এদিকে অভিনেত্রীর আগমনের বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে উপদেষ্টা এবার নিজেই পরামর্শকেন্দ্রের সাক্ষাৎকার কক্ষের তদারকিতে মনোনিবেশ করলেন। দুদিনের সাপ্তাহিক ছুটির কারণে হয়ত কক্ষটির পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় কিছুটা ঘাটতি থাকতে পারে একথা মনে করে উপদেষ্টা খানিকটা শংকিত হয়ে উঠলেন। সাক্ষাৎকারের সফলতার বিষয়টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সূক্ষ অনেক কিছুর উপর এতটাই নির্ভর করতে পারে যা তিনি কোনভাবেই অফিসের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় নিয়োজিত ব্যাক্তিটিকে বোঝাতে সক্ষম হবেন না। নিজ অভিজ্ঞতা ও মেধা থেকে সাক্ষাৎকারের যে পদ্ধতিকে তিনি প্রায় শিল্পের পর্যায়ে উত্তরণ ঘটিয়েছেন সেটিকে বোঝার জন্য তাঁর সমমানের বা তারচেয়ে বেশি বুদ্ধিমত্তা থাকা আবশ্যক। এটি কোনভাবেই অগোছালো বা নিম্নবুদ্ধির কারো পক্ষে পুরোপুরি অনুধাবন করা সম্ভব নয়। আর ভারসাম্যবোধহীন কারো জন্য বিষয়টির অংশ বিশেষ বুঝতে পারাও পুরোপুরি অসম্ভব একটি বিষয়। পরিচ্ছন্নতা বোধের ধারণা যার মধ্যে দূর্বল নিশ্চিতভাবেই তার মধ্যে উৎকৃষ্ট বিচারবোধ জন্ম নিতে পারেনা। সাক্ষাৎকার কক্ষে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় নিয়োজিত ব্যাক্তিটির কাজ প্রায় শেষ হয়ে আসছিল, তিনি তাঁকে দ্রুত কাজ শেষ করে বেরিয়ে যাবার নির্দেশ দিলেন।
পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় নিয়োজিত ব্যাক্তিটি বেরিয়ে যাবার পরই কেবল, উপদেষ্টা সাক্ষাৎকার কক্ষটিতে প্রবেশ করলেন এবং খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে চললেন। এখানকার সবই তাঁর অতিপরিচিত তবুও সবকিছুকে বারবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে তিনি কখনোই ক্লান্ত বোধ করেন না। হঠাৎ তিনি লক্ষ করলেন যে সাক্ষাৎকার কক্ষের ছোট টেবিলের কোণায় এখনো কিছু ধুঁলো জমে আছে। তিনি তৎক্ষণাৎ নিজের রুমাল দিয়ে সেটি পরিষ্কার করে নিলেন এবং রূমালটিকে কোণায় রাখা ময়লার বাঙ্টিতে ফেলে দিলেন।
পরামর্শকেন্দ্র প্রথম চালু হবার পর সাক্ষাৎকার ঘরটির জন্য যে বিশেষ কোন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন তা কেউই উপলব্ধি করতে পারেনি। এমনকি সেসময়ের প্রধান পরামর্শকও এ ব্যাপারে কোন মনোযোগ দেবার প্রয়োজন মনে করেন নি। কিন্তু উপদেষ্টা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন যে একবিংশ শতকের সাক্ষাৎকার কক্ষটিকে হতে হবে কারিগরিভাবে নিপূণ ও কার্যকরী, আবার একইসাথে গ্রাহকের জন্য স্বস্তি ও আরামের। তাই সাক্ষাৎকার কক্ষটির নির্মাণে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা আর কার্যকরী বিশ্লেষণী প্রতিভাকে সম্পূর্ণ নিযুক্ত করেছিলেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী উপদেষ্টা কক্ষটির নির্মাণে যুক্ত করেছিলেন তাঁর স্থাপত্যকলা বিষয়ক অপরিসীম আগ্রহ ও অর্জিত জ্ঞান। তীব্র শব্দ যে মানুষের মনকে বিরুপভাবে প্রভাবিত করতে পারে সে বিষয়টি মনস্তত্বের প্রাথমিক পাঠ থেকেই তিনি বুঝতে শুরু করেছিলেন। তাই সাক্ষাৎকার কক্ষটিকে তিনি করে তুলেছিলেন সম্পূর্ণরূপে বাইরের শব্দ ও কোলাহল মুক্ত। এর দুটি উপকারী দিক রয়েছে, একদিকে যেমন বাইরের শব্দ থেকে মুক্ত থাকা যায় তেমনি ভেতরের শব্দ বাইরে না যাবার কারণে গ্রাহকের একান্ত কথাও বাইরে চাউর হবার কোন সম্ভাবনা থাকেনা, যা সকল গ্রাহকের জন্য খুবই স্বস্তিদায়ক একটি নিশ্চিদ্র ব্যবস্থা।
