
সূর্য না ওঠা ভোরে টয়লেট থেকে বেরিয়ে চায়ের জন্য এগিয়ে জানলাম চুলা জলেনি । লঞ্চের ধোয়া বেরুনোর চোংগা ঘিরে একজন কমবয়েসি মহিলা আর তাকে ঘিরে দুজন পুরুষ । কাছেই বাশের উপর হাত রেখে আমার সঙ্গী বন্ধু বিড়ি ফুকছে । কেবিনের দিকে এগুতেই সে আমায় ফিসফিস করে বলল গেল রাতে ওই মহিলার উপর অবিচার হয়েছে । বেশ কৌতুহলী হলাম । খানিক বাদে আমি বেরিয়ে কেবিনের অপর পাশের বারান্দায় চলে এলাম । রাতের লঞ্চ খুলনা থেকে মাঝরাতে ছেড়েছে , চালনা থেকে আমরা উঠেছি অন্ধকারে । ওই বারান্দাতে কাঠের ফ্লোরে মেয়েটি বসে নদীর দিকে তাকিয়ে । একটু দুরেই আমি ফ্লোরে বসে পড়লাম । সামনে নদী । জানুয়ারির শুরুতে কুয়াশায় আচ্ছন্ন পশুর নদী । বায়ে ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটির দিকে তাকালাম । নিতান্তই কম বয়েসি । মেয়েটি টের পেলো একজন শহুরে কেতাদুরস্ত কাধ লম্বা চুল আর গোঁফের কারসাজির কিশোর তার খুব কাছেই বসে । আমিই মুখ খুললাম – বাড়ি কোথায় ? সাধারনত এটাই দক্ষিনে স্টাইল । খুব সহজ এবং কোন বাধা বিঘ্নতা ছাড়াই মেয়েটি কলকলিয়ে বলে উঠলো লাউডুব । তাকে মনে হচ্ছে সে এইরকম কারো সাথে কথা বলার জন্য মুখিয়ে ছিল । বিয়ে হয়েছে ? হ্যা , সোজা সাপটা উত্তর । বাচ্চা ? একটা । স্বামী কি করে ? নিজেগে ক্ষেত খামার আছে আর পরের ক্ষেতে কিষেন দে । এবার নদীর দিকে স্থির তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম কি অইল কাইল রাত্তির বেলা ?
লঞ্চের মহিলা কেবিনি দরজা খিল দিয়ে শুইলাম । লঞ্চের ওই ছেমড়া অনেক গুঁতো গুতি করে খুলতি না পাইরে নদীবরো জানালা দিয়ে ঢুইকে আমার সব্বনাশ করিছে ।
আমি স্তম্ভিত তাকিয়ে নদীর পাড়ে সবে উঠে আসা সূর্যের দিকে । কি বলা যায় এমন মর্মান্তিক বর্ণনায় । মাথা উচিয়ে দেখলাম কেবিনের বাকি যাত্রীরা জানালা দিয়ে মুখ নিচু করে আমাদের দেখছে ।
খুলনা কি কত্তি গেইলে ?
বাচ্চা ফ্যালাতি ।
আমি কোন জবাব দিচ্ছিনা দেখে সে নিজেই বলল- আমার স্বামী বলল এহন ধান তোলার টাইম , চাল বানানোর কাজ , এহন বাচ্চা নিয়া যাবে না , তুই প্যাট সাফ কইরে আয় । আমার শাউড়ি আমারে নিয়ে খুলনা গেল , ভর্তি করে দেলো কিলিনিকি ।
তোমার শাউড়ি কোয়ানে গেল ?
সে ভর্তি করায়ে লঞ্চে কইরে বাড়ি চইলে আলো ।
আমি অবাক হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম তুমি একা ছিলে ?
হয় একা । রাত্তিরি আমার অপারেশন কইরে পরদিন ছাইড়ে দেলো বিকেলে । চিনি না জানি না টাউনির কিছু । হাইটে লঞ্চ ঘাটে ।
আরও অবাক হয়ে বললাম তোমার রিকশা খরচ দেয়নি ?
