somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শাহ সাহেবের ডায়রি ।। সুন্দরবন থেকে ভেসে আসা বীজে জন্মেছে বিশাল কেওড়া বন

২৭ শে আগস্ট, ২০২৫ সকাল ১১:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




খুলনার উপকূলীয় কয়রা উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে শাকবাড়িয়া ও কয়রা নদী। এই দুটি নদী পেরোলেই চোখজুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবন। নদীপারের গ্রামের পথে হেঁটে গেলে চোখে পড়ে চরের ওপর সারি সারি কেওড়াগাছ। মনে হয়, যেন ওপারের সুন্দরবনের এক ছায়া নেমে এসেছে এপারেও। পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলে আছে ডুমুরের মতো সবুজ কেওড়া ফল।

সম্প্রতি শাকবাড়িয়া নদীর তীরে গিয়ে দেখা হয় কয়রার পাথরখালী গ্রামের বাসিন্দা আবুল হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এপারের চরের গাছগুলোন কিন্তু আমাগের লাগানো না। ওপারের সুন্দরবন থেইকে জোয়ারে ভাইসে আসা কেওড়ার ফল চরে আটকে গাছ হইছে। এখন দেখেন, পুরো চরে কেওড়া বন। গাছের ফলগুলান আরও মাসখানেক পাওয়া যাবে।’





আবুল হাসানের কথা শেষ না হতেই তাঁর পাশ থেকে কথা ধরলেন ষাটোর্ধ্ব রাজিয়া বেগম। বললেন, ‘এই কেওড়া বনডা হইছে আইলার পর, ২০০৯ সালে। তার আগে চরে এমন কিচ্ছু ছিল না। এখন দেখেন কেমন থোকা থোকা ফল ধইরে আছে গাছে। এই কেওড়া ফল আমরা খাই, বাচ্চারাও খায়। কেউ লবণ মেখে কাঁচা খায়, কেউ রন্না করে। আবার অনেকে আচার-চাটনি বানায়। খাইলে টক টক লাগে, কিন্তু দারুণ মজা।’

রাজিয়া বেগমের মুখে গল্প শুনে কয়রা নদীর তীরবর্তী মহেশ্বরীপুর গ্রামে গিয়ে দেখা আবদুল হাকিম ও আমিরুল ইসলামের সঙ্গে। তাঁরা জেলে। তাঁদের সঙ্গে ছোট ডিঙিনৌকায় উঠেন এই প্রতিবেদক। তাঁরা বলেন, এখন সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা চলছে। তবে সুন্দরবন ও লোকালয়ের মাঝখানে বয়ে চলা নদীতে চলাচলে বাধা নেই। নৌকায় সুন্দরবনের কিনারা ঘেঁষে এগোতেই চোখে পড়ে কেওড়ার সবুজ বন, গাছের ডালে থোকা থোকা ফল। নদীর হালকা স্রোত আর পাখির কিচিরমিচির, যেন অপার্থিব সেই মুহূর্ত। বৈঠা বাইতে বাইতে আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা কেওড়ার ডাল রান্না করে খাই। আবার এই কেওড়া সেদ্ধ করে বড়শিতে গেঁথে মাছ ধরি, বড় পাঙাশ পর্যন্ত উঠে আসে।’ পাশ থেকে হাকিম হেসে বলেন, ‘এই ফল শুধু আমরা না, সুন্দরবনের হরিণ আর বানরও খায়। বানর গাছে উঠে ফল পাড়ে, পাতা ছিঁড়ে ফেলে। হরিণ নিচে দাঁড়িয়ে সেই পাতা খায়। তাদের একটা বোঝাপড়া আছে। যখন বাঘ আসে, বানর চিৎকার দিয়ে হরিণকে সাবধান করে।’

নৌকা যখন কেওড়া বনের কিনারায় পৌঁছে, দেখা যায়, এক গাছে কয়েকটি বানর কেওড়া খেতে ব্যস্ত। মানুষের দল দেখে লাফিয়ে গহিন জঙ্গলে পালিয়ে যায়। জেলেরা জানালেন, সুন্দরবনের মধুর একটি বড় অংশ আসে কেওড়ার ফুল থেকে। শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন মাস পর্যন্ত বনে কেওড়ার ফল পাওয়া যায়।

