| খাগড়াছড়ি
মা,
আসসালামুয়ালাইকুম। তখন ছিল শীতকাল, প্রচুর ঠান্ডা । হাড় কাঁপানো শীত । সহ্য করতে না পেরে আমি কাঁদতাম, তুমি তোমার বুকের ওম দিয়ে আমাকে রক্ষা করতে, শীতের হাত থেকে বাঁচাতে । ক্ষুধা পেলে চিৎকার করা কাঁদতাম, হাজার কাজ থাকলেও সব কিছি ফেলে ছুটে এসে আমাকে খাবার দিতে । রাতে কতবার যে বিছানা ভিজিয়ে দিয়েছি, নিজের ঘুম হারাম করে আমার কাপড় বদলে দিতে............
একটু বড় হলাম যখন, আমাকে হাতে ধরে হাঁটা শেখালে । যখন হাঁটাচলা করতে শিখলাম, সবসময় নজরে রাখতে যেন হাঁটতে হাঁটতে পুকুরে গিয়ে পড়ে না যাই। কোথাও হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে দৌড়ে এসে কলে তুলে নিতে আর আমার কান্না থামানোর ব্যাবস্থা করতে । একবার বারান্দায় রাখা গরম ছাইয়ে পা দিয়ে পা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, তুমি পা ভালো না হওয়া না পর্যন্ত আমাকে হাঁটতে দাওনি (খালার কাছে থেকে শোনা), সবসময় কোলে করে রেখেছিলে। আমার কান্নার আওয়াজ শুনলে তোমার কলিজাটা ধক করে উঠতো, আমার কিছু হল ভেবে ........
আর একটু বড় যখন হলাম, পুকুরে নিয়ে গিয়ে নিজের হাতে ধরে সাঁতার কাটা শেখালে, যেন পানিতে না ডুবে যাই, আজকে আমি অনেক ভাল সাঁতার কাটতে পারি । আমার সমস্ত কাজ তুমি করে দিতে নিজের কাজে পাশাপাশি । একবার এক আইস্ক্রিম ওয়ালা আমাকে ফ্রীতে একটা আইসস্ক্রিম দিয়েছিল তার ছেলের নামে সাথে আমার নাম মেলে যেই জন্য । তুমি শুনে আমাকে ভবিষ্যতে আইস্ক্রিম নিতে বারণ করে দিয়েছিলে, অই লোকটাকে ছেলেধরা সন্দেহে, আমাকে বাঁচানোর জন্য .........
একবার কি যেন একটা ভুল করেছিলাম, যার জন্য যেই তুমি আমাকে কখোনো একটা টোকাও দাওনি, সেই তুমি আমাকে বেদম মেরেছিলে । শেষ পর্যন্ত আমার কান্না দেখে লাঠি ফেলে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে তুমি কেঁদেছিলে আর বলেছিলে “ এমন কাজ করিস কেন যার জন্য তোর ওপর আমার হাত উঠাতে হয় ??? যেটা আমার একদম ইচ্ছা করেনা ”
যখন একটু বুঝতে শিখলাম, বুঝলাম তোমার শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে। কত দোয়া করেছি যেন আমার সবকিছুর বিনিময়ে তোমার অসুখ যেন আল্লাহ ভালো করে দেন । শীত আসলেই আমি উদ্বিগ্ন থাকতাম, কারন শীতে তোমার অসুখ বেড়ে যেত, তুমি অভয় দিয়ে বলতে, “চিন্তা কোরোনা, আমার কিচ্ছু হবেনা” । আমার যদি ক্ষমতা থাকতো তাহলে তোমাকে আর এক মুহুর্তও এই কষ্ট পেতে হতোনা .........
যখন আমি নানির বাড়ি থাকতাম, প্রতি বুধবার আব্বুর হাতে কিছুনা কিছু পাঠিয়ে দিতে আমাকে খাওয়ানোর জন্য.........
