somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হেড স্যারের আয়না

২০ শে ডিসেম্বর, ২০১৮ বিকাল ৫:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দেউতিরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক রুমের আয়না।

আশ্চর্য, আয়নাটা এখনও আছে! আধ মানুষ সমান সেই আয়নাটা। আমরা বলতাম হেড স্যারের আয়না। হেড স্যারের ঠিক পিছনে একটু উঁচু করে টাঙানো ছিল দেওয়ালে। চার ধার সেগুন কাঠে বাঁধানো, ম্যাড়মেড়ে পালিশ। ওখানে আয়না কেন, কোথা থেকে এল জানি না। জানার ইচ্ছেও হয়নি কোনও দিন। স্যরের ঘরের চেয়ার-টেবিল-আলমারির মতো আয়নাটাও ছিল। ঘণ্টা বাজানো নরেশ মামা চেয়ার-টেবিল ঝাড়ার সময় ওটাকেও পরিষ্কার করত। হেড স্যারের ঘরে ডাক পড়লে যখন গুটিগুটি পায়ে টেবিলের সামনে দাঁড়াতাম, কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত দেখতে পেতাম আয়নায়। যদিও সময়টা তখন ঠিক নিজের রূপ দেখার মতো নয়। হেড স্যারের ‘কল’ বলে কথা। বুকের ধুকপুকুনিটা নিজের কানেই কেমন বেখাপ্পা লাগছে। স্যারের হাতে যদিও মার খাইনি কখনও; কেউ খেয়েছে বলে শুনিনি। কিন্তু ভরাট গলায় যখন সোজা তাকিয়ে বলতেন, ‘শৈলেন, টিফিন আওয়ারে বিজয়দের বাগানে আম পেড়েছিস, ওরা তো তোর নামে কমপ্লেন করেছে… কী রে শৈলেন, চুপ কেন…’। তখন প্রাণপণ চেষ্টা করেও হাঁটুর ঠকঠকানি থামাতে পারতাম না। ঢোঁক গিলে এমন ভাবে মাথা নাড়তাম যার অর্থ ‘হ্যাঁ’, ‘না’ দুটোই হয়।
নাগর অবশ্য বলত, ‘ফোট, ভয়ের কী আছে!’ নাগর চিরকালের বেপরোয়া। হাত দিয়ে হেলে সাপ ধরে, রাতে নারকেল গাছে চুপিচুপি উঠে নারকেল পেড়ে আনে, অঙ্কে তিন, ইংরিজিতে সাত পেলেও মাঠে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট খেলতে চলে যায়। থাকে হেড স্যারের বাড়ির ঠিক পাশে। হেড স্যারকে দাদু বলে। দিদীমা ওকে দিয়ে বাজার থেকে কাঁচালঙ্কা, মুসুর ডাল, পাকা পেঁপে আনায়। দাদু নাকি একটা দুটো জিনিস ঠিক ভুলে যাবেই। দিদীমা তখন বলে, ‘নাগর, ১০ টাকার নুন এনে দে তো ভাই, তোর দাদুকে কত বার করে বললুম… এই লোকটাকে নিয়ে আমার হয়েছে জ্বালা, একটা কথা যদি মনে রাখতে পারে।’
সবই ঠিক। কিন্তু হেড স্যার ভুলে যান বিশ্বাস করি কী করে! যে মানুষটা ভূগোল প্রাঞ্জল ভাবে বুঝিয়ে দেন, বই না দেখে দ্রাঘিমা অধ্যায়টা লাইন বাই লাইন বলে দিতে পারেন তিনি ভুলে যাবেন সামান্য নুন! স্যার নাকি আবার দিদীমাকে ভয়ও পান খুব। আমি বলি, ‘ভ্যাট!’ ‘কী ভ্যাট!’ নাগর একটু উত্তেজিত ভাবে বলে, ‘আজ সকালেই তো দিদীমা কত কথা শোনাল তোমার দ্বারা কিচ্ছু হবে না…… কবে থেকে বলছি একটা টেপা কল বসাও উঠোনে, অত দূর থেকে জল আনতে হয়…। স্যার নাকি তখন চুপচাপ সরষের তেল মাখছিল ঘষে ঘষে, একটা উত্তরও দিতে পারেনি


