somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সুলেখা দাস

১৩ ই অক্টোবর, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



সূর্য না ওঠা ভোরে টয়লেট থেকে বেরিয়ে চায়ের জন্য এগিয়ে জানলাম চুলা জলেনি । লঞ্চের ধোয়া বেরুনোর চোংগা ঘিরে একজন কমবয়েসি মহিলা আর তাকে ঘিরে দুজন পুরুষ । কাছেই বাশের উপর হাত রেখে আমার সঙ্গী বন্ধু বিড়ি ফুকছে । কেবিনের দিকে এগুতেই সে আমায় ফিসফিস করে বলল গেল রাতে ওই মহিলার উপর অবিচার হয়েছে । বেশ কৌতুহলী হলাম । খানিক বাদে আমি বেরিয়ে কেবিনের অপর পাশের বারান্দায় চলে এলাম । রাতের লঞ্চ খুলনা থেকে মাঝরাতে ছেড়েছে , চালনা থেকে আমরা উঠেছি অন্ধকারে । ওই বারান্দাতে কাঠের ফ্লোরে মেয়েটি বসে নদীর দিকে তাকিয়ে । একটু দুরেই আমি ফ্লোরে বসে পড়লাম । সামনে নদী । জানুয়ারির শুরুতে কুয়াশায় আচ্ছন্ন পশুর নদী । বায়ে ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটির দিকে তাকালাম । নিতান্তই কম বয়েসি । মেয়েটি টের পেলো একজন শহুরে কেতাদুরস্ত কাধ লম্বা চুল আর গোঁফের কারসাজির কিশোর তার খুব কাছেই বসে । আমিই মুখ খুললাম – বাড়ি কোথায় ? সাধারনত এটাই দক্ষিনে স্টাইল । খুব সহজ এবং কোন বাধা বিঘ্নতা ছাড়াই মেয়েটি কলকলিয়ে বলে উঠলো লাউডুব । তাকে মনে হচ্ছে সে এইরকম কারো সাথে কথা বলার জন্য মুখিয়ে ছিল । বিয়ে হয়েছে ? হ্যা , সোজা সাপটা উত্তর । বাচ্চা ? একটা । স্বামী কি করে ? নিজেগে ক্ষেত খামার আছে আর পরের ক্ষেতে কিষেন দে । এবার নদীর দিকে স্থির তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম কি অইল কাইল রাত্তির বেলা ?
লঞ্চের মহিলা কেবিনি দরজা খিল দিয়ে শুইলাম । লঞ্চের ওই ছেমড়া অনেক গুঁতো গুতি করে খুলতি না পাইরে নদীবরো জানালা দিয়ে ঢুইকে আমার সব্বনাশ করিছে ।
আমি স্তম্ভিত তাকিয়ে নদীর পাড়ে সবে উঠে আসা সূর্যের দিকে । কি বলা যায় এমন মর্মান্তিক বর্ণনায় । মাথা উচিয়ে দেখলাম কেবিনের বাকি যাত্রীরা জানালা দিয়ে মুখ নিচু করে আমাদের দেখছে ।
খুলনা কি কত্তি গেইলে ?
বাচ্চা ফ্যালাতি ।
আমি কোন জবাব দিচ্ছিনা দেখে সে নিজেই বলল- আমার স্বামী বলল এহন ধান তোলার টাইম , চাল বানানোর কাজ , এহন বাচ্চা নিয়া যাবে না , তুই প্যাট সাফ কইরে আয় । আমার শাউড়ি আমারে নিয়ে খুলনা গেল , ভর্তি করে দেলো কিলিনিকি ।
তোমার শাউড়ি কোয়ানে গেল ?
সে ভর্তি করায়ে লঞ্চে কইরে বাড়ি চইলে আলো ।
আমি অবাক হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম তুমি একা ছিলে ?
হয় একা । রাত্তিরি আমার অপারেশন কইরে পরদিন ছাইড়ে দেলো বিকেলে । চিনি না জানি না টাউনির কিছু । হাইটে লঞ্চ ঘাটে ।
আরও অবাক হয়ে বললাম তোমার রিকশা খরচ দেয়নি ?
না । শাউড়ি কলো ম্যালা খরচ হয়ে গেল , বাজার ঘাট কম করতি হবে।
ঘাটের লোকরা বলল লঞ্চ রাত দুটোয় ছাড়বে । আমি মহিলা কেবিনি শুয়ে ছিলাম । আমি ছেলেটার হাত পা ধরে অনুরোদ করলাম , কলাম আমার অপারেশন অইছে , আমার সেলাই দিয়া , তাও শোনলো না । সেলাই কাইটে ম্যালা রক্ত পড়িছে , আমার কাছে যে বস্ত্র ছেলো তাই দিয়ে মুছিছি ।
এবার আমি চুপ করে এক রাশ যন্ত্রনা নিয়ে কুয়াশার দিকে তাকিয়ে রইলাম ।
ওকে নাম জিজ্ঞেস করলাম , বলল সুলেখা দাস ।
নিজে থেকেই বলতে থাকল এহন আমার কি অবে ? জানাজানি হলি ঘরে জায়গা অবেনানে ।
আমি বললাম কেন বাপের বাড়ি !
সুলেখা বলল হিন্দু বিবাহিতা নারীর বাপের বাড়ি থাহে না , স্বামীর বাড়ি জায়গা না হলি গলায় দড়ি ছাড়া উপায় নেই ।
এবার সুলেখার দুচোখ বেয়ে জলের ধারা নামলো ।
আমার ডান দিকে সারেঙের কেবিনের সামনে একটা হৈচৈ শুনে উঠে গেলাম । একটা যুবক , কম বয়েসি কান ধরে হাঁটু গেড়ে বসা । তার সামনে দাড়িয়ে চারজন বয়স্ক লোক । একজন আমাকে আর বন্ধুকে দেখে যুবককে গালাগাল শুরু করল । তারপর জুতা দিয়ে মার । আট দশ ঘায়ে শুয়ে পড়ল বেচারা । এই সেই রাত্রি বেলার ধর্ষক । এখন তার বিচার চলছে । চলে এলাম সুলেখার দিকে । সুলেখা জলের দিকে তাকিয়ে ধুসর চোখে দেখছে তার ভবিষ্যৎ । বললাম দেখলেনা ওকে মারছে ? হতাশ সুলেখা আমায় জবাব দিল ওসব নাটক দেখে আমার সন্মান ফিরে পাব না ।
ঘণ্টা বাজল লঞ্চের । লাউডুব এসে গেছে । সামনের লোকগুলো সুলেখাকে বলল ছেলেটার ভুল হয়ে গেছে , কি আর করা , এই নাও বলে দশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিল । সুলেখা টাকা ছুড়ে দিয়ে বলল আমার ইজ্জতের দাম দশ টাকা! টাকায় ইজ্জত ফেরে না । সুলেখা সিঁড়ি দিয়ে একাকী নেমে গেল । লাউডুবের একমাত্র প্যাসেঞ্জার । সবাই দেখছিল কি খাসা বিচার ! কিন্তু টাকা না নেওয়ার দৃশ্য হতাশ করে দিল সবাইকে । লঞ্চ চলা শুরু করল ঘণ্টা বাজিয়ে । আমি তাকিয়ে সুলেখার চলার পথে , ঝোপ ঝাড়ের আড়ালে সুলেখা হারিয়ে গেল । দাড়িয়ে থাকা লোকদের একজন আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল ওর ভাড়া কিন্তু নেইনি আমরা ।
লঞ্চ মংলা বন্দরমুখী । সামনেই দুখানা বড় জাহাজ দাড়িয়ে । মংলা থেকে জোয়ারের পানি সবেগে খুলনার দিকে ধাবমান । আমি একটি সিগারেট ধরালাম , এক কাপ চা খেতে ইচ্ছে হচ্ছে প্রচণ্ড ।
© শাহ আজিজ

