somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

লন্ডনে আটক নিজামের কোটি ডলার, সালার জং মিউজিয়াম এবং হায়দ্রাবাদি পোলাও

২৬ শে জুলাই, ২০২০ রাত ৯:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :







১৯৪৮ সালে, ভারতের স্বাধীনতার কয়েকমাস পরেই হায়দ্রাবাদের তৎকালীন নিজাম সপ্তম আসাফ জাহ্ (মীর ওসমান আলি খান) লন্ডনের পাকিস্তান হাই কমিশনে দশ লক্ষ পাউন্ড ও একটি গিনি (স্বর্ণমুদ্রা) পাঠিয়েছিলেন। হায়দ্রাবাদ তখনও ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়নি। কিন্তু ভারত যদি হায়দ্রাবাদ দখলে কোনও অভিযান চালায়, সেই জন্য পাকিস্তান সেই অর্থ 'নিরাপদে গচ্ছিত রাখবে' সেই ভরসায় আগেভাগেই নিজাম ওই টাকাপয়সা লন্ডনে পাঠিয়ে দেন।নিজামের অর্থমন্ত্রী মঈন নওয়াজ জং সেই টাকাপয়সা লন্ডনের ন্যাশনাল ওয়স্টেমিনস্টার (ন্যাটওয়েস্ট) ব্যাঙ্কে পাঠিয়ে দেন পাকিস্তানের হাই কমিশনারের নামে।লন্ডনে পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত হাবিব ইব্রাহিম রহমতউল্লা সেই অর্থ জমা রাখেন লন্ডনের একটি ব্যাঙ্কে, সপ্তম নিজাম ও ভবিষ্যতের নিজাম খেতাবধারীদের নামাঙ্কিত একটি ট্রাস্টের অ্যাকাউন্টে। কিন্তু এদিকে লন্ডনে টাকাপয়সা পাঠিয়ে দেওয়ার কয়েকদিন পরেই নিজাম মত পাল্টান, তিনি ব্যাঙ্ককে জানান ওই অর্থ তার সম্মতিক্রমে পাঠানো হয়নি এবং তিনি সেটা এখন ফেরত চান।কিন্তু ন্যাটওয়েস্ট ব্যাঙ্ক সেই টাকা তখন ফেরত দিতে রাজি হয়নি। তাদের যুক্তি ছিল, ওই অ্যাকাউন্ট নিজামের ব্যক্তিগত নয় - এবং ওই তহবিলের ওপর পাকিস্তানের 'লিগাল টাইটেল' বা আইনি অধিকার আছে, সুতরাং তাদের সম্মতি ছাড়া টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়।নিজাম ব্যাঙ্কের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হন। প্রায় গোটা পঞ্চাশের দশক জুড়েই তিনি ন্যাটওয়েস্টের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ আদালতে মামলা চালিয়ে গেছেন। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত ওয়েস্টমিনস্টারে ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও গড়ায়। হাউস অব লর্ডস সিদ্ধান্ত নেয়, এই অর্থের মালিকানা নিয়ে ভারত, পাকিস্তান ও নিজামের পরিবার একমত না-হওয়া পর্যন্ত তা ব্যাঙ্কেই 'ফ্রোজেন' থাকবে - অর্থাৎ সে টাকাপয়সা কেউ তুলতে পারবে না বা অন্য কোথাও সরাতেও পারবে না।এখন বাহাত্তর বছর ধরে ব্যাঙ্কে গচ্ছিত সেই টাকাই সুদে-আসলে বেড়ে আজ হয়েছে পঁয়ত্রিশ মিলিয়ন পাউন্ড বা প্রায় সাড়ে চার কোটি ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় যার মূল্য প্রায় সাড়ে তিনশো কোটি রুপি।ভারত থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে লন্ডনের আদালতে নিজের বক্তব্য পেশ করেছেন নওয়াব নাজাফ আলি খান, যিনি এই মামলায় নিজামের পরিবারের মোট ১১৭ জনের প্রতিনিধিত্ব করছেন। নাজাফ আলি খানের যুক্তি ছিল, লন্ডনের ব্যাঙ্কে গচ্ছিত ওই অর্থ কোনও রাষ্ট্রের নয়, নিজাম পরিবারের - ফলে সেটার ওপর প্রধান দাবি নিজামের প্রায় ১২০জন 'ওয়ারিশ' বা উত্তরাধিকারীর।
