somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পরামর্শকেন্দ্র (ছোট গল্প) পর্ব 12

০৮ ই এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১১:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

উপদেষ্টার চমৎকারী বক্তৃতার পুরোটুকুই অভিনেত্রী মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন এবং এর মধ্যে একবারের জন্যও তিনি মুখ খোলেন নি। কিন্তু তখন পর্যন্ত অভীনেত্রীর মুখে, উপদেষ্টার খুবই প্রত্যাশিত একটা দারুন বোধদয়ের স্মারক চিহ্নটি ঠিক পরিষ্ফুটিত হয়ে ওঠে নি। উপদেষ্টা এবার নিজের সামপ্রতিকতম উদ্ভাবনটিকে অভিনেত্রীর ক্ষেত্রে নিয়োজিত করার জন্য প্রস্তুত হলেন। আর সেটি হল একেবারে তাঁর নিজের ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতাকে অভিনেত্রীর সামনে হাজির করা। কেননা উপদেষ্টা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে নিজের বিচারবোধ ও পরামর্শের অভিজ্ঞতা বিষয়ে তিনি ইতিমধ্যে অভিনেত্রীকে আশ্বস্ত করতে সক্ষম হয়েছেন, এখন প্রয়োজন কেবল তাকে একটি পরিপূর্ণ ভারসাম্যময়
সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যাওয়া। যদিও সিদ্ধান্ত নেবার রসদগুলো তিনিই অভিনেত্রীকে যুগিয়ে যাবেন, তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ হবে অভিনেত্রীর নিজের স্বগত উক্তির মধ্য দিয়ে। নিকট ভবিষ্যতের সেই অমোঘ সম্ভাবনাটার কথা মনে করে উপদেষ্টা নিজের মনেই উল্লসিত হয়ে উঠলেন। তবে তাঁর আচরণে পূর্বের আন্তরিক কর্তব্যবোধ এবং উপলব্ধির সততা মেশানো ভঙ্গিটি একইরকম থাকল। একদম নতুন পদ্ধতিকে ব্যবহার করার উত্তেজনায় সাক্ষাৎকারের পুরো সময়টাতে অন্তত একবার ইনহেলার ব্যবহারে আবশ্যিক শারীরিক চাহিদাটিকে তিনি বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন। এদিকে সাক্ষাৎকার চলাকালীন সময়ে উপদেষ্টাকে কোনভাবেই বিরক্ত না করার নিয়মটি একেবারে কঠোরভাবেই মান্য করা হোত আর এজন্যই শব্দ নিরোধের সাথে সাথে তিনি কক্ষটিকে সকল প্রকার বৈদু্যতিক ও রেডিও তরঙ্গ মুক্ত করে তুলেছিলেন। কেননা গ্রাহকের সাথে নিবিড় আলাপচারিতায় তরঙ্গবাহিত কোন প্রকার বাইরের বা ভেতরের যোগযোগ বাধা সৃষ্টি করুক তা তিনি কোনভাবেই চাইতেন না। এবং সেটি গ্রাহক ও পরামর্শক উভয়ের জন্যই সমানভাবে প্রজোয্য ছিল। হয়ত এই ব্যবস্থার কারণেই লোকে তাকে প্রাচীণপন্থী বলে ভৎ্র্সনা করত। তবে নিয়ম অনুযায়ী সেসময় কক্ষের বাইরের দেয়ালে সর্বক্ষণ একটি লালবাতি জ্বলজ্বল করে উপদেষ্টার ব্যস্ততার কথা সবাইকে মনে করিয়ে দিত। এদিকে অভিনেত্রীর বৈচিত্রপূর্ণ জীবনের কি কি অজানা কথা তার স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়ে উপদেষ্টা জানতে পারবেন, কি কি নতুন বিষয় তিনি শিখতে পারবেন এসব অুনমান করতে করতে তাঁর একবারের জন্যও মনে হল না যে অভিনেত্রীর সমস্যাটিকে সমাধানের জন্য তিনি প্রয়োজনের চেয়ে খানিকটা বেশিই পরিশ্রম করে চলেছেন।

