somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সত্যপথিক শাইয়্যান
অন্যদের সেভাবেই দেখি, নিজেকে যেভাবে দেখতে চাই। যারা জীবনকে উপভোগ করতে চান, আমি তাঁদের একজন। সহজ-সরল চিন্তা-ভাবনা করার চেষ্টা করি। আর, খুব ভালো আইডিয়া দিতে পারি।

সৌদি আরব তেল ও হজ্ব পর্যটন খাত থেকে আসা অর্থের উপর 'নির্ভরশীল' দেশ নয়!

০৫ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



"সৌদি আরব তেল ও হজ্ব পর্যটন খাত থেকে আসা অর্থের উপর নির্ভরশীল" - সৌদি আরবের অর্থনীতি এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের দূরদর্শী পরিকল্পনা "ভিশন ২০৩০" সম্পর্কে প্রচলিত এই ধারণাটি বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সম্পূর্ণ সেকেলে এবং ভুল। সত্য এটিই যে, সৌদি আরব যুগ যুগ ধরে তেল এবং হজ-ওমরার আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু "ভিশন ২০৩০" এর মূল লক্ষ্যই হলো দেশকে এই দুটি উৎসের বাইরে নিয়ে গিয়ে একটি বহুমুখী, আধুনিক ও স্বনির্ভর বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রে পরিণত করা। নিচে সাম্প্রতিক অফিশিয়াল ডাটা, অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান এবং বাস্তব উদাহরণের সাহায্যে একটি গভীর বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:

নন-অয়েল জিডিপি (Non-Oil GDP) এর ঐতিহাসিক রেকর্ড

সৌদি আরবের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে তাদের অ-তেল খাতের (Non-Oil Sector) নজিরবিহীন বৃদ্ধিতে। সৌদি জেনারেল অথরিটি ফর স্ট্যাটিস্টিকস (GASTAT)-এর সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবের মোট জিডিপিতে অ-তেল খাতের অবদান এখন ৫০% ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে যেখানে বৈশ্বিক তেল উৎপাদন কমানোর কারণে সৌদির তেল খাতের প্রবৃদ্ধি মন্থর ছিল, সেখানে দেশটির নন-অয়েল জিডিপি গড়ে ৪.৫% থেকে ৫% হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ, তেল বিক্রি না হলেও সৌদির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে শুরু করেছে।

পিআইএফ (PIF): তেলের টাকা ছাড়াই বিশাল ফান্ডের উৎস

অনেকে মনে করেন ভিশন ২০৩০-এর মেগা প্রজেক্টগুলো (যেমন: নিওম সিটি, দ্য লাইন, লোহিত সাগর প্রকল্প) সরাসরি তেলের মুনাফা দিয়ে চালানো হচ্ছে। এই ধারণাটি ভুল। এই প্রকল্পগুলোর প্রধান অর্থায়নকারী হলো পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (PIF), যা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সার্বভৌম তহবিল।

অ্যাসেট ভলিউম: বর্তমানে পিআইএফ-এর পরিচালনাধীন সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৯২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

স্বনির্ভর বিনিয়োগ ব্যবস্থা:
পিআইএফ এখন আর কেবল তেলের উদ্বৃত্ত টাকা জমায় না। এই ফান্ডটি বিশ্বজুড়ে উবার, লুসিড মোটরস, নিনটেনডো, ব্ল্যাকস্টোন এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্লাব ও গলফ লিগে বড় বিনিয়োগ করে বিলিয়ন ডলার ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ আয় করছে। তাছাড়া, রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি 'আরামকো'-র শেয়ার আন্তর্জাতিক শেয়ার বাজারে বিক্রি করে যে ট্রিলিয়ন ডলার উঠে এসেছে, তা পিআইএফ-এর মাধ্যমে টেকসই আবাসন ও খনিজ খাতে পুনর্বিনিয়োগ করা হচ্ছে।



খনিজ ও মাইনিং খাত: সৌদির নতুন "স্বর্ণ খনি"

