somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পরামর্শকেন্দ্র (ছোট গল্প) পর্ব 2

২২ শে মার্চ, ২০০৭ রাত ১২:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যদিও দীর্ঘসময় ও অভিজ্ঞতা উপদেষ্টার উদ্দীপনায় তেমন কোন নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়নি, তবে পরামর্শের পুরো বিষয়টি নি:সন্দেহে পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি পরিশ্রমসাধ্য হয়ে উঠেছে। উপদেষ্টা, এর জন্য সরাসরি দায়ী করেন বিশৃঙখল সমাজ কাঠামোকেই। সারা বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন এত বিভিন্নতাকে বুঝতে পারার চাপটি যে তার গ্রাহকদের অনেককেই বিশৃঙ্খল করে তোলার জন্য যথেষ্ট তা তিনি খুব সহজেই বুঝতে পারেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মহত্ত্ব বহুকাল ধরে প্রতিষ্ঠিত হলেও এখন মানব সেবার যে নতুন পথটিকে তিনি ক্রমাগত দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর করে চলেছেন সেটি হল এই পরামর্শ কেন্দ্র। গত কয়েক দশকেই সেটি প্রায় একটি বিপ্লবের মত ছড়িয়ে পড়েছে, কেবল বড় বড় শহরগুলোতে নয়, পল্লী অঞ্চলগুলোতেও যে এর ছোঁয়া লেগেছে তা তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারেন। আর এটা বুঝতে পেরেই তাঁর উপর আরোপিত দ্বায়িত্বের পরিধি যে ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে সেটি অনুধাবনের আন্তরিক চাপটি তিনি অনুভব করেন। তবে এই মহতী দ্বায়িত্ববোধে তিনি মোটেই বিব্রত বোধ করেন না বরং ঘটে এর ঠিক উল্টোটা; তাঁর উপর আরোপিত দ্বায়িত্ববোধকে তিনি গ্রহণ করেন খেলোয়াড়ী-সুলভ মনোভাব নিয়ে। বোধহয় এই রকম তারুণ্যপূর্ণ দৃঢ় মানসিকতার জন্যই অসংখ্য তরুণ তরুণী, বিশেষত সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ তরুনীরা উপদেষ্টার প্রতি একধরণের তীব্র আকর্ষণ বোধ করে। উপদেষ্টা এই আকর্ষণকেও গ্রহণ করেন স্বভাবজাত শান্ত বুদ্ধি দিয়ে এবং কোন সুন্দরী উদ্ভিন্ন যৌবনা তরুনী বা কোন কোন ক্ষেত্রে বুদ্ধিদীপ্ত কোন তরুনও যে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে উত্তেজিত করে তোলে সে বিষয়টিকে তিনি এড়িয়ে যান না। তাঁর প্রতি তীব্রভাবে আকর্ষণ বোধ করে এমন অনেক তরূণীর সাথে তাঁর ঘনিষ্ট সম্পর্কও রয়েছে। যে বিশেষ দূরদর্শিতা এবং ভারসাম্য প্রবণতা তাঁকে উপদেষ্টার পদে নিযুক্ত করেছে সেটির পূর্ণ সদ্ব্যবহারে তিনি কদাপি পিছপা হন না। এ ধরণের সকল সম্পর্কের ক্ষেত্রেই তিনি যে মৌল নীতিটি সর্বদা অবলম্বন করে চলেন তা হল, "সকল সম্পর্কের শুরু এবং শেষ হয় বন্ধুত্বপূর্ণ সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে"।

এটি হল সেই ভারসাম্যনীতি যা তিনি অর্জন করেছেন জীবনের প্রথম দিককার আপনজন হারানোর কঠোর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার প্রতি তাঁর কোন চাপা ক্ষোভ নেই; এমনকি যুবক বয়সের যে অনুযোগ প্রবণতা তাঁকে সর্বক্ষণ খোঁচাতে থাকত ইদানিং সেটি থেকেও নিজেকে তিনি বিযুক্ত করে তুলেছেন। এক শান্তিময় সৌহার্দ্যপূর্ণ মানবকল্যাণকামীতা এখন তাঁর সমস্ত হৃদয় জুড়ে থাকে। পূর্বে যেসব মহিলার সাথে তিনি ঘনিষ্ট হয়েছিলেন; কোন আকষ্মিক ঘটনায় তাদের কারো সাথে নিবিড় শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন হবার পর তারাও তাঁকে আবিষ্কার করে এক নতুন রূপে। উদ্যাম মিলনের পরিবর্তে তারা উপদেষ্টার নিরন্তর ওঠানামা ও আন্তরিক সংস্পর্শে অনুভব করে একটি কখনো শেষ না হওয়া গতিকে। যা পরিতৃপ্তির সাথে সাথে উচ্চতর কোন অনুভূতিতে মহিলাদের শরীর ও সংবেদনশীলতাকে পরিপূর্ণ করে তোলে। সেসময়টাতেই উপদেষ্টা সবচেয়ে স্পষ্ট বুঝতে পারেন তাঁর সঙ্গীর মনোদৈহিক অনভূতি জগতে ঠিক কি ধরণের খেলা ক্রমাগত ক্রিয়াশীল। সময়ের সাথে সাথে তিনি এই অনুভূতির প্রতি আরো শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠেছেন এবং একবার মাত্র দৃষ্টি দিলেই তিনি তাঁর সঙ্গীর চোখেমুখে দেখতে পান সেই শ্রদ্ধা মেশানো অনুরাগটিকে। খুব নিবিড়ভাবে তিনি তাঁর কর্মময় প্রাজ্ঞ জীবনের সুফলগুলোকে চোখের সামনে স্পষ্ট হতে দেখেন, এবং বুঝতে পারেন এটিই হল সেই দু্যতি যা দীর্ঘদিনের শ্রম আর মেধার সমন্বয়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

