somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আজব দেশের আজব নীতিরে ভাই ,মানুষ মরেও শান্তিু নাই,

০৩ রা এপ্রিল, ২০১৭ সকাল ৯:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১০ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে পাঁচটায় শিহাবের আব্বু ঘর থেকে বেরিয়ে অফিসে গেল। ছেলেকে বলে গেল, ডিউটি সেরে বিকেলে তাকে নিয়ে কোরবানির গরু কিনতে যাবে। আগের দিন গিয়েছিল, কিন্তু পছন্দ হয়নি। ডিউটি ছিল দুইটায়, শিফট বদল করে সকালের শিফট নিয়েছিল—ছয়টা থেকে দুইটা। ছেলে তো সেই থেকে বসে আছে, কিন্তু সে তো আর ফিরে এল না। টাম্পাকোর আগুনে তাকে আর পাওয়া গেল না।
শিহাবের বাবা অফিসে চলে যাওয়ার পর আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। আমার শাশুড়ি এসে ডাকেন। জানতে চান, আনিস কোথায়? আমি বললাম, ও তো ডিউটিতে গেছে। পরে বললেন, টাম্পাকোতে তো আগুন ধরেছে, কী করা? আমার মোবাইল খুঁজে পাই না। অনেকক্ষণ পর দেখি মোবাইল বালিশের নিচে। কল দিলাম। প্রথমে একবার রিং হয়েছে। তারপর বন্ধ হয়ে গেছে। আর ধরে না। ভয় পেয়ে আমরা সবাই মিলে গেলাম টাম্পাকোর সামনে। অনেক কান্নাকাটি করেছি, অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছি। ওখানে পুলিশ দাঁড়িয়ে ছিল, পরে আমাদের আর ঢুকতে দেয়নি। অনেক হুড়োহুড়ি করার পর টঙ্গী মেডিকেল, উত্তরা, বাংলাদেশ মেডিকেল—ঢাকায় যত জায়গা আছে, সব জায়গায় লোকজন খুঁজে দেখেছে। সব জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করেছি, যোগাযোগ করেছি, কিন্তু কোনো জায়গাতেই তাকে পাইনি।
টঙ্গী মেডিকেলে গিয়ে দেখি সাঈদ ভাই বেডে শোয়া। ওনার তো এখানেই বাসা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ভাইয়া, আপনার ভাই কই। উনি অবাক হয়ে ‘আনিস ভাই কই, আনিস ভাই কই’ বলে পাশের বেডগুলোতে খুঁজতে শুরু করেন। বলেন, ‘আনিস ভাই আর আমি তো একসঙ্গে ঢুকছি, আনিস ভাই বাঁয়ে গেছে, আমি ডাইনে গেছি। আমি বের হইছি, আর তিনি বের হতে পারেননি।’
আমরা আশা ছাড়িনি। মনে করলাম, হয়তো বেঁচে আছে, হয়তো কোনো চিপে চাপায় পড়ে আছে, বের হতে পারছে না। আমার ভাই-দেবর-ভাশুর—সবাই তো ফ্যাক্টরির ভেতরে ঢুকে গেল। প্রায় ১০ জন ঘটনাস্থলে উদ্ধারকারীদের সঙ্গে দিনরাত কাজ করল। নিজ হাতে অনেকের লাশ বের করেছে শুধু তাকে পাওয়ার জন্য, কিন্তু তার লাশটা পেলাম না। লাশ বের করছে আর মোবাইল করছে আমাদের, ‘এই লাশ বের করছি, ওইটা বের করছি, আনিস ভাইকে পাচ্ছি না।’ আমরা মোবাইলে ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি আর এদিকে ঘুরছি, অনেক খোঁজাখুঁজি করছি, কোথাও তাকে পাই না। অনেক কান্নাকাটি করেছি রাস্তায় দাঁড়িয়ে, অনেক লাশ পাশে পড়ে ছিল।
নয়জন নিখোঁজ। তার মধ্যে আটটি লাশ পাওয়া গেছে। সেগুলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। আমরা সিআইডি অফিসে নমুনা দিলাম—আমার শ্বশুর-শাশুড়ির রক্ত, আমার ছেলের মুখের লালা। চিকিৎসকদের জিজ্ঞেস করলাম, কত দিন লাগবে রিপোর্ট আসতে। তারা বলল, দেড় মাস। তখন মনে করলাম, আর দেড় মাস ধৈর্য ধরি। কিন্তু দেড় মাস পার হয়ে চার মাস হয়ে গেল। ১৯ জানুয়ারি রিপোর্ট এল পাঁচজনের, তার মধ্যে আমাদের রিপোর্ট নেই। চারটি লাশের নমুনা ‘নষ্ট’ হয়ে গেছে। আবার নমুনা দিয়ে রিপোর্ট তৈরি করতে হবে, আরও কত দিন লাগবে জানি না।
থানায় যোগাযোগ করলে বলে, কোর্ট থেকে ডিএনএ টেস্টিংয়ের নতুন অর্ডার পাস হবে, তারপরে। আমি বলি, স্যার, আর কত দিন লাগবে বলেন, আগের মতো সময় লাগবে? আগে তো চার মাস লেগেছে। কখনো বলে লাগবে, কখনো বলে, না, অত দিন লাগবে না। আমার দেবর-ভাশুর যোগাযোগ করলে একেক দিন একেক কথা বলে। এখন তাহলে আমরা কী করব, কোথায় যাব, কদ্দিনে লাশ বুঝে পাব, কে ঠিক ঠিক বলতে পারবে? ছয় মাসে যে লাশ পেলাম না, সেই লাশ আর কত দিনে পাব?
আমরা সব হারিয়েছি। জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান মানুষটিকে হারিয়ে ফেলেছি। আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু দুটো ছেলে আছে। ছোটটিকে এক মাসের আর বড়টিকে পাঁচ বছর বয়সে রেখে গেছে। এরা বাবার আদর-সোহাগ সবকিছু থেকে বঞ্চিত হলো। সরকার, কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন লাশের যা-ই অবশিষ্ট থাক, সেটা আমাদের ফিরিয়ে দিন, যাতে ছেলেরা বাবার কবরে এক মুঠো মাটি দিতে পারে, বাবার কথা মনে পড়লে কবরের পাশে গিয়ে কান্না করতে পারে, কবর জিয়ারত করতে পারে। তাদের বাবার এটুকু স্মৃতি যাতে থাকে।
৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন টঙ্গী আইআরআই অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠান করে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে আর আহত ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তা দেয়। প্রতিমন্ত্রী, এমপি সাহেব, সচিব—তাঁরা এসেছিলেন। কারও কারও মুখে শুনেছিলাম, ক্ষতিগ্রস্ত সবাইকে যেতে বলেছে। আবার কেউ কেউ বলল, না, শুধু যাদের ডিএনএ ম্যাচ হয়েছে, তারা। আমি ভাবলাম, টাকা না পাই, ওখানে গেলে নিশ্চয়ই জানতে পারব কবে আমাদের বাকি চারটি লাশ দেবে। সেখানে মন্ত্রী থাকবেন, আরও অনেকে থাকবেন। অনেক আশায় আমার বড় ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমার দুঃখের কথা শোনা তো দূরের কথা, ওই ভবনে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি।
আমাদের ডিএনএ নমুনা নষ্ট হয়ে গেছে, এটা তো আমাদের দোষ নয়। শিহাবের বাবা অনেক কষ্ট করে অল্প কিছু টাকা ব্যাংকে জমিয়েছিল আমাকে নমিনি করে। টাকার জন্য ব্যাংকে গিয়ে অনেকক্ষণ বসে ছিলাম। ব্যাংক আমাদের টাকা দিল না। তারা বলে, ডেথ সার্টিফিকেট ছাড়া দেওয়া যাবে না। মনে হয়, চারপাশে মানুষ আমাদের নিয়ে ছেলেখেলা করে। আজ প্রায় সাত মাস, আমাদের উপার্জনের লোক নেই। সরকার বা টাম্পাকো—কেউ দুটো টাকা দিয়ে সাহায্য করল না, কীভাবে আমাদের সংসার চলে, খোঁজও নিতে এল না।
সব জায়গায় আমাদের হয়রানি করা হচ্ছে। এই কি আমাদের দেশের নিয়ম? মানুষ মারা যায়, মাটি দেয়, ভুলে
যায়। কিন্তু আমরা কী করে ভুলব? মনে হয়, এই যেন সে হেঁটে আসছে। তার লাশ না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের মনে কোনো শান্তি নেই।

