somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তৈলচিত্রের মুখ

২৮ শে নভেম্বর, ২০১৫ বিকাল ৩:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঢাকা ভার্সিটিতে ক্যামিস্ট্রি পেয়েও পড়ল না সে। ভর্তি হলো চারুকলায়। ওর বাবা তো রেগে অস্থির। হেঁড়ে গলার চিৎকারে মাথায় তুলল বাড়ি। মানুষটা ছুতো পেলেই এমন তুলকালাম শুরু করে যে আমারই রাগ লাগে।

আমি কাঁধে আলতো হাত ছুঁইয়ে বললাম, আহা থামো তো, ছেলেটার ছোটবেলা থেকেই তো আঁকাআঁকির দিকে ঝোক। ওকে ওর উপরই ছেড়ে দাও।
বলতেই আমার উপর হুমড়ি খেলো সে।
— তুমি চুপ করো। আস্কারা দিয়ে দিয়ে তুমিই নষ্ট করেছো ওকে।
— তোমাকে কে বলল ও নষ্ট হয়েছে?
— হয়নি তো কী? সারাদিন এতো ঘোরাঘুরি কিসের? বাইরে কোথায় কী করে না-করে তার খোঁজ রাখো?
— তাই বলে সারাক্ষণ পুলিশের মত লেগে থাকতে হবে পিছে? তোমার এই পুলিশি স্বভাব যাবে না আর। সব কিছুতেই সন্দেহ!

চার বছর হল মানুষটা পুলিশের ইউনিফর্ম ছেড়েছে। কিন্তু অভ্যাস ছাড়েনি তাকে। এখনো যাকে-তাকে আসামীর মত সন্দেহ, জেরা…। প্রশাসন বিভাগে চাকুরিজীবীদের এই এক প্রোব্লেম। প্রফেশন লাইফ আর পারসোনাল লাইফ গুলিয়ে ফেলে সব।

ছেলেকে আমি আদর করে ‘বাবুই’ বলে ডাকি। দিনরাত আমার ভাবনার ভেতরে ‘বাবুইটা’ টইটই করে উড়ে বেড়ায়। আমি স্বপ্ন দেখি, দেশের বড় বড় আর্টিস্টদের মত বাবুইয়ের মাথায়ও ছুঁয়ে যাচ্ছে আকাশ। মেদুর মেঘগুলো পেজা তুলোর মত জড়িয়ে যাচ্ছে ঝাকড়া চুলে। মানুষ মাথা উঁচু করে তাকাচ্ছে ওর মুখে। গ্যালারি ঘুরে দেখছে ওর আঁকা সারি সারি রঙ-বেরঙের ছবি। ওর তুলির ছোঁয়া নিয়ে বইমেলায় প্রজাপতির মত উড়ে বেড়াচ্ছে রকমারি সব প্রচ্ছদ… আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি এসব। দেখতে দেখতে এক সময় স্বপ্নের মধ্যেই মাথা গুঁজে ঘুমিয়ে পড়ি।

আর্মি স্টেডিয়ামে চলছে আজ চতুর্থ দিনের উচ্চাঙ্গ লহরী। মৃদঙ্গ-ঘটমের তালে মিশে যাচ্ছে বেহালা বিহাগ। নৃত্যশৈলীতে দুলছে কুয়াশার মিহিন পর্দা, সুরের উৎসব।
আমার খুব ইচ্ছে দর্শক গ্যালারির একদম সামনের সারিতে বসে উচ্চাঙ্গ শুনি। মানুষটাকে এতো আহ্লাদ করে বললাম নিয়ে যেতে, নিল না। একদম কাঠখোট্টা। হাত ভরে ঘুষ নিতে নিতে বৌয়ের হাত ধরাও ভুলে গেছে।

রাতের চ্যানেলগুলো ঘুরছে মন খারাপে। ভারতীয় সিরিয়াল দেখার বাজে অভ্যাস আমার নেই। বাংলাদেশের সব চ্যানেলেই কাইয়ুম চৌধুরীর মৃত্যু সংবাদ দেখাচ্ছে। আমি স্থির চোখে দেখছি। আহা, জীবন এঁকে এঁকে আজ তুলিতে তুলে নিলেন মৃত্যুর রঙ…শেষ কথাটি কী বলতে চেয়েছিলেন তিনি?

