বেশ কিছুদিন ধরে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নির্বিচারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে হত্যা, নির্যাতন এবং সহিংসতা অব্যাহত রেখেছে। ১৯৮২ সাল থেকেই মিয়ানমারের সেনা শাসকগোষ্ঠী রোহিঙ্গা মুসলিমদের সাথে অমানবিক আচারন করছে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তাদের লেখাপড়া এবং চিকিৎসার মতন মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
রোহিঙ্গারা মূলত প্রাচীন আরকান রাজ্যের অধিবাসী হলেই বর্তমানে তাদের অধিকাংশই সেনাবাহিনী আর বৌদ্ধদের নির্যাতনে মিয়ানমার ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। এখন মাত্র ৮ লক্ষ রোহিঙ্গা মিয়ানমারে রয়েছে অথচ প্রতিবেশি দেশ বাংলাদেশে বৈধ ও অবৈধ ভাবে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় দশ লক্ষ ছাড়িয়েছে বলে ধারনা করা হয়। এ ছারাও রোহিঙ্গারা পাকিস্তান, মালায়শিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভারত এমনকি সৌদিআরবে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
এবার মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের বাঙ্গালী সন্ত্রাসী বলে তাদের দেশ থেকে সম্পূর্ণরুপে নির্মূল করতে চাচ্ছে। এক্ষেত্রে তাদের অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করছে আরেক মুসলিম হত্যাকারী দেশ ইসরাইল। মিয়ানমারে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের দাবিতে ইসরাইলের হাইকোর্টে আর্জি জানানো হলেও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে অস্বীকার করেছে দেশটির প্রশাসন।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধদের জুলুম-নির্যাতন থেকে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসাতে গিয়ে প্রায়ই নাফ নদীতে নৌকা ডুবে মারা যাচ্ছে রোহিঙ্গারা। এ পর্যন্ত নাফ নদী থেকে ৫৭ জন রোহিঙ্গার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) হিসাব অনুযায়ী, রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সহিংসতা শুরুর পর প্রতিদিন শত শত রোহিঙ্গা মুসলিম মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। গত এক সপ্তাহে প্রায় পৌনে এক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
এর মধ্যে মিয়ানমারের হেলিকপ্টার তিন দফায় বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে এবং বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরে মিয়ানমার পুলিশ গুলি ছুড়েছে, স্থানীয়রা গুলির খোসা উদ্ধার করে বিজিবি ক্যাম্পে জমা দিয়েছে। বিজিবি মহাপরিচালক এসব ঘটনার করা জবাব দিতে বিজিবিকে নির্দেশ দিয়েছে, অন্যদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রানালয় থেকে মিয়ানমারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে!
এদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দিতে আহব্বান জানিয়েছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন বাংলাদেশে আগত রোহিঙ্গাদের খরচ তার দেশ বহন করবে। তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সাথে এ বিষয়ে টেলিফোন আলাপ করেছেন। এছাড়াও তুর্কি প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘের সাধারন পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন।তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদ যেন কোন ভাবে যুক্ত হতে না পারে সে চেষ্টা চালাচ্ছে মিয়ানমারের প্রধান আশ্রয়দাতা রাষ্ট্র চীন!!
মিয়ানমার সেনাবাহিনী সেদেশের কথিত 'আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি'র (আরসা) সদস্যদের ধরিয়ে দিতে স্থানীয় মুসলিমদের সহযোগিতা চেয়েছে। অথচ এই আরসার জন্ম হয়েছে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর নির্যাতনের কারনেই। যেমনটা বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্ম হয়েছিল পাক সেনাবাহিনীর বুলেটের জবাব দিতেই। মিয়ানমার সরকার স্বীকার করছে যে, গত কয়েকদিনের সহিংসতার সময় দেশটির রাখাইন রাজ্যে ২,৬২৫টি ঘর-বাড়ি পোড়ানো হয়েছে। এজন্য সরকার কথিত আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি বা আরসা-কে দায়ী করেছে।
যে মুহূর্তে ঈদের আমেজ চলেছে সারা মুসলিম বিশ্বে তখন রোহিঙ্গারা জীবন বাঁচাতে ছুটছে নিজ জন্মভূমি ছেড়ে। কথায় কথায় মানবাধিকারের দোহাই দেওয়া দেশগুলো রোহিঙ্গাদের জন্য মানাবাধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলছে না! রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায় মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দেনেসিয়ার জনগনের মধ্যে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং ঘৃণা বাড়ছে। তারা মিয়ানমার সরকারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে আহব্বান জানিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেটনো মারসুডি মিয়ানমার সফর করছেন। তিনি সে দেশের সামরিক বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে দেখা করে এই সংকট সমাধানের আহ্বান জানান।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ‘রোহিঙ্গা মুসলিমদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মৃত্যুর সংখ্যা এবং ব্যাপক ঘরবাড়ি ছেড়ে পালানোর খবর’-এ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক এক বার্তায় ‘মিয়ানমার এবং এ অঞ্চলের কল্যাণের স্বার্থে রোহিঙ্গা ভাইবোনদের গুরুতর দুর্দশার অবসান’-এর আহ্বান জানিয়েছেন।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর বর্বর হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন নিয়ে আলোচনা করেছেন। রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে চলমান হত্যাকাণ্ড ও বর্বর নির্যাতন থেকে রক্ষার সম্ভাব্য উপায় নিয়ে তারা আলোচনা করেন। এর আগে, ইরান ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট একই বিষয়ে আলাপ করেন।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান মিয়ানমারের অসহায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর চলমান হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে সেখানে জাতিগত শুদ্ধি অভিযান বন্ধে পদক্ষেপ নিতে মুসলিম দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। ইরানের ইসলামি সংস্কৃতি ও যোগাযোগ সংস্থা রোহিঙ্গা ইস্যুতে ইরানের অবস্থান তুলে ধরে বিবৃতি প্রকাশ করেছে।
রোহিঙ্গা নির্যাতন ইস্যুতে একমাত্র দেশ হিসেবে মিয়ানমারের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ। হয়ত ৪-৫ লক্ষ জনগোষ্ঠীর অধিকারি দেশটির এই সিদ্ধান্তে তেমন কিছুই আসবে যাবে না। কিন্তু নিঃসন্দেহে এটি রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিবাদ।
মিয়ানমারের মুসলিম অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে জাতিগত শুদ্ধি অভিযানের কড়া নিন্দা জানিয়েছেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বোরিস জনসন। তবে তিনি মিয়ানমারের জনগণকে একতাবদ্ধ করতে এবং রাখাইনের সব সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর সহিংসতা ও নির্যাতন বন্ধ করতে সু চি'কে আহব্বান জানিয়েছেন।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ বিকাল ৩:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