তার পর থেকে স্যারকে লক্ষ করি খুঁটিয়ে। ব্লাক ব্রাশ করা কাঁচাপাকা চুল, মোটা গোঁফ, পুরু চশমা, চলাফেরা কথা বলায় কোথাও ভয়ের চিহ্নমাত্র নেই। আমরা তো আমরা অন্য স্যারেরা পর্যন্ত কেমন থতিয়ে থাকেন সামনে, ছুটির বেলায় ‘আসছি স্যার’ বলে বাড়ি যান। ওই যে মোহন্ত স্যার, প্রচণ্ড রাগী আর ভীষণ মারকুটে, পান থেকে চুন খসলেই বেতের ঘা, সেই মোহন্ত স্যার পর্যন্ত মাথা নিচু করে কথা বলেন স্যারের সামনে। নাগর বলল, আরে হবেই তো, মোহন্ত স্যার হেড স্যারের ছাত্র, এই ইস্কুলেই পড়েছে যে!
ক্লাস নাইনে ওঠার পরেই, ক্লাসে জ্বলজ্যান্ত তিনটা মেয়ে। ক্লাসটার ভোল বদলে গিয়েছে রাতারাতি। যেমন তেমন জামা প্যান্ট পরে আর ইস্কুলে যাওয়া যায় না। চুল আঁচড়াতে অনেকটা সময় লাগে। মাঝে মাঝেই মেয়ে বেঞ্চের দিকে আড়চোখে তাকাই আর আন্দাজে মাথায় হাত দিয়ে চুল ঠিক করে নিই। আর এমনই কপাল, ঠিক রোল নাম্বার ফিফটি টু-এর সঙ্গে ঠোকাঠুকি হয়ে যায়। রোল নাম্বার ফিফটি-টু মানে বিউটি রায়। ফর্সা রং, কোঁকড়ানো মাথার চুল, আদুরে ঠোঁট, আর ঢুলুঢুলু চোখ। একেবারে সোজা তাকায়। চোখে চোখে ঠোকাঠুকি কেমন যেন একটা মনে হয় নিজেকে। সঙ্গে সঙ্গে পিছনের দেওয়ালটা দেখি। নেহাতই সাদা চুনকাম করা আর পাঁচটা দেওয়ালের মতই দর্শনীয় কিছু নেই, তবুও খুব মনোযোগ দিয়ে দেখি। আর ওই সাদামাটা দেওয়ালই এক দিন হইচই ফেলে দিল খুব। বড় বড় করে লেখা, বিউটি + তুষার । তুষার মানে, কায়দা করে চুল আঁচড়ান, গায়ে সব সময় সেন্টের গন্ধ।কী করে কে জানে, সন্দেহভাজনদের তালিকায় আমার নামটাও ঢুকে গেল। ব্যস, অমনি হেড স্যারের ঘরে ‘কল’। গিয়ে দেখলাম, বিউটি দাঁড়িয়ে আছে সামনে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছে। মাথা নিচু করে দাঁড়ালাম সবাই। মাঝে মাঝে শুধু টুক করে আয়নায় দেখে নিচ্ছি বিউটি কে আর হেড স্যারের গম্ভীর গলা শুনছি ঠিক করে বল কে করেছে… কী রে শৈলেন, চুপ কেন, মনে হচ্ছে তুই জানিস, না হলে সবাইকে কিন্তু টি.সি. করে দেব স্কুল থেকে!