তেলের বাইরে সৌদি আরব এখন তাদের বিশাল প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ উত্তোলনে মনোযোগ দিয়েছে। সৌদির শিল্প ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাটির নিচে আনুমানিক ২.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের অব্যবহৃত খনিজ সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিপুল পরিমাণ সোনা, তামা, ফসফেট, দস্তা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সবচেয়ে মূল্যবান উপাদান লিথিয়াম ও রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস (Rare Earth Elements)। বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV) এবং মাইক্রোচিপ শিল্পের জন্য এই খনিজগুলো অপরিহার্য। সৌদির লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে মাইনিং খাতকে দেশের অর্থনীতির তৃতীয় বৃহত্তম স্তম্ভে পরিণত করা, যা তেলকে ছাড়াই অর্থনীতি সচল রাখবে।

লজিস্টিকস, ম্যানুফ্যাকচারিং এবং এভিয়েশন হাব

সৌদি আরব এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থিত। এই ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে তারা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের কেন্দ্র হতে চায়।

রিয়াদ এয়ার: ২০২৩ সালে চালু হওয়া এই নতুন আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাটি ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ১০০টিরও বেশি গন্তব্যে সংযোগ তৈরি করবে, যা দুবাইয়ের 'এমিরেটস' বা 'কাতার এয়ারওয়েজ'-এর মতো ট্রানজিট ও এভিয়েশন খাত থেকে বিলিয়ন ডলার আয় নিশ্চিত করবে।

রিয়াদ ইকোনমিক জোন এবং অটোমোবাইল শিল্প: সৌদিতে এখন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান 'লুসিড' এবং সৌদির নিজস্ব ব্র্যান্ড 'সিয়ার' (Ceer) গাড়ি উৎপাদন শুরু করেছে। এছাড়াও গ্লোবাল টেক জায়ান্ট যেমন - গুগল, মাইক্রোসফট ও অ্যামাজন সৌদিতে তাদের আঞ্চলিক ক্লাউড ডেটা সেন্টার স্থাপন করেছে, যা থেকে বিশাল অঙ্কের কর রাজস্ব আসছে।




হজ্বের টাকা কি সৌদির চালিকাশক্তি? (ভুল ধারণার অবসান)

অনেকের মাঝে একটি বড় ভুল ধারণা রয়েছে যে, মুসলিমদের হজের টাকা দিয়ে সৌদির রাষ্ট্র চলে। অর্থনৈতিক ডাটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সৌদির বিশাল অর্থনীতিতে হজের আয়ের অংশ অত্যন্ত নূন্যতম।

সৌদি আরবের বার্ষিক জিডিপি প্রায় ১ ট্রিলিয়ন (১,০০০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার।
করোনা মহামারীর আগে স্বাভাবিক সময়ে হজ ও ওমরাহ খাত থেকে সৌদির বার্ষিক আয় হতো মাত্র ১২ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, সৌদির মোট অর্থনীতির মাত্র ১.২% থেকে ১.৫% আসে ধর্মীয় পর্যটন থেকে। ভিশন ২০৩০-এর আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে ওমরাহ যাত্রীর সংখ্যা বছরে ৩ কোটিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে, যার ফলে এই আয় হয়তো ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। কিন্তু ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে ৩০ বিলিয়ন ডলার কখনোই প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে না। এই আয় মূলত স্থানীয় মক্কা-মদিনার হোটেল, পরিবহন ও খুচরা ব্যবসার উন্নয়ন ঘটায়, পুরো দেশের বাজেট এর ওপর নির্ভর করে না।

ট্যাক্স ও অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংস্কার
মাও বা ডেং যেমন চীনের কর কাঠামো সংস্কার করেছিলেন, সৌদি আরবও তাদের অর্থনীতিতে কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করেছে। অতীতে সৌদিতে কোনো কর ছিল না। কিন্তু বর্তমানে ১৫% ভ্যাট (VAT) এবং করপোরেট ট্যাক্স চালুর মাধ্যমে তেল-বহির্ভূত অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪-২০২৫ সালের বাজেট অনুযায়ী, সৌদির অ-তেল খাতের কর রাজস্ব অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে, যা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এবং অভ্যন্তরীণ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে স্বয়ংসম্পূর্ণ।