ব্যাপারটা এখানেই ঝুলে আছে এবং থাক । আমার মনে প্রশ্ন এল নবাব পাকিস্তান দুতাবাসে কেন ওই টাকা রাখতে বলেছিলেন বা অর্থমন্ত্রী নিজেই ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন । দুটি দেশ অর্থাৎ পাক-ভারতের ক্যাচাল বহুমাত্রিক এবং বর্ণাঢ্য এবং এর পেছনের দুই দুই মহান কালাকার জিন্নাহ আর নেহরু । পাশেই ছিলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী । তিন পিস মালই লন্ডনে পড়েছেন এবং ভারতে এসে চরম হাউকাউ বাধাতে দারুন ভুমিকা নিয়েছিলেন । আশ্চর্য হবেন জেনে জিন্নাহ আর মোহনদাস কিন্তু গুজরাটি ।
৮২ সালে আমরা এক গ্রুপ ছাত্র ভারত সফরে ভুবনেশ্বর ছেড়ে আওরঙ্গবাদ যাচ্ছি । ট্রেনেই এক হায়দ্রাবাদি আমাদের জানাল হায়দ্রাবাদের উপর দিয়েই যাবে কিন্তু তা দেখবেনা তাই কি হয়? আমরা নেমে পড়লাম । প্লান না থাকলে যা হয় তাই হল । সস্তায় থাকার জায়গা কোথায় মিলবে কেউ বলতে পারল না । যুবক আগেই উধাও । ষ্টেশনে ইন্ডিয়ান টুরিস্ট ব্যুরোর অফিস থাকে তারা আমাদের জানাল অমুক বাসে এতগুলো ষ্টেশন পার হয়ে সেকেন্দ্রাবাদে নামবে । বাস ষ্টেশনে সেই যুবক আমাদের দেখে ভেগে গেল । আমরা নামলাম এবং কাছেই আকাঙ্খিত সরাইখানায় পোটলা রেখে রেস্টুরেন্টে খেতে বসলাম । আমায় মোরগ পোলাও এনে দিল । ঝাক্কাস , এমন স্বাদের পোলাও খাইনি কখনো ।নারকেলের দুধের ঝোল , আহা ! যুবকের ওপর রাগ কমে গেল । পরদিন সালার জং মিউজিয়াম দেখতে গিয়ে হা হয়ে গেলাম । এত কালেকশন !! ৫৪হাজার পিস ছোট বড় জিনিস সাজানো বিশাল তিনতলা দালানে । আমরা জানলাম এক ব্যাক্তির সবচে বড় সংগ্রহ এই পৃথিবীতে । মিউজিয়ামটি গড়ে তোলেন নবাব মীর ইউসুফ আলী খান নামের এক সৌখিন মানুষ। তিনি সালার জং তৃতীয় নামে বিখ্যাত। নানান দুষ্প্রাপ্য আর অমূল্য জিনিস সংগ্রহ করা ছিল তার শখ। সারা জীবন তিনি যা সংগ্রহ করেছেন তার সব কিছুই আছে এখানে।
১৯৫১ সালে এই মিউজিয়ামটি নির্মিত হয়। ১৯৫৮ সালে ভারত সরকার মিউজিয়ামটি অধিগ্রহণ করে। বর্তমানে মিউজিয়ামটিতে ৩৮টি গ্যালারি আছে। ইতালি থেকে মার্বেল পাথরে খোদাই করা বিশাল মূর্তি এনেছে নবাব । তার রুচিবোধ এতই প্রবল যে ওই ভাস্কর্য না দেখলে বোঝা যায়না সুন্দরী মহিলার মুখে সিল্কের রুমাল ভেদ করে কিভাবে ভাস্কর নিখুত করে চোখ মুখ বের করে এনেছেন । ভাস্কর্যর ছাত্র হিসেবে লজ্জা পেলাম আমাদের বিপুল আর বিশাল ঘাটতিতে । প্রতি ঘণ্টায় ঘড়িতে ঘণ্টা বাজানোর তেলেস্মাতি ব্যাপার দেখা ছাড়া আমি বাকি সময় কাঁচ ঘেরা ওই ১৪/১৫ ফিট উচু ভাস্কর্যর দিকে হাজার মানুষের ভিড়ে পলকহীন তাকিয়ে ছিলাম । অন্যান্য তালায় ঢু মারলাম এবং দ্রুত দেখে নিলাম কিন্তু মনে হল তিনদিন এক নাগাড়ে না দেখলে পূর্ণতা আনা অসম্ভব । তেলেঙ্গানার দরিদ্র কৃষকদের ধান পান বেচে নবাবরা যে ফুর্তি করেছে তার সব সালার জং মিউজিয়ামে এসে মাফ পেয়ে গেছে ।
৮২ সালে হায়দ্রাবাদ গরীব শহর ছিল । চারমিনারের ওপর দাড়িয়ে পকেট থেকে চারমিনার সিগারেট ধরিয়ে নিচে মানুষের চলাচল আর দরিদ্র মুসলিমদের রুপার অ্যান্টিক পিসে চোখ আটকে গেল । আহা আমার অনেক পয়সা থাকলে কয়েকটা কালেকশন করতাম । অসাধারন পিস শয়ে শয়ে রাস্তায় সাজানো ।
পরদিন গোলকুণ্ডা দুর্গ আর পাহাড়ের মাথায় সিঁড়ি যা দিয়ে ঘোড়া উঠত বেশ ভাল লেগেছিল ।
হায়দ্রাবাদ এখন ঝলমলে শহর । এক টাকার সেই মুসলিম সরাইখানা এখনও আছে নিশ্চয়ই । আমরা পাথরের একতালা বাড়িতে রাতে বারান্দায় চাদর পেতে ঘুমিয়েছি । ওদের হাম্মামখানা দুর্দান্ত পরিস্কার , স্বচ্ছ পানি । ছাত্র নামে গেলে কম খরচে ভারতে ঘোরা যায় । টুরিস্ট বুথ দারুন উপকার করে এইসব ক্ষেত্রে ।
আমাদের পরবর্তী ষ্টেশন ছিল ইলোরা খ্যাত আওরঙ্গবাদ ।






সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুলাই, ২০২০ রাত ৯:৫৪
১০টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৪৫ বছরের অপ-উন্নয়ন, ইহা ফিক্স করার মতো বাংগালী নেই

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১০ ই আগস্ট, ২০২০ বিকাল ৫:০৫



প্রথমে দেখুন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলো; উইকিপেডিয়াতে দেখলাম, ১০৩ টি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি আছে; ঢাকা ইউনিভার্সিটি যাঁরা যেই উদ্দেশ্যে করেছেন, নর্থ-সাউথ কি একই উদ্দেশ্যে করা হয়েছে? ষ্টেমফোর্ড ইউনিভার্সিটি কি চট্টগ্রাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ মাতানো ব্লগাররা সবাই কোথায় হারিয়ে গেল ?

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ১০ ই আগস্ট, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:৩৪

ইদানিং সামু ব্লগ ব্লগার ও পোস্ট শূন্যতায় ভুগছে। ব্লগ মাতানো হেভিওয়েট ব্লগাররা কোথায় যেন হারিয়ে গেছেন।কাজের ব্যস্ততায় নাকি ব্লগিং সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। আমি কিছু ব্লগারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ৬৪

লিখেছেন রাজীব নুর, ১০ ই আগস্ট, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:২৫



সুরভি বাসায় নাই। সে তার বাবার বাড়ি গিয়েছে।
করোনা ভাইরাস তাকে আটকে রাখতে পারেনি। তবে এবার সে অনেকদিন পর গেছে। প্রায় পাঁচ মাস পর। আমি বলেছি, যতদিন ভালো... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ অমঙ্গল প্রদীপ (পাঁচশততম পোস্ট)

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১০ ই আগস্ট, ২০২০ রাত ১১:১৪

প্রদীপের কাজ আলো জ্বালিয়ে রাখা।
কিন্তু টেকনাফের একটি ‘অমঙ্গল প্রদীপ’
ঘরে ঘরে গিয়ে আলো নিভিয়ে আসতো,
নারী শিশুর কান্না তাকে রুখতে পারতো না।

মাত্র বাইশ মাসে দুইশ চৌদ্দটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

গণপ্রজাতন্ত্রী সোমালিয়া দেশে চাকরি সংকট

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১১ ই আগস্ট, ২০২০ রাত ১২:২০



গণপ্রজাতন্ত্রী সোমালিয়া সরকার মন্ত্রী পরিষদে কতোজান বিসিএস অফিসার আছেন? তাছাড়া সততার সাথে সোমালিয়া সরকার চাইলেও সঠিক ও যোগ্য মন্ত্রীপদে কতোজন বিসিএস অফিসার দিতে পারবেন?

(ক) মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় - একজন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×