somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মা তোমার জন্য একটা চিঠি :|

১৭ ই ডিসেম্বর, ২০১১ বিকাল ৫:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

| ১৭ ডিসেম্বর ২০১১
| খাগড়াছড়ি
মা,

আসসালামুয়ালাইকুম। তখন ছিল শীতকাল, প্রচুর ঠান্ডা । হাড় কাঁপানো শীত । সহ্য করতে না পেরে আমি কাঁদতাম, তুমি তোমার বুকের ওম দিয়ে আমাকে রক্ষা করতে, শীতের হাত থেকে বাঁচাতে । ক্ষুধা পেলে চিৎকার করা কাঁদতাম, হাজার কাজ থাকলেও সব কিছি ফেলে ছুটে এসে আমাকে খাবার দিতে । রাতে কতবার যে বিছানা ভিজিয়ে দিয়েছি, নিজের ঘুম হারাম করে আমার কাপড় বদলে দিতে............

একটু বড় হলাম যখন, আমাকে হাতে ধরে হাঁটা শেখালে । যখন হাঁটাচলা করতে শিখলাম, সবসময় নজরে রাখতে যেন হাঁটতে হাঁটতে পুকুরে গিয়ে পড়ে না যাই। কোথাও হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে দৌড়ে এসে কলে তুলে নিতে আর আমার কান্না থামানোর ব্যাবস্থা করতে । একবার বারান্দায় রাখা গরম ছাইয়ে পা দিয়ে পা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, তুমি পা ভালো না হওয়া না পর্যন্ত আমাকে হাঁটতে দাওনি (খালার কাছে থেকে শোনা), সবসময় কোলে করে রেখেছিলে। আমার কান্নার আওয়াজ শুনলে তোমার কলিজাটা ধক করে উঠতো, আমার কিছু হল ভেবে ........

আর একটু বড় যখন হলাম, পুকুরে নিয়ে গিয়ে নিজের হাতে ধরে সাঁতার কাটা শেখালে, যেন পানিতে না ডুবে যাই, আজকে আমি অনেক ভাল সাঁতার কাটতে পারি । আমার সমস্ত কাজ তুমি করে দিতে নিজের কাজে পাশাপাশি । একবার এক আইস্ক্রিম ওয়ালা আমাকে ফ্রীতে একটা আইসস্ক্রিম দিয়েছিল তার ছেলের নামে সাথে আমার নাম মেলে যেই জন্য । তুমি শুনে আমাকে ভবিষ্যতে আইস্ক্রিম নিতে বারণ করে দিয়েছিলে, অই লোকটাকে ছেলেধরা সন্দেহে, আমাকে বাঁচানোর জন্য .........

একবার কি যেন একটা ভুল করেছিলাম, যার জন্য যেই তুমি আমাকে কখোনো একটা টোকাও দাওনি, সেই তুমি আমাকে বেদম মেরেছিলে । শেষ পর্যন্ত আমার কান্না দেখে লাঠি ফেলে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে তুমি কেঁদেছিলে আর বলেছিলে “ এমন কাজ করিস কেন যার জন্য তোর ওপর আমার হাত উঠাতে হয় ??? যেটা আমার একদম ইচ্ছা করেনা ” :(( :(( বিশ্বাস করো তারপর থেকে এমন কাজ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখতাম যা তোমাকে কষ্ট দেয় ............

যখন একটু বুঝতে শিখলাম, বুঝলাম তোমার শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে। কত দোয়া করেছি যেন আমার সবকিছুর বিনিময়ে তোমার অসুখ যেন আল্লাহ ভালো করে দেন । শীত আসলেই আমি উদ্বিগ্ন থাকতাম, কারন শীতে তোমার অসুখ বেড়ে যেত, তুমি অভয় দিয়ে বলতে, “চিন্তা কোরোনা, আমার কিচ্ছু হবেনা” । আমার যদি ক্ষমতা থাকতো তাহলে তোমাকে আর এক মুহুর্তও এই কষ্ট পেতে হতোনা .........

