somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রবীন্দ্রনাথের শেষের দিনগুলি ও শেষযাত্রা

১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ সকাল ১১:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গোটা জীবন কবি দেখেছেন ‘মৃত্যুর শোকাযাত্রা’,মৃত্যুলোক বারবার তাঁকে বিধ্বস্ত করতে চেয়েছে,কিন্তু তাকে পরাভূত করতে পারে নি। ১৯০০ সালের নভেম্বরে কলকাতা থেকে স্ত্রী মৃণালিনীকে লিখেছিলেন,‘বেঁচে থাকতে গেলেই মৃত্যু কতবার আমাদের দ্বারে এসে কত জায়গায় আঘাত করবে… মৃত্যুর চেয়ে নিশ্চিত ঘটনাতো নেই – শোকের বিপদের মুখে ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ বন্ধু জেনে যদি নির্ভর করতে না শেখো তাহলে তোমার শোকের অন্ত নেই।’
মাত্র ১৪ বছর বয়সে তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। বিয়ের দিন, তিনি নতুন বৌ নিয়ে জোড়াসাঁকোর বাসায় ঢুকছেন, সে-সময়ই স্বেচ্ছামৃত্যু ডেকে নেন ঠাকুরবাড়ির ঘরজামাই সারদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়, সৌদামিনির স্বামী, যার উপরেই ছিলো জমিদারি দেখাশোনার ভার। কবির বিয়ের চার বছরের মধ্যেই আত্মঘাতী হলেন তাঁর ‘বৌঠান’ কাদম্বরী। রবীন্দ্রনাথের পর আরও এক ভাই জন্মেই মারা যান,দুই ভাই ছিলেন বদ্ধ উন্মাদ। কবির মাত্র আঠাশ বছর বয়স,মারা গেলেন কবিপত্নী মৃণালিনী দেবী। এরপর একে একে প্রিয়তম পুত্রের, কন্যার মৃত্যুযন্ত্রণা তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে। এই আঘাত সইতে সইতে একমাত্র দৌহিত্র মীরা দেবীর পুত্রের নিষ্ঠুর শোককে কবি প্রত্যুত্তর দিয়েছেন তাঁর মতো করেই,‘যাবে যদি যাও,অশ্রু মুছে যাও।’
এই রবীন্দ্রনাথকেও শেষ সময়ে সহ্য করতে হল চূড়ান্ত অসহনীয় যন্ত্রণা, তাঁর যাবতীয় ইচ্ছাকে, আবাদনকে পায়ের তলায় দুমড়ে-মুচড়ে কবির মৃতদেহকে দুষ্কৃতিদের মতো ছিনিয়ে নিয়ে চিতায় তোলা হল, সেদিনের সেই দৃশ্য ভাবলে আজও গ্লানিতে মাথা নিচু হয়ে যায়। এমনকী জেনে স্তম্ভিত হতে হয়, তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন যে শয্যাটিতে, সেটি এবং তাঁর চিতাভস্মসহ কলসটিও বেমালুম বেপাত্তা হয়ে গেল!
কবির অসুস্থতা
বীন্দ্রনাথ পরিণত বয়সে মূত্রাশয়ের অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। ‘প্রস্টেট’-এর সমস্যাই শেষ পর্যন্ত আমাদের কাছ থেকে তাঁর চিরবিদায়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই চলে যাওয়াকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে চান না অনেকেই। রূপে রসে সৃষ্টিকর্মে আশি বছরের পরিপূর্ণ জীবন তাঁর। কিন্তু জরা তাঁকে সম্পূর্ণ গ্রাস করতে পারেনি। জ্ঞান হারাবার আগে পর্যন্ত মন ছিলো ক্রিয়াশীল। এমন অনিন্দ্যসুন্দর দেহকান্তি, প্রশান্ত মুখমণ্ডল, পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে ঠোঁটের ও চোখের কোণে চরম বিরক্তি ও যন্ত্রণা নিয়ে।
তাঁর শেষের দিনগুলো কেমন ছিলো?
