somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ গলে পড়া চাঁদ

২৮ শে নভেম্বর, ২০১৬ রাত ১০:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে, শীত নামানো বৃষ্টি। চোখ লেগে আসছে আমিনের। ছোট টঙের দোকানে মোটামুটি একটা জটলা জমে আছে। বৃষ্টি থেকে বাঁচার আশায় অনেকেই জমেছে এখানে। সে আশা কারও জন্য নিরাশা হচ্ছে, টঙের পলিথিনের ছাউনি দিয়ে বৃষ্টির আঁচ বাঁধা পাচ্ছে না। বরং ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে আরও। এই নিয়ে চার কাপ চা খাওয়া হল আমিনের। তবু ঘুমের ঘোর কাটছে না, কাটার কথাও না। দুই রাত না ঘুমাবার ধকল এতো সহজে কেটে যায় না। নির্ঘুম রাত কাটাবার পিছনে যথা উপযুক্ত কারণ আছে। পুলিশ খুঁজছে আমিনকে। নিলির বাবা আমিনের বিরুদ্ধে কেস ঠুকে দিয়েছেন। অথচ আমিন জানে, আমিন কিছুই করে নি। সম্পূর্ণ নির্দোষ। সে কথা পুলিশের কাছে গিয়ে বলতেও পারছে না। প্রত্যেক অপরাধীই নিজেকে নির্দোষ বলে দাবী করে। সেই মিথ্যুক গুলোর জন্য আমিনের সত্য খুব একটা গুরুত্ব পাবে না পুলিশের কাছে। পুলিশ খোঁজ চালাচ্ছে আমিনের কাছের বন্ধু গুলোর বাড়িতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে। তাই মোটামুটি দূর সম্পর্কের বন্ধু গুলোর ওখানেই কাটাচ্ছে রাত, নির্ঘুম রাত। গত রাতে শিহাবের বাসায়, তার আগের রাতে সোহেলের মেসে। দুজনের কারও সাথেই ভাল সম্পর্ক ছিল না কখনও। এক সাথে পড়াশুনা করত কলেজে সেই হিসাবে, "আরে দোস্ত" রকম সম্পর্ক। আজ রাতে কোথাও কাটানো যাবে না। এর মধ্যে সংবাদ পত্রে খবর চলে এসেছে। কিছু কিছু সস্তা বাজারি, অনলাইন সংবাদ পত্র রংচং মেখে আমিন আর নিলির সংবাদ ছেপেছে। এরই মধ্যে ফেসবুকে নাকি আবার আমিনের বিচার চেয়ে ইভেন্ট খোলা হয়েছে। ফেসবুকের জনপ্রিয় "সেলিব্রেটিবৃন্দ" আমিনের বিরুদ্ধে বিশাল বিশাল সব স্ট্যাটাস লিখছে। এরাও সস্তা বাজারি সংবাদ পত্র গুলোর মত। ঘটনার আগা মাথা কিছুই না জেনে, এদের মাথা মোটা বুদ্ধির জোরে বিশাল সব জ্ঞান গর্ভ বাণী সম্বলিত কথা বার্তা লিখে নিজেদের জনপ্রিয় করে তোলার চেষ্টায় ব্যস্ত। ইস্যু পরিবর্তন তো টিস্যুর মত আগের ইস্যু মুছে নতুন ইস্যুকে টিস্যু বানিয়ে নাক মুছতে শুরু করে। নিলির সাথে তেমন কিছুই কখনও ছিল না আমিনের। নিলির পরিবার থেকেই শুধু শুধু ব্যাপারটা বাড়িয়ে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। শাহেদ নামের ছেলেটার সাথে দেখা করা জরুরী। নিলি ছাড়া সে ব্যাপারটাও অসম্ভব। শাহেদের সাথে কখনও দেখা হয় নি, কথাও হয় নি আমিনের। নিলির সবসময় একই কথা, শাহেদের সাথে তোমার এতো কী? শাহেদ থাকবে শাহেদের মত, তুমি তোমার মত।
আমিন আমিনের মত থাকতে গিয়েই ধরা খেল। শাহেদ শাহেদের মত নিশ্চিন্তে পার পেয়ে গেল। বন্ধু হিসাবে বার কয়েক নিলির বাসায় যাওয়া হয়েছে আমিনের। ছেলে বন্ধুকে নিলির পরিবার খুব একটা ভাল চোখে দেখে না, তবুও প্রথম দিকে আমিনের সাথে খারাপ কোন ব্যবহার করে নি নিলির পরিবার। নিলির বাসায় গেলে, বেশ হাসি মুখেই কথা বলতেন নিলির মা, বাবা, একমাত্র বড় ভাই। আদর যত্ন করে খেতে দিত। আমিনও কেমন যেন আপন করে নিয়েছিল পরিবারটাকে। ব্যাপার গুলো ঘোলাটে হতে শুরু করল কবে থেকে, বলা মুশকিল। যতটা সম্ভব নিলির যেবার থার্ড সেমিস্টারের ফলাফল দিল সেবার। নিলি ডিপার্টমেন্টে দ্বিতীয় হয়েছে, সে খুশিতে আমিন এক তোড়া রজনীগন্ধা নিয়ে হাজির হয়েছিল নিলিকে অভিনন্দন জানাতে। তবে নিলির পরিবার এবং এলাকাবাসী কাছে ব্যাপারটা এমন ছিল যেন আমিন ফুলের তোড়া না, বোমা নিয়ে নিলির বাসায় হাজির হয়েছে। সে বোমা কিছুক্ষণের মধ্যে বিস্ফোরণে এলাকাবাসী সহ নিলির পরিবারের সবাই নিহত হবে। এই অপরাধের জন্য আমিনকে জঙ্গি হিসাবে গ্রেফতার করা হবে। নিলি সেদিন ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে এক ফোটাও হাসে নি, বরং মুখখানা প্রচণ্ড শক্ত করে বলেছিল, এসব কি বাড়াবাড়ি না আমিন?
- তুমি ভাল রেসাল্ট করলে, আমি তাই কিছু আনতেও পারি না?
- আনতে পারো, তবে এভাবে কেন? যাই হোক, যা করেছ ভাল করেছ। এখন যাও।
- না খেয়েই চলে যাব?
- এই সকাল বেলা বাসায় কিছু রান্না হয় নি। আম্মা খুব রাগ পেয়েছে তোমার উপর। খেতে দিবে না। যাও তুমি।
আমিন অপরাধীর মত বাসা থেকে বেরিয়ে এসেছিল সেদিন। বাসার সামনের বখাটে গুলো সেই সকাল বেলাও ছিল। আমিনকে দেখে এমন করে তাকাচ্ছিল যেন, আমিনকে হাতের মুঠোয় পেলে ভর্তা বানিয়ে ফেলবে। ঘটনার শুরু বোধ হয় সেদিনই। বখাটে গুলো নাকি, নিলির বড় ভাইকে ডেকে নানা কথা শুনিয়ে দিয়েছে। এলাকার মান সম্মান সব নাকি আমিন এক তোড়া ফুল দিয়ে ডুবিয়ে দিয়েছে। বাড়িতে এসে নিলিকেও অনেক কথা শুনিয়েছিল নিলির বড় ভাই। "বন্ধু থাকবে বন্ধুর মত, ফুল নিয়ে কেন আসতে হবে?"
অথচ নিলির বড় ভাই নিয়মিত বনানী যায়, দুই তিনটা গোলাপ হাতে করে প্রায় দিন, সে যে মেয়েকে পছন্দ করে তাকে প্রেম নিবেদন করতে। সেসব মানা যায়, আমিনের ব্যাপার আলাদা। এরপর থেকে আমিনের নিলিদের বাসায় যাওয়া আসা বন্ধ। মাঝে মধ্যে হলের জঘন্য খাবারে যখন মুখ ফিরে আসত নিলিদের বাসায় গিয়ে দারুণ কিছু খাবার খাওয়া যেত। সে পথও বন্ধ। নিলি একদিন আমিনকে বলল, আমিন তোমাকে নিয়ে বাসায় খুব ঝামেলা হচ্ছে।
- আমি আবার কী করলাম? ফুল নিয়ে গিয়েছিলাম তাও তো প্রায় দুই মাস।
- আরে না, আমার বাসায় আমার বিয়ের কথা চলছে।
- হ্যাঁ ভাল কথা। বয়স হয়েছে তোমার। বিয়ে করা জরুরী।
- আমি তো রাজি না।
- আচ্ছা। তো এর মধ্যে আমি আসলাম কোথা থেকে?
- সেটা আমিও জানি না। বিয়ের কথা বলল, আমি রাজি না বললাম। ছেলে পছন্দ না, পরিবার পছন্দ না। এসব বলার পর, তোমাকে নিয়ে কথা জিজ্ঞেস করা শুরু করল। আমাকে বুঝাল সমবয়সী এভাবে বিয়ে হয় না। হ্যান ত্যান কত কিছু। ছেলের পরিবার ভাল হতে হবে তো। এমন ছেলেকে যদি পছন্দ করিস, যার পরিবার নিয়ে আমরা লজ্জা পাব, তবে কীভাবে হয়? আরও কত কী।
- আমাকে তুমি পছন্দ কর, এসব বলেছ নাকি আবার?
- আরে না, তোমাকে পছন্দ করি এসব বলব কেন? এদের ধারণা আমি তোমাকে পছন্দ করি। আমি কিছুই বলি নাই।

আমিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আমিনের পরিবারের অবস্থা আসলেই বেশি একটা ভাল না। বেশি একটা ভাল না, না বলে বলা উচিৎ খুবই খারাপ। সহসাই সেদিন মনের মাঝে উঁকি দিচ্ছিল, যদি কখনও কাউকে পছন্দ করেই ফেলে আমিন, তাকে বিয়ে করবে ভেবেই নেয়। সে মেয়ের পরিবারের লোক গুলোও তো বলবে, ছেলের বাবা কামলা খাটে। রাজমিস্ত্রিদের সাথের হেল্পার। ছিঃ ছিঃ।
এরা ভাববে না, ছেলে কী করছে। এদের চিন্তায় আসবে না, এই পরিবারের ঐ অশিক্ষিত কামলা বাবাই, আমিনকে পড়াশুনা করে এতো দূর এনেছে। আর বছর খানেক গেলেই আমিন ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বের হবে। বড়ই আজব মানুষের মন, বিচার শক্তি, বোধ শক্তি।
এই ঝামেলা চলতে চলতেই অঘটনটা ঘটে গেল। আমিন এখন পুলিশের ভয়ে এখানে ওখানে ঘুরে বেরাচ্ছে। আশেপাশে প্যান্ট শার্ট পরা কাউকে দেখলেই পুলিশ মনে হয়। এখন কোথায় যাওয়া যায়, কোথায় যাওয়া দরকার কিছুই মাথায় ঢুকছে না। হুট করে মাথায় একজনের কথা আসল। আমিনের এক পরিচিত বড় বোন, নাম স্নিগ্ধা, একবার এক লোকের ঠিকানা দিয়েছিল বলেছিল জীবন নিয়ে হতাশ হয়ে গেলে, তার কাছে যেতে। অনেক খুঁজে মানিব্যাগের কোণায় ঠিকানাটা পেল। বৃষ্টি এখনও থামে নি। ঝিরিঝিরির বৃষ্টির রেষ বাড়ছে আরও। আমিন চায়ের টঙে বিলটা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। লোকটার বাড়িতে যাওয়া দরকার। কেন দরকার সে ব্যাপারে কিছু মাথায় আসছে না এখন।
নিলিকে সবসময় ক্লাসে চুপচাপ দেখত আমিন। খুব একটা কথা বলত না কারও সাথে, না ছেলেদের সাথে, না মেয়েদের সাথে। তবুও ক্লাসে পাশাপাশি বসতে বসতে টুকটাক কথায় কীভাবে যেন বেশ ভাল একটা সম্পর্ক হয়ে গেল। টুকটাক কথা, একসময় কথার ঝুড়ি হল। ক্যাম্পাসে, ভার্সিটি আসা যাওয়ার পথে, বাসায় বসে মোবাইলে কথা চলতই। রুটিন করে প্রতি রাতে নিলি আমিনের সাথে কথা বলত। রাত বারোটা থেকে দুইটা। মাঝে মাঝে দেরিতে কথা বলা শুরু হত, তবে সেই দুইটা পর্যন্তই। দুইটার সময় সবসময় ফোন রেখে ঘুমাতে চলে যেত। একদিন হুট করেই নিলি বলল, তোমাকে একটা কথা বলব?
- হ্যাঁ বল।
- রাগ করবে না বল?
- রাগ করব কেন?
- আমার শাহেদ নামে একটা ছেলের সাথে গত দুই বছর ধরে সম্পর্ক।
কথাটা শুনে খানিক সময়ের জন্য থমকে গিয়েছিল আমিন। বুকের কোথায় যেন একটু একটু চিনচিনে ব্যথা করছিল। সে ব্যথার কারণ জানে না আমিন। জানার কোন প্রয়োজন ছিল না। সব ব্যথার কারণ জানতে নেই। জানতে গেলেই চিনিচিনে ব্যথা ক্ষত হবে, শরীরের সব জায়গায় ছড়িয়ে যাবে। আমিন একটু স্বাভাবিক হয়েই বলেছিল, এতদিন বল নি যে?
- বলা হয় নি।
- কী করে? কোথায় পড়ে? ছবি দেখাও।
- থাক এতো কিছু জানতে হবে না। যতটুকু জেনেছ তাই অনেক। সময় আসুক, সব জানবে। তোমার সাথে কথা বলার পর, প্রতি রাতে ওর সাথে কথা বলি।
- আচ্ছা।
- কী আচ্ছা?
- আমার সাথে কথা বলার পর ওর সাথে কথা বল।
- হুম, রাত দুইটা বাজে। ঘুমিয়ে যাও তুমি। শাহেদ ফোন দিবে এখন।
আমিন সে রাতে ঘুমাতে পারে নি। অজানা একটা শূন্যতা এসে মনে হচ্ছিল কিছু পূর্ণতাকে হাওয়া করে দিয়ে গিয়েছে। এরপর প্রতি নিয়ত আমিনকে নিলি শাহেদের কথা বলত। ঐ যে সে রাতে যে টুকু বলেছে, ঐ টুকুই ঘুরে ফিরে। এর চেয়ে বেশি কিছুই জানতে পারে নি আমিন।

আমিন এসে বার কয়েক দরজায় সামনের কলিং বেল টিপল, ভিতর থেকে কোন সাড়া আসল না। ভিতরে কেউ নেই নাকি? কিছুক্ষণ বাদে দরজা খুলে একজন বেরিয়ে আসল। আমিন ভেবেছিল বেশ ভারিক্কী রকম চেহারার একজন মানুষ হবেন তিনি। কিন্তু ঘটনা সম্পূর্ণ আলাদা। কেমন ছোট খাটো একজন মানুষ। চেহারায় এখনও বাচ্চা সুলভ ছাপ। দেখে মনে হয় আমিনই এর চেয়ে ঢের বড়।
- কাকে চাই?
বেশ গম্ভীর গলায় লোকটা জিজ্ঞেস করল।
- জ্বি আপনার সাথেই দেখা করতে এসেছি।
- আমার নাম কী?
প্রশ্ন শুনে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল আমিন। স্নিগ্ধা আপু নামটা বলেছিল, বেশ আনকমন একটা নাম, তাই ভুলে গিয়েছে। আমিন একটু আমতা আমতা করে বলল, আসলে আমি নামটা ভুলে গিয়েছি।
- এ কী কথা? নাম জানেন না, আবার আমার সাথেই দেখা করতে এসেছেন?
- আপনি তো ডাক্তার তাই না?
- হ্যাঁ। তবে আমি তো কোন রুগী টুগি দেখি না।
- তাহলে ঠিক আছে। ভিতরে আসব? আমাকে আপনার ঠিকানা, স্নিগ্ধা নামে একজন দিয়েছিল। সম্পর্কে আমার একভাবে উনি বোন হন।