আমার জীবনের সত্যি ঘটনা , প্রতিটি শব্দ সত্যি ।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই অক্টোবর, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৫০
১৯টি মন্তব্য ১৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সরকারী অফিসারদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:০০

দেশের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সরকারী অফিসারদের হাত ধরেই হয়। সেজন্যে, এই পদগুলো যোগ্য মানুষদের হাতে যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু, সমস্যা হচ্ছে, গত কয়েক দশকে দেশের টপ ট্যালেন্টদের বেশির ভাগই কোনক্রমেই সরেকারী অফিসার... ...বাকিটুকু পড়ুন

মেমোরি লুপ (Memory Loop)

লিখেছেন চারাগাছ, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:০৪




মেমোরি লুপ (Memory Loop)

​গভীর রাত। ল্যাবের নিস্তব্ধতা চিরে শুধু ভেসে আসছে মনিটরের নীলচে আলোর মৃদু কম্পন। টেবিলের ওপর ঝুঁকে বসে আছেন ডা. আরিয়ান। স্ক্রিনে ভাসছে তার বহু বছরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

টাই চাই

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৩১

সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে: অদ্য হইতে কোনো সরকারি বা বেসরকারি কার্যালয়ে ও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থানে টাই ও বেল্ট পরিধান দণ্ডনীয় অপরাধ। কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে একবাক্যে: "কর্মক্ষেত্র ও যত্রতত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের জন্য ৭-গ্রেডভিত্তিক ন্যায়সংগত সরকারি বেতন ও প্রশাসনিক সংস্কার একটি প্রস্তাবিত নীতিপত্র

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২০


ন্যায়সংগত পারিশ্রমিক, বেতন বৈষম্য হ্রাস, মেধার মূল্যায়ন এবং দক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রশাসন প্রতিষ্ঠার একটি সমন্বিত প্রস্তাব

বাংলাদেশের সরকারি বেতন কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে ২০টি গ্রেডের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে আসছে। ভেবেছিলাম দেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুlie ২৪ আন্দোলন পরবর্তী বৈষম্যহীন বাংলায় (যেহেতু বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই), বেসরকারী ও সরকারী কর্মজীবীর জীবন...

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২১

/বাংলাদেশের মোট কর্মজীবীদের মধ্যে সরকারী আর বেসরকারী কত শতাংশ?

/গত ২ বছরে যত শিল্প কারখানা ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে এবং তাতে যত সংখ্যক বেসরকারী কর্মজীবী (কর্মকর্তা, কর্মচারী, শ্রমিক….) চাকরী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×