রবীন্দ্রনাথ প্রস্টেট সমস্যায় গুরুতর অসুস্থ হন ১৯৪০-এ কালিম্পং থাকার সময়। এর তিন বছর আগে ১৯৩৭ সালে কবিগুরু অসুস্থ হয়েছিলেন, ১০ সেপ্টেম্বর সেই প্রস্টেট গ্ল্যান্ডের সমস্যা মাথাচারা দিয়েছিলো। কিছুটা সুস্থ হয়ে কবি আবার শান্তিনিকেতনে ফিরে এলেন। বিশ্বভারতীর বিপুল কর্মযজ্ঞ, লেখলেখির পাশাপাশি ‘চণ্ডালিকা’ নৃত্যনাট্যের রূপায়ণ, দোলপূর্ণিমায় বসন্ত উৎসব অনুষ্ঠানের পর ‘চণ্ডালিকা’র দল কলকাতা গেল; ডাক্তারের নিষেধে কবির যাওয়া বন্ধ। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করে তিনি একজন সঙ্গী নিয়ে কলকাতা চলে গেলেন। ‘ছায়া’ প্রেক্ষাগৃহে হাজির হয়ে দেখলেন ‘চণ্ডালিকা’র নতুন রূপসৃষ্টি। তারপর গ্রীষ্মে কালিম্পং। গেলেন মৈত্রেয়ী দেবীর আমন্ত্রণে মংপুতে। দুমাস থাকলেন। ১৯৩৯ সালে পুরী গেলেন, সঙ্গী এন্ডরুজ।
কবি এসময় শারীরিক দিক দিয়ে ক্রমশ দুর্বল হয়ে উঠছিলেন। দীর্ঘদেহী সুপুরুষ কবি খুঁড়িয়ে চলছিলেন, হাঁটতে তাঁর কষ্ট হচ্ছিলো, ঠেলা গাড়ি বা হুইল চেয়ার নিয়ে চলাফেরায় বাধ্য হচ্ছিলেন। চোখের দৃষ্টিও কমে আসছিলো, কিছুদিন আগে থেকেই কানে কম শুনছিলেন। শান্তিনিকেতনে আর মন টিকছিলো না কবির, কলকাতায় এলেন, কিন্তু চলাফেরার সাবধানতা মানতে চাইলেন না। প্রতিমা দেবী তখন কালিম্পংয়ে। কবি সেখানে যেতে চাইলেন, বিশ্রাম ও পরিবর্তনের জন্য। তখন থেকেই বেশ দুর্বল। কবির স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য রাজগির বা কালিম্পংয়ে, কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা চলছিলো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কবির আগ্রহ জয়ী হয়, হিমালয়ের কোলে, এই কালিম্পঙেই আসা ঠিক হয়। যাত্রার আগে অমিয় চক্রবর্তীকে লিখলেন, ‘কিছুদিন থেকে আমার শরীর ক্রমশ ভেঙে পড়ছে, দিনগুলো বহন করা যেন অসাধ্য বোধ হয়। তবু কাজ করতে হয়… তাতে এত অরুচিবোধ যে, আর বলতে পারি নে। ভারতবর্ষে এমন জায়গা নেই যেখানে পালিয়ে থাকা যায়।… বিধান রায় কালিম্পং যেতে নিষেধ করেছিলেন। মন বিশ্রামের জন্য এমন ব্যাকুল হয়েছে যে তাঁর নিষেধ মানা সম্ভব হয় না। চললাম আজ কালিম্পং।’ উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ১৮৯৪ ও ১৮৯৬, দু’দুবার ত্রিপুরার রাজা বীরচন্দ্রের সঙ্গে কার্শিয়াং এসেছিলেন কবি। কবির উদ্যোগেই এখানে কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিলো।
তাঁর কালিম্পং যাত্রার আগে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ তাঁর সঙ্গে দেখা করেন, রাণী মহালানবীশকে চিঠিতে লেখেন – ‘জোড়াসাঁকো গিয়ে দেখি কবি লালবাড়ির দক্ষিণের বারান্দায় গম্ভীর মুখে বসে আছেন।… আমাকে বললেন, ‘প্রশান্ত, পাহাড়ে তো যাচ্ছি, কিন্তু কেন জানি না আমার ক্রমাগত মনে হচ্ছে এই যাওয়াটা আমার শুভ হবে না, একটা বিপদ ঘটবে।’ কবি যেন সবটাই আগাম টের পেতেন, এক্ষত্রেও অন্যথা হলো না। কালিম্পং পৌঁছেই কবি রানী চন্দকে লিখলেন : “জীবনের রণক্ষেত্র থেকে ভগ্নদূত এবার বেরিয়ে চলে এসেছি ধ্বজ পতাকা সমস্ত ফেলে দিয়ে। চাকাভাঙা রথে বসে আছি চলৎশক্তিহীন হয়ে।… লেখা প্রায় আমার বন্ধ; চলাফেরা তথৈবচ। অসুস্থদেহী বৌমার ঘাড়ে আমার স্বাস্থ্যের দায় চাপিয়ে বসে আছি – তাঁর সঙ্গিনী আছেন সেই ইংরেজ মেয়েটি।’ প্রতিমাদেবী রবীন্দ্রনাথের শেষজীবনের অভিভাবিকা, যাকে সবচেয়ে বেশি ভরসা করতেন কবি। পুত্র রথীন্দ্রনাথের বৌ।
