somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পরামর্শকেন্দ্র (ছোট গল্প) পর্ব 3

২৩ শে মার্চ, ২০০৭ রাত ১:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পরামর্শকেন্দ্র তখনো খালি। কফি খেতে খেতে উপদেষ্টা লক্ষ করলেন নিজের কামরার স্বচ্ছ দেয়ালের ভেতর দিয়ে যতটুকু দেখা যায় অফিসের সেই মাঝারি পরিসরে তরূণীটিকে ছাড়া তখন পর্যন্ত আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না। যদিও তিনি নিশ্চিত জানেন গত দুদিনের সাপ্তাহিক ছুটির রেশ কাটিয়ে পরামর্শ কেন্দ্রটি কিছুক্ষণের মধ্যেই কর্মব্যাস্ত হয়ে উঠবে। নিজের শক্ত চেয়ারটিতে হেলান দিয়ে টেবিলের কম্পিউটারটিতে চোখ বুলিয়ে তিনি সেদিনের সাক্ষাৎকারগুলোর তালিকাটি দেখতে শুরু করেন। দীর্ঘ তালিকার একদম শীর্ষে রয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন গুরত্বপূর্ণ ব্যাক্তি, এরপর এককালের অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন অভিনেত্রীর নাম, দুজন সামরিক কর্মকর্তা, তিনজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এভাবে তালিকার অধিকাংশটা জুড়ে রয়েছেন সমাজের গণ্যমান্য অনেকের নাম। এঁদের মধ্যেই তিনি দেখতে পেলেন এমন একজনের নাম যিনি পরামর্শ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে একসময় সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন। দীর্ঘ তালিকায় এই নামটিকে তিনি কখনো দেখতে পাবেন তা উপদেষ্টা প্রত্যাশা করেননি; তবে একদা সহকর্মীর নামটি দেখে তিনি কিছুটা পুলকিত বোধ করলেন। তাঁর সত্যি সত্যি মনে হল পরামর্শকেন্দ্রের বিষয়টি এবার স্বরূপে আবির্ভূত হয়েছে। এভাবে তালিকার শেষ দিকে এসে তাঁর নজরে পড়ল কয়েকটি অপরিচিত নাম। যদিও এখনকার মত অপরিচিত কয়েকটি নাম; তবে নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি নির্দ্বিধায় বলতে পারেন এদের কারো কারো সাথেই তাঁর ঘনিষ্ট যোগাযোগ হবে এবং হয়ত এদের কারো কল্যাণের জন্যই তিনি আবিষকৃত নতুন পদ্ধতিগুলোর সম্ভাবনা যাচাই করতে পারবেন।

দিকে দিকে পরামর্শ কেন্দ্রের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই উপদেষ্টা লক্ষ করছিলেন যে সমাজের উঁচু তলার অনেকেই তাঁর পরামর্শ কেন্দ্র আর তাঁর বিশেষ রীতি পদ্ধতির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। তিনি এই ক্রমবর্ধমান আগ্রহকে ব্যবহার করেছেন দারূন দক্ষতার সাথে, পরামর্শকেন্দ্রের ধারণার যে বৈশ্বিক বিস্তার সেটির পেছনেও এই আগ্রহের অবদান অনেক। নিন্দুকেরা তাঁর এই পরামর্শকেন্দ্রের ধারণাকে যতই ব্যবসায়িক বলে সমালোচনা করুক না কেন তিনি সবসময়ই এর আর্থিক ও পরিচিতিগত ব্যবহারকে খারাপ চোখে দেখেননি। তাই বলে পরামর্শ কেন্দ্রের মূল উদ্দেশ্যকেও তিনি হারিয়ে যেতে দেননি। একেবারে সাধারণ মানুষের জন্য পরামর্শ কেন্দ্রগুলোর দরজা সবসময়ই উন্মুক্ত, কেননা তিনি বিশ্বাস করেন পরামর্শকেন্দ্রগুলো তৈরী হওয়ার মূল লক্ষ্যই হল আপামর সাধারণ মানুষকে সহযোগীতা করা।