লোকটা ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলল, বিরক্ত না হতাশ বোঝা গেল না। গম্ভীর ভাবেই বলল, ভিতরে আসুন।
আমিন লোকটার সাথে ভিতরে গেল। একদম অগোছালো ঘর। ছোট একটা রুম, ইচ্ছা করলেই সুন্দর গুছিয়ে রাখা যায়। এই লোক তা করেন নি, দেখে মনে হচ্ছে ইচ্ছা করে অগোছালো করে রেখেছে। আমিন এদিক ওদিক তাকিয়ে সব দেখছিল। লোকটা সোফায় বসে বলল, জ্বি বলুন। আমার কাছে কেন?
আমিন মুখ ঘুরিয়ে লোকটার দিকে তাকাল। আমিনও লোকটার মত মুখে একটা গাম্ভীর্য এনে বলল, আমাকে চিনতে পারছেন?
লোকটা বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিল, না। আপনার সাথে আমার আগে কখনও দেখা হয় নি, আপনাকে আমি কখনও দেখিও নি।
"আমাকে চিনতে পারছেন?" প্রশ্নে বেশির ভাগ মানুষই চিনুক বা না চিনুক অন্তত কিছুক্ষণ সূক্ষ্ম দৃষ্টি মেলে পর্যবেক্ষণ করে। এই লোক তা করে নি। তার মানে এই লোকের তার স্মৃতি শক্তির উপর প্রবল বিশ্বাস কিংবা এই লোক কারও চেহারাই মনে রাখতে পারে না।
আমিন বেশ উৎসাহের সাথে বলল, আমি আমিন।
- আচ্ছা, তারপর?
- তাও চিনতে পারছেন না?
- আমিন নামে আমি একজনকেই চিনতাম, আমার বড় মামা। উনি তিন বছর আগে ডায়াবেটিক হয়ে মারা গেছেন। আর কাউকে চিনি না আমি এই নামে।
- ঐ যে নিলি আর আমিন। আমি সেই আমিন।
- আমি নিলি নামেও কাউকে চিনি না।
- ফেসবুকে দেখেন নি, প্রেমিকাকে হোটেলে নিয়ে খুন করেছে যে আমিন, আমি সেই আমিন।
- আমি ওসব চালাই না।
আমিন বেশ হতাশ হল। ভেবেছিল খারাপ দিক থেকে হলেও পরিচিত একটা নাম হয়ে গিয়েছে আমিন। এখন যে কাউকে বললেই চিনবে। ঘটনা তেমন হল না। এই লোক জেদ ধরে বসে আছে, উনি কোন ভাবেই আমিনকে চিনবেন না। আমিন একটু মাথা চুলকে কিছুক্ষণ বলল, আপনি কি খুব বেশি ব্যস্ত?
লোকটা স্বাভাবিক ভাবেই বলল, হ্যাঁ, মোটামুটি। একটু বাহিরে বের হচ্ছিলাম আমি।
- আমি আসাতে কি খুব বিরক্ত হলেন?
- আমি কারও উপর কখনও বিরক্তও হই না, রাগও হই না।
আমিন কিছু একটা ভাবল কিছুক্ষণ। এরপর বলল, আপনি যেহেতু রাগ করেন না, তাহলে আপনাকে একটা কথা বলব?
- জ্বি বলেন।
- আপনি আপনার কাজটা সেরে আসুন। তারপর আপনার সাথে কথা বলি। আমাকে বাহির থেকে দরজা লাগিয়ে দিয়ে যান। আমি একটু ঘুমাই। গত দুই রাত ধরে ঘুমাই নি।
- আচ্ছা, ঘুমান আপনি। ওপাশে বিছানা আছে। ছারপোকা প্রচুর। ঘুমাতে পারবেন কিনা আমি জানি না।
- সমস্যা নেই। আর একটা কথা বলব?
- যা মনে আসবে বলে ফেলবেন। এতবার অনুমতি নেবার কিছু নেই।
আমিন গলাটা নামিয়ে আস্তে করে বলল, আপনার এখানে কি পুলিশ আসার কোন সম্ভাবনা আছে?
- জ্বি না। যদি না আপনি সাথে করে নিয়ে আসেন।
-আচ্ছা আপনি যান তাহলে। কাজ সেরে আসুন। আমি ঘুমাই।
লোকটা আমিনের সামনে থেকে চলে গেল। আমিন পিছন পিছন দরজা পর্যন্ত গেল। লোকটা বাহির থেকে দরজা সত্যি লাগিয়ে দিয়েছে। আমিন ভিতর থেকেই বলল, আর একটা কথা বলব?
লোকটা কোন উত্তর দিল না।
আমিনই বলল, আপনার নামটা জানা হয় নি।
লোকটা সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে নিজের নাম বলল, রাজীব কিংবা রাকিব রকম কিছু। স্পষ্ট বুঝতে পারে নি আমিন। তবুও আবার জিজ্ঞেস করল না। আমিন দরজার কাছ থেকে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল। চোখ লেগে আসছে। বিছানায় প্রচুর ছারপোকা। থাক, এই ক্লান্ত শরীরে ঘুমটা বড় দরকার। সেখানে ছারপোকায় আর কিইবা বিরক্ত করবে? একটু রক্ত খাবে, একটু জ্বলবে, এই তো। কত কী হয়ে যাচ্ছে, অকারণে, বে হিসাবে। সেখানে ছারপোকার বেঁচে থাকার তাগিদে খানিকটা রক্ত খাওয়া কিছুই নয়।
নিলি শেষ কয়েক দিন ধরেই বলছিল শাহেদ নিলিকে নিজের করে চায়। প্রথম দিকে আমিন শাহেদ সম্পর্কিত কথা গুলো এড়িয়ে গেলেও, শেষমেশ একদিন কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলেই ফেলল, আরে বাবা, শাহেদের সাথে তোমার ভালবাসার সম্পর্ক, তোমাকে চাইবে না তো কাকে চাইবে? ভালবাসার সম্পর্ক মানেই তো সেটা বিয়েতে পৌঁছাবে, তাই না? আর তুমিও তো ওকে বিয়ে করতে চাও, চাও না বল?
নিলি একটু অবাক হয়ে আমিনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, শাহেদ আমাকে অন্য ভাবে চায়, এখনি। বিয়ের আগেই।
আমিন হাতের তালুর অন্য দিক দিয়ে নাকের নিচের ঘাম মুছতে মুছতে বলল, মানে কী?
- মানে কী, তুমি ভাল করেই জানো। আমি ওকে ভালবাসি, ওর চাওয়া গুলো আমার কাছে অনেক কিছু। তুমি সব ব্যবস্থা করে দিবে।
আমিন এবার অন্য হাতের তালু দিয়ে পুরো মুখটা মুছতে মুখতে বলল, আমি কীভাবে ব্যবস্থা করব? আমি পারব না।
- আমি একটা মেয়ে মানুষ। আমার পক্ষে ওসব ব্যবস্থা করা সম্ভব না আমিন।
আমিন বেশ শক্তভাবে বলল, যার দরকার সে ব্যবস্থা করুক। সে তো ছেলে মানুষ। আমাকে কেন বলছ?
- তুমি ব্যবস্থা করে দিবে।
নিলি আর কোন কথা বলে নি। চুপচাপ উঠে গিয়েছিল আমিনের সামনে দিয়ে। আমিন নিলির চলে যাওয়া পথের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। সে দৃষ্টি জুড়ে ব্যথা ছিল, কিছু হারাবার বেদনা ছিল, কিছু ভেঙে যাওয়া সুখের দুঃখ খণ্ড ছিল। নিলি তা বুঝে নি। বুঝতেও চায় নি। নিলির সত্ত্বা জুড়ে শুধু শাহেদ। আমিনের জায়গা কোথায় সে খবর আমিন জানে না। জানে না হয়ত নিলিও। জানতেও চায় নি কখনও।
নিলির আবদারে না করার কোন উপায় ছিল না আমিনের। আমিন ঠিক ব্যবস্থা করেছিল নিলি আর শাহেদের চাওয়া পাওয়ার হিসাব ঠিক করার জন্য।
আমিন ধপ করে বিছানায় উঠে বসল। হাতের দিকে তাকিয়ে দেখল, ছারপোকা কামড়িয়ে চাকা চাকা বানিয়ে দিয়েছে। চুলকাচ্ছে খুব। লোকটা এখনও আসে নি। এ বিছানায় কী করে কারও থাকা সম্ভব তাই মাথায় ঢুকছে না। মনে হচ্ছে রাজীব বা রাকিব সাহেব এ বিছানায় ছারপোকার চাষ করেন। ছারপোকার অভয়াশ্রম গড়ে তুলেছেন। ছারপোকাও তাই নির্ভয়ে সুন্দর দলবল, বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে এসে রক্ত খেয়ে যাচ্ছে। আমিন বিছানা থেকে নেমে সোফায় গিয়ে বসল। রাগ বড় বাজে জিনিস, কোন রাগ কখনও ভাল কিছু বয়ে আনতে পারে নি। আমিনের রাগও খারাপ কিছুই ঘটিয়েছে। আমি সেদিন নিলিকে বলতেই পারত, নিলি ওসব ঠিক নয়। প্লিজ কারও সাথে বিয়ের আগে ওসব কিছু কোরো না। ভাল দেখায় না। পাপ হয়।
আমিন তা বলে নি। রাগে, অভিমানে, প্রচণ্ড ব্যথায় সব ব্যবস্থা করেই দিয়েছিল। শাহেদ নিলি কতক্ষণ থাকবে ঠিক নেই, তবুও সারাদিনের জন্য হোটেলের রুমটা ভাড়া করেছিল। যেন বিরক্ত না করে ওদের তাই অতিরিক্ত আরও তিনশত টাকাও দিয়েছিল হোটেল ম্যানেজারকে। সব ব্যবস্থা করেছিল, সব শেষ করে দেবার ব্যবস্থা।
আবার চোখ লেগে আসছে। সোফার মধ্যেই ঘুমিয়ে গেল আমিন আবার।
ঘুম ভাঙল লোকটার ডাকে। কখন যেন চলে এসেছে, টের পায়নি আমিন।
- আপনি এখনও ঘুমাচ্ছেন? সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে।
আমিন ছোট করে চোখ মেলে, চোখের পাতা টান টান করে বলল, না না ঘুমাচ্ছি না। একটু চোখ বুজে ছিলাম।
লোকটা আলতো করে একটা হাসি দিল। একটা খাবারের প্যাকেট আমিনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, খেয়ে নিন।
আমিন কিছু না বলে খাবারের প্যাকেটটা নিয়ে নিল। হাতটা না ধুয়েই খেয়ে নিল। পুরোটা খাবার। লোকটা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমিনের খাওয়া দেখল। লোকটা খেয়াল করল, আমিনের চোখ ছল ছল করছে। ছেলেটা হয়ত বাসার বাহিরে থাকে। খেতে গিয়ে বাসার কথা মনে পড়ছে। পরিবারের বাহিরে থাকা প্রতিটা ছেলে মেয়ের পরিবারের কথা সারাদিন মনে না পড়লেও, খাবার সামনে নিলে মনে পড়েই। খুব করেই মনে পড়ে।
আমিনের খাওয়া শেষ হলেই লোকটা বলে, জ্বি, এখন বলুন, আমার কাছে কেন?
আমিন সে কথার উত্তর না দিয়ে বলল, আপনার নামটা?
লোকটা স্বাভাবিক ভাবে উত্তর দিল, রাদিব।
আমিন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। অনেক করেও নামটা মনে করতে পারছিল না। এখন বেশ একটা হালকা ভাব কাজ করছে।
রাদিব আবার বলল, জ্বি এখন বলুন।
আমিন রাদিবের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার ব্যাপারে সত্যি আপনি শুনেন নি?
- জ্বি না।
- আচ্ছা। আপনার ঠিকানাটা আমাকে স্নিগ্ধা আপু দিয়েছিলেন, অনেক আগে। বলেছিলেন যদি কখনও জীবন নিয়ে হতাশ হয়ে যাই যেন আপনার সাথে দেখা করি।
- আমি তো কোন মনঃচিকিৎসক নই।
- তাও আপনার সাথেই কেন যেন আমার দেখা করতে ইচ্ছা করছিল।
রাদিব আমিনের সামনে থেকে উঠে বিছানায় গিয়ে বসল। আমিনের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি জীবন নিয়ে হতাশ নাকি?
- জ্বি না।
- তাহলে?
- পুলিশ আমাকে খুঁজছে।
- আচ্ছা।
- নিলি নামের আমার প্রেমিকাকে হোটেলে নিয়ে খুন করার জন্য।
রাদিব তবুও স্বাভাবিক ভাবেই বলল, আপনি আপনার প্রেমিকাকে খুন করেছেন?
- না। এটা পুলিশের ধারণা। আসলে আমার কোন প্রেমিকাই ছিল না।
- তাহলে?
- নিলি আমার বন্ধু ছিল। বেশ ভাল বন্ধু।
- আচ্ছা, আমাকে এসব বলে লাভ হবে কী?
- জানি না, কী লাভ হবে। তবুও আপনাকে সব বলতে ইচ্ছা করছে। আপনার একটু সময় হবে প্লিজ।
রাদিব তৎক্ষণাৎ কিছু একটা ভেবে বলল, আচ্ছা বলেন।
- কোথা থেকে শুরু করব?
- আমি ঘটনার কিছুই জানি না। আপনি যে কোন জায়গা থেকে শুরু করতে পারেন।
আমিন বলতে শুরু করল। রাদিবের চোখের ভাষা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, রাদিব খুব মনোযোগ দিয়ে ঘটনা শুনছে। বিরক্ত বা রাগ হচ্ছে না। আমিনও সবিস্তারে সব বলে যাচ্ছে। নিলি আর আমিনের কথা, শাহেদ আর নিলির কথা। প্রতিটা কথা, প্রতিটা বিষয়। কেন বলছে জানে না আমিন। সেই বৈশাখে রবীন্দ্র সরোবরে যাবার কথা, টি এস সি তে মঞ্চ নাটক দেখার কথা, খিলগাঁওয়ের ঐ খাবার পাড়ার রাস্তার পাশে বসে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাবার কথা। রাগের কথা, অভিমানের কথা, খুনসুটির কথা, রাগ ভাঙাবার কথা। কিছুই বাদ দিচ্ছে না।
আমিন বলতে বলতে যখন থেমে গেল, রাগিব তখন জানতে চাইল, আপনার সাথে নিলির শেষ কথা হয়েছে কখন?
- ঐ হোটেলের রুমেই। আমি নিলিকে দিয়ে আসি, তখন।
- আপনার শাহেদের সাথে দেখা হয়েছিল।
- জ্বি না।
- নিলিকে একাই রেখে এসেছিলেন ঐ হোটেলের রুমে?
- জ্বি।
রাদিব ঘড়ির কাটার দিকে তাকাল। নয়টা বাজতে তিন মিনিট বাকি। রাদিব উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ঐ হোটেল কয়টা নাগাদ খোলা থাকে?
আমিন একটু চিন্তা করে বলল, বিকাল চারটার দিকে খুলে। কয়টা নাগাদ খোলা থাকে জানি না।
- বিকাল চারটায় খুলে মানে সারা রাত খোলা থাকার কথা।
আমিন কিছু বলে না। রাদিব আমিনের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি আসলে এ ব্যাপারে কিছুই করতে পারব না। আপনি আপনার কাছের একজন মানুষকে হারিয়েছেন। সান্ত্বনা জিনিসটা আপনার জন্য না। পুলিশ আপনাকে খুঁজছে। আপনি চাইলে যে কয়দিন ইচ্ছা আমার এখানে থাকতে পারেন।
আমিন সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমার কথা আপনি বিশ্বাস করেছেন?
- অবিশ্বাস করার মত আপনি কিছু বলেন নি। মিথ্যা বললে আপনাকে আপনার কথার মাঝে আমি এমনিই থামিয়ে দিতাম। একটা মিথ্যা বলেছেন। সেটা পরে বলব আপনাকে।
আমিন বলার মত কিছু পাচ্ছে না। শুধু আস্তে করে হুম বলল।
রাদিব আবার দরজার দিকে যেতে যেতে বলল, আপনি শুয়ে পড়ুন। ঘুমাতে পারেন।
- আর আপনি?
- আমি চলে আসব। চিন্তা করবেন না।