২৭শে সেপ্টেম্বর ১৯৪০, কালিম্পঙেই কবি আবার আসুস্থ হন। প্রতিমা দেবীর বয়ানে ঘটনাটি যেমন জানা যায়, ‘রবীন্দ্রনাথ জ্বরে বেহুঁশ,… ডা. শরৎচন্দ্র বসাকের বাড়ি থেকে টেলিফোনে খবরটি কলকাতায় পাঠানোর চেষ্টা চলছে,টেলিফোনের কি ভাগ্যি সহজেই প্রশান্তচন্দ্রকে কলেজে পেয়ে গেলাম। তাঁকে প্রথমেই বললাম, কোনো প্রশ্ন করে সময় নষ্ট করো না। আগে শুনে নাও কি খবর , কারণ তিন মিনিট সময় এখনই ফুরিয়ে যাবে। বাবামশাই খুব অসুস্থ,অজ্ঞান হয়ে গেছেন,আজই ডাক্তার নিয়ে কলকাতা থেকে রওনা হওয়া দরকার।… যা ব্যবস্থা করবার সব তুমি করো এখনই, নাইলে বাবামশাইকে বাঁচানো যাবে না।’ সেদিন রাতের দার্জিলিং মেলে ডাক্তার সত্যসখা মৈত্র, ডা. স্যার নীলরতন সরকারের ভ্রাতুষ্পুত্র ডা. জ্যোতিপ্রকাশ সরকার ও ডা. অমিয়নাথ বসুকে সঙ্গে করে প্রশান্তচন্দ্র মহালানবিশ রওনা দেন। ঐদিনই সবাই মিলে তৎক্ষণাৎ কবিকে শান্তিনিকেতন নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও এর মধ্যেই আর একটি খুব গুরুত্বপুর্ণ ঘটনা ঘটে যায়। কালিম্পঙে দার্জিলিং থেকে এক ইংরেজ সিভিল সার্জন ডাক্তার কবিকে দেখতে আসেন, ২৭ সেপ্টেম্বর। তিনি প্রতিমা দেবীকে বলেন, ‘Young Lady, do you know the risk you are taking, he may not last twelve hours।’
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
মৈত্রেয়ী দেবীর প্রথম যে বইটি তার জন্য স্থায়ী আসনের ব্যবস্থা করে দেয় বাংলা সাহিত্যের আসরে ,তার নাম ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ। দার্জিলিং জেলার এই মংপু অঞ্চলে ছিল সিঙ্কোনার চাষ এবং সিঙ্কোনা গবেষণা কেন্দ্র। সেখানে তার স্বামী রসায়নবিদ ডঃ মনমোহন সেন ছিলেন গবেষণা কর্মে নিযুক্ত । স্বামীর সঙ্গে সংসার করতে গিয়ে মৈত্রেয়ী দেবী সেই পার্বত্য অঞ্চলে বড় নিঃসঙ্গ বোধ করতেন । দর্শন - সাহিত্য - মুখর সেই পিতৃগৃহের অভাব খুব বড় করে বাজত ,তা ছাড়া কলকাতার একটি কন্যা ঐরকম দু - চার ঘর মানুষের মাঝখানে যে নির্বাসিত বোধ করবে এতো স্বাভাবিক!
যদিও মংপু ছিল অত্যন্ত দুর্গম এবং মনে মনে চিরনবীন হলেও রবীন্দ্রনাথ তখন সত্তর – উত্তীর্ণ। তবু তিনি চারবার মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবীর আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন । তার সঙ্গে সঙ্গে আরো বহু গুণীজনের সমাগম হতাে সেখানে । সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথের কথাবার্তা আলাপ - আলোচনা যথাসম্ভব লিপিবদ্ধ করে রাখতেন মৈত্রেয়ী দেবী । সে তো টেপ - রেকর্ডারের যুগ নয় , ধরে রাখতে হতো মনে আর কলমে — আবার সামনে বসেও তো লিখে নেওয়া চলত না । কৃপণের ধনের মতন করে প্রতিদিনের কথাগুলি তিনি সঞ্চয় করে রাখছিলেন, রবীন্দ্রনাথ চলে এলে সেই কথাগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করেও অনেকটা সময় কাটানো যাবে এই আশায় । কিছুকাল পরে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর অল্পদিনের মধ্যেই তার একটা বড় অংশ তিনি প্রকাশ করেছিলেন ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ ' বইটিতে । রাজশেখর বসুর মতন উন্নাসিক মানুষ থেকে শুরু করে অতি সাধারণ পাঠকেরও কৃতজ্ঞতা অর্জন করেছেন তিনি এই বই লিখে । রবীন্দ্রনাথের এমন সরস প্রাণবন্ত স্মৃতিচারণা আর বিশেষ নেই ।-গোরী আইয়ুব
