আসলে আমি সেদিন ওদের দেখতে চাইনি।
দূর থেকে মনে হচ্ছিল, তিনজন মানুষ বারান্দায় দাঁড়িয়ে শহর দেখছে—এর মধ্যে নতুন কী আছে?
কিন্তু অদ্ভুতভাবে চোখ ফেরাতে পারছিলাম না।
মনে হচ্ছিল, ওরা শহর দেখছে না, নিজেদের হারিয়ে যাওয়া কোনো সময় দেখছে।
আকাশটা ছিল ৯০-এর দশকের বিকেলের মতো—ধূসর, নিচু, ভারী।
নিচে ঢাকার ছাদগুলো ভিজে অন্ধকার হয়ে আছে, দূরের দালানগুলো মেঘে আধাআধি ঢেকে, বাতাসে বৃষ্টির আগের সেই পুরোনো গন্ধ।
এমন আবহাওয়ায় শহরকে নতুন লাগে না, পুরোনো লাগে।
মনে হয়, দালানগুলোও যেন মানুষের মতো—বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত।
দূর থেকে ওদের কথা শোনা যাচ্ছিল না।
তবু কেন জানি মনে হচ্ছিল, আলাপটা খুব সাধারণ কিছু দিয়ে শুরু হয়েছে—
শহর, কাজ, বৃষ্টি, পুরোনো দিন—
তারপর হঠাৎ কোথাও গিয়ে থেমে গেছে।
হয়তো ওদের একজন বলছিল, আগে বিকেল নামলে মানুষ ছাদে উঠত।
হয়তো আরেকজন হেসে বলছিল, এখন মানুষ ছাদে ওঠে না, শুধু জীবনের ওপর থেকে একটু তাকাতে আসে।
তারপর মাঝের মানুষটা খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
“শহরটা যত বড় হয়, মানুষ তত কম জায়গা পায় নিজের কষ্ট রাখার।”
কথাটা বলেই হয়তো সে চুপ করে গেছে।
কারণ কিছু কিছু বাক্যের পরে আর কথা এগোয় না, শুধু নীরবতা একটু ঘন হয়।
আর হয়তো সেই নীরবতার ভেতরেই আরেকজন খুব আস্তে বলেছে—
“আমরা আসলে কেউ শহরটাকে মিস করি না, আমরা মিস করি সেই মানুষটাকে, যে এই শহরে একসময় ছিলাম।”
এই কথাগুলো আমি শুনিনি।
দূর থেকে দাঁড়িয়ে কল্পনা করেছি।
তবু বুকের ভেতর এমনভাবে লেগেছে, যেন কথাটা আমার জন্যই বলা।
কারণ সত্যি কথা হলো,
শহর শুধু বদলায় না—
শহর মানুষকে বদলে দেয়।
একসময় যে বন্ধুত্বে শুধু পাশাপাশি দাঁড়ালেই চলত,
এখন সেখানে সবাই কথা বলে, হাসে, খোঁজ নেয়—
তবু কেউ ঠিক কারও ভেতরের খবর রাখে না।
দূর থেকে ওদের ছায়া দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল,
মানুষ আসলে একা হয় হঠাৎ না।
মানুষ ধীরে ধীরে একা হয়।
একই শহরে থাকতে থাকতে,
একই বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হতে হতে,
একই আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থেকেও।
শেষবার চোখ তুলেছিলাম যখন,
ওরা তখনও দাঁড়িয়ে।
মেঘ তখনও নেমে আছে শহরের মাথায়।
আমার শুধু মনে হচ্ছিল—
৯০-এর দশক আসলে কোথাও যায়নি,
সে এখনও ফিরে আসে
কোনো মেঘলা বিকেলে,
তিনজন মানুষের নীরব দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিতে,
আর এই কষ্টে—
যে আমরা এখনও পাশাপাশি দাঁড়াই,
কিন্তু আগের মতো আর একে অন্যের কাছে পৌঁছাতে পারি না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