রাদিব বেরিয়ে গেল বাসা থেকে। এ কাজ রাদিবের না। মাঝে মাঝে হতাশায় ডোবা মানুষ গুলোকে সান্ত্বনা দেবার কাজ ভালই পারে রাদিব। কিন্তু এই কাজে খুব অস্বস্তি কাজ করে। তবুও সামনে চলে আসে কাজ গুলো। আর একবার স্নিগ্ধা ঘাড়ে এসব চাপিয়ে দিল। স্নিগ্ধা রাদিবকে হয়ত অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন কেউ ভাবে। নয়ত ঘুরে ফিরে এসবে জড়িয়ে দেবার কোন মানে হয় না। কিন্তু রাদিব জানে, সাধারণ লৌকিক অনেক কিছুই রাদিবের মাঝে অবর্তমান। একবার ইচ্ছা করছিল স্নিগ্ধাকে ফোন দিতে, ওর খবর নিতে, নৃ কেমন আছে জানতে, মৃন্ময় সাহেবের পুলিশি ঝামেলা মিটেছে কিনা শুনতে। শেষমেশ দিল না। স্নিগ্ধাও হয়ত ভেবে বসে আছে, রাদিব একদিন ফোন দিবে। খুব কাঙ্ক্ষিত জিনিসটাই মানুষের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত লাগে। অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যাপার গুলো ভাল কিছু বয়ে আনে না। ঘোর প্যাঁচে সব জটিল করে তুলে।

