উপদেষ্টার কন্ঠে পেশাদ্বারীত্বের ভাবটুকু আবার ফিরে আসছিল তবে সেখানে নতুন যুক্ত হওয়া বন্ধুত্বপূর্ণ স্বরটুকুও ছিল। এবার তিনি প্রকৃত পরামর্শকের কন্ঠে বলে উঠলেন, আসলে আপনার মূল সমস্যা হল আপনি নিজেকে প্রিয় কোনকিছু থেকে বিযু্ক্ত করতে পারছেন না। এর একটি বড় কারণ আপনার পিতৃমাতৃহীন সংগ্রামী বড় হওয়া, নিজের বলে কোন কিছুর জন্য একা একা যুদ্ধ করা, প্রিয় মানুষকে জীবন সঙ্গী হিসেবে না পাওয়া আবার তার জন্য অপেক্ষা করা ইত্যাদি কখনোই আপনাকে সুস্থির হতে দেয়নি। একজন ডুবন্ত মানুষ যেমন খরকুটোকে আঁকড়ে ধরে আপনি সেভাবেই অভিনয়কে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন এবং সেটাকে আমি মোটেও দোষের বলে মনে করছিনা। কিন্তু আপনি যদি নিজের বাইরে চোখ মেলে তাকান তাহলে দেখতে পাবেন পৃথিবী কতটা পরিবর্তনশীল। আপনার অভিনয় জীবনের শুরুর দিককার কথা একবার চিন্তা করুন। ভেবে দেখুন সেসময় থেকে এ সময়ে কতই না পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। প্রযুক্তি বিকশিত হয়েছে, মানুষের যোগাযোগ ক্ষমতাও কতনা নতুন ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আপনার কাছে এখন মনে হচ্ছে অভিনয়ই সত্য, কিন্তু এটি আপনার সত্য। আমি আপনাকে আপনার কর্মক্ষেত্রের উদাহরণ দিয়েই বলি, অভিনয় কি করে, অভিনয় মানুষকে এক নতুন ধরণের বাস্তবতার স্বাদ দেয়। পূর্বের বাস্তবতাকেই যদি আমরা আঁকড়ে ধরে রাখতাম তাহলে নতুন নতুন মাধ্যমের বিকাশই ঘটতো না। আমরা থেকে যেতাম যাত্রা পালার যুগে। এই সিনেমা টেলিভিশনের উদ্ভাবনের ফলেই তো আপনি পর্দায় অভিনয় করতে পারছেন। এখন যে নতুন প্রযুক্তি এসেছে তাতে হয়ত সেভাবে অভিনেতা অভিনেত্রীদের আর প্রয়োজন থাকবে না। এবার আপনাদের বদলে পর্দায় নেচে বেড়াবে ত্রিমাত্রিক ছবি। কিন্তু এতে হতাশ হবার কিছু নেই। এটি এক নতুন ধরণের বাস্তবতা। জীবনের জন্যই আপনাকে এই বাস্তবতার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে। একজন পরামর্শক হিসেবে আমি বুঝতে পারি যে কোন কোন মানুষের জন্য হয়ত এই পরিবর্তন মেনে নেওয়া কষ্টকর। মানুষ তো আর যন্ত্র নয়; আর সে কারণেই তো এই পরামর্শ কেন্দ্র। এ পর্যন্ত বলে উপদেষ্টা থামলেন, তবে অভিনেত্রীর মুখোভঙ্গিতে ঠিক যেসব পরিবর্তন তিনি ইতিমধ্যেই ফুটে উঠবে বলে প্রত্যাশা করেছিলেন ঠিক তেমনটি ঘটেনি। বরং অভিনেত্রীর মুখে তিনি দেখতে পেলেন এক বিষাদময় ছায়া। বিবাহ বিচ্ছেদের প্রাক্কালে উপদেষ্টা নিজের স্ত্রীর মুখে যে গভীর বিষাদ তিনি লক্ষ করেছিলেন, খুব অদ্ভুতভাবে একই রকমের বিষাদ তিনি অভিনেত্রীর শান্ত চোখ দুটিতে দেখতে পেলেন।
তবে বিষয়টিক আমল না দিয়ে তিনি আবার শুরু করলেন। এদিকে কন্ঠস্বরের পরিবর্তনের সাথে সাথে ঘরের দেয়ালের রংও দারুণভাবে পাল্টে যাচ্ছিল। কিন্তু উপদেষ্টার সেদিকে দৃষ্টি দেবার মত কোন সময় ছিল না। তিনি অভিনেত্রীর দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কন্ঠে বলে চললেন, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেবার বিষয়ে আপনি যথেষ্ট পারঙ্গম বলেই আমি মনে করি। তারপরও পরামর্শক হিসেবে আপনাকে কতগুলি বিষয় জানানো দরকার। প্রথমেই আমি আপনাকে জানাতে চাই মানুষের কিছু মৌল প্রবণতা প্রসঙ্গে। সকল মানুষ মাত্রই অধিকার প্রবণ, প্রিয় সবকিছুকেই সে অধিকার করতে চায়। আর এটি করতে যেয়েই সে নিজেকে অধিকারের বস্তুটির সাথে নিজেকে যুক্ত করতে শুরু করে। বিষয়টি এরকম যে সে নিজেও প্রথমে বুঝতে পারে না সে কিভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেটি থেকে বিচ্ছিন্ন হবার সময় এলেই সে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে বা আরো মর্মান্তিকভাবে, লোভী হয়ে ওঠে। পৃথিবী জোড়া এই যে বিশৃঙ্খলা এই যে যুদ্ধ, হানাহানি কাটাকাটি এর পেছনে রয়েছে মানুষের অধিকার বোধের চেতনা। কিন্তু আমি নিজের অভিজ্ঞতায় আপনাকে এতটুকু আশ্বস্ত করতে পারি যে অধিকার বোধে কখনোই মানুষের জন্য ভালো কিছু ঘটেনি। আপনি নিজেই যদি বিষয়টি একটু খোলা চোখে খেয়াল করেন তাহলেই আমার কথার যথার্থতা দেখতে পাবেন এবং আমি মনে করি বিষয়টি বোঝার জন্য আপনি যথেষ্ট বুদ্ধিমতি এবং পরিণত মানুষ। আপনি কি অস্বীকার করতে পারবেন যে অভিনয়কে আপনি আপনার জীবনে আবশ্যিক করে তোলেন নি, যদিও এতে আপনার চারপাশের পরিবেশ এবং বড় হওয়ারও একটা বড় অবদান ছিল। আর ঠিক এই জায়গাটিতেই আমি আপনার মনোযোগ নিবিষ্ট করতে চাই। উপদেষ্টা দক্ষ ক্যানভাসারের মত মনোমুগ্ধকর ভাবে বলে চলছিলেন। আপনার চারপাশ আপনাকে যেভাবে অভিনয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে, এবং আপনার বর্তমান পরিস্থিতি সেটিকে যেভাবে আবশ্যক করে তুলেছে আজ সেটিকে আর ধরে না রাখতে পারার সম্ভাবনাতেই আপনার মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকগুলো তীক্ষ্ন বিশ্লেষণ আর অকাট্য যুক্তির পর, এবার দম নেবার জন্য উপদেষ্টা একটু থামলেন। একই সাথে অভিনেত্রীর মধ্যে যে ভারসাম্যময় সত্যগুলোকে তিনি ঢুকিয়ে দিতে চাচ্ছিলেন সেগুলিকে থিতু হতে দেবার জন্যও তিনি সময় দিলেন।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