কেউ ধরা পড়ল না, কেউ টি.সি. ও হল না, পল্লবী ছিল আমাদের বিদ্যালয়ের সেরা সুন্দরী আর প্রচণ্ড ডাঁটিয়াল। কোনও ছেলেকেই পাত্তা দিত না। অমলটা কেবল অবুঝের মতো পিছনে পড়ে থাকত। ওটা আবার তোতলা আর ন্যালাখ্যাপা টাইপের। জামার পাঁচটা বোতাম মিনিমাম তিন রকমের, তার মধ্যে একটা আবার নিশ্চিত ভাবেই প্যান্টের। সেই অমল পোশাকআশাকে হঠাৎ ভয়ানক যত্নবান হয়ে উঠল। এক বোতামের ইস্তিরি করা জামা, কোমরে বেল্ট। মুশকিল হচ্ছে কথা বলার সময় চোখ বুজে যেত ওর, আর যথেষ্ট সময় পেলেও কথা শেষ করতে পারত না। তবু বেপরোয়ার মতো কথা বলার চেষ্টা করত পল্লরীর সঙ্গে।
টেনে ওঠার কিছু দিনের মধ্যেই বিয়ে হয়ে গেল পল্লরীর। বর চাকুরী করে। দেখতেও দারুণ। সেই দুঃখেই বোধ হয় বেল্ট বাঁধা ছেড়ে দিল অমল। মুখে অবশ্য ডোন্ট কেয়ার ভাব দেখাত একটা। কিন্তু দেখালে কী হবে, তোতলামিটা বেড়ে গেল আরও।
মাসখানেক পরে আবার ইস্কুলে এল পল্লরী। এত সুন্দরী হয়ে গেছে যে বেশিক্ষণ তাকানো যাচ্ছে না যেন। পল্লরী ক্লাসে ঢুকতেই একেবারে কাঁঠালে মাছি দশা। বাকি মেয়েরা একেবারে ছেঁকে ধরেছে ওকে, তার পর সারাক্ষণ চাপা গলায় গুজগুজ ফিসফাস আর হিহিহিহি…। তুষারের মেয়ে মহলে অবাধ গতিবিধি। বলল, ‘ব্যাপারটা বুঝেছিস, সবাই পল্লরীর কাছে নাইট এক্সপিরিয়েন্স শুনছে।’ নাইট এক্সপিরিয়েন্স কথাটার মধ্যে কেমন একটা নিষিদ্ধ হাতছানি; শুনলে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে যেন!
এই সব প্যাঁচপয়জারের মধ্যেই হুড়মুড় করে এসে গেল টেস্ট পরীক্ষা।