রাদিব আধ ঘণ্টা চেষ্টা করেও হোটেলের ম্যানেজারের সাথে দেখা করতে পারে নি। বাহিরের গার্ড বলল, হোটেল বন্ধ। ম্যানেজার নেই।
কিন্তু রাদিব জানে ম্যানেজার ভিতরেই আছে। অবশেষে রাদিব একটা মিথ্যা বলেই দিল, আপনার হোটেলের ম্যানেজারকে আসতে বলুন। বলুন নিলির কেসের ব্যাপারে কথা বলতে পুলিশ এসেছে। না আসলে ঝামেলা হবে।
গার্ড স্যার স্যার বলে কিছুক্ষণ ভুল হয়ে গিয়েছে, এই সেই অনেক কিছু বলল, আমি অক্ষনি নিয়া আসতেছি ব্যাটারে। আপনি দাঁড়ান।
গার্ড সত্যি সত্যি সাথে করে ম্যানেজারকে নিয়ে আসল।
ম্যানেজার এসেই বলল, স্যার সত্যি কথা স্যার আমি তেমন কিছুই জানি না। আমি নিচ থেকে কোন চিৎকার চেঁচামেচিও শুনি নাই। আপনাদের যে টুকু বলছি, আমি ঐ টুকুই জানি শুধু।
রাদিব ছোট একটা হাসি দিয়ে বলল, থাক এতো ভয় পাবার মত কিছু হয় নি। ভিতরে চলুন। আমাকে শুধু কিছু তথ্য দিবেন। সত্য তথ্য। আপনার কিছুই হবে না।
রাদিব ম্যানেজারের সাথে ভিতরে গেল। কথা হল। তবে সে কথা বার্তার ফলাফল বেশ একটা ভাল না। ম্যানেজারের ভাষ্যমতে নিলির সাথে আমিন ছাড়া কেউ ছিল না। মিনিট বিশেক পর আমিন বেরিয়ে যাবার পর আর কেউ আসেও নি। রাদিব বার বার জানতে চেয়েছে, ভাল করে মনে করে দেখুন। আমিন যাবার পরও আর একটা ছেলে এসেছিল, নিলির ওখানে।
- না স্যার। আর কেউ আসে নি। যে রুম ভাড়া নিছিল, ঐ ছেলেই শুধু আসছিল মেয়েটার সাথে। ছেলেটা আমাকে তিনশ টাকা বেশি দিয়েছিল যেন ওদের কোন ডিস্টার্ব না করা হয় সে জন্য।
- আপনি তো সিগারেট খান, তাই না?
- জ্বি স্যার।
- সিগারেট কেনার জন্যও আপনি বাহিরে যান নাই?
- না স্যার। আমি হাগতে মুত্তেও যাই নাই সেদিন। সত্যি কথা স্যার। সেদিন আমার হোটেলের রাত নয়টা পর্যন্ত একমাত্র কাস্টমার তারাই ছিল।
- আর রাত নয়টার পর?
- আমার হোটেলের কিছু রেগুলার কাস্টমার আছে, ওরা। ওরা নিচ তলার রুম গুলা নেয়।
- আপনি কখন জানলেন নিলি মারা গেছে?
- সাড়ে নয়টার দিকে লোড শেডিং হয়। জেনারেটও কাজ করছিল না। আমি মোমবাতি নিয়ে প্রতি রুমে যাই। দোতলার ঐ রুমের দরজায় কয়েক বার নক করি। পরে দেখি খোলা। ভিতরে কোন সাড়া শব্দ নাই। এরপর মোম নিয়ে ভিতরে গিয়ে দেখি...।
রাদিবের সব জটলা পেকে যাচ্ছে। আমিনের কথা শুনে একবারও মনে হয় নি মিথ্যা বলছে। আর এই ম্যানেজার আগেই পুলিশের ভয়ে ভড়কে গিয়েছে। মিথ্যা বললে কথা গুলিয়ে ফেলত। এই লোকও মিথ্যা বলেনি।
রাদিব বেরিয়ে চলে আসল। হালকা হালকা বৃষ্টি হচ্ছে। রাদিব মনস্থির করল, ভিজবে আজ। ভেজার চিন্তা ভাবনা করলে গায়ে বৃষ্টির আঁচ লাগে না। গা বাচিয়ে চলতে গেলেই মনে হয় সব ভিজে যাচ্ছে। বেশ অদ্ভুত জিনিসটা। তুমি যা চাও তা হবে না, যা চাও না তাই হবে। তাই যা তুমি চাও তা তুমি চেও না। কীসব যেন বিড়বিড় করছে রাদিব। সেসবের মানে নেই। এই বৃষ্টির মানে নেই, অর্থহীন নানা কিছুরই মানে নেই।
আমিন ঘুমাচ্ছে। ঘুমের ঘোরে একটু পর পর কেঁপে উঠছে বাচ্চা ছেলের মত। মনে হয় স্বপ্ন দেখছে কোন। সে স্বপ্নে কী আমিন কাউকে খুন করছে? মুখটা বেঁধে হাতে ছুরি চালিয়ে রগ কেটে দিয়ে রক্তক্ষরণ দেখছে? হয়ত না, হয়ত বা।
সকাল বেলার কিছু কাজ ঠিক করে নিয়েছে রাদিব। চায়ের দোকানে চা খাবার ফাঁকে দোকানে আসা বাকী মানুষ গুলোর কথা শুনছে। খুব পরিচিত একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছে। এদের কথা বার্তার কোন লাগাম নেই। মুখে যা আসছে তাই বলছে।
- ঐ মাইয়াই তো একটা খান...। পোলার লগে শুইতে বিছানায় গেছে। কাজ সাইরা মাইরা দিছে।
- আরে কওন যায় না। ঐ পোলাও না হইতে পারে। এগুলা তো দিন দিন মানুষ পাল্টায় একেক বার একেকটার সাথে ...।
- কইছে আপনারে। এই যে দেখেন আজকের পেপারে আসছে। ঐ মেয়ের মোবাইল চেক কইরা, আমিন না জামিন ছাড়া আর কারও সাথে কথা বলার রেকর্ড পায় নাই। তাইলে কী হইল?
- তাও ঐ মাইয়াই খারাপ।