না । শাউড়ি কলো ম্যালা খরচ হয়ে গেল , বাজার ঘাট কম করতি হবে।
ঘাটের লোকরা বলল লঞ্চ রাত দুটোয় ছাড়বে । আমি মহিলা কেবিনি শুয়ে ছিলাম । আমি ছেলেটার হাত পা ধরে অনুরোদ করলাম , কলাম আমার অপারেশন অইছে , আমার সেলাই দিয়া , তাও শোনলো না । সেলাই কাইটে ম্যালা রক্ত পড়িছে , আমার কাছে যে বস্ত্র ছেলো তাই দিয়ে মুছিছি ।
এবার আমি চুপ করে এক রাশ যন্ত্রনা নিয়ে কুয়াশার দিকে তাকিয়ে রইলাম ।
ওকে নাম জিজ্ঞেস করলাম , বলল সুলেখা দাস ।
নিজে থেকেই বলতে থাকল এহন আমার কি অবে ? জানাজানি হলি ঘরে জায়গা অবেনানে ।
আমি বললাম কেন বাপের বাড়ি !
সুলেখা বলল হিন্দু বিবাহিতা নারীর বাপের বাড়ি থাহে না , স্বামীর বাড়ি জায়গা না হলি গলায় দড়ি ছাড়া উপায় নেই ।
এবার সুলেখার দুচোখ বেয়ে জলের ধারা নামলো ।
আমার ডান দিকে সারেঙের কেবিনের সামনে একটা হৈচৈ শুনে উঠে গেলাম । একটা যুবক , কম বয়েসি কান ধরে হাঁটু গেড়ে বসা । তার সামনে দাড়িয়ে চারজন বয়স্ক লোক । একজন আমাকে আর বন্ধুকে দেখে যুবককে গালাগাল শুরু করল । তারপর জুতা দিয়ে মার । আট দশ ঘায়ে শুয়ে পড়ল বেচারা । এই সেই রাত্রি বেলার ধর্ষক । এখন তার বিচার চলছে । চলে এলাম সুলেখার দিকে । সুলেখা জলের দিকে তাকিয়ে ধুসর চোখে দেখছে তার ভবিষ্যৎ । বললাম দেখলেনা ওকে মারছে ? হতাশ সুলেখা আমায় জবাব দিল ওসব নাটক দেখে আমার সন্মান ফিরে পাব না ।
ঘণ্টা বাজল লঞ্চের । লাউডুব এসে গেছে । সামনের লোকগুলো সুলেখাকে বলল ছেলেটার ভুল হয়ে গেছে , কি আর করা , এই নাও বলে দশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিল । সুলেখা টাকা ছুড়ে দিয়ে বলল আমার ইজ্জতের দাম দশ টাকা! টাকায় ইজ্জত ফেরে না । সুলেখা সিঁড়ি দিয়ে একাকী নেমে গেল । লাউডুবের একমাত্র প্যাসেঞ্জার । সবাই দেখছিল কি খাসা বিচার ! কিন্তু টাকা না নেওয়ার দৃশ্য হতাশ করে দিল সবাইকে । লঞ্চ চলা শুরু করল ঘণ্টা বাজিয়ে । আমি তাকিয়ে সুলেখার চলার পথে , ঝোপ ঝাড়ের আড়ালে সুলেখা হারিয়ে গেল । দাড়িয়ে থাকা লোকদের একজন আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল ওর ভাড়া কিন্তু নেইনি আমরা ।
লঞ্চ মংলা বন্দরমুখী । সামনেই দুখানা বড় জাহাজ দাড়িয়ে । মংলা থেকে জোয়ারের পানি সবেগে খুলনার দিকে ধাবমান । আমি একটি সিগারেট ধরালাম , এক কাপ চা খেতে ইচ্ছে হচ্ছে প্রচণ্ড ।
© শাহ আজিজ
আমার জীবনের সত্যি ঘটনা , প্রতিটি শব্দ সত্যি ।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই অক্টোবর, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