কফির কাপে একটা ছোট্ট চুমুক দিয়ে উপদেষ্টা আবার শুরু করলেন। অভিনেত্রীর দেহভঙ্গি থেকে তিনি অনুমান করতে পারছিলেন যে তাঁর উপস্থাপিত যুক্তিগুলো তাকে কিভাবে আলোড়িত করছে। অভিনেত্রী তখন থেকে ঠিক একই জায়গায় বসে আছেন। কিছুক্ষণ আগেও সাময়িকভাবে নিজের পাগুলোকে তিনি নাড়াচ্ছিলেন। এখন সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। অভিনেত্রীর দিকে দয়ার্দ দৃষ্টিতে তাকিয়ে উপদেষ্টা মনে মনে বললেন, এই তো আর কিছুক্ষণ, এরপর সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। তবে কথা বলায় সময় এবার তিনি অভিনেত্রীর দিকে সরাসরি না তাকিয়ে নিচু স্বরে শুরু করলেন। সাক্ষাৎকারের এটি একটি মোক্ষম সময় যখন থেকে গ্রাহক সাধারণত পরামর্শকের সুরেই কথা বলতে শুরু করে। কন্ঠে পেশাদ্বারীত্বের পূর্ণ বিস্তার ঘটিয়ে তিনি বললেন, আমি অনেকটা আপনার মতই একজনকে দীর্ঘদিন যাবৎ ঘনিষ্টভাবে চিনতাম, একদা যাঁর সাথে আমার গভীর সক্ষতাও ছিল। সে ছিল আপনার মতই বুদ্ধিমতি, গভীর মানসিকতা সম্পন্ন ও সুন্দরী। বাক্যের শেষে বিশেষণগুলোক তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই ব্যবহার করলেন যাতে অভিনেত্রীর জন্য তাঁর হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া সহজ হয় এবং তিনি সজীব ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠেন। এর পরপরই তিনি বললেন, একসময় তার সাথে আমার বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল, তিনি ছিলেন আমার স্ত্রী, অবশ্য এখনো আমি তাকে নিজের বন্ধুই মনে করি। কিন্তু আপনার মতই নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে সে এতটাই আগ্রহী হয়ে উঠেছিল যে শেষ পর্যন্ত তাঁকে আমার ছেড়ে আসতে হয়। সন্তান নেবার ব্যাপারে তার অনড় অবস্থানের কারণেই আমার এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এতদূর পর্যন্ত বলে উপদেষ্টা থামলেন এবং অভিনেত্রীর মুখে প্রত্যাশিত কৌতুহলের আভাটিকে ক্রমশ বিকশিত হতে দেখে পূর্ণ উদ্যমে চালিয়ে গেলেন। আপনার কাছেও অভিনয়ের বিষয়টি আমার প্রাক্তণ স্ত্রীর সন্তান চাহিদার মত। কিন্তু দেখুন, পরিবর্তনশীল বিশ্বে পরিবর্তনশীল সম্পর্কে স্ত্রীর সাথেও আমার দূরত্ব তৈরী হয়েছে। নিশ্চয়ই তিনি নতুন কাউকে বেছে নিয়েছেন যেমন আমি বেছে নেবার চেষ্টা করেছি।