এরপর খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল কক্ষের আলো এবং দেয়ালে রংয়ের ব্যবহার। নিজের একান্ত অভিজ্ঞতাকে তিনি এক্ষেত্রে কাজে লাগিয়েছিলেন পূর্ণরূপে। তিনি লক্ষ করেছিলেন যে অতিরিক্ত কাজের চাপে বিশৃঙ্খল বোধ করলেই তাঁর বনেবাদারে ছুটে যেতে ইচ্ছে করত, ইচ্ছে করতো প্রকৃতির অবারিত সবুজ ঘাসে পা ডুবিয়ে বসে থাকতে। তবে বেশিক্ষণ সবুজে ডুবে থাকতেও তাঁর ভালো লাগতো না, তিনি খুঁজতে চাইতেন অন্য রং অন্য ধরণের শেড। আর তাই গ্রাহকের প্রশান্তি আর বৈচিত্র্যময় মানসিকতার কথা ভেবেই তিনি সাক্ষাৎকার কক্ষে নানান রংয়ের একটি ধারাবাহিক উপস্থাপনাকে বাস্তব রুপ দিতে চেয়েছিলেন। বিষয়টি আপাত দৃষ্টিতে সরল মনে হলেও বিষয়টি ছিল যথেষ্ট জটিল তবে সেটি সম্ভব হয়েছিল সারা ঘর জুড়ে সাদা দেয়ালের মাঝে লুকানো বিভিন্ন রংয়ের আলো প্রক্ষেপণ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। আর পুরো বিষয়টি সফল হয়েছিল উপদেষ্টার অপ্রতিদ্বন্দী উপস্থিত বুদ্ধির কারণে। আলোর ব্যবস্থাটি নিয়ে সহকারী প্রযুক্তিবিদ যখন চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন তখন তিনিই তাকে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরামর্শ দেন আর সেদিন থেকেই তুরুণ প্রযুক্তিবিদটি তাঁর ভক্ত হয়ে ওঠে। গ্রাহকদের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থাটির প্রভাব ছিল সুদূর প্রসারী। ফলে সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় উপদেষ্টা যখন যেই রংকে উপযুক্ত মনে করতেন কক্ষের দেয়ালে সেই রংয়ের প্রক্ষেপণ স্পষ্ট হয়ে উঠত। খুব অভিজ্ঞ চোখ ছাড়া কেউই দেয়ালের আলোর উৎসটিকে খুঁজে পেতনা আর গ্রাহকদের প্রায় সকলেই দেয়ালের আলোর প্রক্ষেপণকেই দেয়ালের আসল রং বলে মনে করত। তবে সমপ্রতি, পরামর্শকেন্দ্রের পুরো বিষয়টির প্রতি গুনমুগ্ধ প্রযুক্তিবিদটি সাক্ষাৎকার কক্ষটিতে স্বর সংবেদী এমন কিছু সেন্সর জুড়ে দিয়েছে যাতে কক্ষে প্রতিধ্বণিত প্রতিটি স্বরের সাথে সাথে কক্ষের দেয়ালের রং, এমনকি সুরের মুর্ছনার পরিবর্তন ঘটবে। যদিও এখন পর্যন্ত উপদেষ্টা নতুন ব্যবস্থাটিকে পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ পাননি। সেই শৈশব থেকেই যেকোন ধরণের সুরেলা সংগীতের প্রতি উপদেষ্টার রয়েছে দারুণ আকর্ষণ, এছাড়া মানুষের চিন্তার উপর বিভিন্ন ধরণের সুরের প্রভাবকেও তিনি কখনো খাটো করে দেখেননি। আসলে সুক্ষ থেকে সূক্ষতম বিষয়কে এবং পৃথক পৃথক ভাবে সবকিছুকে দেখবার যোগ্যতার কারণেই তিনি আজ উপদেষ্টা পদে অধিষ্ঠিত। আর তাই সাক্ষাৎকার কক্ষটিতে গ্রাহকদের বিভিন্ন রুচির কথা ভেবেই তিনি গড়ে তুলেছেন বৈচিত্র্যময় সুরের সংগ্রহশালা। বৈচিত্র্যের প্রতি তাঁর এই অমোঘ আকর্ষণ তাঁর দার্শনিক অবস্থার কথাই বারবার মনে করিয়ে দেয়।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




