
সন্ধ্যারাতে যশোর মনিহার পৌছুলাম । বাস দাড়িয়ে । আমি ড্রাইভারের ঠিক পিছনের সিটে । ড্রাইভার জানালা দিয়ে কারো সাথে নিচু স্বরে আলাপ করছে । কথাবার্তা শোনার ইচ্ছা না থাকলেও কিছু শব্দে কান খাড়া হয়ে যায় । ড্রাইভার বলছে ভোরে চিটাগং ছেড়ে ঢাকা গাবতলি এসেছে , টাকা কম মিলেছে । এখন আবার ঢাকা যেতে হলে ২২০০ টাকার নিচে হয় না । নিচের লোকটি বলছে ১৮০০ নিয়া রাজি হইয়া যাও । অবশেষে ২২০০ টাকায় ট্রিপ সেটেল হল । ড্রাইভার নেমে গেল । আরেকজন এসে সিটে বসলো এবং গাড়ি খুলনার দিকে যাত্রা করল । এটা খুবই সাধারন নিয়ম এই রুটে । ড্রাইভার যশোরে এসে বিশ্রাম , গোসল , খাওয়া সারে । খুলনা থেকে এই বাস আবারো রাত ১১টায় শুরু করবে এবং তা যশোর এলে ওই পুরাতন ড্রাইভার আবারো বাসের স্টিয়ারিঙে বসে ঢাকা যাবে । একদিনে এই ড্রাইভার প্রায় চার হাজার টাকা কামাই করবে । কিন্তু ৩৬ জন যাত্রীর জীবন ঝুকিতে থাকবে । বাংলাদেশে ভাল ড্রাইভার নেই । সবাই মধ্যপ্রাচ্যে চাকুরি নিয়ে চলে যায় । বাস চালায় সহকারি ড্রাইভার যাদের ভারী গাড়ির লাইসেন্স নেই । এভাবেই ৩৬ ঘণ্টা একটানা বাস চালালে গাড়ি দুর্ঘটনা অবশ্যম্ভাবী । যা বলছি তা ৬ বছর আগের কথা । আরেকটু পিছিয়ে যাই ১৯৯৮ বা ৯৭ সালে । মংলা থেকে ঢাকা আসছি মাইক্রোবাসে চার বিদেশী সহ । আমরা আগেরদিন এসেছি এবং মিটিং ও পরিদর্শন শেষে আবার বিকালে ঢাকা ফিরছি । রাত ১ টা হবে । আমিন বাজারে একটা ডাইভারশন করেছে একেবারে নিচু দিয়ে গাড়ি আবারো উপরে উঠবে । ড্রাইভারের পাশে আমি । হটাত চমকে উঠলাম গাড়ি ডানে উঠছে না , চকিতে তাকিয়ে দেখি ড্রাইভার ঘুমিয়ে গেছে । পাশ থেকেই স্টিয়ারিং ধরে ডানে ঘুরিয়ে ধরে গাড়ি উপরে উঠালাম । আমার কেনুইএর গুঁতোয় বেচারা জেগে আবার স্টিয়ারিং ধরল । বাদিকে গাড়ি থামিয়ে তাকে পানির বোতল দিলাম এবং বললাম মুখ চোখ ধুয়ে নাও । বিদেশিরা ঘুম ভেঙ্গে উঠে জিজ্ঞাসা করছে কি হয়েছে । আমি আসল তথ্য লুকিয়ে বললাম ওর একটু রিলাক্স দরকার , বিড়ি খাবে , তাজা হোক একটু । আমরা আবারো নিশ্চিত ভাবে বনানী চলে এলাম । এই বিদেশিরা ড্রাইভারকে যথেষ্ট বিশ্রামের সুযোগ দেয়নি গতকাল থেকে । ড্রাইভার গেল রাতে না ঘুমিয়ে খুলনাতে তার পরিচিতজনের সাথে আড্ডা মেরেছি , পরে জেনেছি । কেন সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে এবং যাত্রী মারা যায় তার দুটো কারন এখানে দেখালাম । প্রায় সব বাস ড্রাইভার হাল্কা লাইসেন্সে বড় গাড়ি চালায় , রাতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয় না , বাড়তি আয়ের লোভ তাদের একটা দুর্ঘটনার দিকে ধাবিত করে এবং বাংলাদেশের একটা সাধারন চিত্র এটি ।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ডিসেম্বর, ২০২০ দুপুর ১:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