মাধ্যমিক পরিক্ষার ফলাফল যেদিন দেয় সেদিন তুমি অনেক দোয়া করেছিলে। আমি বাসা থেকে বের হবার সময় ১০ টাকা আমার হাতে গুঁজে দিয়েছিলে । যার ৮ টাকাই চলে যায় যাতায়াত খরচে । বাকি দুইটাকা দিয়ে দুইটা চকলেট কিনেছিলাম একটা আব্বুর জন্য, আরেকটা তোমার জন্য । ফলাফল নিয়ে বাসায় এসে দেখি তুমি যায়নামাযে বসে আছ । আমি যখন আমার ফলাফল জানালাম আর চকলেট টা তোমার মুখে তুলে দিলাম, খুশিতে তুমি কেঁদে দিয়েছিলে । আমার জীবনের স্মরনীয় ঘটনা কেউ শুনতে চাইলে আমি এই ঘটনার কথাই বলি । আমার চাকুরির মৌখিক পরিক্ষাতেও একই কথা বলেছিলাম ।
মাধ্যমিক শেষে যখন পড়ালেখা করার জন্য বাসা ছেড়ে রাজশাহির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম অনেক উপদেশ দিলে। কিভাবে চলব, কি কথা বলব সব । মাঝে মাঝে যখন ছুটিতে বাড়ি ফিরতাম তোমার হাঁসিমাখা মুখ দেখে খুব ভালো লাগত, আবার যখন ছুটি শেষ হয়ে আসতো তোমার মুখ আবার কালো হয়ে যেত । সারাক্ষন দুশ্চিন্তা করতে, কোথায় থাকি, কি খাই এই সব । ............
উচ্চমাধ্যমিক এর পর যখন রাজশাহি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলাম, তোমার মুখে খুশির ঝিলিক দেখেছিলাম আরেকবার । তোমার আর আব্বুর উতসাহেই সামরিক বাহিনীতে আসার মত সাহস দেখিয়েছিলাম । যেদিন ISSB তে GREEN CARD পেলাম সেই সংবাদ পাবার পর তোমার মুখে তৃতীয় বারের মত খুশির ঝিলিক দেখেছিলাম ............
যেদিন BMA এর উদ্দেশ্যে রওনা দেই সেদিন তোমার যে ব্যাথা ভরা মুখ দেখেছিলাম সেটার পুনঃরাবৃত্তি ঘটেছিল BMA তে 1ST TERM এর ৭ম সপ্তাহে হওয়া “অভিভাবক দিবসে”, যখন তোমরা আমাকে রেখে BMA ছেড়ে চলে যাচ্ছিলে ।
আর যেদিন পাসিং আউট হলো সেদিনের কথা কি আর বলবো ??? রাজ্যের সব সুখ শুধু তোমার আর আব্বুর মুখেই দেখেছিলাম, খুব ভালো লাগছিল এই ভেবে যে তোমাদের স্বপ্ন পুরন করতে পেরেছি ।
****** মা আমাকে দোয়া করো যেন তোমাদের এই হাসি চিরদিন ধরে রাখতে পারি, আমার কোন কাজের কারনে যেন এই হাসি মলিন না হয়ে যায় । ******* দোয়া কোরো মা ।
তোমার ছেলে
শামস
(গত কয়েকদিন অনেক ব্যাস্ত ছিলাম । এক মায়ের জন্মদিন ছিল গত ১৬ই ডিসেম্বর, আমার দেশ মাতা । সেই উপলক্ষ্যে যত ব্যাস্ততা । কত কিছু করলাম । কত অনুষ্ঠান, কত আয়োজন, কত কিছু । কিন্তু তার পরের দিনই যে আমার প্রিয় মানুষ, আমার জন্মদাত্রি মায়ের জন্মদিন ছিল তা আমার জানা ছিলনা। অনেকদিন চেষ্টা করেছি কিন্তু কোনভাবে জানতে পারিনি । আমার ছোট ভাই সেটা পেরেছে , নানির বাসার পুরাতন একটা খাতায় সবার জন্মের দিন তারিখ লেখা আছে । সেটা সে বের করেছে খুঁজে ।
গতকাল রাতে ২ টায় যখন অপারেশন থেকে রুমে ফিরলাম আমার মোবাইলে মেসেজ আসলো। আমার ছোট ভাই দিয়েছে “ আজকে আম্মুর জন্মদিন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

