সাক্ষাৎকার কক্ষের আসবাবের বিষয়েও উপদেষ্টার প্রত্যক্ষ নজরদারী বলবৎ ছিল। তিনি সাক্ষাৎকার কক্ষটির জন্য আরামদায়ক অথচ একটু পুরোনো ধাঁচের আসবাব এবং প্রথাগত রুচির বাইরে পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশ থেকে সংগ্রহ করা ঘর সাজানোর নানান জিনিসপত্রের ব্যবস্থা করেছিলেন। আর এর সবকিছুর উদ্দেশ্য ছিল গ্রাহককে একটি বৈচিত্রপূর্ণ আবহের স্বাদ দেয়া। তবে তাঁর বিশেষ উদ্ভাবনী পদ্ধতির সবচেয়ে আকর্ষনীয় দিকটি ছিল এর সরল এবং সাধারণ উপস্থিতি। যে ঐশ্বরিক ভারসাম্যবোধ তাঁকে সবসময় চালনা করত সেটির জোরেই তিনি সাক্ষাৎকার কক্ষটিকে সাজিয়ে ছিলেন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে পাওয়া যায় অথচ আকর্ষনীয়, এমন সব উপাদান দিয়ে। কক্ষটিতে সুগন্ধযুক্ত নির্মল বাতাসের ব্যবস্থাও যেমন তিনি করেছিলেন তেমনি কক্ষের উষ্ণতা যাতে সবসময়ই একটি আরামদায়ক অনভূতি দেয় সেটির ব্যবস্থাও তিনি করেছিলেন। তবে বাতাস প্রবাহ আর কক্ষের উষ্ণতার বিষয়টি অফিসের সবকটি কক্ষের জন্যই বলবৎ ছিল।
এর পেছনে অবশ্য উপদেষ্টার নিজেরও একটি কারণ ছিল, কেননা ছোটবেলা থেকেই তাঁর শরীরের ত্বক ছিল অতিরিক্ত রকমের আলো-বাতাস সংবেদী, এছাড়া অধিক উত্তেজিত হলে হাঁপানির লক্ষণও কখনোসখনো তাঁর মধ্যে দেখা যেত।
শরীরের এই অনন্য বৈশিষ্ট তাঁর চিন্তা কাঠামোর স্পর্শকাতর, বেশ খানিকটা উদ্বেগী এবং দুশ্চিন্তাপ্রবণ অংশটিকে প্রকাশ করত, তবে চিন্তা ও শরীর উভয়ের ক্ষেত্রেই বনেদী ভাবটি সবসময় নিরবিচ্ছিন্নভাবে বহমান থাকত।
নিজের অভিজাত শৈশবকে তিনি এর জন্য দায়ী করেন ঠিকই কিন্তু পরক্ষণেই স্বস্তিবোধ করেন নিজের আর্থিক সংগতিময় জীবনের কথা চিন্তা করে। নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় জীবনের কঠোর রুপকে তিনি নানা সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে দেখেছেন ঠিকই কিন্তু তিনি স্পষ্ট অনুমান করতে পারেন মানুষের আরাম ও স্বস্তির প্রতি আগ্রহের কথা। সবমিলিয়ে পরামর্শকেন্দ্রের সাক্ষাৎকার কক্ষটিকে দেখলে যে কেউ একটি আরামদায়ক ও সম্মৃদ্ধ কক্ষকেই চোখের সামনে দেখতে পাবে, তবে অনেকেরই সেটিকে বিলাসবহুল এবং দয়ালু রাজার নিভৃত কক্ষ হিসেবে ভুলও হতে পারে। আদতে সাক্ষাৎকার কক্ষটির মধ্য দিয়ে উপদেষ্টা তাঁর গ্রাহকদের জন্য একটি বিস্তৃত, নিরাপদ ও শান্তিময় স্থানের ব্যবস্থাই করতে চেয়েছেন এবং মানব জাতিকে দিতে চেয়েছেন পরিপূর্ণতার স্বাদ। কিন্তু পরামর্শকেন্দ্রের সাক্ষাৎকার কক্ষটি সত্যিকার অর্থে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে তখনি যখন উপদেষ্টা স্বীয় বৈচিত্র্যপূর্ণ উদ্ভাবনী পরামর্শ ব্যবস্থা এবং সেটির বুদ্ধিদীপ্ত শান্ত ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সেটিকে আলোকিত করে তোলেন।