এখন আপনি যেমন অভিনয়কে ঘিরে নিজের অধিকার চর্চা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন আমি অনুমান করি আমার প্রাক্তণ স্ত্রীরও নিশ্চয়ই এমনি অনুভূতি হয়েছিল। কিন্তু সেসময়ে আমার যা উপলব্ধি হয়েছিল তা এখন আরো পোক্ত হয়ে উঠেছে। একজন সম-বয়সী বন্ধুর মতই আমি আপনাকে সৎভাবে জানাতে চাই যে আপনার এই অধিকার বোধের বিষয়টিই আপনাকে অসুস্থ করে তুলেছে। আপনার কোন কাজে আনন্দ না পাবার কারণও সেটাই, কেননা আপনি কোনভাবেই এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিকে মানিয়ে নিতে পারছেন না। নিজেকে একটু চিন্তা ভাবনা করার সময় দিন, দেখবেন সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে। আমি অনুমান করছি আপনি নতুন নতুন বিষয় পছন্দ করেন। আপনি চাইলে আমি নিশ্চিতভাবেই আপনার জন্য সম্মানজনক একটি কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারব। সমস্যাটা থেকে উত্তরণের জন্য আমার ভারসাম্য নীতিটাকে আপনি কাজে লাগাতে পারেন। আমি এখন পর্যন্ত কোনকিছুর সাথেই তীব্রভাবে যুক্ত হইনি এবং সব ধরণের তীব্রতা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টা করেছি। আমার কাছে সত্যিকার অর্থেই মনে হয়েছিল যে সন্তান জন্ম হলে আমার এই বিচ্ছিন্ন থাকার প্রচেষ্টাটি বাধাগ্রস্থ হবে, আমি হয়ত তীব্র অধিকার প্রবণ হয়ে উঠব। কিন্তু আমার স্ত্রী কখনোই বিষয়টি এভাবে বুঝতে পারেনি আর তাই আমাকে বিচ্ছেদ গ্রহণ করতে হয়েছে। এই ঘটনার পরপরই আমি আরো ভালোভাবে বুঝতে পারি অধিকার বোধের বিষয়টি কতটা মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। এভাবে একটানা কথা বলতে বলতে উপদেষ্টা কিছুটা পরিশ্রান্ত হয়ে উঠেছিলেন, একটু দম নিয়ে অভিনেত্রীর দিকে সরাসরি তাকিয়ে তিনি বললেন, "তাই আমি আপনাকে বন্ধুর মতই অনুরোধ করছি, নিজেকে কখনোই অধিকার বোধে আক্রান্ত হতে দেবেন না। নিজেকে এর থেকে মুক্ত করুন, দেখবেন সবকিছু কেমন ঠিকঠাক ভালো হয়ে উঠছে।"

সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ভারত খারাপ, তবে নিমন্ত্রণ পত্র ভালো

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৬ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৫



দুই ঘণ্টা বিমানবন্দরে বসিয়ে রাখা হয়েছে, প্রবেশও করতে দেয়নি। তারপরও ঘোষণা দিলেন - আবার আমন্ত্রণ পেলে যাবেন।

ভারতবিরোধী কথা বলা ছিলো তার রাজনৈতিক স্ট্যান্ড পয়েণ্ট, কারো কাছে নতি স্বীকার করবো... ...বাকিটুকু পড়ুন

খাম্বা/খাল তারেক কে কিছু উপলব্ধি শেয়ার করছি

লিখেছেন অপলক , ১৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৪২

আজ আর মনের মাধুরী মিশিয়ে বকাঝকা করব না। আজ কিছু ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা শেয়ার করব।



খাল খনন বা ঢাকার বাসস্ট্যান্ড সরানোর চেয়ে কি কি গুরুত্বপূর্ন কাজ এই অর্থবছরে করা যেতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গানটি প্রিয় রাজীব নূর ও কবি স্বপ্নের শঙ্খচিলকে উৎসর্গ করছি

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:০৬

আমার খুব প্রিয় একটি কবিতার সাথে ব্লগার স্বপ্নের শঙ্খচিলের কবিতা মিলিয়ে গানটি বুনেছি।
শোনার আমন্ত্রণ রইলো।
============================

এই জল ভালো লাগে;
বৃষ্টির রূপালি জল কত দিন এসে
ধুয়েছে আমার দেহ- বুলায়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অপারেশন ইকারুস: কুয়ালালামপুরের ছায়া সম্রাট

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৭ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৫



বালির নীল দিগন্ত
ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের একটি নির্জন পাথুরে সৈকত। ভারত মহাসাগরের বিশাল নীল ঢেউ আছড়ে পড়ছিল তীরে। সমুদ্রের ঠিক ওপরের একটি আধুনিক কাঁচের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আহলে হাদিস বিরোধী পোষ্টে ব্লগে লাইক না থাকলেও গ্রুপে লাইক পাঁচ হাজার আটশত

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৭ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৪



হাদিস প্রেমিক হলো নাস্তিক ও আহলে হাদিস। উভয় দল হাদিস দিয়ে মুসলিমদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। আমি যেহেতু মুসলিমদের হেদায়াতের জন্য কাজ করি সেহেতু আমাকে আহলে হাদিস বিরোধী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×