মৈত্রেয়ী দেবীর বয়ানে গোটা ঘটনাটা জানা যায়। ‘রোগশয্যার পাশে নির্নিমেষ তাকিয়ে বসে আছি, রুগীর দেহে কোনো সারা নেই, – নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে পড়ছে, মাঝে মাঝে পা একটু নড়ছে, চোখ বন্ধ, – বাহিরের বিশ্বপ্রকৃতিতে যেন বিসর্জনের বাজনা বাজছে। প্রবল বৃষ্টির সঙ্গে ঝড়ের শোঁ শোঁ শব্দে আকাশে বাতাসে গাছের মাতামাতিতে চলছে তাণ্ডব। ভিতরের আবছা অন্ধকারে মৃত্যুময় স্তব্ধতা, শুধু ঘড়ি বাজছে টিক টিক টিক। এক একটি মুহূর্তে আছে অনন্তের অনুভূতি, সীমাহীন সময় তার সমস্ত পরিমাপের গণ্ডি লুপ্ত করে মনকে নিয়ে গেছে কুলহারা সমুদ্রে। এ ঝড় যে থামবে, এ রাত্রি যে শেষ হবে, সুপ্রভাতের প্রসন্নতায় আবার যে কখনো পাওয়া যাবে জীবনের আনন্দবাণী সে আশ্বাস কোথাও নেই। ছিন্নপাল তরণীর মতো আমাদের বিভ্রান্ত মন নানা চিন্তায় ঘুরপাক খাচ্ছে, তাকিয়ে আছি বন্ধ জানালার কাচের বিতর দিয়ে অবিশ্রান্ত বর্ষণের দিকে।’ (বাইশে শ্রাবণ/ রাণী মহানলবিশ)
সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ ডাক্তার এলেন। রবীন্দ্রনাথকে পরীক্ষা করলেন, ‘আশি বছরের পুরাতন দেহে চামড়া কোথাও এতটুকু কুঞ্চিত নয়,… মসৃণ সুন্দর পেলব অথচ দৃঢ় সেই শালপ্রাংশু বয়স্ক দেহের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়পূর্ণ একটু হেসে সিভিল সার্জন বললেন, what a wonderful body। রবীন্দ্রনাথ প্রায় অচৈতন্য দেখে তিনি নির্দেশ দিলেন অবিলম্বে হাসপাতালে নিয়ে যেতে। কিন্তু তা সম্ভব নয় দেখে প্রতিমা দেবীকে উল্লিখিত কথাগুলি বলেন। কিন্তু আমাদের ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৌভাগ্য যে প্রতিমাদেবী এই অপারেশনে তখন রাজী হননি। তিনি জানতেন কবির অপারেশন ভীষণ অপছন্দের। পরদিন ডা. সত্যসখা দেখে বললেন যে অপারেশন না করতে দিয়ে খুব ভালো হয়েছে। তিনি গ্লুকোজ ইঞ্জাকসান দিলেন এবং একটু পরে অনেকখানি ইউরিন বের হয়ে গেলো। সেই অসুস্থ অবস্থায় প্রতিমা দেবী একা যে সিদ্ধান্ত নিয়ে কবিকে রক্ষা করেছিলেন এর এক বছরের মাথায় কলকাতা, শান্তিনিকেতনের কেউ তেমন দৃঢ় সিদ্ধান্তে আসতে পারলেন না। ফলে. হয়ত ত্বরান্বিত হল কবির শেষযাত্রা।
কালিম্পং থেকে কবিকে কলকাতায় আনা হয়, প্রায় অচৈতন্য অবস্থা তাঁর। অসুস্থ রবীন্দ্রনাথকে কালিম্পং থেকে বেশ কশরত করে কলকাতা আনা হয়, সঙ্গে ছিলেন কলকাতা থেকে যাওয়া ডাক্তার ও স্বজনেরা। একটা স্টেশন ওয়াগনের সিট খুলে ফেলে বিছানা পাতা হয় কবির জন্য। ড্রাইভারের পাশে পালা করে প্রশান্ত মহলানবিশ ও সুরেন কর বসেছিলেন। ভেতরে ছিলেন মৈত্রেয়ী দেবী। ‘মাঝে মাঝে জল খাওয়াতে খাওয়াতে ও অর্ধ-অচৈতন্য দীর্ঘ শরীরকে সেই পাহাড়ের পথে ঝাঁকুনি থেকে বাঁচিয়ে রক্ষা করবার চেষ্টা করতে করতে সে তিন ঘণ্টা খুব কাজেই কাটলো। দীর্ঘ দুর্গম পথ, কিন্তু একজন সহায় থাকতে আগের ক’দিনের মতো ভয় শঙ্কা কিছু ছিলো না, শুধু সেই পরমপ্রিয় আরাধ্য নরোত্তমের সেবার দুর্লভ সৌভাগ্য মনকে স্নিগ্ধ করে রেখেছিলো। পথে মাঝে মাঝে আমাদের বাগানের মজুরের দল দেখা গেল, একহাঁটু জল-কাদায় ডাক্তার সেন তাদের দিয়ে রাস্তা ঠিক করাচ্ছেন। গাড়ি একটু একটু করে সাবধানে অগ্রসর হচ্ছে, তিনি এসে গাড়ির পাশে দাঁড়ালেন। আমাদের তখন মনে হচ্ছিল কবির হয়ত একেবারেই চেতনা নেই। কিন্তু তা ঠিক নয়, – পরে জোড়াসাঁকোয় আমায় একবার জিজ্ঞাসা করলেন, – দেখো, ডাক্তার তো কালিম্পং আসেনি, কিন্তু নামবার সময় একবার তাকে দেখলুম, সে কি স্বপ্ন?’