সাক্ষাৎকার কক্ষের তদারকি শেষ করে উপদেষ্টা যখন অভিনেত্রীর আগমনের বিষয়টি জানার জন্য কক্ষ থেকে বের হলেন, তখনি তাঁর নজরে পড়ল, ডানদিকের দর্শনার্থীদের অপেক্ষার স্থানটিতে একটি জটলার সৃষ্টি হয়েছে। এতক্ষণ শব্দ নিরোধক কক্ষে থাকায় জটলাটিকে তাঁর রীতিমত কোলাহল বলে মনে হল এবং হঠাৎই এমন কর্কশ শব্দস্রোত তাঁকে কিছুটা বিক্ষিপ্ত করে দিল। বিষয়টি কি জানার জন্য কিছুদূর অগ্রসর হতেই তিনি দেখতে পেলেন যে অভিনেত্রীকে ঘিরেই এই জটলা সৃষ্টি হয়েছে। অভিনেত্রী বেশ গোছানোভাবে আসন পেতে বসে রয়েছেন এবং এক সময়ের পর্দা কাঁপানো অভিনেত্রীকে সামনাসামনি পেয়ে অফিসের অনেকেই তার অটোগ্রাফ নেবার জন্য ভির করেছে। মানুষের জটলাকে উপদেষ্টা সবসময়ই অপছন্দ করে এসেছেন, কেননা এত মানুষের একত্র উপস্থিতি সবসময়ই তাঁর সূক্ষ ভারসাম্যবোধের উপর চাপ তৈরী করে। এছাড়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যত বেশি মানুষ তত বেশি অপরিচ্ছন্নতা ততবেশি বিশৃঙ্খলার সম্ভাবনা। সাক্ষাৎকারের বিষয়টি দ্রুত সম্পাদন করার একটি তাগিদ তিনি নিজের ভেতরে অনুভব করলেন এবং মুখে একটি নির্বিকার ভাব ফুটিয়ে তুলে তিনি মৃদু কেশে কোলাহলরত জনতাকে নিজের উপস্থিতির জানান দিলেন। অফিসের কর্মচারী বৃন্দের জটলা অভিনেত্রীকে নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিল যে উপদেষ্টার উপস্থিতিকে তারা তখনো খেয়াল করতে পারেনি, কিন্তু তিনি দ্বিতীয়বার কেশে উঠতেই সকলের যেন একসাথে বোধদয় হল। তারা পড়িমড়ি করে, এদের মধ্যে অনেকে অটোগ্রাফের খাতাটা অভিনেত্রীর হাতে রেখেই সুরসুর করে যার যার ডেস্কে ফিরে যেতে শুরু করল। কিন্তু ভুল করে তাদের একজনও উপদেষ্টার দিকে চোখ তুলে তাকালো না। এই অভিনব দৃশ্য দেখে অনেকেরই, বিশেষত অভিনেত্রীর মনে হতে পারে যে উপদেষ্টা বোধহয় খুব কঠোর প্রকৃতির মানুষ। হয়ত অফিসে তিনি খুবই ক্ষমতার ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু বিষয়টা মোটেও সেরকম কিছু ছিলনা। তড়িঘড়িতে ফেলে যাওয়া খাতাগুলোকে একপাশে সরিয়ে অভিনেত্রী ইতিমধ্যে নিজের আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। সাধারণ সৌজন্য বিনিময়ের পর উপদেষ্টা তাঁকে পরামর্শ কেন্দ্রের পক্ষ থেকে সম্ভাসন জানালেন এবং সাক্ষাৎকার কক্ষটির দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করলেন।
সাক্ষাৎকার কক্ষটির দিকে অগ্রসর হতে হতে উপদেষ্টা সহকর্মীদের সামপ্রতিকতম আচরণ নিয়েই ভাবছিলেন। সবসময়ই তাঁদের সম্পর্ক খুব বন্ধুত্বপূর্ণ কেননা বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগটিকেই তিনি সবচেয়ে বেশি মূল্য দেন। এমনকি দীর্ঘ কর্মজীবনে কোনদিনও তিনি সরাসরি কাউকে কোনকিছু করতে আদেশ করেন নি বা চাপিয়ে দেননি। আসলে কোন কিছুকে চাপিয়ে দেবার প্রবণতাটাই তাঁর মধ্যে কখনো ছিল না। নিজের সাথে সাথে তিনি সবসময়ই অপরের সিদ্ধান্তকে মূল্য দিয়ে এসেছেন। আর কাউকে কিছু বোঝাতে হলে তিনি তাকে সরাসরি কিছু বলেন না বরং কৌশলে সেই ব্যাক্তিটিকেই তাঁর নিজের সিদ্ধান্তের বিভিন্ন যৌক্তকতাগুলোকে দেখাতে থাকেন। আর বিষয়টিকে তিনি এমন দক্ষভাবে সম্পন্ন করেন যাতে ব্যাক্তিটির মনে হয় 'আরে, এগুলো তো আমারই কথা'। যেকোন বিষয়ের নানাদিক বিশ্লেষণ, পরস্পর বিপরীত বিষয়গুলোর তুলনা এবং নিজের ভুবন ভুলানো হাসিকে ব্যবহার করেই উপদেষ্টা পরিশেষে একটি ভারসাম্যময় মানবকল্যাণকামী সিদ্ধান্তে উপনীত হন। কেননা উপদেষ্টা মনে করেন জীবন সম্পর্কে খুব গভীর কিছু উপলব্ধি এরই মধ্যে তাঁর হয়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




