
আমাদের কিষানরা ফাল্গুন মাসে বড় গহনার নৌকায় ধান নিয়ে খুলনা আসত । এরপর ধানের বস্তা শ্রমিকরা ঠেলা গাড়িতে করে এনে আমাদের গোলায় উঠাতো । ওইদিন সন্ধ্যায় আমাদের কিষান দুজন বই দেখতে যেত । বই খুলনার স্থানীয় ভাষা । সিনেমার সরল অর্থ বই । ৬০ দশকে তিনটি সিনেমা হলের একটিতে রহিম বাদশা- রুপবান ধরনের সিনেমা চলত । এরা সন্ধ্যার শোতে ঢুকে রাত ৯টায় বাসায় ফিরত । এরপর রাতে একেবারে সামনের ঘরে দুজন গল্প করত আমার সাথে । যেসব কাহিনী বলত তা আমার মাথায় ঢুকত না । আমি সিনেমার বড় ব্যানার দেখি কিন্তু মৌলভি সাহেবের ছেলে তাই বই দেখতে গেলে ইজ্জত থাকেনা বলেই এসব প্রসঙ্গ উঠত না । ওরা পরদিন খালি নৌকা নিয়ে ফেরত যাবে । কিষানদের মাতবর হামিদ ভাই থেকে যেত । হামিদ ভাই আবার পরদিন বই দেখত । বাবার খুব প্রিয় মানুষ হামিদ । বই দেখার বিষয় আমার চতুর বাবা মৌলভি সাহেব বুঝতেন কিন্তু কেন তিনি কিছু বলতেন না আমার মাথায় আসত না । প্রতি বছর এমনটি হতো । বাবা হামিদের সাথে ফিস ফিস করে কিছু গোপন কথা বলতেন । তিনি গ্রামের বিষয়আশয় নিয়ে কথা বলতেন । আমার বোন বলত আমার বড় ভাই কি পরিমান ধান ক্ষেতেই বিক্রি করেছে তার হিসাব নিত । তিনি খুব বেপরোয়া ছিলেন । ট্রেনে কলকাতা যেতেন বই দেখতে । সারা দিন তিনটি বই দেখে রাতের ট্রেনে খুলনা আসতেন । গ্রামে রটে যেত কি কি বই দেখা হল আর বাকিরা সবাই সন্ধ্যার আসরে বসে হুক্কা টানত আর হামিদের জবানীতে বইএর পুরো কাহিনী শুনত । দুঃখের জায়গা বয়ানের সময় এক দুজন কেঁদে ফেলত । ধান উঠলে এদের অনেকেই সাহস করে খুলনা আসত বই দেখতে । তারা রাতে বই দেখে লঞ্চ ঘাটে ঘুমাত । ভোরের লঞ্চে আবার গ্রামে ফিরত । বড় সাহেব মানে আমার বড় ভাইয়ের কলকাতা গিয়ে বই দেখার কাহিনী চাউর হতো এবং সুচিত্রা সেন বা আমাদের কবরীকে গ্রামের মহিলারা মুখস্ত করে ফেলত ।
৬৭ সালে কোরবানির বা ইদের পরে আমার মা জননী আমার হাতে তিনটি টাকা দিলেন এবং বললেন পার্কের পাশে যে সিনেমা হল আছে সেখানে গিয়ে সিনেমা দেখবে এবং টিকেট এনে আমাকে দেবে , অন্য সিনেমা হলে একদম না । আমরা দুভাই জামা ভাজ করে বালিশের নিচে দিলাম যাতে ক্রিজ পড়ে । দুপুরে খেয়েই দৌড় । তিন টাকার মধ্যে সিনেমা , রিকশাভাড়া আর বাদাম খরচ । রিকশা ভাড়া কুড়ি পয়সা , সিনেমা ১০ আনা আর বাদাম কুড়ি পয়সা । আমরা হলে ঢুকেই একদম সামনের সারিতে বসলাম । টর্চ ওয়ালা লোক এসে বলল এখানে না , আরও পিছনে তোমাদের সিট । সিনেমা শুরু হল । নায়ক নায়িকা কিসসু নেই খালি হাজি সাহেবরা ছুটা ছুটি করছে কাবা ঘর ঘিরে । ভীষণ বেদনাহত আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম । ধাক্কায় উঠে গেলাম । একজন বলছে বাকি ঘুম বাসায় গিয়ে ঘুমাইও , সিট ছাড়ো । আমার ছোটটি বলল সে এখানে আরেকটু ঘুমাবে । টেনে হিঁচড়ে ভিড় ভেঙ্গে বেরিয়ে এলাম । বাসায় মার হাতে টিকেট সমর্পণ । রাতে খাবার সময় মেঝ ভাই জিজ্ঞেস করলেন কি সিনেমা দেখলি ? মন খারাপ করে বললাম খানা এ খোদা । তিনি হাসতে হাসতে বললেন আমি পাকিস্তানী সিনেমা দেখেছি । হাড় জ্বলে গেল । তিনি এও জানালেন আমাদের সিনেমা হলের সামনে থেকে মানুষের ফেলে যাওয়া টিকিটের অংশ বাবাকে বুঝ দিয়েছে । খাওয়া বন্ধ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম ।
জীবন বড়ই বেদনার ।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে ডিসেম্বর, ২০২০ রাত ৮:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