এই কোমা ও বিষক্রিয়ার তন্দ্রা ভারি অদ্ভূত – বেশ লক্ষ করে দেখেছি বাইরে যখন চেতনার লক্ষণ নেই ভিতরে তখন যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে।
রাত্রি ন’টা নাগাদ আমাদের পাঁচ ছ’খানা গাড়ির ক্যারাভান শিলিগুড়ি পৌঁছল।এই সময় রবীন্দ্রনাথকে শিলিগুড়ি রেলস্টেশন থেকে কলকাতাগামী ট্রেনে তোলা হয়। এটাই ছিলো উত্তর বাংলায় কবির শেষ বিদায়। এই বিদায়ের ক্ষণে ‘শিলিগুড়ি স্টেশন লোকে লোকারণ্য।’
মৈত্রেয়ই দেবী আরও লিখেছেন,‘দুই কি তিনটে কামরা রিজার্ভ করা হল। একটা কামরায় ডা. অমিয় বোস, ডা. জ্যোতিপ্রকাশ সরকার,শ্রী সুরেন্দ্রনাথ কর ও আমি রোগীর পরিচর্যায় রইলুম। অন্য কামরায় আর সকলে চলে গেলেন। শ্রীযুক্ত প্রশান্ত মহলানবীশ আমাদের কামরায় ছিলেন না কিন্তু প্রায় প্রতি স্টেশনেই তাঁকে নেমে আসতে দেখেছিলুম। কারণ,খবর ছড়িয়ে পড়েছিলো,স্টেশনে গাড়ি আসলেই লোকের ভিড় উৎকণ্ঠিত হয়ে কুশল প্রশ্ন করছিল,রেলিঙের উপর চড়ে চড়ে ঘরের ভিতর দেখবার চেষ্টাও করছিল।
গভীর রাত পর্যন্তও স্টেশনে স্টেশনে এই স্নেহব্যাকুল জনতার উচ্ছ্বাস থামেনি। প্রশান্তবাবু ভয় পাচ্ছিলেন পাছে কোনো গোলমাল হয়। তাই হাত জোড় করে অনুনয় করে করে ভিড় সরাবার চেষ্টা করছিলেন। আমি জানালায় বসে বসে সে দৃশ্য দেখে নিজের অসীম সৌভাগ্যে লজ্জা বোধ করছিলুম। আমার চেয়ে যোগ্যতর ভক্ত,আমার চেয়ে অধিক উৎকণ্ঠিত,অধিক আগ্রহশীল আরো অনেকেই নিশ্চয়ই ওই ভীড়ের মিধ্যে ছিলেন,যারা এ নিশিথ রাত্রে উড়োখবর পেয়ে ভিড় ঠেলাঠেলি করে দাঁড়িয়ে আছেন,কখন এপথ দিয়ে ট্রেন যাবে,কখন একটুখানি দেখতে পাবেন সেই আশায়,– তাঁরা এ ঘরে ঢুকতে পাবেন না। তাঁদের ও পরম আত্মীয়ের চিরবিদায়ের মুহূর্তে স্নেহস্পর্শটুকু পাবার, মনের আর্তিটুকু পৌঁছে দেবার উপায় নেই।’
একমাস শয্যাশায়ী থাকার পর ১৮ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথকে শান্তিনিকেতন আনা হয়। শরীর অশক্ত,কিন্তু সৃষ্টির কাজে বিরাম নেই। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁকে ত্রিপুরার রাজদরবার থেকে এসে ‘ভারতভাষ্কর’ উপাধি প্রদান করা হয়।
তখন ‘যোগাযোগ’-এর ২য় পর্ব লেখার কথা ভাবছেন কবি,এছাড়াও অনেক লেখার ভাবনা কবির মাথায় ছিলো, কিন্তু সেগুলো আর বাস্তবে রূপ পেলো না! কবি ক্রমশ আরো অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন। বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন, ‘চলে আসার দিন রবীন্দ্রনাথকে দেখলুম রোগশয্যায়। ভাবিনি এমন দৃশ্য দেখতে হবে। বাইরে বিকালের উজ্জ্বলতা থেকে হঠাৎ তাঁর ঘরে ঢুকে চমকে গেলুম। অন্ধকার; এক কোণে টেবল-ল্যাম্প জ্বলছে। মস্ত ইজিচেয়ারে অনেকগুলো বালিশ হেলান দিয়ে কবি চোখ বুঁজে চুপ। ঘরে আছেন ডাক্তার, আছেন সুধাকান্তবাবু। আমরা যেতে একটু চোখ মেললেন, অতি ক্ষীণস্বরে দু-একটি কথা বললেন, তাঁর দক্ষিণ কর আমাদের মাথার উপর ঈষৎ উত্তোলিত হয়েই নেমে গেলো। বলতে পারবো না তখন আমার কী মনে হলো, কেমন লাগলো। হঠাৎ আঘাত লাগলো হৃৎযন্ত্রে, গলা আটকে এলো, কেমন একটা বিহ্বলতায় তাঁর দিকে ভালো করে তাকাতেও যেন পারলুম না। বাইরে এসে নিঃশ্বাস পড়লো সহজে। আমর কবি এই উজ্জ্বল আলোর চির সঙ্গী , রুদ্ধ ঘরে বন্দী হয়ে আছে ভঙ্গুর মৃৎপাত্র।’
