১৭
— চলুন
অদিতি খুব দ্রুত ওর বাবার বাসা থেকে বেরিয়ে আসে। নীরব কিছু একটা হয়তো বলতে চাইছিল, অদিতি সুযোগ দিল না। বাবাও হয়তো কিছু বলতে চাইছিলেন, সে সুযোগ না দিয়ে, ‘আসি বাবা’ বলে দ্রুত বেরিয়ে যায় অদিতি। দুই ভাইয়ের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করেনি। ওদের যা বলার বাবাই বলে দেবেন। ফয়সালের বিরুদ্ধে কিছু করবে কি না, তা নিয়ে এই মুহূর্তে সে কিছু ভাবছে না। নওরিনের প্ল্যানেও সম্মতি দিতে ইচ্ছে হয়নি।
আশফাক বাইক স্টার্ট দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে
— এবার কোথায়?
স্মিত হাসি হেসে অদিতি উত্তর দেয়
— বা রে, এতদূর চালিয়ে নিয়ে এলেন, ভাড়া নেবেন না?
— মিটার তো নেই?
— সেজন্যই তো, যাত্রীর বিবেচনায় যা ভাড়া হয়, তাই নিবেন। অবশ্য ভাড়া কম মনে হলে ঝগড়াও করতে পারেন। আপাততঃ চলুন
— আরও ভাড়া খাটতে হবে?
— জ্বি।
আর কোন প্রশ্ন না করে আশফাক বাইকে ওঠে। অদিতি উঠে বসবার পরে জানতে চায়
— কোনদিকে?
— আপনার পছন্দের কোন রেস্টুরেন্টে।
মুচকি হাসি দেয় আশফাক। সে ধানমণ্ডির দিকে ফিরে যাওয়া শুরু করেছিল। বাইক ঘোরাল। বলল
— এতদূর যখন এসেছি, বেইলি রোডে ঢুকি।
খানিক ক্ষণের ভেতরের ওরা বেইলি রোডে পোঁছে গেল। বেশিরভাগই বিকেলের পরে জমে ওঠে, কিছু কিছু আছে সব সময়েই ভাল চলে। এখানে আশফাকের প্রায়ই আসা হয়। একটা রেস্টুরেন্টের সাথে বেশ ভাল পরিচয়ও হয়ে গেছে। সেটায় ঢুকল। বেশ ফাঁকা। বসবার পরে অর্ডার নেয়ার জন্য একজনকে আসতে ইশারা করল। ছেলেটা কাছে আসবার পরে আশফাক কিছু বলার আগেই অদিতি অনুরোধ করল
— আপনার পছন্দ মত বলুন।
প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল। করল না। এসব নিয়ে সময় নষ্ট করার কোন ইচ্ছা আশফাকের নেই। যে বিষয়ে আলোচনা করতে চাইছে, কিভাবে সেই বিষয়ে আসা যায়, ঝড়ের বেগে সেই চিন্তাই করছে। দ্রুত অর্ডার দিল আশফাক। এরপরে অদিতির দিকে তাকিয়ে বলল
— আমি কিছু নীতি মেনে চলি।
অদিতিও অপেক্ষা করে ছিল। সে ও জানে, আশফাক কোন না কোন ছুতায় তার সম্পর্কে জানতে চাইবে। এখন ভণিতা পর্ব চলছে। এই খেলাটা খেলার ইচ্ছে না থাকলেও তাকে খেলতে হবে। খেলাটা ছোট হলেই ভাল। ইচ্ছে আছে প্রথম সুযোগেই মূল খেলায় ঢুকে যাওয়ার। ভণিতা পর্বে যোগ দিল অদিতি। জানতে চাইল
— কি?
বেশ গম্ভীর একটা ভাব নিয়ে আশফাক বলতে শুরু করল
— নীতিটা হচ্ছে, কেউ নিজে না জানালে কারো জীবনের ব্যক্তিগত ব্যাপারে জানতে চাই না।
অদিতি মিষ্টি করে হাসল। রিভার্স খেলছে। মনে হচ্ছে এটা ওর ট্রেডমার্ক ফর্মুলা। চাইছে অদিতি জিজ্ঞেস করার আগেই যেন নিজে থেকেই ওর জীবন সম্পর্কে বলে। তাহলে আর ওকে তার জীবনের ফর্মুলা ভাঙতে হবে না। মূল খেলায় এখনও ঢোকা যায়। নাহ, ও নিজের প্ল্যানেই খেলুক। অদিতি ঠিক করল, এই ফাঁকে সে ও টাইম পাস করে। বলল
— আমার নেই।
এবার আশফাকও বুঝল, অদিতি নিজে থেকে কিছু বলবে না। অন্ততঃ সে যতক্ষণ তার আস্থাভাজন না হচ্ছে , ততোক্ষণ বলবে না। সম্ভবতঃ সময় নেবে। ব্যাপারটা মেনে নিল আশফাক। অদিতির প্ল্যানেই খেলার সিদ্ধান্ত নিল। স্মিত হাসি দিয়ে বলল
— বেশ। বলুন কি জানতে চান?