যখন আমি নানির বাড়ি থাকতাম, প্রতি বুধবার আব্বুর হাতে কিছুনা কিছু পাঠিয়ে দিতে আমাকে খাওয়ানোর জন্য.........
মাধ্যমিক পরিক্ষার ফলাফল যেদিন দেয় সেদিন তুমি অনেক দোয়া করেছিলে। আমি বাসা থেকে বের হবার সময় ১০ টাকা আমার হাতে গুঁজে দিয়েছিলে । যার ৮ টাকাই চলে যায় যাতায়াত খরচে । বাকি দুইটাকা দিয়ে দুইটা চকলেট কিনেছিলাম একটা আব্বুর জন্য, আরেকটা তোমার জন্য । ফলাফল নিয়ে বাসায় এসে দেখি তুমি যায়নামাযে বসে আছ । আমি যখন আমার ফলাফল জানালাম আর চকলেট টা তোমার মুখে তুলে দিলাম, খুশিতে তুমি কেঁদে দিয়েছিলে । আমার জীবনের স্মরনীয় ঘটনা কেউ শুনতে চাইলে আমি এই ঘটনার কথাই বলি । আমার চাকুরির মৌখিক পরিক্ষাতেও একই কথা বলেছিলাম ।:)

মাধ্যমিক শেষে যখন পড়ালেখা করার জন্য বাসা ছেড়ে রাজশাহির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম অনেক উপদেশ দিলে। কিভাবে চলব, কি কথা বলব সব । মাঝে মাঝে যখন ছুটিতে বাড়ি ফিরতাম তোমার হাঁসিমাখা মুখ দেখে খুব ভালো লাগত, আবার যখন ছুটি শেষ হয়ে আসতো তোমার মুখ আবার কালো হয়ে যেত । সারাক্ষন দুশ্চিন্তা করতে, কোথায় থাকি, কি খাই এই সব । ............

উচ্চমাধ্যমিক এর পর যখন রাজশাহি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলাম, তোমার মুখে খুশির ঝিলিক দেখেছিলাম আরেকবার । তোমার আর আব্বুর উতসাহেই সামরিক বাহিনীতে আসার মত সাহস দেখিয়েছিলাম । যেদিন ISSB তে GREEN CARD পেলাম সেই সংবাদ পাবার পর তোমার মুখে তৃতীয় বারের মত খুশির ঝিলিক দেখেছিলাম ............
যেদিন BMA এর উদ্দেশ্যে রওনা দেই সেদিন তোমার যে ব্যাথা ভরা মুখ দেখেছিলাম সেটার পুনঃরাবৃত্তি ঘটেছিল BMA তে 1ST TERM এর ৭ম সপ্তাহে হওয়া “অভিভাবক দিবসে”, যখন তোমরা আমাকে রেখে BMA ছেড়ে চলে যাচ্ছিলে । :( :(

আর যেদিন পাসিং আউট হলো সেদিনের কথা কি আর বলবো ??? রাজ্যের সব সুখ শুধু তোমার আর আব্বুর মুখেই দেখেছিলাম, খুব ভালো লাগছিল এই ভেবে যে তোমাদের স্বপ্ন পুরন করতে পেরেছি ।
****** মা আমাকে দোয়া করো যেন তোমাদের এই হাসি চিরদিন ধরে রাখতে পারি, আমার কোন কাজের কারনে যেন এই হাসি মলিন না হয়ে যায় । ******* দোয়া কোরো মা ।


তোমার ছেলে
শামস



(গত কয়েকদিন অনেক ব্যাস্ত ছিলাম । এক মায়ের জন্মদিন ছিল গত ১৬ই ডিসেম্বর, আমার দেশ মাতা । সেই উপলক্ষ্যে যত ব্যাস্ততা । কত কিছু করলাম । কত অনুষ্ঠান, কত আয়োজন, কত কিছু । কিন্তু তার পরের দিনই যে আমার প্রিয় মানুষ, আমার জন্মদাত্রি মায়ের জন্মদিন ছিল তা আমার জানা ছিলনা। অনেকদিন চেষ্টা করেছি কিন্তু কোনভাবে জানতে পারিনি । আমার ছোট ভাই সেটা পেরেছে , নানির বাসার পুরাতন একটা খাতায় সবার জন্মের দিন তারিখ লেখা আছে । সেটা সে বের করেছে খুঁজে ।
গতকাল রাতে ২ টায় যখন অপারেশন থেকে রুমে ফিরলাম আমার মোবাইলে মেসেজ আসলো। আমার ছোট ভাই দিয়েছে “ আজকে আম্মুর জন্মদিন :) B-) B-) ” রাত দুইটায় আর কল করলামনা। সকালে উঠেই প্রথম কাজ ছিল সেটা করে ফেললাম :D:D। আম্মুকে শুভ জন্মদিন বললাম। বাসায় থাকলে অনেক কিছু করতে পারতাম, কিন্তু করতে পারছিনা । যদি বেঁচে থাকি পরবর্তি বছরে মাকে আমিই আগে শুভেচ্ছা জানাবো। দোয়া করবেন সবাই আমার মায়ের জন্য, আমার জন্য আমার বাবার জন্য এবং আমার ভাইয়ের জন্য )









সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০১১ বিকাল ৫:১০
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×