

গাছগাছড়া আর প্রাণীজ মজ্জা দিয়ে যা তৈরি হয় তাই আয়ুর্বেদিক ঔষধ । সারা পৃথিবীতেই গাছ গাছড়া এবং কোথাও প্রাণীজ মজ্জা মিশিয়ে ওষুধ তৈরি ও সেবন একসময় একমাত্র উপায় ছিল । আধুনিক সময়ে খনিজ দ্রব্য মিশিয়ে যে ঔষধ তৈরি হয় তা দিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞান ব্যাপক অগ্রগতি লাভ করেছে । কিন্তু এতে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া বেশি থাকায় মানুষ গাছগাছড়ার দিকে ঝুকছে আংশিকভাবে । হৃদ যন্ত্রনা এবং অ্যাটাক হলে ছোট একটি ট্যাবলেট তাৎক্ষনিক ব্যাথা নিরাময় করবে কিন্তু আয়ুর্বেদিকের এখানে সুযোগ নেই । কিন্তু তরুন বয়স হতে আয়ুর্বেদিক চর্চা হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখে । আয়ুর্বেদিক চর্চার পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস , জীবনের অন্য চর্চা সুস্থ থাকার নিয়ামক বটে । আমি বেশ কিছু মানুষকে চীন এবং ভারতে দেখেছি তারা নিয়মতান্ত্রিক জীবন পালন করে সুস্থ আছেন । ইরান এবং পেরুর পাহাড়ি অঞ্চলে শত বর্ষী বৃদ্ধরা কর্মঠ জীবন যাপন করছেন । তারা ছাগলের দুধ এবং ফল, দুম্বার মাংস , যবের রুটি খেয়ে থাকেন । এরাও গাছগাছড়ার তৈরি নানাপদের সামগ্রি খেয়ে থাকেন সুস্থ থাকার জন্য । আদিবাসী এবং সভ্যতা থেকে দূরে থাকা মানুষেরা তাদের নিজস্ব ঔষধ রীতিতে চলছেন হাজার বছর ধরে । এদের অনেক বিষয় সভ্য সমাজে অজ্ঞাত । চাইনিজ ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন বা হারবাল ঔষধ সারা পৃথিবীতেই বাজার বিস্তার করেছে । রাষ্ট্র চীনা কোম্পানিগুলোকে পুরোপুরি স্বাধীনতা , অর্থ ও সুযোগ দেওয়াতে চীনারা দ্রুত বাজার ধরতে পেরেছে । চীনে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে যেখানে হারবাল ঔষধের ওপর শিক্ষা দেওয়া হয় । পশ্চিমে এসব ঔষধের স্বীকৃতি নেই তাই অধিকাংশ মানুষকে ওয়েস্টার্ন মেডিসিনের ওপর নির্ভর করতে হয় ।
আমার গলা ফুলে ব্যাথা হলে ডাক্তার আমায় ছোট ছোট কালো উজ্জ্বল দানা দিলেন খেতে । পাচ মিনিটেই আমার ব্যাথা উধাও । ঠাণ্ডার দেশে বাঙ্গালের সর্দি কাশির প্রকোপ বেশি থাকে । এরজন্য কফির মত প্যাকেট করা দানা গরম পানিতে গুলিয়ে চা’এর মত তিনবেলা খেলে চমৎকার উপকার পাওয়া যায় । জীবন প্রতিরোধক ঔষধের কোন বিকল্প নেই তাই সবাইকে পশ্চিমা এন্টিবায়োটিক ঔষধের ওপর নির্ভর করতে হয় । গলা ব্যাথার দানাতে গণ্ডারের শিং এর মজ্জা মেশানো আছে । লে বাবা , ঠাণ্ডা গলা ব্যাথা সারাতে সব গণ্ডার শেষ হয়ে যাবে । এভাবেই চীনেদের ওষুধে নানারকম প্রাণীজ মজ্জা মেশানো হয় সাথে শুকনো ডাল , পাতা , ফলমূল তো আছেই । ভারতীয় হারবাল আবার প্রাণীজ মজ্জা মেশায় না ভেজ বলে । সে তুলনায় চীনাদের ঔষধ প্রাণীজ মজ্জা মিশিয়ে আরও ভাল ফল পাচ্ছে । আমার পরিবারে আমি আর আমার কন্যা দুজনই চীনাদের হারবাল ঔষধ খেয়ে খুব উপকার পেয়েছি । মেয়ের আট মাস বয়েসে ব্রংকাইটিস ভাব দেখা দেয়াতে বৃদ্ধা ডাক্তার যিনি ৬০ এর দশকে আমেরিকায় উচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন আমাদের