ক্রমশ গুরুতর অসুস্থ কবির চিকিৎসা নিয়ে দ্বিমত দেখা দিচ্ছলো। এক পক্ষ অশতিপর কবির জন্য কবিরাজি চিকিৎসার পক্ষে ছিলেন,অন্যদিকে ডা. বিধানচন্দ্র রায় প্রমুখ বলছিলেন অপারেশানের মাধ্যমে নিরাময় ছাড়া অন্য পথ নেই। কবি নিজে কবিরাজির পক্ষে ছিলেন। ড. নীলরতন সরকারও অপারেশনের বিপক্ষে ছিলেন। তাঁর অভিমত ছিল, কবি এই বয়সে অপারেশনের ধকল সহ্য করতে পারবেন না। শান্তিনিকেতনে কবির কবিরাজি চিকিৎসা চলছিলো, করছিলেন শ্যামাদাশ বাচস্পতির ছেলে বিমলানন্দ কবিরাজ। কবির দেহ এই চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছিলো ধীরে ধীরে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অপারেশানের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত হলো। ২৫শে জুলাই কবিকে কলকাতা নিয়ে যাওয়া হবে। শান্তিনিকেতন থেকে রবীন্দ্রনাথকে জোড়াসাঁকোয় নিয়ে আসার তোড়জোড় শুরু হয়।
কবিকে বাসে করে বোলপুর নিয়ে যাওয়া হয়, তার পেছনে রথীবাবুর গাড়িতে ছিলেন রানী ও মীরা। রবীন্দ্রনাথকে স্টেচারে শুইয়ে নেওয়া হয়েছিলো, সঙ্গে ছিলেন ডা. জ্যোতি সরকার ও নাতনি নন্দিতা (বুড়ি)। বোলপুর স্টেশনে পৌঁছে কবিকে সেলুনে তোলা হল। সঙ্গে ছিলেন কবিরাজ মশাই, তাঁর নির্দেশে চিড়ের মণ্ড তৈরি করে আনা হয়েছিলো কবির খাদ্য হিসাবে। মাঝে মাঝে তাই তাঁকে খাওয়ানো হচ্ছিল। তাঁর অসুস্থতাজনিত ক্লান্তি বোঝা যাচ্ছিল। তবুও কৌতুকবোধ হারাননি তিনি। বর্ধমান এলে ‘কেমন আছেন?’ জিজ্ঞাসার উত্তরে মজা করে বলেন, ‘না, বেশ আছি, দিব্যি মুণ্ডু খেতে খেতে চলেছি।’ হাওড়া স্টেশনে নিউ থিয়েটার্স-এর বাস তাঁর জন্য হাজির ছিলো। দেবকী বসু এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
পরদিন, ২৬ জুলাই, কবি গুরুতর অসুস্থ হলেন, জ্বর এলো ধুম। এর মধ্যেই লিখলেন, ‘প্রথম দিনের সূর্য / প্রশ্ন করেছিল / সত্তার নূতন আবির্ভাব – কে তুমি? / মেলে নি উত্তর।’ ২৯ জুলাই বিকেলে কবি রচনা করলেন – ‘দুঃখের আঁধার রাত্রি বারে বারে / এসেছে আমার দ্বারে; … ভয়ের বিচিত্র চলচ্ছবি – / মৃত্যুর নিপুণ শিল্প বিকীর্ণ আধারে’।’ এ কোন রবীন্দ্রনাথ? গোটা জীবন যিনি পরাজয়কে জয় করার মন্ত্র উচ্চারণ করেছেন, সঞ্চারিত করেছেন, তিনি আজ ‘অনর্থ পরাজয়’-এর কথা বলছেন!
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
শেষ বিদায়-বিশ্বকবির চুড়ান্ত অপমান ও ভয়ঙ্কর বিশৃঙ্খলা
৩০ জুলাই, অপারেশানের দিন ঠিক হয়। চিকিৎসকেরা ঠিক করেছেন কবিকে অজ্ঞান করা হবে না। ‘লোক্যাল এনেস্থেশিয়া’ দেয়া হবে। জোড়াসাঁকোর বাড়ির পূর্বদিকের বারান্দায় অপারেশান করা হবে। তাই সাদা কাপড়ে জায়গাটা ঘিরে দেওয়া হয়েছে। সকাল সাড়ে ন’টায় রাণিকে কবি তিনটে কবিতার লাইন বললেন – ‘অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে / সে পায় তোমার হাতে / শান্তির অক্ষয় অধিকার।’ কবিতাটি সকালে লেখা ‘তোমার সৃষ্টির পথ’ কবিতার সঙ্গে জুড়ে দিতে বললেন।
এগারোটার সময় স্ট্রেচারে করে বাইরে এনে টেবিলে শুইয়ে দেওয়া হল। ললিতমোহনের সঙ্গে ছিলেন ডা. অমিয় সেন ও সত্যসখাবাবু। অজ্ঞান করার গ্যাস তৈরি থাকলেও তা ব্যবহার করা হয়নি। প্রস্টেট কাটা নয়, তলপেটে একটা ফুটো করে ইউরিন বেড় করে দেওয়ার রাস্তা করে দেওয়া। চিকিৎসার পরিভাষায় ‘সুপ্রা পিউবিক সিস্তোস্কোপি’। কবি সমস্তটাই টের পান, সহ্য করেন যন্ত্রণাকে। অপারেশানের পর ১২টা নাগাদ তাঁকে বিছানায় আনা হয়। ১ আগস্ট থেকে আরো অবনতি, প্রবল হিক্কা উঠতে থাকল। ৩ আগস্ট থেকে কিডনিটাও ঠিকঠাক কাজ বন্ধ করে দিলো।