……………………………… দশ বছর পর……………………………

আজ আমার প্রথম দিন। দেউতিরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের পোস্টে আজ জয়েন করেছি। প্রথম দিন বলে একটু তাড়াতাড়িই চলে এসেছি। কেউ আসেনি এখনও। শুধু যে ছেলেটা ঘণ্টা বাজায় সে এসেছে, একটা একটা করে ঘর খুলছে।
আমি সরু বারান্দার দিকে এলাম। এখানেই লুকিয়ে সিগারেট খেয়েছি আমি, তুষার আর নাগর। সে দিনের সেই ধোঁয়া এখনও কিছুটা যেন থেকে গিয়েছে। একটু দূরে সেই কৃষ্ণচূড়ার ফুলের গাছটা একটু বুড়ো হয়ে গিয়েছে। এখানেই দাঁড়িয়ে অমল পল্লরীকে বলেছিল, ‘তোকে মাইরি একদম ভা লো-লো-লো-লো…!’ মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করার আগেই হেসে চলে গিয়েছিল পল্লরী। পরে অমলের কাছে জানতে পারি, ও প্রকৃতপক্ষে ভালোবাসি বলতে চেয়েছিল সে দিন। এই সেই কলতলা, এখানে পা পিছলে পড়ে গিয়ে মাথা ফেটে গিয়েছিল বিউটির । ওই যে সেই ভবনের সামনে নারকেল গাছটা আর নেই , টেস্টের পর অ্যাডমিট কার্ড নিতে এলাম যে দিন, সে দিন একা একা মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে গাছটাকে দেখতাম আর মনে হচ্ছিল, এই ইস্কুলে আজই শেষ দিন…।
হেড স্যারের ঘরে ঢুকলাম আমি, অনেক কিছু বদলে গিয়েছে। চেয়ার-টেবিল ঝকঝকে, নতুন স্টিলের আলমারি। কিন্তু আশ্চর্য; আয়নাটা এখনও আছে। সেই আয়না। সেগুন কাঠে বাঁধানো আধ মানুষ সমান সেই আয়নাটা। ধুলো পড়ে একটু কালচে হয়ে গিয়েছে পালিশ।
একটু একটু করে এগিয়ে গেলাম। দাঁড়ালাম আয়নাটার সামনে। আয়নার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলাম খুব। ভেতরে একটা বাচ্চা ছেলে দাঁড়িয়ে। তাকিয়ে দেখছে আমার দিকে। দেউতিরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সেই শৈলেন নামের ছেলেটা। গায়ে সে দিনেই সেই আধ ময়লা সুতির শার্ট, ইস্তিরি বিহীন প্যান্ট। মিটমিট করে হাসছে, আর দেখছে আমায়। ভীষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি আমি………………।

সর্বশেষ এডিট : ২০ শে ডিসেম্বর, ২০১৮ বিকাল ৫:০৯
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিশুতোষ কবিতাঃ মিষ্টি খাবো

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৭:৩৬




"মিষ্টি খাবো, মণ্ডা খাবো"—
বায়না ধরলো খোকা।
"চেঁচাস নে আর, বড্ড জ্বালাস,
তোর যে দাঁতে পোকা!"

খোকা বলে, "কোথায় পোকা?
দেখি না তো চোখে!
মাঝে মাঝে ব্যথা তবে
ওঠে থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসুন দেখে আসি, রাজাকার, লালবদর,ছাত্রদল ও শিবিরের উত্তরাধিকারীরা পাকিস্তানে কেমন আছে‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৮:০১



কেমন আছে পাকিস্তানে বসবাসরত ৪০ লক্ষ বাঙালী?

১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে দাড়িয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিচার করার হুঙ্কার দিলেন। পাকিস্তানে বসে তখন খুনি জুলফিকার আলী... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাবতে পারি না

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:১৪


আমি ভাবতে পারি না মধ্য রাতের চাঁদ
আমি ভাবতে পারি না স্নিগ্ধ ভোরের স্নান
মধ্য দুপুরের সূর্য তাপ, সন্ধ্যার ক্লান্তি মুখ!
আমাকে ডেকে নিয়ে যায় ঘাসফড়িং কিংবা
জোনাকির ঘরপোড়া দল- শান্তির সংগ্রামে
দাঁড়িয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

পতাকার যুদ্ধ অথবা গামছা ও কালিমা

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:৪০

একটি দেশের পতাকা শুধু কাপড় নয়। এটা একটি চুক্তি—আমরা কে, এই প্রশ্নের সম্মিলিত উত্তর। বাংলাদেশের পতাকার রং লাল-সবুজ। লাল মানে রক্ত, সবুজ মানে মাটি। এই দুটি রঙের পেছনে একটি নির্দিষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

কি করে কি করি, কি যে করি !

লিখেছেন মেহবুবা, ১৪ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:০৫




আজ বেশ ক'দিন হোল আমার ব্লগবাড়িতে জ্বীন ভূতের কারসাজি চলছে! আধা পৃষ্ঠা জুড়ে কয়েকটি পোষ্ট আসছে, সব আসছে না।নিজ ব্লগবাড়িতে কত কি আয়োজন থাকে ; যেমন মন্তব্য,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×