সাব্বির, কেমন আছ?
- ভালো নাই ভাইয়া।
আমার এই প্রশ্নের জবাবে গত কয়েকমাস একই উত্তর দেয় সাব্বির। আমি প্রতিদিনের মত দ্বিতীয় প্রশ্নটা করি।
- কেন ভালো নেই?
সে বলে চান্স পাব কিনা জানিনা। খুব টেনশনে আছি। কিছু ভালো লাগছে না।
এবার মেডিকেলে পরীক্ষা দিবে সে। গত কয়েকমাস ধরে এই একটি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে তার সকল চিন্তা-ভাবনা, আশা-আক্ঙ্ক্ষা। ছোটবেলা থেকে যে স্বপ্নের জাল বুনছিল সে তার খুব কাছাকছি এসে পৌছেছে সে। আর মাত্র অল্প কয়েকটা দিন। এর পরেই দিগন্ত বিস্তৃত সম্ভাবনার ভবিষ্যতের হাতছানি তার সামনে। স্বপ্নের মেডিকেল কলেজে চান্স পাবে সে। ডাক্তার হবে।
স্বপ্ন বাস্তবায়নের এক অদম্য স্পৃহা তার সকল টেনশন ছাপিয়ে তাকে করে তোলে উদ্যমী-পরিশ্রমী।নিয়মিত ১০-১২ ঘন্টা পড়াশোনা করে সে। কোন কোন দিন এর চাইতেও বেশি। তার জীবনের অন্য সব প্রয়োজনগুলো তার এই স্বপ্নের কাছে ম্লান হয়ে যায়।
গলার মধ্যে স্টপওয়াচ লাগিয়ে রাখে। প্রত্যেকটা সেকেন্ড এখন তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। একেবারেই সময় নষ্ট করা যাবে না। একসময় যে সাব্বির খেলাধূলা দেখার জন্য পাগল ছিল এখন তার চোখের সামনেই শেষ হয়ে গেল ‘‘TheThe Greatest show on earth’’ খ্যাত অলিম্পিক।
প্রিয়দল ব্রাজিল হেরে গেছে ফাইনালে-এই অনুভূতি তাকে এখন আর খুব বেশি নাড়া দেয় না। তার অনুভূতির পুরোটা জায়গা জুড়ে এখন শুধু মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা। শুধুই ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন।
সাব্বিরের আম্মু মাঝে মাঝে আমাকে অভিযোগ করেন, সাব্বির নাকি পড়তে পড়তে টেবিলেই ঘুমিয়ে যায় অনেক সময়। খাবার নিয়ে ডাইনিং এ বসে থাকেন তিনি। কিন্তু সাব্বিরের পড়া শেষ হয় না।
ছেলের এই হার না মানা পরিশ্রম অভিভূত করে মাকে। দূর থেকে ছেলের টেবিলের দিকে তাকিয়ে অশ্রু বিসর্জন দেন তিনি। আল্লাহর কাছে দুহাত তুলে দোয়া করতে থাকেন ছেলের জন্য।
আগে থেকেই নিয়মিত নামায পড়ত সাব্বির। কিন্তু গত কয়েকমাসে তার ইবাদত বন্দেগী আরও অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। হয়েছে অনেক পরিশীলিত। রাতে ঘুমানোর আগে প্রায়ই দুই রাকাত নামায পড়ে ঘুমায় সে। সেজদায় গিয়ে অঝোরে চোখের পানি ঢালতে থাকে। চোখের পানিতে জায়নামায ভিজিয়ে হৃদয়ের সকল আবেগ দিয়ে মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে প্রার্থনা করে- “হে আল্লাহ তুমি আমার স্বপ্নটা পূরণ করে দাও। আমাকে মেডিকেলে চান্স পাওয়ার ব্যবস্থা করে দাও”।
সাব্বিরের আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম এবং সর্বোপরী কোচিং এ তার পারফরমেন্স-এ তার বন্ধুমহলে সবাই নিশ্চিত যে সাব্বির অবশ্যই চান্স পাবে। তার বাবা-মাও অনেক আশাবাদী ছেলে ডাক্তার হবে। এখন শুধু অপেক্ষা সেই মহারণের জন্য।
শেষ মুহুর্তের প্রস্তুতিটা সম্পন্ন করছে সাব্বির।
... ঠিক এমনই মুহুর্তে এল সেই দুঃসংবাদ। তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নের ইমারত দুই লাইনের একটি ঘোষণার মাধ্যমে খান খান করে ভেঙে দিলেন মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
ভর্তিপরীক্ষা ছাড়াই নাকি এবার ভর্তি করা হবে মেডিকেলে।
হাজারো মেধাবী শিক্ষার্থী আর তাদের অসহায় অভিভাবকদের চামড়া ভেদ করে হৃদয়ের গভীরে যন্ত্রণার ঝড় বইয়ে দিয়েছে এই সিদ্ধান্ত।
সাব্বিরের স্বপ্নের নীল আকাশে এখন কালোমেঘের ঘনঘটা। অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেছে তার স্বপ্নীল আকাশ।
হাজারো পরীক্ষার্থীর সাথে ভর্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্য প্রমাণ করে স্বপ্নের সোনালী ক্যাম্পাসে চান্স পাওয়ার স্বপ্ন কি তার স্বপ্নই থেকে যাবে?? দূর্নীতির অক্টোপাসে ঘেরা এই দেশে টাকা আর মামার দৌরাত্ম ছিন্ন করে নিজের স্বপ্নটি কি পূরণ করতে পারবে সাব্বির??
সাব্বির কি পারবে ডাক্তার হতে??
...এরকম হাজারো প্রশ্নবানে জর্জরিত সাব্বিরের কোমল হৃদয়।
এখন শুধুই কর্তৃপক্ষের দিকে তাকিয়ে থাকা।
এই হঠকারী সিদ্ধান্ত কি বাতিল করবে তারা?? তাদের কি বোধাদয় হবে??
আমরা আহ্বান জানাব মেডিকেল ক্যাম্পাসকে মেধাশূন্য করার এই হটকারী সিদ্ধান্ত বাতিল করা হোক। সাব্বিরদের মত ‘মেধাবীদের’ চান্স পাওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




