বিজ্ঞানের আলোচনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ প্রথমেই যে ভুলটা করে বসে তা হলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মধ্যে ঐক্য স্থাপন । বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি --এ দুয়ের মধ্যে যে যোজন যোজন দূর রয়েছে তা মাথায় থাকলে বিজ্ঞান সম্পর্কে আলোচনার সঠিক পথ পায়।
‘রাষ্ট্র বিজ্ঞানকে পৃষ্ঠপোষকতা করে প্রায়শই তার আধিপত্য ও শক্তিবৃধির জন্য।’ এই উক্তির মধ্যে সত্য থাকলেও বিজ্ঞানের জন্মরহস্য আমাদের ভিন্ন তথ্য দেয়।
মানুষই বিজ্ঞানের জনক। আর বিজ্ঞান প্রযুক্তির জনক। তবে সন্তান যে সর্বদাই পিতার বাধ্যগত থাকবে তেমনটা ভাবা যায় না। প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও অনেকটা সেই রকম। একজন চরম অবিজ্ঞানমনস্ক মানুষও প্রযুক্তির ব্যবহার করতে পারে নিজের স্বার্থে, পরিবারের স্বার্থে, এমনকি সমাজের স্বার্থেও। কেউ যখন প্রযুক্তিকে মানুষের স্বার্থে, সমাজের স্বার্থে ব্যবহার করে তখন তার উদ্দেশ্যে বিজ্ঞানে তথা বিজ্ঞানীর উদ্দেশ্যের সাথে মিলে যায়। কিন্তু যদি কেউ বিজ্ঞানকে নিজের কিংবা সংকীর্ণ গোষ্ঠির স্বার্থে ব্যবহার করে, যা অন্যের স্বার্থকে আঘাত করে বা ব্যহত করে, তখন তার দায় কোনো মতেই বিজ্ঞানের উপর বর্তায় না। এমনকি এই কাজটি যদি বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানীও করে থাকে তবুও না। এখানে Ownwership এর ব্যাপারটা একটা বড় ফ্যাক্ট। বিজ্ঞানের মজার বিষয়টা হলো এখানেই যে বিজ্ঞানের মধ্য থেকে কোনো ভুল সংঘটিত হয়ে থাকলে বিজ্ঞান স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা শুধরে নেয়ার চেষ্টা করে। বিজ্ঞানদর্শনের মধ্যেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই মেকানিজমটা রয়েছে। এরিস্টটলের পৃথিবীকেন্দ্রীক মহাবিশ্বতত্ত্ব থেকে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ পর্যন্ত এমন দৃষ্টান্ত বিরল নয়। যে মুহূর্তে বিজ্ঞান তার ভুলটি শুধরে নিল সেই মুহূর্তেই বিজ্ঞান নবজন্ম লাভ করল। পৃথিবীতে যত দর্শন, তত্ত্ব, আদর্শ আছে স্বয়ংক্রিয় সত্যযাত্রার এমন অনন্য নজির আর কোথাও কি আছে?
মঙ্গলগ্রহে অভিযানের পেছনে কিছু মানুষের সাম্রাজ্য বিস্তারের অভিসন্ধি থাকলেও মানুষ কেবল অপউদ্দেশ্য নিয়েই জ্ঞানচর্চা করে না। বিজ্ঞানচর্চার পেছনে সবচেয়ে বড় ও মহত উদ্দেশ্যটিই থাকে মানবকল্যাণ। তবে কখনও কখনও বিজ্ঞানীর এই বিজ্ঞানচর্চা সরাসরি মানুষের কল্যাণে নাও আসতে পারে, কিংবা নাও লাগতে পারে। বিজ্ঞানের ইতিহাসের অনেক অংশজুড়েই দেখা যায় বিজ্ঞানীর বিজ্ঞান চর্চা চলতে থাকে এর অসীম সম্ভাবনার কথা না জেনেই।সেই ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীর এই নিববিচ্ছিন্ন ও নিবিষ্ট চর্চার পেছনে তার জ্ঞানতৃষ্ণার অবদানকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।
বিজ্ঞান একটি পদ্ধতির নাম। বলা নিষ্প্রোয়জন মানুষই এই পদ্ধতির জনক ও ধারক। মানুষ নিঃসন্দেহে একটি বহুমাত্রিক সত্তা। বিজ্ঞানীও এর বাইরের নয়। সমাজের আর দশটা মানুষের মতোই বিজ্ঞানীরও আনন্দ আছে, বেদনা আছে, আবেগ আছে, অনুভুতি আছে, আছে কাম-প্রেম-ভালোবাসাও। কাজেই বিজ্ঞানীকে সমাজের বাইরের মানুষ ভাবা ঠিক নয়। মানুষের জ্ঞান বাড়লেই বিজ্ঞান ও ধর্ম বিরোধীতা কমবে এমন হাইপোথিসিস তখনই সত্য হবে যখন এর পেছনে নৈর্ব্যক্তিকতা থাকে, বস্তুনিষ্ঠতা থাকে এবং সর্বোপরি এর উদ্দেশ্য থাকে মানবকল্যাণ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


