somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: পরিমিত পরিমিতি

০২ রা জানুয়ারি, ২০২৪ রাত ১০:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


মিতি আমাকে ফোনের ওপাশ থেকে বলল, "ঘুমিয়ে যাও, রাত হয়েছে অনেক। কাল দেখা হবে।"
আমি ফোন রেখে তাকিয়ে দেখি, মিতি আমার পাশে শুয়ে আছে। আধো ঘুমে মিটিমিটি করে তাকাচ্ছে।
"লাইটটা নিভিয়ে দাও," বলে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
আমি লাইট নেভানোর সময় ওয়ারড্রবের দিকে চোখ পড়তেই মনে পড়ল, মিতিকে আমি খুন করে ওয়ারড্রবের মধ্যে ভরে রেখেছি দুই দিন আগে। তাহলে ফোনের ওপাশে কে ছিল? আমার বিছানায় শুয়ে আছে কে? আমি লাইট না নিভিয়ে চলে আসলাম। আমার হাত পা কাঁপছে, শরীর জুড়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যাচ্ছে। মাথা বড় এলোমেলো লাগছে। কী ঘটছে আমি তার কিছুই বুঝতে পারছি না। আস্তে করে মিতির পাশে শুয়ে পড়লাম। আমার শরীর ধরধর করে ঘামছে। মিতিকে ছুঁয়ে দিতে ভয় করছে। আমার পাশে মিতির থাকার কথা না, কোনভাবেই না। আমি উঁকি দিয়ে নিশ্চিত হলাম। মিতির চোখ জোড়া বন্ধ, ঘুমাচ্ছে।

মিতির সাথে আমার বিয়ের বয়স বছর দুই। প্রেমের বিয়ে, পালিয়ে বিয়ে করেছিলাম দুজনে। দুজনের কারও পরিবার মেনে নেয়নি। আলাদা থাকছি মিরপুরের এক ফ্ল্যাটে। এক বছর যা কেটেছে ভাল। এরপর থেকে দুজনের মাঝে কলহ শুরু। ছোটখাটো বিষয়ে সন্দেহ, ছোটখাটো বিষয়ে ঝগড়া। মিতির ভার্সিটি জীবনের বন্ধু শিহাবকে আমার অপছন্দ। মিতি তবু ওর সাথে কথা বলবে। আমার সাথে সানজিদার সম্পর্ক বন্ধুত্বের বাইরে কিছুই না। তবু মিতির প্রবল অভিযোগ, আমাদের মাঝে কিছু আছে। আমার তা শুনে রাগ লাগে, মাথায় রক্ত উঠে যায়। আমি মিতিকে বুঝাই, মিতি বুঝতে চায় না। কথা কাটাকাটি হয়, মিতির গায়ে হাত তুলি। মিতি চুপ করে থাকার মেয়ে না। পাল্টা হাত তুলে আমার গায়ে। রাগ করে দরজা আটকে বসে থাকে। আমার ধারণা, সে সময়টায় মিতি শিহাবের সাথে কথা বলে। মিতি তা স্বীকার করে না। আমি সানজিদাকে সব খুলে বলি। মেয়েটা আমাকে সান্ত্বনা দেয়। আমার খারাপ লাগার সময়টায় পরম বন্ধুত্বের ছোঁয়া হয়ে পাশে থাকে। মিতি তবু মেয়েটাকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলে।

আমি যখন অফিসে থাকি, আমি জানি এ বাসায় শিহাব আসে। মিতি তাও অকপটে অস্বীকার করে যায়। মাঝে মাঝে আমি অফিস না করে চলে আসি বাসায়। শিহাবকে খুঁজি বেডরুমে, বাথরুমে, খাটের নিচে। কোথাও শিহাবকে পাওয়া যায় না। মিতি বড্ড চালাক। আগেই সরিয়ে ফেলে শিহাবকে। মিতি সাইকোলজির ছাত্রী। আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে, "তুমি যে ওথেলা সিন্ড্রোমে আক্রান্ত একটা মানুষ, সেটা কি জানো?"

আমি বিছানার পাশে রাখা কাচের জগ ছুড়ে ফ্লোরে ফেলে দিয়ে বলি, "আমাকে সাইকোলজি শিখাতে আসবে না একদম। নিজের জামাই রেখে অন্য পুরুষে আসক্তি থাকলে তাকে কী বলে? সেটা বলো।"
মিতি চুপ করে থাকে। নিশ্চুপ চোখের ভাষায় এক রাশ ঘৃণা খেলা করে যায়, আমি তা বুঝতে পারি বেশ।

আমি মিতির মত চালাক হতে পারিনি। আমার খারাপ লাগার সময়টায় যতবার সানজিদার সাথে দেখা করেছি। ততবারই মিতির কাছে ধরা খেয়ে গিয়েছি। আমিও একজন মানুষ। আমারও খারাপ লাগা আছে, আমি তা মিতিকে বুঝাতে পারিনি। বুঝাতে পারিনি, সানজিদা আমার শুধুই বন্ধু, এর বাইরে কিছুই না।

