ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত দুইটা বিষয় ছিল আমার কাছে চরম আতংকের নাম। একটা ইংরেজি অপরটা হল গণিত। ইংরেজিতে তো কোনমতে ১০/২০ তুলতে পারতাম, কিন্তু গণিতে তো আর কোনমতে কিছু হয় না সুতরাং প্রত্যেক পরীক্ষায়ই গণিতে আমার প্রাপ্ত নাম্বার ছিল ডাবল জিরো। এই অবস্থা চলছিল ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে নবম শ্রেণীর ফাইনাল পরীক্ষা পর্যন্ত। আশা ছিল এই দুটি বিষয়ে বাদে বাকি বিষয়গুলোতে পাশ করে যথারীতি দ্বিতীয় বিবেচনায় দশম শ্রেণীতে উর্ত্তীন হব। আশা বিফলে যায়নি, দ্বিতীয় বিবেচনা’য়ই দশম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। আমাদের সময় এক বিষয়ে ফেল করলে ‘প্রথম বিবেচনা’, দুই বিষয়ে ফেল করলে ‘দ্বিতীয় বিবেচনা’, তিন বিষয়ে ফেল করলে ‘তৃতীয় বিবেচনা’ আর চার বা ততোধিক বিষয়ে ফেল করলে ‘বিশেষ বিবেচনা’র ব্যবস্থা ছিল। আর আমরা ক’জন ফ্রেন্ড ছিলাম এই বিবেচনা’র সুবিধা ভোগি।

[ছবি : স্যারের ফেইসবুক পেইজ থেকে]
দশম শ্রেণীর শুরুতে পেলাম দিবানন্দ স্যারকে আমাদের গণিতের শিক্ষক হিসেবে। পাল্টে যেতে থাকল আমার গণিত ভীতির হিসেব নিকাশ। আস্তে আস্তে পাটিগণিত আর বিজগণিত আয়ত্বে আসতে শুরু হল, ক্লাসের খাতায় ‘০’ শুণ্যের বদলে কিছু নাম্বার বসতে শুরু করল।কঠিন মগজের মত উপপাদ্য আর সম্পাদ্য ও সহজ মনে হতে লাগল। শুরু হল আমার গণিত ভালোবাসা।পাশাপাশি সব বই এর নিচে রাখা ইংরেজি বইটাও তুলে আনলাম গণিতের পরই। দশম শ্রেণীর প্রি-টেষ্ট পরীক্ষায় বুঝতে পারলাম কিছু একটা হবে।পরীক্ষার রেজাল্ট বের হবার পর অভ্যাসবশত নিচ থেকে আমার নাম খোজা শুরু করলাম, লিষ্টের নির্ধারিত জায়গা পর্যন্ত আমার নাম দেখতে না পেয়ে বুজলাম কম দিনের অভ্যাসে হয়তো সরল অংকের ফলাফল মিচিং হইছে।সম্পাদ্যের জায়গা উপপাদ্যের সূত্র মিলিয়ে দিয়েছি।কিন্তু ঘাড় ঘুড়িয়ে যখন লিষ্টের উপরের দিকে তাকালাম, রেজাল্ট দেখে আমি নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, আমি বিবেচনা মুক্ত হয়ে গেছি।এইবারই প্রথম কোন প্রকার বিশেষ বিবেচনার সুবিধা না নিয়ে সকল শিক্ষকদের সহযোগিতায় ও দোয়ায় একেবারে ক্রমিক নং- (২) দুইয়ে পৌছে গেছি।স্যারেরাও বিশ্বাস করতে পারছিলেন কি না জানি না তবে সবচেয়ে বেশী খুশি হয়েছিলেন মনে হয় শ্রদ্ধেয় তছর আলী স্যার, আশিক স্যার, রাধিকা স্যার ও কৃপেশ স্যার। কারণ উনারাই ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ইংরেজীর ক্লাসে আমাকে মানুষ করতে উনাদের হাতের অক্লান্ত বিয়াম করতে হয়েছিল প্রতিনিয়ত। শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর নি:স্বার্থ শিক্ষাদানের কল্যাণে শুরু হল এস.এস.সি ফাইনাল পরীক্ষা দেবার স্বপ্ন । প্রি-টেষ্ট পরীক্ষার পর কিছুদিন স্কুল বন্ধ ছিল, এই সুযোগে ভর্তি হলাম দিবানন্দ স্যার এর কাছে গণিত প্রাইভেট পড়তে। আমার এখন মনে হইতেছে দিবানন্দ স্যার এর হাতে মনে হয় গণিতের একটা আলাদিনের চেরাগ আছে। ঘষা দিলেই সকল অংকের সহজ নিয়ম বের হয়। স্যারের কাছে মাত্র এক মাস প্রাইভেট পড়াকালিন সময়ের মধ্যেই গণিত বই আমার কাছে মাসী-খালার মত পরিচিত হয়ে গেল (বি:দ্র: প্রাইভেট পড়া বলতে এ যামানার প্রাইভেট নয়, আমাদের প্রাইভেট ছিল স্যারের নিজ বাড়ীতে নূন্যতম সম্মানীতে, অনেক সময় সম্পূর্ণ ফ্রিতে)।
এস.এস.সি পরীক্ষার রেজাল্ট বের হল। গণিতে লেটার মার্কস সহ উত্তীর্ণ হলাম। মার্কসীট দেখে পরে জানতে পেরেছিলাম সে বছর এস.এস.সি ফাইনাল পরীক্ষায় আমাদের রৌয়াইল হাই স্কুল থেকে আমিই মনে হয় গণিতে সবচেয়ে বেশী মার্ক পেয়েছিলাম। এই লেটার মার্কের পুরো অবদানই ছিল শ্রদ্ধেয় দিবানন্দ স্যার এর। স্যার আপনাকে খুব বেশি মিস করি।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জুন, ২০১৬ রাত ২:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