সন্ধ্যায় শান্তিনিকেতন থেকে প্রতিমা দেবী এলেন,সঙ্গে কৃষ্ণ কৃপালিনি ও বাসন্তী। ৫ আগস্ট প্রায় কোমায় চলে গেলেন কবি। ডেকে আনা হলো ড. নীলরতন সরকার ও ডা. বিধানচন্দ্র রায়কে। ৬ তারিখ শেষ আশা হিসাবে কবিরাজ বিমলানন্দকে ডাকার কথা বললেন মীরা দেবী কিন্তু রুগী তখন তাঁর হাতের বাইরে, তবুও বললেন এমবি ৬৯৩ ওষুধটি বন্ধ করলে শেষ চেষ্টা করতে পারেন,কিন্তু বিধান রায় তাতে রাজী হলেন না।
রদিন রাখী পূর্ণিমা,অন্যদিকে কবির মহাপ্রস্থানের প্রস্তুতি চলছে। চিনা ভবনের অধ্যক্ষ এম্বারের জপমালা হাতে তাঁর মাথার সামনে ইষ্টনাম জপছেন। রামানন্দবাবু খাটের পাশে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করছেন। পণ্ডিত বিধুশেখর শাস্ত্রী ‘পিতা নোহাসি’ মন্ত্র পাঠ করছেন। শেষ রাত থেকে ব্রহ্মসঙ্গীত গাওয়া হচ্ছে।
ওদিকে আকাশবাণী থেকে কবির এই মৃত্যু পথযাত্রার খবর প্রচারিত হওয়ায় তাঁকে শেষ দেখার জন্য অজস্র মানুষ ছুটে আসতে শুরু করেছে। জমা হওয়া ওই ভিড় দোতলায় উঠবার জন্য উন্মাদ হয়ে ওঠে। ভেঙে পড়ে সমস্ত শৃঙ্খলা। জনতার চাপে কিছুক্ষণের মধ্যেই কোলাপসিবল গেট ভেঙে পড়লো। কেঊ কেউ জল নিকাশি পাইপ বেয়েও উঠতে লাগলো। স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে থকা শ্যামাপ্রসাদসহ প্রত্যেকে তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে অসহায় ভাবে দেখছেন।
১২টা নাগাদ কবির ডান হাতটা একটু উঠেই নেমে এল, একটা তীব্র আর্তস্বর ভেসে এলো ঘর থেকে, ‘গুরুদেব আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।’ তাঁকে যে ঘরে রাখা হয়েছিলো তার দুটো দড়জাই বন্ধ করে দেওয়া হলো।
কবির প্রাণহীন দেহটাকে শেষযাত্রার জন্য তৈরি করা হচ্ছে, তখনো উচ্ছৃঙ্খল জনতার বাঁধভাঙা চাপ আছড়ে পড়ছিলো সেই ঘরের দিকে। একদল জনতা টান মেরে দরজার ছিটকানি খুলে ফেললো। তখন নিরাভরণ, প্রাণহীন দেহটিকে স্নান করানো হচ্ছিলো। কবির শবদেহও কৌতূহলী মানুষের এই অপমান থেকে নিস্তার পেলো না। রাণী মহালানবিশের বয়ানে, ‘যে মানুষের মন এত স্পর্শকাতর ছিল, যে মানুষ বাইরের লোকের সামনে নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনের কথা কখনও প্রকাশ করতে পারতেন না, সেই মানুষটার আত্মাহীন দেহখানা অসহায়ভাবে জনতার কৌতূহলী দৃষ্টির সামনে পড়ে রইল।’ কবির শেষ ইচ্ছা ছিলো, ‘তুমি যদি আমার সত্যি বন্ধু হও, তাহলে দেখো আমায় যেনো কলকাতার উন্মত্ত কোলাহলের মধ্যে ‘জয় বিশ্বকবি’, ‘জয় রবীন্দ্রনাথের জয়’, ‘বন্দেমাতরম’ এরকম ধ্বনির মধ্যে সমাপ্তি না ঘটে। আমি যেতে চাই শান্তিনিকেতনের উদার মাঠের মধ্যে উন্মুক্ত আকাশের তলায়, আমার ছেলেবেলার মাঝখানে।’ সেখানে জয়ধনি থাকবে না, উন্মত্ততা থাকবে না। থাকবে শান্ত স্তব্ধ প্রকৃতির সমাবেশ। কলকাতার উন্মত্ত কোলাহল, জয়ধ্বনির কথা মনে করলে আমার মরতে ইচ্ছা করে না।’ এই কারণেই হয়তো শেষজীবনে পাহাড়ের নীরব শান্তির কাছে আসতে চেয়েছিলেন, থাকতে চেয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে। কিন্তু কবির অন্তিম ইচ্ছাগুলোকে সম্মান জানানোর কেউ ছিলেন না। বেলা ৩টা নাগাদ একদল লোক ঘরের মধ্যে ঢুকে ঠাকুরবাড়ির স্বজনদের চোখের সামনে দিয়েই কবির মরদেহ কাধে তুলে নিয়ে চলে গেলো, জয়ধ্বনি দিতে দিতে। অনিয়ন্ত্রিত সেই জনতার কাঁধে কবির দেহ, কেওড়াতলা নয়, চললো নিমতলার ঘাটে, যখন ঘাটে দেহ পৌঁছালো তখন আমাদের প্রাণের ঠাকুরের মুখমণ্ডল বিকৃত, চুল দাড়ি ছিঁড়ে নিয়েছে উন্মত্ত জনতার কেউ কেউ। সুন্দর ও শান্তির সাধকের চিরবিদায় নিতে হলো অসুন্দরের হাতে, উচ্ছৃঙ্খল জনতার মাঝে। যে ঈশ্বরপ্রতিম মানুষটি চিরকাল শান্তির মন্ত্র উচ্চারণ করে গিয়েছেন। যার নিজের ভাষ্য ছিলো, ‘চিরকাল জপ করেছি শান্তম। এখান থেকে বিদায় নেবার আগে যেন সেই শান্তম মন্ত্রই সার্থক হয়। কলকাতার উন্মত্ত কোলাহল, জয়ধ্বনির কথা মনে করলে আমার মরতে ইচ্ছে করে না।’ সেই কবিকে এক অশান্ত জনতার হাতে শেষ বিদায় নিতে হলো।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