রাদিব চায়ের বিল দিয়ে উঠে গেল। এসব অশ্রাব্য কথা শুনতে ভাল লাগছে না। পুলিশ যদি সত্যি নিলির কল লিস্টে আমিনের নাম্বার ছাড়া আর কারও নাম্বার না পায়, তবে ব্যাপারটা আরও জটিল হবে। এখানে আমিন ছাড়া সন্দেহ করার মত কেউ থাকবে না। কিন্তু শাহেদ? শাহেদ নামের ছেলেটাকে কোথায় পাবে রাদিব? এই একটা চরিত্র যার ব্যাপারে কেউ তেমন একটা কিছু জানে না। রাদিব আমিনের কাছ থেকে নিলিদের বাসার ঠিকানা নিয়েছে। একটু নিলির পরিবারের সাথে কথা বলা জরুরী। কিন্তু এই অবস্থায় বাহিরের কারও সাথে কথা বলতে রাজি হবে বলে মনে হয় না। আমিনের কাছ থেকে তেমন কিছু একটা ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায় নি। আমিনের কাছে রাদিব শুধু জানতে চেয়েছিল, শেষ আপনাদের কী কথা হয়েছিল?
শেষ কথা গুলো তেমন একটা গুরুত্ব বহন করছে না। এখন শাহেদকে দরকার। রাদিব নিলিদের বাসার আশেপাশে কিছুক্ষণ ঘুর ঘুর করল। সাহস করে একবার দরজার কলিং বেল টিপেছিল। লুকিং হোল দিয়ে ভিতর থেকে রাদিবকে দেখে আবার চলে গিয়েছে। দরজা খুলে নি। রাদিব তাও আবার কয়েকবার কলিং বেল টিপল।
বিরক্ত হয়ে কেউ একজন ভিতর থেকেই বলল, কাকে চাই?
- জ্বি আমি একটু কথা বলতে চাচ্ছিলাম।
- কোথা থেকে এসেছেন?
- একটু নিলির ব্যাপারে কথা বলতাম।
- আপনি কি পুলিশের লোক?
- জ্বি না।
- তাহলে চলে যান। বাসায় কেউ নেই।

রাদিব তাও দাঁড়িয়ে রইল। পুলিশের লোক বলাটা দরকার ছিল। রাদিব আবার কলিং বেল টিপল।
ভিতর থেকে এবার হুংকার আসল, কি সমস্যা?
বলে দরজা খুলে মোটামুটি বয়স্ক একজন লোক বেরিয়ে আসলেন।
- কী হইছে? কী চাই?
- জ্বি একটু কথা বলতাম।
- কী কথা বলবেন? কত সাংবাদিককে তো বললাম যা বলার। তাদের কাছ থেকে জেনে নিন।
- আমি সাংবাদিক না।
- তাইলে কী আপনি?
- জ্বি রাদিব।
- রাদিব আবার কী?
- রাদিব নাম আমার।
লোকটা বোধহয় নিলির বাবা। তিনি রাগের মাঝেই হুট করে অসহায় একটা মুখ করে বললেন, প্লিজ আমাদের মাফ করেন। আমরা কেস তুলে নিব। এতো যন্ত্রণা আর ভাল লাগছে না। মেয়ের শোকে আমাদের মানসিক অবস্থা এমনিই ভাল না। তার উপর আপনারা এসে এভাবে জ্বালাচ্ছেন।
- দেখুন, আমি বেশি সময় নিব না। কিছু কথা বলব শুধু, নিলির ব্যাপারে।
- আপনাকে কেন আমরা বলতে যাব এসব?
- আমিন কোথায় আছে আমি জানি। আপনারা প্লিজ আমার সাথে কথা বলেন।
লোকটা গর্জে উঠে বললেন, কই আছে ঐ হারামজাদা? কুত্তার বাচ্চা কই আছে? দাঁড়ান আমি এক্ষনি পুলিশে খবর দিচ্ছি।
রাদিব অনুরোধের সুরে বলল, প্লিজ এখন পুলিশ ডাকবেন না। আমিন যদি অপরাধী হয়, আমি নিজে ওকে পুলিশের কাছে দিয়ে আসব।
- আমিন অপরাধী না মানে? ও আমার মেয়েকে খুন করেছে। ঐ ফকিন্নির বাচ্চা আমার মেয়েকে খুন করেছে।
লোকটা কথাটা বলেই হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন।
"আমার মেয়েটাকে কত বলতাম, ঐ ছেলের সাথে চলিস না।"
- আমি কি ভিতরে আসব?

