somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পরামর্শকেন্দ্র (ছোট গল্প) পর্ব 5

২৫ শে মার্চ, ২০০৭ রাত ১:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

উপদেষ্টা যখন তাঁর শিক্ষকের তৈলচিত্রটির দিকে তাকিয়ে এসব কথা ভাবছিলেন তখন অফিস সহকারী তরুণীটি এসে খবর দিল যে অভিনেত্রী আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পরামর্শকেন্দ্রে এসে পেঁৗছাবেন, এছাড়া অনিচ্ছাকৃত দেরীর জন্যও তিনি বারবার ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। উপদেষ্টা অভিনেত্রীর আগমন বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে অফিস সহকারীকে সাক্ষাৎকার কক্ষটি তদারকি করার নির্দেশ দিলেন। তবে নির্দেশ পাবার সাথে সাথেই তরুণীটি চলে গেল না, উপদেষ্টা লক্ষ্য করলেন যে তরুণীটি হয়ত কিছু বলতে চাইছে। তিনি জিগ্গাসু দৃষ্টি নিয়ে তার দিকে তাকাতেই সে সকালে তাঁকে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করল। এবার চট করে সকালের ঘটনাটি মনে পড়লেও, মনেমনে তিনি বেশ লজ্জিত হলেন এবং যে বুদ্ধিদীপ্ত সারল্য তাঁর কর্মক্ষমতাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে, সেটিকে কয়েকগুনে বাড়িয়ে বললেন, 'আমি তো বিষয়টিকে এভাবে মনেই করিনা, আর বিরক্ত হবার প্রশ্নই ওঠেনা, কৌতুহল একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়।' অত্যন্ত বিবেচক মানুষেরর মত কথাগুলো বলার পরপরই উপদেষ্টার মনে হল, এবার তিনি একটি সফল সাক্ষাৎকারের জন্য সত্যিই প্রস্তুত। তরুনীটি মনোযোগ দিয়ে উপদেষ্টার কথাগুলো শুনল এবং কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে একটি সি্নগ্ধ হাসি উপদেষ্টাকে উপহার দিয়ে গেল। তুরুণীটির হাসির রেশ ধরেই মানুষের চিন্তাজগৎ বিষয়ক একটি সহজ উপলব্ধির কথা তাঁর মনে হল, আশ্বস্ত এবং নিরাপদ বোধ করা মানুষের একটি মৌলিক চাহিদা। নিশ্চিতভাবেই এই মুহুর্তে তরুণীটি তাঁর প্রতি একধরণের আকর্ষণ বোধ করেছে আর এজন্যই সে তাঁর মনোযোগ আকর্ষনের চেষ্টাও করছে। কিন্তু আকর্ষণটি ঠিক কোন জাতীয় সেটাকে বুঝতে পারাই এখন তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সহজাত প্রজ্ঞায় তিনি তখনি কোন সিদ্ধান্ত নিতে চাইলেন না, বিষয়টিকে তিনি আরো খানিকটা সময় দিতে মনস্থির করলেন। আকর্ষণবোধের নানা ধরণকে জানতে তিনি আগ্রহী ঠিকই কিন্তু যে কোন ধরণের তীব্রতার প্রতি তাঁর স্পষ্ট ঘৃণা রয়েছে। বিশেষত আবেগের তীব্রতা মাত্রই বিচারবোধের ভারসাম্যকে নষ্ট করে।

অতীতের কর্মব্যস্ত দিনগুলির পর এখন; বিশেষত জীবনের একটি বড় অংশ অতিক্রম করার পর অভিনেত্রী আর ঠিক সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে পারেন না। তবে আজকে তাকে বেশ একটু সকালেই ঘুম থেকে উঠতে হয়েছে। এর একটি কারণ হল একেবারে সকালেই প্রোডিসারের ফোন এবং পরামর্শকেন্দ্রে সাক্ষাৎকারের পূর্ব নির্ধারিত শিডিউল। নিজের অত্যন্ত কর্মব্যাস্ত সময়েও তিনি কখনো শিডিউলের বাইরে যাননি এবং যথাসম্ভব চেষ্টা করেছেন যাতে ঠিক সময়মত কর্মস্থলে উপস্থিত হতে পারেন, তা সে মঞ্চ হোক বা দূরের কোন লোকেশন। এখন অনেকেই হয়ত অভিনেত্রীকে বিগত যৌবনা বলে তর্ক করতে রাজি হবে আর বাজির দরও সেদিকেই হয়ত বেশি ঝুঁকে থাকবে। কিন্তু অভিনেত্রী কখনোই নিজেকে সেভাবে দেখতে পছন্দ করেন না। হ্যা, একটি বিষয় হয়ত ঠিকই যে তিনি সেভাবে আর কাজের ডাক পান না কিংবা অনেকদিন ধরে কোন প্রধান চরিত্রেও তাঁর অভিনয় করা হয় না। অলস সময়ের সঙ্গী হিসেবে শেষ রাতের নিদ্রাহীনতা তাঁকে মাঝেমাঝে আঁকড়ে ধরে ঠিকই, তবে একথা কোনভাবেই বলা যাবে না যে তিনি বুড়িয়ে গেছেন কিংবা আরো রুঢ়ভাবে বললে ফুরিয়ে গেছেন। তবে কিঞ্চিত জেল্লা হারানো বা একটু মুটিয়ে যাবার বিষয়ে তিনি নিজেও যথেষ্ট অবগত, কিন্তু এটার মানে এই নয় যে তিনি ফুরিয়ে গেছেন বা তাঁকে এখনি আজীবন সম্মাননার জন্য শেষবারের মত স্টেজে উঠে ফুলের মালা গ্রহণ করতে হবে। তিনি হয়ত এখন আর আগের মত নাচতে পারেন না, তবে এর অর্থ নিশ্চয়ই এমন নয় যে প্রোডিউসাররা এবার তার ত্রিমাত্রিক ছবির জন্য দরকষাকষি শুরু করবে। অনেকদিনের কর্মহীনতা থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে সমপ্রতি পৌরাণিক কাহিনী ভিত্তিক এ্যানিমেশন ছবিটিতে কাজ করতে তিনি নিজেকে রাজি করিয়েছেন ঠিকই, তবে দু:খজনক হল সেটিতেও তাঁর ভূমিকা কেবল কন্ঠ ব্যবহারের। পুরো ছবিতেই তাকে তোতাপাখির মত সংলাপ বলে যেতে হবে আর তাঁর ত্রিমাত্রিক ইমেজকে দিয়ে পরিচালক নিজের মত অভিনয় করিয়ে নেবেন। প্রডিউসারের সাথে কথা শেষ করার পরই তাঁর মনে হল, পরিচালক অভিনয়ের এই নতুন মাত্রাটিকে যতই মহিমান্বিত করার চেষ্টা করুক না কেন, ত্রিমাত্রিক ছবি আর তাঁর মত অভিনেত্রী কি একই ব্যাপার !?