অদিতি এবার হাত দুটো থুতনির নিছে নিয়ে তার ওপর থুতনির ভার রাখল। ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে, ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইল
— আপনি কেন আমার পিছু নিয়েছেন?
বেশ বড়সড় ধাক্কা খেল আশফাক। এভাবে সরাসরি আঘাত করবে ভাবেনি। যতটা নরম আর লাজুক টাইপ মেয়ে ভেবেছিল, এই মেয়ে তো তেমনটা না। তারপরও না বোঝার ভান করে জানতে চাইল
— মানে?
এবার অদিতি বেশ গম্ভীর হয়েই বলতে লাগল
— মানে আমার ধারণা, আপনি সেদিন থেকেই আমাকে ফলো করছেন।
এবার আর পিছিয়ে আসবার উপায় নেই। আশফাকও সিদ্ধান্ত নিল, স্ট্রেট খেলবে। জানতে চাইল
— আর?
— আর মানে?
— আর মানে হচ্ছে, আর আমার সম্পর্কে আপনার আর কি কি ধারণা।
— বেশ অনেকগুলোই।
— শুরু করুন
— আপনার সেদিনের সেই গল্প মিথ্যা।
— সেটা তো সেদিনই স্বীকার করেছি।
— সেই স্বীকার করাটাও মিথ্যা।
— মানে?
— মানে সেদিন যে গল্প শুনিয়েছিলেন যে আপনি আমাকে একটা গল্প শুনিয়ে ইমোশানালি দুর্বল করে আপনার চাকরীটা বাগিয়েছেন, সেই গল্পটাও ছিল মিথ্যা।
আশফাক এবার মিটিমিটি হাসছে। জানতে চাইল
— তাহলে আসল গল্পটা কি?
— আসল গল্পটা প্রোবাবলি, আমার জন্য একটা স্পেশাল পোস্ট ক্রিয়েট করা হয়। আর ঐ পোস্টে কোন কম্পিটিশানই ছিল না। আমি না করলে ঐ চাকরীরই কোন অস্তিত্ব থাকবে না। সো, আমার ছেড়ে দেয়ার কারণে আপনার চাকরী হয়েছে, এই গপ্পটা মিথ্যে। আপনার হয়েছে আপনার যোগ্যতায়। তার মানে হচ্ছে, আমার কাছে গল্পটা বলাটা ছিল বাহানা।
— কেন?
— প্রবাবলি, আমার চেহারা ভাল লেগেছিল, আলাপ করতে চাইছিলেন, কিংবা বলা যায়, প্রেমের প্রথম স্টেজে ছিলেন। আর গল্পটা ছিল আমার সাথে আলাপ করার।
আশফাক বেশ সপ্রসংস দৃষ্টিতে অদিতির দিকে তাকাল। ঠোঁটে মিটিমিটি হাসি। বলল
— ক্যারি অন।
— আমার চাকরী ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারটায় সম্ভবতঃ আপনি ইমপ্রেসড হন। আর তাই আপনি সম্ভবতঃ আমার পিছু পিছু এসে সেদিন আমার হোস্টেল চিনে গিয়েছিলেন। এবং এরপরে, প্রায়ই এখানে আসতেন আর আমার সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতেন। আপনার গুপ্ত চড় কে, জানি না, তবে কেউ একজন আছে আই গেস। আর আমার ন্যুড ছবির ব্যাপারটা আপনি আপনার গুপ্তচরের কাছ থেকেই জেনেছেন। দ্যাট মিনস, পর্ণ সাইটে ঢোকার গল্পটাও বানানো। তবে নট সিওর। আনম্যারিড, যেতেও পারেন ওসব সাইটে।
আশফাক এবার বেশ মুগ্ধ দৃষ্টিতে অদিতির দিকে তাকিয়ে থাকল। সেই তাকিয়ে থাকা দেখে অদিতি চোখ নাচাল। জানতে চাইল 'ঠিক বলছি?’। আশফাক বড় করে একটা নিঃশ্বাস ফেলল, এরপরে বলল
— আই উইথড্র মাই কমেন্ট
— গাধা?
— ইয়েস।
— ওটা আপনি কখনই মিন করেননি। ওটা রিভার্স খেলেছিলেন। প্রত্যেক মেয়ে প্রশংসা শুনতে পছন্দ করে, তাই ইচ্ছে করেই উল্টোটা করেছিলেন।
— বাট প্রেমে পড়াটা জেনুইন।
অদিতি খানিকটা ভাবল। এরপরে আশফাকের দিকে তাকিয়ে বলল
— গাধা কমেন্ট উইথড্র না করে বরং প্রেমের প্রস্তাবটা উইথড্র করুন।
— বেশ করলাম। অন ওয়ান কন্ডিশান।
অদিতি হেসে ফেলল। বলল
—জীবনে প্রেমের প্রস্তাব কম পাইনি। বাট সেটা উইথড্র করবার জন্য কেউ কখনও কন্ডিশান দেয়নি। এনিওয়ে, বলুন কি শর্ত?