নিশুতি রাত চেপে বসেছে জানালায়। মানুষটা বেঘোরে ঘুমোচ্ছে পাশেই। আমার ঘুম এক্কাদোক্কা। বাবুইয়ের রুমে এখনো আলো। ছেলেটা এতো রাতেও কি ছবি আঁকছে? নিজের রুমটাকেই আর্টের হোমগ্যালারি বানিয়ে নিয়েছে সে। সারাদিন ওখানেই রঙ নিয়ে খেলা। আমি পায়ে পায়ে ওর রুমের দরজায় এলাম। ঘর ভর্তি ছোট বড় ছবি সাজানো। টেবিলের উপরে ছড়ানো তুলি। সব কিছুতেই মন খারাপের রঙ।
প্যাস্টেলওয়েলে একটা অর্ধেক আঁকা মুখের ক্যানভাসের সামনে হাটু মুড়ে বসে এক মনে তুলির আঁচড় টানছে বাবুই। এতোটা মনযোগী যে আমার উপস্থিতিও টের পেল না।

আমি দাঁড়িয়ে দেখছি, তুলির ছোঁয়ায় একটু একটু করে জীবিতদের মত জেগে উঠছে তৈলচিত্রের মুখ। খুব চেনা। আত্মার মত আপন। হঠাৎ মনে হল, এটাই তো আমার বাবুই! না না… মুখটা হাসছে। কী সুন্দর করে হাসছেন কাইয়ুম চৌধুরী!

(উৎসর্গ: শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। গতকাল ছিল তার প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে থাকুন তিনি। হাজারও কাইয়ুম চৌধুরীর জন্ম হোক এই বাংলায়।)
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে নভেম্বর, ২০১৫ ভোর ৬:৫২
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সে আমার দিকে তাকিয়েছিল || একটা রোমান্টিক গান

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৪ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৪

সে আমার দিকে তাকিয়েছিল
ওওও
বহুবার সে তাকিয়েছিল
আমি ভাবতে চেয়েছি
আমাকে তার ভালো লেগেছিল



সে দেখতে এতটা সুন্দরী
তার উপমা যেন সে নিজেই
মাঝে মাঝে অধরে তার ফুটছিল হাসি
মুগ্ধতায় আমি হারিয়েছিলাম খেই
তখন মিহিসুতোর মতো বৃষ্টিরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

=কিছু গোপন ব্যথা রেখে দিলাম অন্তরে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৩



আমার হয়ে থাকুক কিছু
মন কুঠুরির আড়াল হয়ে
দুঃখগুলো যাক না নিরব
একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।

বাড়ুক ব্যথা বুকের গহীন
কেউ না জানুক গোপন থাকুক
ব্যথার কাঁপন উঠুক না হয়;
হেলা বুকে কষ্ট আঁকুক।

যাক না এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ সময়ের ব্যবধানে তারা দুজন

লিখেছেন সামিয়া, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৩



কোর্টের সামনের চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। দুপুরের রোদটা তখন কিছুটা নরম হয়েছে। মানুষের ভিড়, আইনজীবীদের কালো কোট, চায়ের দোকানের ধোঁয়া আর ফাইল হাতে ছুটে চলা লোকজন মিলে জায়গাটা যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মের অবমাননা রুখতে গিয়ে নিজের ধর্মকেই ছোট করছেন না তো?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৫


সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ধর্ম অবমাননার আবার একটা ঘটনা ঘটলো। ২৩ জুন ২০২৬। প্রিন্স রায় দীপ্ত নামের পঁচিশ বছরের একটা ছেলে নবীজিকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ তাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারতীয় মুসলিমদের অসহনীয় জীবন

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৫ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:১৫


পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার সুপুরডিহি গ্রামের ঠেলাগাড়িতে বাসনপত্র বিক্রেতা দরিদ্র মুসলিম আকবর ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানধারী জঙ্গি হিন্দুদের হাতে প্রাণ দিলেন, আর মুক্তি পেলেন অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার হাত থেকে। পুরুলিয়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×