শারমিন আক্তার: গাজীপুরে টঙ্গীর টাম্পাকো ফয়েলস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিখোঁজ মেশিন অপারেটর আনিসুর রহমানের স্ত্রী
কবে আমাদের দেশটা এটা সুন্দর , সুশাসন, ‍সু শৃঙ্খল হবে!
সুত্র: প্রথম আলো
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা এপ্রিল, ২০১৭ সকাল ৯:১১
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"বহু দিন পর বন্ধু"

লিখেছেন সনজিত, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৮


বহু বছর পর হঠাৎ তোর সঙ্গে দেখা।
প্রথমে চিনতেই পারিনি।
তারপর একচিলতে হাসি-
মনে হলো,
সময় আমাদের চেহারা বদলেছে,
কিন্তু শৈশবের মুখটা এখনো একই রয়ে গেছে।

চোখের কোণে ক্লান্তির রেখা,
চুল অর্ধেকটা সাদা রং,
কাঁধে সংসার,... ...বাকিটুকু পড়ুন

কিছু খাতের চাকুরী বেতন-ভাতামুক্ত ঘোষণা করা যেতে পারে

লিখেছেন এমএলজি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:২৮

এক সমীক্ষায় জানা যায়, বাংলাদেশে সরকারি চাকুরেদের প্রায় ৯১ শতাংশ ঘুষ গ্রহণ করে। এছাড়া, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনেকেও মনে করেন বাংলাদেশে দুর্নীতি নির্মূল সম্ভব নয়; যার অর্থ দাঁড়ায়, দুর্নীতিকে আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্বিচারিতার এক অদ্ভুত মহাকাব্য

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:২৩



দ্বিচারিতার এক অদ্ভুত মহাকাব্য

যতদিন যাচ্ছে, ততই মনে হচ্ছ -এই দেশের তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশকে নিয়ে আশাবাদী হওয়াটা রীতিমতো বিলাসিতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সেদিন দেখলাম, এক ছাত্রশিবির নেতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

×