ঠিক একই ধরণের শান্তিপূর্ণ ভারসাম্যময় দু্যতি তিনি বোধ করেন পরামর্শকেন্দ্রে আসা কোন গ্রাহকের পরিতৃপ্ত চোখের দিকে তাকিয়ে। ঠিক সেই মুহুর্তে নিজেকে তাঁর কেবল পরামর্শক মনে হয় না, নিজেকে মনে হতে থাকে একজন আলোকিত মানুষ হিসেবে। কিন্তু তখনো তাঁর সদাবিশ্লেষণী সত্তাটি তাঁকে পরিপূর্ণ পরিতৃপ্ত হতে দেয় না বরং আরো দক্ষ ও শাণিত হবার দিকে ধাবিত করে। তিনি বুঝতে পারেন আরো অনেক দূরহ কাজকে সুসম্পন্ন করার জন্যই তাঁর জন্ম হয়েছে এবং আমৃতু্য তাঁকে সেইসব কাজ সম্পাদনের জন্যই চেষ্টা করে যেতে হবে।

উপদেষ্টার আত্মমগ্ন স্বভাবের সাথে পরামর্শকেন্দ্রের কর্মচারীবৃন্দ সকলেই কমবেশি পরিচিত। তারা সেটিকে একটা শ্রদ্ধা মেশানো ভয়ের সাথেই মান্য করে চলে। তবে সেদিন সকালে, পরামর্শ কেন্দ্রে সমপ্রতি যোগদান করা তরুণীটি উপদেষ্টার নিজের মনে অফিস জুড়ে ঘুরে বেড়ানোর বিষয়ে নিজের তীব্র কৌতুহলকে দমন না করতে পেরে বলে, 'স্যার, আপনি কি কিছু খুঁজছেন', একইসাথে নিজের দ্বায়িত্ববোধের প্রমাণ হিসেবেই সে বলে, 'আপনার কফি প্রস্তুত, কফিতে ক'চামচ চিনি দেব ?' উপদেষ্টা তাঁর নিয়মিত আত্মমগ্নতায় বাধগ্রস্থ হয়ে একটু বিরক্ত হন। আসলে তরুণীর প্রশ্নটিকে তিনি প্রথম দফায় বুঝতেই পারেন না এবং অফিসের নিশ্চুপ পরিবেশকে লক্ষ করতে করতে অন্যমনষ্ক স্বরে তুরুণীটিকে আবার প্রশ্নটি করতে অনুরোধ জানান। উপদেষ্টার অন্যমনষ্কতায় কিছুটা বিব্রত বোধ করায় তরুণীটি এবার পরিষ্কার কন্ঠে কেবল কফিতে চিনির পরিমাণের বিষয়টি সম্পর্কে উপদেষ্টাকে জানায়। উপদেষ্টা তাঁর স্বভাবসুলভ মার্জিত আচরণে নিজের চাহিদার কথা তরূণীকে জানায়। তরুণীটি স্বাভাবিকের চাইতে দ্রুত গতিতে, আসলে বাস্তবে যতটা সম্ভব তার চাইতেও দ্রুত গতিতে কফি প্রস্তুত করার জন্য সচেষ্ট হয়। উপদেষ্টা তরুণীটির ত্রস্ত হয়ে ওঠার বিষয়টিকে বুঝতে পারেন। উচ্চতর পদবী এবং বিশ্বজোড়া খ্যাতি মাঝেমাঝে যে তাঁকে তাঁর সহকর্মীদের চাইতে একটা বিশেষ দূরত্বে ঠেলে দেয় তা তিনি অনুভব করেন। কিন্তু অনড় পেশাদ্বারীত্বে কিছু অনিবার্য অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করা যে তাঁর পরামর্শক পেশারই অংশ তা তিনি বুঝতে পারেন। মাঝেমাঝে তিনি যে এমন অনাকাঙ্খিত দূরত্বকে কমিয়ে আনার চেষ্টা করেননি তা নয়, কিন্তু ফলাফল যে সবসময় তাঁর প্রত্যাশামত হবে এমনটি তো কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেনা। তাই এইসব ছোটখাট বিষয়ের প্রতি বেশি মনোযোগী হওয়ার চাইতে তিনি সেদিনের জন্য নির্ধারিত কাজগুলোকে গুছিয়ে নেবার জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে মার্চ, ২০০৭ রাত ১২:২৮
১৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৭



মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭



আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহভঙ্গ!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮



পদ্মা সেতু নিয়ে কত অপবাদই না দেয়া হয়েছিলো! বলা হয়েছিলো- বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প করতে পারবে না। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অথচ শেষ পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×