ফিরে এসে লোকালয়ের বাজার দেখা গেল কেওড়ায় ভরপুর। প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ টাকায়। দোকানি জাফর মোল্লা বলেন, আগে কেওড়া ফল বাজারে খুব একটা বিক্রি হতো না, এখন অনেকেই খোঁজ করেন।কেওড়া ফল শুধু স্বাদে নয়, স্বাস্থ্যগুণেও ভরপুর। উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সদস্যসচিব মো. সাইফুল ইসলাম জানান, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, কেওড়া ফল ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল, ডায়রিয়া, এমনকি ক্যানসার প্রতিরোধে কার্যকর। এতে থাকা উপাদান খাদ্য ও প্রসাধনী শিল্পে ব্যবহৃত হয়, যা সাধারণত বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তাঁর মতে, নদীর চরের জমিতে বাণিজ্যিকভাবে কেওড়ার চাষ শুরু হলে উপকূলের মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে।

তবে কেওড়ার এই সবুজ বিস্তারে যেমন সম্ভাবনা আছে, তেমনি আছে নিয়মের বেড়াজালও। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, সুন্দরবনের ভেতরের কেওড়াগাছ থেকে ফল সংগ্রহ করা আইনত দণ্ডনীয়। তবে চরের জমিতে, বিশেষ করে লোকালয়ে যদি বাণিজ্যিক চাষ হয়; তাহলে তা পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় অর্থনীতির জন্য দারুণ সুফল বয়ে আনবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে আগস্ট, ২০২৫ সকাল ১১:৫৫
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমরা যেন পারষ্পরিক সম্মান আর ভালোবাসায় বাঁচি....

লিখেছেন জানা, ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৪২



প্রিয় ব্লগার,

শুভেচ্ছা। প্রায় বছর দুয়েক হতে চললো, আমি সর্বশেষ আপনাদের সাথে এখানে কথা বলেছি। এর মধ্যে কতবার ভেবেছি, চলমান কঠিন সব চিকিৎসার ফলে একটা আনন্দের খবর পেলে এখানে সবার সাথে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বালাদেশের নির্বাচনী দৌড়ে বিএনপি–জামায়াত-এনসিপি সম্ভাব্য আসন হিসাবের চিত্র: আমার অনুমান

লিখেছেন তরুন ইউসুফ, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:২৩



বিভিন্ন জনমত জরিপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রবণতা এবং মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক তৎপরতা বিশ্লেষণ করে ৩০০ আসনের সংসদে শেষ পর্যন্ত কে কতটি আসন পেতে পারে তার একটি আনুমানিক চিত্র তৈরি করেছি। এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম পরে, আগে আল্লাহ্‌কে মনে রাখো

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৫:৩৭

প্রিয় শাইয়্যান,
পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্‌কে তুমি যখন সবার আগে স্থান দিবে, তখন কি হবে জানো? আল্লাহ্‌ও তোমাকে সবার আগে স্থান দিবেন। আল্লাহ্‌ যদি তোমার সহায় হোন, তোমার আর চিন্তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনঃ কেন আমি বিএনপিকে ভোট দিবো?

লিখেছেন ভুয়া মফিজ, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:২৯



আসছে ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সরকারপক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই নির্বাচন হবে বিতর্কমুক্ত এবং উৎসবমুখর পরিবেশে। আমার অবশ্য এই দুই ব্যপারেই দ্বিমত... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘বাঙালি মুসলমানের মন’ - আবারও পড়লাম!

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আহমদ ছফা'র ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইটা আরাম করে পড়ার মতো না। এটা এমন এক আয়না, যেটা সামনে ধরলে মুখ সুন্দর দেখাবে- এমন আশা নিয়ে গেলে হতাশ হবেন। ছফা এখানে প্রশংসা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×