মিতি একদিন রাগ করে আমার বাসা ছেড়ে চলে যায়, ওর এক বান্ধবীর বাসায় গিয়ে হয়ত উঠে যায়। আমাকে ফেলে যায় বিপদে। আমি যাবতীয় সেদ্ধ করা ব্যতিরেক আর কিছুই রান্না পারি না। আমি না খেয়ে থাকব, ব্যাপারটা সানজিদা মানতে পারে না। মিতি চলে যাবার পর, সানজিদা চলে আসে আমার এখানে। রান্না করে ভাল মন্দ খাওয়াবার জন্যে। মিতির বিশাল রাগ একদিনেই গলে যায়। যা নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল বাসা থেকে, হাতে করে তা নিয়ে আবার ফেরত আসে পরদিন সকালেই। এসে আবিষ্কার করে সানজিদা আমার জন্য পরোটা আর ডিম ভাজি বানাচ্ছে। মিতি আমাকে কিছু বলে না। সানজিদার সামনে গিয়ে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে, "পাঁচ মিনিটের মধ্যে তুমি এখান থেকে চলে যাও। নয়ত তুমি আর তাহের দুজনেরই কপালে খারাপ কিছু আছে বলে দিলাম।"

সানজিদা লহ্মী মেয়ে। চুপ করে চলে যায়। মিতি অপেক্ষা করে সানজিদার চলে যাবার। সানজিদা চলে যেতেই, পরোটা আর ডিম ভাজি ছুড়ে ফেলে দেয়। আমার সকালের নাস্তা করা হয় না। না খেয়েই চলে যাই। অফিস ফিরে আমি বুঝতে পারি, দারুণ রেগে আছে মিতি। রাগ আছে আমারও। দুজনের মাঝে তর্কাতর্কি, হাতাহাতি খুনের পর্যায়ে চলে যায়। ডাইনিং টেবিলের উপরের কাচের জগের আঘাতে মৃত্যু হয়, লাশ চলে যায় লুকাবার জন্য ওয়ারড্রবে।

আমার শরীর এখনও ঘামছে। একটা মৃত মানুষের এভাবে আমার পাশে শুয়ে থাকার কথা না। কলিং বেল বেজে উঠল। কলিং বেলের শব্দে আমি আরও চমকে উঠি। মিতি ঘুমায়নি। চোখ মেলে তাকায় কলিং বেলের শব্দে। উঠে বসে বিছানায়। আমি ভাবি, এতো রাতে কে আসতে পারে? মিতিকে না পেয়ে নিশ্চিত শিহাব এসেছে। আমি ভেবে পাই না কী করব। মিতিই উঠে যায়। দরজার লুকিং হোলে তাকায়। কাউকে দেখে ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলে। দরজা খুলে দেয়। দরজার সামনে সানজিদা দাঁড়িয়ে। ঘেমে অস্থির সানজিদা রুমের ভিতর একবার উঁকি দিয়ে বলে, "তাহের কোথায়? ওকে গত দুইদিন ধরে ফোনে পাচ্ছি না। অফিসেও যাচ্ছেনা।"

মিতি সানজিদার দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে একবার ওয়ারড্রব আর একবার বিছানার দিকে তাকায়। মিতি এখনও আমাকে বিছানার উপর দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু আমার লাশটা থাকার কথা ছিল ওয়ারড্রবের ভিতর। সেদিন মিতি নয়, খুন হয়েছি আমি। তবু মিতি দেখতে পাচ্ছে আমাকে বিছানায়।
০২/০৩/২০১৯

রিয়াদুল রিয়াদ
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জানুয়ারি, ২০২৪ রাত ১১:৪০
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গল্পঃ ভোজ

লিখেছেন ইসিয়াক, ৩০ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ২:৪০


গতকাল শরীরটা ভালো ছিলো না। তার জেরেই সম্ভবত ঘুম থেকে উঠতে বেশ বেলা হয়ে গেল। ঘুম ভাঙলেই আমি প্রথমে মোবাইল চেক করে দেখি কোন জরুরী কল এসেছিল কিনা। আজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফেরার ট্রেন

লিখেছেন Sujon Mahmud, ৩০ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:১২


ঈদের ছুটিটা যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল। বারোটা দিন—ক্যালেন্ডারের হিসেবে ছোট, কিন্তু হৃদয়ের হিসেবে এক বিশাল পৃথিবী। সেই পৃথিবীতে ছিল হাসি, ছিল কান্না, ছিল ঘরের গন্ধ, ছিল প্রিয় মানুষের... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাদ্রাসার শিক্ষক: একটি প্রগতিশীল (?) অগ্রযাত্রা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১:০৮


আমি আসলে জন্মগতভাবেই খুব আশাবাদী মানুষ। সত্যি বলছি। ২৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে যখন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন নীতিমালা জারি করল, আমি মনে মনে বললাম , অবশেষে কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবন চালাতে শহরে থাকা কিন্তু বেঁচে থাকা যেন বাড়িতেই

লিখেছেন Sujon Mahmud, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৯

ঈদের ছুটিটা কেমন যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, এই তো সেদিন বাড়ি গেলাম—মায়ের হাতের রান্না, বাবার গল্প, ছোট মেয়ের হাসি, আর স্ত্রীর সেই নীরব অভিমান… সবকিছু মিলিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×