রাদিব শেষমেশ ভিতরে যাবার অনুমতি পেয়েই গেল। আর পরিবারের লোকজনও রাদিবের সাথে কথা বলতে রাজি হয়ে গেল। তবে এতোটুকুও নিশ্চিত করেছে, আপাতত তারা পুলিশে খবর দিচ্ছে না।
রাদিব শুধু কিছু প্রশ্ন করেছে, এরা উত্তর দিয়েছেন। বেশ ধৈর্য সহকারে উত্তর দিয়েছেন। এদের সাথে কথা বলার মাঝেও আমিন ছাড়া অন্য কারও দিকে সন্দেহের তীর যায় নি। তবে একটা ব্যাপারে এখানে এসে গোলমেলে বেঁধে গিয়েছে। আমিন বলেছিল নিলি আমিনের ব্যাপারে বাসায় কিছু বলে নি। তবে এখানে এসে জানতে পেরেছে অন্য কিছু। যখন বিয়ের কথা চলছে, নিলিকে জোর করছে বিয়ের জন্য। নিলি সোজা সাপ্টা বলে দিয়েছিল বিয়ে করবে না। কারণ জানতে চাওয়াতে নিলি বলে নি কিছু, চুপ ছিল। একটু জোর করতেই বলেছিল, ভালবাসে নিলি কাউকে। যদিও নিলির পরিবার মোটামুটি নিশ্চিত ছিল আমিনের ব্যাপারে। এতো বছরের মধ্যে আমিনই ছিল নিলির একমাত্র ছেলে বন্ধু। শুধু ছেলে বন্ধু না, সবচেয়ে ভাল বন্ধুও ছিল আমিন। নিলির পরিবার কখনও নিলির কোন বন্ধু কিংবা বান্ধবী দেখে নি। নিলির ভাল লাগত না কখনও কারও সাথে মিশতে, কথা বলতে। সখ্যতা হয় নি কখনও কারও সাথে তাই। নিলির কখনও পছন্দ ছিল না কোলাহল, কখনও বাহিরে কোথাও যেতেও চাইত না। সেই নিলি হুট করেই আমিনের সাথে পরিচয়ের পর থেকে মাঝে মাঝেই বাহিরে বের হত। বাসায় সবসময় কিছু হলেই আমিনের গল্প করত। রাতের বেলা কথা বলত। ব্যাপার গুলো জানত নিলির পরিবার। কিছু বললেই চুপচাপ কান্নাকাটি করত নিলি। তাই কিছু বলা কমিয়েই দিয়েছিল। এমনকি আমিনকে মাঝে মাঝে বাসায় পর্যন্ত নিয়ে আসত। বিয়ের কথা বলার পরও অবশ্যম্ভাবী ভাবে বলেছিল নিলি আমিনের কথা। আমিনকে ভালবাসে। বিয়ে করলে আমিনকেই বিয়ে করবে। নিলির পরিবার বুঝাবার চেষ্টা করেছে অনেক। নিলি বুঝতে চাইত না। বলত নিলি, বেশি জোর করলে পালিয়ে বিয়ে করবে। তবু নিলির পরিবার থেকে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, এই ছেলের সাথে নিলির কিছু মেনে নিবেন না তারা। নিলি চাইলে যা ইচ্ছা করতে পারে। এই কথায় কয়েকদিন খাওয়া দাওয়াও বন্ধ করে রেখেছিল নিলি। লাভ হয় নি তবু। মন গলে নি নিলির পরিবারের।
রাদিব একটু চিন্তিত ভঙ্গিমায় জানতে চাইল, আপনারা শাহেদ নামে কাউকে চিনেন?
- কে?
- শাহেদ।
- না তো। কেন?
- নিলির কোন এই নামে কোন বন্ধু ছিল বলে জানেন?
- মানে? আপনাকে তো বললাম ওর আমিন ছাড়া আর কোন বন্ধু ছিল না, না ছেলে বন্ধু না মেয়ে বন্ধু।
রাদিব একটু দ্বিধায় পড়ে গেল।
- আপনাদের কখনও এই নামে কারও কথা বলে নি নিলি?
- না।
- নিলি এই নামে একটা ছেলেকে ভালবাসে বলেছিল আমিনের কাছে। প্রতি রাতে রাত দুইটার পর কথা বলত।
- অসম্ভব।
বললেন নিলির মা। ও যতক্ষণ জেগে থাকত পাশের রুমে আমিও জেগে থাকতাম। নিলি মোবাইলে কথা বলার সময়টুকু লাইট জ্বালিয়ে রাখত। আমাদের বলত পড়াশুনা করছে। আসলে যে কথা বলত, এটা বুঝতাম। ও কোনদিন রাত দুইটার পর লাইট জ্বালিয়ে রাখত না। পড়াশুনার সময় টুকু নিলি দরজা লাগিয়ে রাখলেও, ঘুমাবার সময় দরজা খুলে ঘুমাত। রাত দুইটায় দরজা খুলে শুয়ে পড়ত। আমি আড়াইটার দিকে গিয়ে আবার দেখে আসতাম, মশারী টাঙিয়েছে কিনা, গায়ে কাঁথা দিয়েছে কিনা। রাত দুইটার পর কারও সাথে কথা বলার প্রশ্নই আসে না।
রাদিব চিন্তিত ভাবে সবার দিকে তাকাল। হয়ত জিজ্ঞেস করার মত কিছু নেই। আমিনকেও জিজ্ঞেস করার মত কিছু নেই। জিজ্ঞাসা এখন শুধু শাহেদ তাও না। শাহেদ কোন জিজ্ঞাসা হতে পারে না। আমিনের কাছে শেষ প্রশ্ন ছিল রাদিবের, নিলির সাথে আপনার শেষ কী কথা হয়েছিল?
প্রশ্নটার উত্তর যতটা গুরুত্বহীন ভেবেছিল রাদিব, আসলে কোনভাবেই অতটা গুরুত্বহীন নয়। সবটাই ওখানে। সব প্রশ্নের উত্তর ওখানে।
রাদিব নিলির পরিবারকে শেষমেশ যে কথাটা বলে আসল, তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না তারা।
- আপনারা মানেন বা না মানেন, আমিন নিলিকে খুন করেনি। খুন করার কোন কারণ নেই, প্রশ্ন নেই। নিলি আপনাদের বলেছিল নিলি আমিনকে ভালবাসে ব্যাপারটাও সত্যি। সবটাই সত্যি শুধু, আমিন নিলিকে খুন করেছে এটা ছাড়া।
- তাহলে কে খুন করেছে?
- কেউ ই করে নি।
- মানে?
- মানে নিলি আত্মহত্যা করেছে। আপনাদের বিশ্বাস করার কথা না, প্রশ্নও উঠে না। হুট করে আমার মত একজন অপরিচিত মানুষ আমিনের পক্ষ নিয়ে গেল, নির্দোষ দাবী করে গেল। নিলি আত্মহত্যা করেছে বলে গেল, এটা আপনাদের বিশ্বাস করার কথা না। আমিন আমাকে যা যা বলেছে সবটাই সত্যি বলেছে। শুধু এই ব্যাপারটা ছাড়া। আমিন বলেছে, আমিন নিলিকে ভালবাসত না। এটা সত্য না। আমিনও নিলিকে ভালবাসত। অনেক ভালবাসত। সত্যি ভালবাসা যে ভালবাসা সে ভালবাসা। সত্যি ভালবাসার মানুষটাকে কখনও খুন করা যায় না। অন্য কারও সাথে দেখেও না। আমি বললাম, এখন আপনারা কী করবেন সেটা আপনাদের ব্যাপার। আমিন আমার ওখানেই আছে। ইচ্ছা করলে পুলিশে ধরিয়ে দিতে পারেন, আবার কেসটা তুলেও নিতে পারেন। পোস্ট মর্টেম রিপোর্টেও আমার কথার ব্যতিক্রম কিছু পাবেন না। বাকিটা আপনাদের হাতে। শুধু অনুরোধ, কারণ ছাড়া একটা নিরপরাধ ছেলের জীবন নষ্ট করার আগে ভেবে দেখা উচিৎ। আপনাদের ছেলে না হোক, অন্য কারও ছেলে, একটা পরিবারের সব কিছু। আমি কাল আবার আসব।
রাদিব উঠে গেল। কাজ শেষ। বাসায় যাওয়া ছাড়া আর কোথাও যাবার ইচ্ছা এখন নেই। বাসায় ঢুকার পথে চায়ের দোকানে এখনও নিলি আর আমিনের ব্যাপার নিয়ে নোংরা আলাপচারিতা চলছে। রাদিব সেসবে মনোযোগ দিল না। বাসায় চলে এল। আমিন এখনও বিছানায় শুয়ে আছে। মুখ শুকনা হয়ে আছে। শূন্য দৃষ্টি মেলে রাদিবের দিকে তাকিয়ে রইল।
- বাহিরের অবস্থা কী?
আমিন জিজ্ঞেস করল। রাদিব সে প্রশ্নের উত্তর না করে পাল্টা প্রশ্ন করল, মিথ্যাটা না বললে হত না?
আমিন অবাক হয়ে রাদিবের দিকে তাকিয়ে রইল। কোন মিথ্যার কথা বলছে রাদিব বুঝছে পারছে না আমিন।
- আমি আপনাকে কোন মিথ্যে বলি নি।
- আমার সাথের মিথ্যেটার কথা বলছি না। নিলির সাথে মিথ্যাটা বলেছিলেন।
আমিন চুপচাপ রাদিবের দিকে তাকিয়ে রইল। রাদিব বলে যায়, আপনি জানেন ভালবাসা পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় জিনিস গুলোর একটা? এই রহস্যের রহস্য ভেদ করা কখনই যায় নি, যাবেও না। মানুষ ভালবাসা বুঝবার জন্য, প্রকাশ করার জন্য কত কিছুই করে। তবুও শেষমেশ কখনই নিজের সবটুকু ভালবাসা বুঝাতে পারে না, প্রকাশও করতে পারে না, একটা অভিমানে ডুবে সব মিলিয়ে যায়। তবে যে ভাবেই হোক, একটা ভালবাসায় মিথ্যে চলে আসলে, যেমন হোক সে মিথে, ছোট কিংবা বড়। সে ভালবাসা কখনই ভাল থাকে না। অসুস্থ হয়ে যায়। ধুঁকতে ধুঁকতে একসময় মুমূর্ষু হয়। হুট করে একদিন মরে যায়। তখন খুব করে চাইলেও, যত্ন করলেও তা ফিরে আসে না। আপনি আমার সাথে যে মিথ্যেটা বলেছিলেন সেটা হল আপনি নিলিকে ভালবাসেন না। আপনি নিলিকে ভালবাসতেন। বাসতেন না বলেন?
আমিন মাথা নিচু করে বলল, জ্বি। কিন্তু নিলি অন্য কাউকে ভালবাসত।
- না। ঐ যে বললাম মিথ্যে। একটা মিথ্যের হাত ধরে আর একটা মিথ্যে আসল, আর একটা মিথ্যের পিছু অন্য একটা। মিথ্যের চাপে একজন হারিয়েই গেল। শাহেদ নামে কেউ কখনও ছিল না। এটা কাল্পনিক একটা চরিত্র, যেটা ছিল আপনার আর নিলির মাঝে। এই কাল্পনিক চরিত্রটা বানিয়েছিল নিলি। নিলি জীবন নিয়ে হতাশ ছিল। সে হতাশায় একমাত্র আশা ছিলেন আপনি। আপনার কাছ থেকে যা আশা করত নিলি, অন্য কারও কাছ থেকে তা কখনই চাইত না। নিলি চাইত, আপনি ঐ কাল্পনিক চরিত্রটাকে সরিয়ে নিলিকে আপন করে নেন। ভালবাসেন। একটা কাল্পনিক চরিত্র এতোটা শক্তিশালী হবে সেটা নিলিও বুঝতে পারে নি। কাছে আসার পরিবর্তে আপনি আরও দূরে সরে চলে যেতে শুরু করলেন। আর নিলিও সেই কাল্পনিক চরিত্রটাকে আরও শক্তিশালী করতে লাগল। আপনি বার বার সেই কাল্পনিক চরিত্রটার কাছে হেরে যাচ্ছিলেন। কিন্তু নিলি চাইত আপনাকে জিতিয়ে দিতে। জিতিয়ে দেবার জন্যই সেদিন আপনাকে হোটেলের রুম ভাড়া করতে বলেছিল। এটা নিলির মাথায় কীভাবে এসেছিল জানি না আমি। হয়ত নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল। শাহেদ নামের চরিত্রটা চিরতরে হারিয়ে যাক চেয়েছিল নিলি, ঠিক ওভাবে ছাড়া হয়ত আপনার মনের ভিতর থেকেও শাহেদ নামের চরিত্রটাকে তাড়াতে পারত না। হোটেলে গিয়ে শাহেদ নিজের করে চায় নিলিকে এটাই বলেছিল আপনাকে। কিন্তু নিলিকে নিজেকে আপনার করতে চেয়েছিল। হয়ত আরও অনেক পথ ছিল, কিন্তু নিলির কাছে মনে হয়েছে ওটাই সবচেয়ে ভাল উপায়, নিলির কাল্পনিক চরিত্রের সাথে আপনার জিতে যাবার। এ জন্যই হোটেলের রুমে আপনি নিলিকে যখন রেখে আসতে যান, নিলি আপনার সাথে অমন অস্বাভাবিক আচরণ করছিল। আপনার হাত ধরছিল, জড়িয়ে ধরতে চাচ্ছিল। ঐ যে আপনাকে জিতিয়ে দেবার জন্য। কিন্তু এবারও একটা কাল্পনিক চরিত্র জিতে গেল, এবার হেরে গেল নিলি। এবারের কাল্পনিক চরিত্রটা আপনার তৈরি। আপনি বললেন, আপনার সিঁথি নামে একটা মেয়ের সাথে সম্পর্ক। তার সাথে দেখা করতে যাবেন, দেরী হয়ে যাচ্ছে। আপনি হেরে যাওয়া মেনে নিতে পেরেছিলেন, নিলি পারে নি। এতো দিনের ভালবাসার মানুষটার মনে অন্য কারও বাস, এটা নিলি মানতে পারে নি। হেরে যাওয়া ব্যাপারটা সবাই স্বাভাবিক করে নিতে পারে না। একটা স্বপ্নের মৃত্যু, একটা মানুষের সবটা হারিয়ে ফেলার সমান। নিলি সবটাই হারিয়ে ফেলেছিল। ফলাফল যা হবার তাই হল। নিলি হারিয়ে গেল। আপনি ফেঁসে গেলেন। নিলি আপনাকে ফাঁসাতে চায় নি, তবুও পরিস্থিতি এমন হয়ে গিয়েছে। ঠাণ্ডা মাথায় দুজনের কেউ ই চিন্তা করেন নি, ভালবাসার অন্য কোন মানুষ থাকলে, এতো কাছের একটা বিপরীত লিঙ্গের বন্ধু কখনই মেনে নিত না। আপনারা নিজেদের বের করা প্রতিটা মুহূর্ত একে অপরকে দিয়েও বুঝতে পারেন নি, কাল্পনিক চরিত্রের জন্য কোন সময় অন্য জন রাখে নি। একটা কাল্পনিক চরিত্র নিজেরাই শুধু শুধু অতটা শক্তিশালী করেছিলেন। ভালবাসার অদ্ভুত রহস্যে দুজনেই পথ হারিয়ে ফেললেন।
আমিন ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল। অজান্তে কিংবা জানা পক্ষেই চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করল। রাদিব কিছু বলল না। কিন্তু কান্নার প্রয়োজন আছে এ পৃথিবীতে। কিছু কান্না হাসির চেয়ে শক্তিশালী। মনের মাঝের ব্যথা গুলো ধুয়ে মুছে দেয়। জমাট বাধা কষ্ট গুলোকে টুকরো টুকরো করে বিলীন করে দেয়।
রাদিব ঘর গুছানোয় মনোযোগ দিল। এলোমেলো ঘরটাকে খানিক সময়ের মধ্যে একদম গুছানো বানিয়ে ফেলল। দেখে বোঝার উপায় নেই, খানিক আগেই এই ঘরটা কত এলোমেলো ছিল। রাদিব বলল, অগোছালো জিনিস গুছিয়ে নেবার মধ্যে একটা তৃপ্তি আছে। আমি মাঝে মাঝেই ঘর এমন এলোমেলো করে রাখি, গুছিয়ে নেব তাই।
আমিন আস্তে করে বলল, সব অগোছালো জিনিস কি গুছিয়ে নেয়া যায়?
রাদিব কোন উত্তর না দিয়ে একটা সিগারেট ধরাল। আমিনের দিকে তাকিয়ে বলল, সিগারেট খান আপনি?
- না।
- আমিও খাই না। শুধু পুড়তে দেখি। সিগারেট পুড়তে দেখার মাঝে কী যেন আছে। আমাকে ভাল লাগা দেয়। মনে হয় কিছু সমস্যা পুড়ে পুড়ে ছাই হচ্ছে। কিছু জটিলতার জট খুলে যাচ্ছে।
আমিন এক দৃষ্টিতে রাদিবের দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটার চেহারায় কোন বাচ্চা সুলভ ভাব নেই এখন, বেশ ভারিক্কী রকম একটা চেহারা। লোকটার তুলনায় নিজের বয়স, বুদ্ধি সবই বড় কম লাগছে।
সন্ধ্যার পর আমিন বেরিয়ে গেল রাদিবের বাসা থেকে। নিলির পরিবার কেস তুলে নিয়েছে কিনা জানে না আমিন, পুলিশ ধরবে কিনা, নিলিকে হত্যার মিথ্যে দায়ে আমিনের শাস্তি হবে কিনা তাও জানে না। জানার দরকার নেই। কিছু জানার প্রয়োজন মাঝে মাঝেই হারিয়ে যায়।
আকাশে আজ মেঘ নেই। বৃষ্টিও হচ্ছে না। শেষ যেদিন মেঘ ছাড়া আকাশ দেখেছিল আমিন, সেদিন আকাশে গোলগাল একটা চাঁদ ছিল। আজ দেখে মনে হচ্ছে চাঁদটা অনেক খানি গলে গিয়েছে। গলতে গলতে চাঁদটা একদিন শেষ হয়ে যাবে। অমানিশা হবে। আবার চাঁদটা জমতে শুরু করবে। নিজেকে গুছিয়ে নিবে ধীরে ধীরে। গলে পড়া চাঁদ জমতে শুরু করে, নিজেকে গুছিয়ে নেয়। এলোমেলো ঘরের জিনিস পত্রের স্তুপ, নিপুণ হাতে গোছালো হয়ে উঠে। ভেঙে পড়া মানুষ আবার চলতে শিখে যায়, গুছিয়ে নেয় নিজেকে। কিন্তু কিছু অগোছালো জিনিস হয়ত কখনও গুছানো হয় না। না মন চায়, না মনের কায়াটা চায়, না তা পারে। কিছু জিনিস আজন্ম কাল গলতে থাকে, গলতে গলতে ফুরিয়ে যায়।
আমিন সুনসান রাস্তায় কারও হাসির শব্দ শুনছে। অন্ধকারে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে না। তবে বুঝতে পারছে আমিন, ওর দিকে তাকিয়েই হাসছে ছেলেটা। আমিন পরাজিত, ঐ অন্ধকারের কাল্পনিক চরিত্রটার কাছে।