"তেল ও হজের টাকা ছাড়া সৌদি চলবে না" - এই বক্তব্যটি সত্তর বা আশির দশকের জন্য সত্য হলেও ২০২৬ সালের আধুনিক সৌদির জন্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মোহাম্মদ বিন সালমানের নীতি মূলত জাপানের 'ইয়োশিদা ডকট্রিন' বা চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের মতোই বাস্তবমুখী। তারা তেলের ক্ষয়িষ্ণু যুগের আগেই নিজেদের সম্পদকে প্রযুক্তি, বৈশ্বিক বিনিয়োগ, খনিজ উত্তোলন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে রূপান্তর করে ফেলেছেন। ফলস্বরূপ, আগামী দিনে তেলের বৈশ্বিক চাহিদা শেষ হয়ে গেলেও সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে টিকে থাকার সব পরিকাঠামো ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে।

তথ্যসূত্রঃ
১) General Authority for Statistics (GASTAT), Saudi Arabia
২) Saudi Vision 2030 Official Portal
৩) Ministry of Industry and Mineral Resources, Saudi Arabia
৪) International Monetary Fund (IMF) - Saudi Arabia Country Reports
৫) The World Bank - Gulf Economic Monitor
৬) Public Investment Fund (PIF) Official Reports & Global SWF Data
৭) Bloomberg & Reuters (Energy and Economy Sections)
৮) The Economist Intelligence Unit (EIU)ঃ সৌদির ধর্মীয় পর্যটন (হজ ও ওমরাহ) এবং এর জিডিপি অনুপাত নিয়ে ইআইইউ-এর বিশেষ অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিবেদন, যা প্রমাণ করে যে সৌদির সামগ্রিক বাজেটে হজের আর্থিক অবদান মাত্র ১.৫% এর কাছাকাছি।



সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:৪২
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সৌদি আরব যেভাবে বিশ্বের ধনী দেশগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে একটি অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হলো

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ সকাল ৭:২২



সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর এবং দ্রুততম ঘটনা। বিশ শতকের প্রথমার্ধেও যে দেশটি ছিল মূলত যাযাবর বেদুইন, পশুপালন এবং সীমিত হজের আয়ের ওপর নির্ভরশীল একটি চরম... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘ছুটি’র স্মৃতি

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৫০

(প্রায় দু’মাস আগে লেখা। তখন গ্রীষ্মকাল হলেও ঢাকায় কয়েকদিন পরপর বৃষ্টি হতো। এখনকার মত “ঘাম ঝরে দরদর” ধরণের গরম ছিল না। রাতগুলো তুলনামূলকভাবে বেশ ঠাণ্ডা থাকতো।)

আজ খুব ভোরে (শেষরাতে)... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে কারণে এবারের বিশ্বকাপও আর্জেন্টিনার ঘরেই উঠবে B-)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৪



কারণ আর্জেন্টিনা দুর্দান্ত, মেসি-মার্তিনেজরা অপ্রতিরোধ্য। আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত এই বিশ্বকাপের সবগুলো ম্যাচেই একছত্র আধিপত্য দেখিয়ে জয়লাভ করে প্রবল বেগে ফাইনালের দিকে ধ্বাবিত হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে গতবারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

হোমিওপ্যাথি হচ্ছে একটি ধাপ্পাবাজ কিবিরাজি চিকিৎসা পদ্ধতি এর বৈজ্ঞানীক কোন ভিত্তি নেই

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১:০৪



হোমিওপ্যাথি যে একটি ভাঁতাবাজি চিকিৎসা পদ্ধতি তা আমি আগেও জানতাম কিন্তু আমি কখনো এর বিরুদ্ধে কথা বলিনি বা কোথাও কিছু লিখিনি- তবে আজ কি মনে করে চ্যাটজিপিটির কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লবের শরিকরা

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ২:৪১

যারা বিপ্লব আনে, তারা বিপ্লব টেকায় না। যারা বিপ্লব টেকায়, তারা শরিকদের টেকায় না। ১৯৭৯ সালে ইরানে খোমিনি ক্ষমতায় এসেছিল বামদের কাঁধে চড়ে। কমিউনিস্ট, সেকুলার, নারীবাদী—সবাই শাহের বিরুদ্ধে এক কাতারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×