অভিনেত্রী পুরো বিষয়টাকে কোনভাবেই মন থেকে মেনে নিতে পারছেন না। পরিচিত অনেক অভিনেতা বন্ধুর কাছেও ইদানিং শুনছেন যে তারাও এমন প্রস্তাব পেয়েছেন আর উদীয়মান নতুনেরা এরই মধ্যে নিজেদের সাইনিং এমাউন্ট বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই সুযোগ বুঝে বুদ্ধিমান প্রোডিউসাররা এবার জনগণের বিনোদনের জন্য এতদিনের পরিচিত কন্ঠ আর ইমেজকে ব্যবহারের জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। অভিনয় জীবনের শেষ দিকে এসে তাঁকে এমন একটা কিছুর মুখোমুখি হতে হবে তা তিনি কল্পনাও করেন নি। অভিনয় মানে তো কেবল চরিত্রের উপস্থাপন নয়, অভিনয় মানে মানুষের বিচিত্র রূচি, অভ্যাস প্রভৃতির মধ্যে ঢুকে যাওয়া, তাদের আবেগ অনুভূতিকে নিজের মধ্যে অনুভব করা এবং পর্দায় বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তোলা। আয়নার দিকে তাকিয়ে এজাতীয় নানান কথা ভাবতে ভাবতে আর নিজের সুন্দর চোখগুলোর রাতজাগা ক্লান্তিকে মেকাপে ঢেকে দিতে দিতে, অভিনেত্রীর মধ্যে একধরণের শূণ্যতা সৃষ্টি হল। ইদানিং প্রায়শই এমন শুণ্যতা তাকে গ্রাস করে ফেলছে, কখনো কখনো এর তীব্রতা এমনি ভয়াবহ হয় যে তিনি ঠিকমত খেতে পারেন না, রাতে ঠিকমত ঘুমাতে পারেন না। সব ধরণের পরিস্থিতিতেই মানিয়ে নেবার যে গুন তার মধ্যে বিদ্যমান ছিল তা যেন হারিয়ে যাচ্ছে, তবে তিনি সবচেয়ে শংকিত বোধ করছেন নিজের আনন্দহীনতার জন্য। অভিনয় সবসময়ই তার কাছে সেই আনন্দের উৎস, কিন্তু সেটিও যদি এমন দূর্লভ হয়ে ওঠে! নিজের হতাশ ও আনন্দহীন জীবন থেকে পরিত্রাণের একরকম শেষ চেষ্টা হিসেবেই তিনি উপদেষ্টার স্মরাণাপন্ন হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নির্মল আনন্দ, জীবনকে অনুভব করা আর আত্মসম্মান বোধ ছাড়া মানুষের জীবনে চাওয়ার আর কিই বা থাকতে পারে। মেকাপ আর সাজপোশাক ঠিক করতে করতে হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকাতেই অভিনেত্রী চমকে উঠলেন। যদিও প্রডিউসারের সাথে আলাপের কারণে খানিকটা দেরী হবার বিষয়টি তিনি পরামর্শকেন্দ্রকে ইতিমধ্যেই অবগত করিয়েছিলেন তবুও আর বিন্দুমাত্র দেরী হোক তিনি তা চাইছিলেন না। এমনিতেই বন্ধুদের মাধ্যমে উপদেষ্টার খুঁতখুঁতে স্বভাবের বিষয়ে তিনি অবহিত ছিলেন। তাই কোনক্রমেই উপদেষ্টাকে আর তিনি অপেক্ষা করাতে চাচ্ছিলেন না; আসলে নিজের সমস্যা থেকে মুক্ত হবার জন্য তিনি খুবই অস্থির হয়ে উঠছিলেন।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৭



মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭



আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহভঙ্গ!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮



পদ্মা সেতু নিয়ে কত অপবাদই না দেয়া হয়েছিলো! বলা হয়েছিলো- বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প করতে পারবে না। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অথচ শেষ পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×