* কবির সেই মত্যুর সময়কালের ঘটনা আমার প্রত্যক্ষদর্শন কোনভাবেই সম্ভব নয়- এর ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন! লেখার পুরো অংশটুকু প্রত্যক্ষদর্শীদের লিখিত বয়ান থেকে নেয়া। এখানে এই সকল তথ্যের সত্য মিথ্যা যাচাই করা আমার কম্মো নয়। লেখার কিছু অংশ অন্য সু্ত্র থেকে নেয়া কিছু অংশ আমার সাজানো ও সংযোজন করা। তথ্যগত সামান্য ভুলত্রুটি মার্জনীয়।- শেরজা তপন
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ সকাল ১১:৪৮
২৩টি মন্তব্য ২৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মুরাদ হাসানকে মন্ত্রিত্ব কেড়ে নেওয়া হইছে, মাহিয়া মাহি ওমরাহ করতে গেছেন

লিখেছেন জ্যাকেল , ০৭ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সকাল ৮:৩৭

নৈতিক স্খলন জনিত কারন দেখিয়ে তথ্য প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান ইহার মন্ত্রিত্ব তো গেল। ইমন (দালাল) সাক্ষাৎকারে বলেছে সে রেইপ করার কথা আগে জানতে পারেনি। এইদিকে মাহিয়া মাহি ওমরাহ করতে গিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুনজির- মুস্তফা.........

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৭ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সকাল ১০:৩৭

মুনজির- মুস্তফা.........


বাবার কোলে নিচ্ছেন শিশুকে। অনাবিল হাসি একরত্তির মুখে। আর বাবার চোখে মুখে পরিতৃপ্তির ছাপ। মেহমেত আসলানের তোলা এই ছবি সিয়েনা ইন্টারন্যাশানালে সেরা ছবির স্বীকৃতি পেয়েছে। ছবিটি সিরিয়ার সীমান্তে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনের কৌতুক

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ০৭ ই ডিসেম্বর, ২০২১ দুপুর ১২:০১


আলম সাহেবের বয়েস হয়েছে।
সরকারী চাকুরে ছিলেন, অবসর নিয়েছেন অনেক বছর আগেই। চোখের সামনে একমাত্র ছেলেটা ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠেছে। আলম সাহেবের স্ত্রী নিজের স্বাধ্যের মধ্যের সবটুকু দিয়ে মোটামুটি ধুমধাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ হরে জরুরি ভিত্তিতে যা করণীয়। ভূমি/জমি/বাড়ি বেদখল হলে করণীয়

লিখেছেন এম টি উল্লাহ, ০৭ ই ডিসেম্বর, ২০২১ দুপুর ১২:২৫



জোর করে কেও যদি আপনার সম্পত্তি দখল করে ফেলে, তখন আপনি কি করবেন? প্রতিনিয়ত জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট হতে কেউ না কেউ দখলচ্যূত হচ্ছেন। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রায়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোটলোক চেনার উপায় কী?

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:৩০



একবার এক ধনী লোক এক জায়গায় অনেক গুলা হীরা রাখে। সেখান থেকে একটা ইঁদুর ভুল করে হীরের টুকরো গিলে ফেলে।
হীরের মালিকের রাতের ঘুম উড়ে যায়। ইঁদুর মারার জন্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×