গলে পড়া চাঁদ
- রিয়াদুল রিয়াদ (শেষ রাতের আঁধার)
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে নভেম্বর, ২০১৬ রাত ১০:৫৮
৩টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

গরীবের বউ সবার ভাবি

লিখেছেন অপলক , ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:০২



৩৬ জুলাই আন্দোলনের পর অনেক আশায় ছিলাম। আশার গুড়ে বালি। তত্বাবধায়ক সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক গভর্ণর ড. আহসান এইচ মনসুর বুদ্ধিদীপ্ত প্ররিশ্রম করে ২০২৬ জানুয়ারীতে রিজার্ভে রেখে গেছেন ৩৫... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন থেকে যারা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসেন এখন তাদেরকে আওয়ামী লীগের প্রয়োজন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



ক্ষমতায় গেলে কোন দল যাদেরকে মনে রাখে না ক্ষমতায় গেলে তাদেরকেই তারা সবচেয়ে বেশী মিস করে। সেই নিখাঁদ দল প্রেমিকদেরকে এখন আওয়ামী লীগ খুঁজছে। তারা লগি বৈঠা নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৫



আমার এক বন্ধু আছে। ধরা যাক, নাম তার করিম। করিমকে একদিন চায়ের দোকানে একজন বলল, “আপনি নাকি ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা?” করিম চায়ের কাপ নামিয়ে বলল, “ভূয়া হলে লাভটা কী?” লোকটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ই আগস্ট ছিলো আরো একটি ১৫/২১শে আগষ্টের অপচেষ্টা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



২১শে আগস্ট পালন করা অর্থে , আমার কাছে মনে হচ্ছে আবারো জঘন্য কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কারন আমরা ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×