— আমি কিছুক্ষণের জন্য আমার নীতি থেকে সরতে চাই।
অদিতি এবার হেসে ফেলল। লাইনে এসেছে। জানতে চাইল
— ব্যক্তিগত তথ্য জানতে না চাওয়ার নীতি?
— জ্বি
অদিতি কিছুক্ষণ ভাবল। ছেলেটা খারাপ না, তবে একে এখন আসল কথা বলার সময় এসে গেছে। এরপরে উত্তর দিতে যখন উদ্যত হল তখন আশফাক আবার বলে উঠল
— আমি কি আমার সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য দিতে পারি?
অদিতি না সূচক কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু আশফাকের চোখের দিকে তাকিয়ে থেমে গেল। চোখে একরাশ অনুনয় ঝড়ে পড়ছে। বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঝামেলা করবে। তারপরও ব্যাপারটায় সম্মতি দিল অদিতি। বলল
— বলুন।
— আমি খুব ভাল গল্প করতে পারি। আমার আরেকটা যোগ্যতা আছে। খুব কষ্টে থাকা মানুষকে খুব ভাল সঙ্গ দিতে পারি। বন্ধু বান্ধবরা আমাকে বলত, দুঃখ ফ্রেন্ড। আনে হচ্ছে, কেউ কোন কষ্টে থাকলে আমার কাছে আসত, ঘণ্টা খানেক গল্প করলেই নাকি ওদের দুঃখ কমে যেত।
কথাগুলো বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনল অদিতি। এরপরে জানতে চাইল
— শেষ?
— জ্বি। শেষ।
অদিতি নিজের কথাগুলো গুছিয়ে নিল। এরপরে বলতে শুরু করল
— আমার সম্পর্ক দুটো তথ্য জানলেই আশাকরি আপনার চলবে। প্রথমটা হচ্ছে, আমার ম্যারিটাল স্ট্যাটাস সম্পর্কে আপনি ভুল জানেন। একটা বিশেষ কারণে সিভিতে আনম্যারিড লিখতে হয়। আসল তথ্য হচ্ছে, আই অ্যাম ম্যারিড। যদিও দ্যা ম্যারেজ ইজ ওভার, বাট দিন পনের আগে পর্যন্তও বেশ সুখের একটা সংসার ছিল আমার। আর দ্বিতীয় তথ্যটা হচ্ছে…
অদিতিকে থামিয়ে দিয়ে আশফাক বলল
— আপনার জনৈক শুভাকাঙ্ক্ষী আপনার ন্যুড ছবি আপলোড করেছে। অ্যান্ড প্রোবাবলি সেই কারণেই সুখের সংসার ছারখার হতে যাচ্ছে।
মাথা নেড়ে না সূচক প্রতিবাদ করে বলল
— না, ওটা তো আপনি গুপ্তচর মারফত কিছুটা জেনেছেন আর কিছুটা গেস করছেন। বাট সেই তথ্য আপনার জন্য জরুরী না।। দ্বিতীয় কথাটা আপনার জন্য জানা জরুরী সেটা হচ্ছে, আমি এই পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
আশফাকের মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তবে অদিতির দিকে তাকিয়ে বুঝল, শী ইজ সিরিয়াস। এই সিদ্ধান্ত থেকে সে নড়বে না। শেষ চেষ্টা করল
— আমি কিন্তু সেব্যাপারে আপনাকে হেল্প করতে পারি। দেশের বেশ কিছু দুর্গম এলাকায় আমি গিয়েছি। ডিটেলস দিতে পারব
ম্লান একটা হাসি দিল অদিতি। এরপরে বলল
— নাহ। থ্যাংকস ফর দ্যা অফার। বাট, এই যুদ্ধ আমার একার। আমি একাই লড়তে চাই।
— কি করতে চান?
— জানি না। শুধু জানি হাতে আছে মাত্র এক সপ্তাহ।
— এবং তারপর মাথা গোঁজার কোন ঠাই থাকবে না, অন্ন বস্ত্রের কোন সাধনও থাকবে না।
অদিতি মিষ্টি করে হাসল
— ইয়েস।
— অ্যান্ড ইয়েট, ইউ ওয়ান্ট টু ফাইট ইট এলোন।
— ইয়েস।
— পারবেন?
— পারব? না পারব না, এই মুহূর্তে সেটা নিয়ে ভাবছি না।
— দেন?
— জীবনে প্রথমবারের মত 'আমি' হতে ইচ্ছে করছে। কারো স্ত্রী না, কারো কন্যা না, কারো প্রেমিকা না। আর এই ইচ্ছাকে আমি সম্মান জানাব। টিল মাই লাস্ট ব্রেথ। আমি লড়ব।
শেষ
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০১৭ রাত ২:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