বললেন তাকে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন দেব যাতে মুসলিমদের জন্য নিষিদ্ধ জিনিস আছে কিন্তু তোমরা তা জানতে চেও না । ফ্রিজে রাখা তরল ওষুধ ছোট বাটি যা হাসপাতাল সরবরাহ করেছে তাতে রেখে গরম পানির ভাপে ঠাণ্ডা কাটিয়ে খুব কষ্ট করে মধু চিনি মিলিয়ে ঠেসে ধরে ছয়দিন মেয়েকে খাওয়ানো হল । ডাক্তার যা বলেছিলেন ঠিক তাই হল । ছয় দিন পর সকালে দেখা গেল তার কোন কাশিই নেই । এর কিছুদিন পর তার জ্বর হল এবং জ্বর বাড়তে থাকায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হল । কোন ওষুধ কাজে দিচ্ছে না । ১৩ দিনের দিন তাকে ইটের গুড়োর মত ঔষধ খাওয়ালে জ্বর নেমে গেল । রক্ত কালচার করেও জ্বরের কারন বের করা যায়নি । ৩০বছর পেরিয়েছে , তার কখনো কাশি হয়নি । আমার ঠাণ্ডার দেশে নিয়মিত শেভ করতে গেলে কেটে যেত । একবার ব্রন কেটে মুখ ফুলে জ্বর এসে গেল । ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে তিনি আমায় বললেন এই ব্রন একটি ভীষণ সমস্যা বটে । আমায় গুল্লি দিলেন মোমএর আচ্ছাদন দিয়ে ঢাকা । সেকি ঘুম রাত্রে । সকালে মনে হল টয়লেট করে এত আরাম পাইনি কখনো । এরপর থেকে আমার ব্রন ওঠেনি , সমস্যাও হয়নি । ব্যাপারটা আমাদের কবিরাজি মোদক এর মত লেগেছিল । ছাত্র জীবনে শীতের সফরে পরদিন ট্রেনেই জ্বর এল । একজন পি এল এ’র ডাক্তার ট্রেনে ছিলেন ঘোষণায় তিনি এলেন । ট্রেন থামলে সব নিয়ম ভেঙ্গে তিনি ১৮ মিনিটের মাথায় আমায় ওষুধ এনে দিলেন , হারবাল মেডিসিন । আমার শিক্ষক তার সাথে ছিলেন । কয়েক ঘণ্টায় জ্বর আর এলো না । ওই সেনা ডাক্তারের কথা আমার এখনও মনে পড়ে । আমার কর্মজীবনে বাঙালি ম্যানেজারের সন্তান নেই তাই আমাদের চীনা কলিগ জানতে চাইলেন কেন ? আলাপে ম্যানেজার আমায় জানালেন চেষ্টা অনেক করেছেন কিন্তু হচ্ছেনা । আমাদের কলিগ তার স্ত্রীকে নিয়ে গেলেন লোকাল পাশ হীন ডাক্তারের কাছে । যে ফর্দ দিলেন তা আমায় হারবাল মেডিসিনের দোকান হতে সংগ্রহ করতে হল । বিশাল দোকানে এলাহি কারবার । বহু রকম জিনিসে যা সাজিয়ে ২৮ টি প্যাকেট করে দিলেন তাতে শুকনা প্রাণীজ মজ্জা থেকে গাদা ফুলের পাপড়ি সবকিছু ছিল । একটি ঝামা বাটি দিল যাতে ওসব ওষুধ পানিতে জ্বাল দিয়ে তার তলানি খেতে হবে তিনবেলা। ভদ্রমহিলা পরে তিন সন্তানের মা হয়েছেন এবং তারা এখন আমেরিকা প্রবাসী । পরবর্তীতে আমাদের এক সহপাঠী চেষ্টা করেছিল কিন্তু তারা সফল হয়নি । এছাড়া আকুপাঙ্কচার , মক্সিবাসন থেরাপি খুব কাজে দেয় মাসল পেইন বা হাড়ের ব্যাথায় । অসুখ গভীরে গেলে অনেকক্ষেত্রে হারবাল কাজে দেয়না , তখন আধুনিক ধারার ওষুধে সারানো উত্তম।
আপনার বাড়ন্ত সন্তানকে আমাদের নাগালের মধ্যে পাওয়া যায় এমন ভেষজ খাওয়ানো অভ্যেস করান । কালিজিরা , চ্যাবনপ্রাস , নিম সহ শতাধিক গাছগাছড়া আছে এদেশে যা সপ্তাহে একবার খাওয়ান এবং নিজে খান । শারিরিক শ্রম এবং ব্যায়াম অপরিহার্য ।

সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই আগস্ট, ২০২০ রাত ১০:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