উপদেষ্টা যখন সারাদিনের কর্ম পরিকল্পনাকে মনেমনে গুছিয়ে নিচ্ছেন তখনি সহকারী তরূনীটি এসে খবর দিল যে আজকের তালিকার জনপ্রিয় অভিনেত্রী এইমাত্র বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন যাতে তিনি উপদেষ্টার সাথে সরাসরি বৈঠক করার সুযোগ লাভ করেন এবং তাঁর মূল্যবান পরামর্শ ও সাহায্য পান। সহকারী তরূণীটি টেবিল থেকে কফির মগটা উঠিয়ে নিতে যেয়ে উপদেষ্টাকে আরো জানালো যে অভিনেত্রীর কন্ঠে আগ্রহ ও উদ্বেগের পরিমাণ ছিল লক্ষ্যনীয়। এজাতীয় কেইসগুলো উপদেষ্টা সাধারণত প্রধান পরামর্শকের উপরই ন্যাস্ত করেন, তবে তিনি খোঁজ নিয়ে দেখলেন যে প্রধান পরামর্শক তখনো অফিসে উপস্থিত হননি। অন্যদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিটিও এখন পর্যন্ত যোগাযোগ করেননি। পরামর্শকেন্দ্রের ভারসাম্য ও সুষমবন্টন নীতি অনুযায়ী, প্রতিদিনের তালিকায় উলি্লখিতদের মধ্যে যিনি প্রথম যোগাযোগ করবেন তিনিই প্রথম সাক্ষাৎকারের সুযোগ পাবেন আর এভাবেই ধারাবাহিকভাবে সাক্ষাৎকারের ক্রম রক্ষা হবে। খুবই জরুরী পরিস্থিতি বা অতীব গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছাড়া পরামর্শ কেন্দ্রে কখনো এর ব্যাত্যয় ঘটেনি। উপদেষ্টা এই নিয়ম কঠোরভাবে রক্ষা করার জন্য সবসময় চেষ্টা করেছেন । পরামর্শকেন্দ্রের শুরুর সময়কালের অভিজ্ঞতাকে তিনি এক্ষেত্রে আন্তরিকভাবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন। সেসময় রাস্তার ভবঘুরে থেকে কলকারখানার শ্রমিক সবাই পরামর্শকেন্দ্রের বিষয়টাকে আমোদবিনোদনের একটি কেন্দ্র হিসেবেই ধরে নিয়েছিল। আর এজন্য তিনি তাদের দোষও দেন না; কিন্তু বাস্তবতা হল এই বিপুল সংখ্যক অনাকাঙ্খিত দর্শনার্থীদের চাপে পরামর্শকেন্দ্রটিকে মাঝেমধ্যেই হিমসিম খেতে হত। মূলত ভীর নিয়ন্ত্রনের একটি উপায় হিসেবেই তিনি সাক্ষাৎকারের এই বিশেষ নিয়মটি চালু করেন। কিন্তু সেসময় তিনি ভাবতেও পারেননি যে এই নিয়মটিই শেষ পর্যন্ত পরামর্শকেন্দ্রের পরিচয়জ্ঞাপক অনন্য বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠবে। উপদেষ্টা অবশ্য এর জন্য মোটেই অনুতপ্ত নন; প্রিয় শিক্ষকের নির্দেশনাকে তিনি ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন। কোন প্রতিষ্ঠানকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হলে বিভিন্নমুখী প্রচারকে মোকাবেলা করার দক্ষতাটি থাকা আবশ্যক। তবে মাঝে মাঝে ঘনিষ্ট বন্ধুদের ঠাট্টা মেশানো বিদ্রুপ তাঁকে কষ্ট দেয়, যখন তারা ইদানিংকালে, বিশেষত এই পরামর্শকেন্দ্রে, সাধারণ মানুষের উপস্থিতির ক্রমহ্রাসমান হার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। হয়ত তাঁদের এই বিদ্রুপ খুবই ক্ষণস্থায়ী তবে তা নিশ্চিতভাবে সূক্ষ অনুভূতির উপদেষ্টাকে কিছুক্ষণের জন্য বিচলিত করে তোলে।

