান্ড আই থিংক, ওটা ভেঙ্গেছে মেয়েটার দোষে।
কঠোর গলায় অদিতি বলে ওঠে
— খবরদার। রাজী হবি না।
নওরিন অবাক হয়ে অদিতি দিকে তাকায়। ওর এই অধিকারবোধ ব্যাপারটা তার ভাল লাগে। আপত্তির কারণটা যদিও বোঝে, তারপরও স্পষ্ট করে জানতে চায়
— কোনটা সমস্যা? আগে বিয়ে হওয়া? না ডিভোর্স হওয়াটা?
অদিতি এবার বেশ বিরক্ত হয়। এসব মেয়েদের নিয়ে এই এক সমস্যা। সবকিছুর ভেতরে যুক্তি খুঁজতে যায়। প্রতিটা সম্পর্কের একটা স্বাভাবিক চেহারা তো আছে। বয়সের পার্থক্য, ফ্যামিলি এসব তো আর এমনি এমনি দেখা হয় না। এসব ব্যাপার তো আল্টিমেটলি লাগেই। বেশ অসহিষ্ণু গলাতেই বলে
— দুটোই।
নওরিন তবুও ব্যাপারটা নিয়ে তর্ক করতে চায়। বলে
— বা রে, বনিবনা না হলে তাও একসাথে থাকবে? এমনভাবে সংসার করার চেয়ে তো বরং ডিভোর্স নিয়ে নেয়াই ভাল।
— অত তর্ক করিস না তো। আর ভাল ছেলের কি আকাল পড়েছে নাকি? ডিভোর্সি ছেলেকে কেন বিয়ে করবি?
নওরিন স্মিত হাসে। এরপরে বেশ নাটকীয় ঢঙে এগিয়ে এসে দুজনের সামনে দাঁড়ায়। এরপরে বলে
— তাহলে, ব্যাপারটা দাঁড়াল, বিয়ের জন্য, পাত্র বা পাত্রীর প্রথম যোগ্যতা হচ্ছে ভার্জিনিটি। এই তো?
অদিতির মুখটা হঠাৎ চুপসে যায়। মাথা নিচু করে ফেলে। ব্যাপারটা নিয়ে সে আর কথা বলে না। অদিতির এই চুপসে যাওয়াটা নওরিন লক্ষ্য করে। বুঝতে পারে কথাটা অদিতিকে আহত করেছে। তাই সে এগিয়ে এসে অদিতির সামনে মাটিতে বসে। অদিতির হাঁটুতে হাত রেখে বলে
— আমি তোমাকে মিন করিনি আপু। বিলিভ মি, আমি আসলেই সমস্যায় আছি। প্রস্তাবটা পাওয়ার পরে আমি নিজেও একই কথা ভেবেছি। মানুষটা বেশ ভাল। ইন্ডাস্ট্রিতে উনার তেমন কোন বাজে রেপুটেশান নেই। দারুণ একজন মানুষ। উনার সাথে গল্প করতেও বেশ মজা লাগে। শুধু ডিভোর্স ব্যাপারটা না থাকলে হয়তো আমি রাজীও হয়ে যেতাম। বাট… ঐ একটা কারণে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। প্রশ্নটা হচ্ছে, কেন? আগে একটা সম্পর্ক থাকাটা সমস্যা? না সেই সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়াটা সমস্যা? খুব ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখো, হুইচ ওয়ান ইজ দ্যা রিয়েল প্রবলেম?
অদিতি কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনে। সমস্যাটা বোঝে। কিছুক্ষণ ভাবে। এরপরে বলে
— আমার মনে হয়, সম্পর্ক ভাঙ্গাটা। যে একবার ভেঙ্গেছে, সে আবারও ভাঙবে।
নওরিন এবার শিরিনের দিকে তাকিয়ে বলে
— আর তুমি?
— আমার মনে হয় সম্পর্ক থাকাটা। আজ তুই যদি ডিভোর্সি হতি, আর সেই ডিরেক্টর ব্যাচেলর হত, তাহলে করতো প্রপোজ?
নওরিন উঠে দাঁড়ায়। খানিকক্ষণ পায়চারী করে। এরপরে বলে
— তাহলে জুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত কি দাঁড়াল? দুইটি 'না' ভোট আর একটি ভোট দানে বিরত। এই তো?
অদিতি কিছুটা সিরিয়াস হয়ে বলে ওঠে
— না। তিনটিই 'না' ভোট। এই নিয়ে আর কোন কথা না। তুই কালকে গিয়ে না বলে আসবি।
নওরিন হেসে ফেলে। আর কথা বাড়ায় না। শিরিনের দিকে তাকিয়ে বলে
— তোমার টিপস দেয়া কি শেষ?
শিরিন, অদিতির দিকে তাকায়। এরপরে নওরিনের দিকে তাকিয়ে বলে
— তুই কিছু দিবি মনে হচ্ছে।
— ইয়েস। যদিও, তুমি যা বলছ, সে অনুসারে চাকরী তোমার হচ্ছেই। তারপরও, ইন কেস, যদি কোন কারণে, চাকরীটা না হয়, দেন আই হ্যাভ অ্যান অফার।
অদিতি একটা স্মিত হাসি দিয়ে একবার শিরিনের দিকে তাকিয়ে তারপর নওরিনের দিকে তাকায়। বলে
— নাটকে নামাবি নাকি?
— নাহ। ওটা তুমি পারবে না। খুব বাজে আক্ট্রেস তুমি। তবে মডেলিংয়ে নামাব। আমার জন্য একটা অফার ছিল, বাট অ্যাডটায় টিপিক্যাল বাঙ্গালী নারী দরকার। ফটোগ্রাফার আমাকে নিতে চাইছে না। বলে, আমার চেহারায় ওয়েস্টার্ন ভাবটা একটু বেশি, টিপিক্যাল বাঙ্গালী হিসেবে আমাকে মানাবে না। ভাবছি, ওখানে তোমাকে ফিট করে দেব। ভিডিও না। স্টিল। কাজ তেমন কিছুই না, শুধু ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসতে হবে। ব্যাস।
চলবে
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে আগস্ট, ২০১৭ রাত ১০:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