এজাতীয় নানান কথা ভাবতে ভাবতে উপদেষ্টা উপলব্ধি করলেন যে আজকের দিনটি তিনি শুরু করতে চান সফল একটি সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে। আসলে সফল পরামর্শের বিষয়টি তাঁর জন্য এখন এতটাই সহজ হয়ে গেছে যে তিনি চাইলেও হয়ত আর অসফল হতে পারবেন না। পরিসংখ্যানও ঠিক একই কথা বলবে; পরামর্শদানের বিষয়টিকে তিনি এতটাই নিখূঁত করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন যে, সারা বিশ্বজুড়ে পরামর্শকেন্দ্রের মাধমে উপকৃত হয়েছেন এমন মানুষদের সরাসরি জরিপে দেখা গেছে সফলতার হার প্রায় একশতভাগ। কিন্তু তারপরও নিন্দুকেরা নানা কথা বলে, নিন্দা করা আর গুজব ছড়ানো ব্যাতীত আর কোন কাজটাই বা তারা ঠিকঠাকমত করতে পারে । আর যেটুক নিন্দা হয় সেটিরও কারণ হল বাকী সেইসব নগণ্য ক্ষুদ্র অংশ যারা যুদ্ধের বা অন্যান্য কারণে পরামর্শকেন্দ্রের প্রকৃত সুবিধাটা নিতে পারছেন না। কিন্তু পৃথিবী জোড়া সামাজিক বিশৃঙ্খলার জন্য তো তাঁকে দায়ী করা যায় না। আসলে কেউ চাইলেও তাকে দায়ী করতে পারবে না কেননা পরামর্শকেন্দ্র তো পৃথিবীর সবখানেই মোটামুটি ছড়িয়ে গেছে, আর মানুষেরও উচিৎ নিজেকে সাহায্য করার বিষয়ে সচেতন হওয়া। তবে এরপরও তিনি সেই ক্ষুদ্র অংশের জন্য একধরণের মমত্ব বোধ করেন, নিজের বিচক্ষণতা আর ভারসাম্য রক্ষার তাগিদেই তিনি অচিরেই শতভাগ মানুষকে ছুঁতে পারার গৌরবটি অর্জন করতে চান।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে মার্চ, ২০০৭ রাত ১২:২৫
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

গরীবের বউ সবার ভাবি

লিখেছেন অপলক , ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:০২



৩৬ জুলাই আন্দোলনের পর অনেক আশায় ছিলাম। আশার গুড়ে বালি। তত্বাবধায়ক সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক গভর্ণর ড. আহসান এইচ মনসুর বুদ্ধিদীপ্ত প্ররিশ্রম করে ২০২৬ জানুয়ারীতে রিজার্ভে রেখে গেছেন ৩৫... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন থেকে যারা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসেন এখন তাদেরকে আওয়ামী লীগের প্রয়োজন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



ক্ষমতায় গেলে কোন দল যাদেরকে মনে রাখে না ক্ষমতায় গেলে তাদেরকেই তারা সবচেয়ে বেশী মিস করে। সেই নিখাঁদ দল প্রেমিকদেরকে এখন আওয়ামী লীগ খুঁজছে। তারা লগি বৈঠা নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ই আগস্ট ছিলো আরো একটি ১৫/২১শে আগষ্টের অপচেষ্টা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



২১শে আগস্ট পালন করা অর্থে , আমার কাছে মনে হচ্ছে আবারো জঘন্য কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কারন আমরা ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×