
আগের পর্বের লিঙ্কঃ
রীতা ব্যানার্জী- আই হুইটনেস(ফুলরাণী মা)- অযোধ্যা ফয়েজাবাদ
রীতা ব্যনার্জীর শ্বশুরমশায় ছিলেন 'গুমনামী বাবা বা ভগবানজীর ব্যক্তিগত ডাক্তার। সেই সুত্রেই উনার পরিবারের সাথে তাঁর বিশেষ সখ্যতা গড়ে ওঠে। খুব অল্প কিছু মানুষের সাথে তিনি মুখোমুখি সাক্ষাৎ করেছিলেন- এর মধ্যে এঁনাদের পরিবার ছিলেন বিশেষ আপন।
প্রথমবার যখন গুমনামী বাবা এই ডাক্তারের শরণাপন্ন হন, তখন চিকিৎসা শেষে তাঁকে বলেছিলেন;
- ডাক্তার সাহেব এখান থেকে বের হয়ে আপনি কাউকে কিছু বলবেন না। আমার নাম সন্ন্যাসীদের রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ হয়েছে- দুনিয়ার রেজিস্টার থেকে আমার নাম মুছে দেয়া হয়েছে।(মানে মুছে দেয়া হয়েছে- জোর করে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে।)
রীতা ব্যানার্জীর ভাষ্য;
- প্রথম দেখায় তিনি চোখে গোল চশমাটি লাগিয়ে মুখটা কাছে এনে বললেন। আচ্ছাসে দেখ-লো ম্যায় কোই সুভাস চান্দ্রা বোস তো নেহী?
- তিনি তার স্বামীকে একটা ফিলিপ্স রেডিও ঠিক করতে দিয়েছিলেন। রেডিও ঠিক করে ফেরত দেবার সময়ে প্রায় জোর করে রীতা ব্যানার্জীও গিয়েছিলেন তার সাথে। ওনার স্বামীর খুব তাড়া ছিল। কিন্তু সেই সময়ে গুমনামী বাবা স্নান কামরায় ছিলেন। ওদেরকে অপেক্ষা করতে বললে, রীতা বলল; বাবা আমরা বসতে পারব না তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে হবে। এরপর একদম সাইলেন্স; স্নানের ঘর থেকে কোন শব্দ আসছিল না দেখে- রীতা ভেবেছিলেন তিনি সম্ভবত রাগ করেছেন। তাই ভয়ে প্রশ্ন করেছিলেন; বাবা আপনি কি রাগ করেছেন?
- রাগ!! যার বাবা মা থাকতে বাবা মা নেই, যার ভাই বোন থাকতে ভাই বোন নেই যার নাম থাকতে গুমনামি, এমনকি যার দেশ থাকতে দেশ নেই। এমনকি নিজের দেশকে নিজের বলার অধিকার নেই- সে কি কখনো রাগ করতে পারে ? হ্যাঁ অভিমান করতে পারে।(এই প্রথমবার একথা পুরোটাই তিনি বাংলায় বলেছিলেন)
- বাবা আমি যদি কিছু রান্না করে আনি আপনি খাবেন?
-কিয়া বানানা জানতে হো তুম? শুক্ত বানানা জানতে হো- ঘন্টো বানান জানতে হো?
হ্যাঁ বাবা জানতি হু। ও দুটো আমার ও খুব প্রিয়।
– হা খাউঙ্গা
ক’দিন বাদে আমার শ্বশুরমশাই বাজার করে দিলে আমি নিজ হাতে রান্না করলাম। খাবার নিয়ে যাবার পথে গাড়ির ব্রেক ফেল হওয়ার পরে গাড়ির কিছু ক্ষতি হলেও আমরা অক্ষত ছিলাম। পরে স্কুটারে করে খাবার নিয়ে যাই। সেদিন ও তিনি স্নানঘরে ছিলেন।
আমরা এসেছি শুনেই বললেন; কোথাও চোট লাগেনি তো???
ভাষাগতঃ হিন্দীতে তিনি সাবুজ(সবুজ) বলতেন-যা হিন্দী ভাষায় নেই, শীতল পাটি( হিন্দিতে শীতল পাটি বলে কিছু নেই।
- তিনি একবার ছবি তুলতে চেয়েছিলেন। প্রশ্ন করেছিলেন- ছবি তুলে কি করবে- তোমার মনের মধ্যে আমার ছবি নেই?
- উঁনার মা বিথি চ্যাটার্জী লখনৌয়ের নাম করা গায়িকা ছিলেন। গুমনামী বাবার অনুরোধে তিনি কেত্তন, অতুল প্রসাদ, নজরুল গীতি গাইলেন। আপনি বিশ্বাস করবেন না, উনি বাংলা কেত্তন শুনে হাউ মাউ করে কাদছিলেন।
নজরুল গীতি শুনে উনি বলেছিলেন- ইস শাখ সে ইস শারির কা কিসি দিন কা বাস্তা থা।
- জন্মদিনে উনার ভক্ত ও প্রিয়জনেরা খেজুর গুরের পায়েস আর সন্দেশ কলকাতা থেকে নিয়ে আসত।
- উনি সিগার খেতেন জানতাম কিন্তু আমাদের সামনে কখনো খাননি। বহুদিন পরে উনার একটা ছবি দেখে চমকে উঠেছিলাম- বালিশে একটু উঁচু বিশেষ ভঙ্গীতে শুয়ে আছেন। আমাদের ভগবানজী মাঝে মধ্যের ঠিক অমন ভঙ্গীতে শুয়ে থাকতেন।
- উনি মারা যাবার পরে মাতাজি বারান্দাতে রাখা তার লাশের উপরে ঢেকে দেয়া চাদর সরিয়ে সবাইকে মুখটা দেখাচ্ছিলেন। সবাইকে বলছিলেন, কখনোতো তোমরা দেখতে পাওনি তাকে আজ দেখে নাও। আমি তাকে বললাম মাতাজি, উনি বেঁচে থাকরে নিজেকে সবসময় আড়ালে রেখেছেন। থাকনা একটু আড়ালে কি দরকার।
- লাশ ছিল দুদিন, দায়িত্ব ছিল আর কে মিশ্র উপরে সৎকার করা সবাইকে খবর দেয়া সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ন কাজের। উনি বলছিলেন উনি সবাইকে খবর দিয়েছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় তার এত গুনগ্রাহী ভক্ত অনুরাগীদের কেউ এল না এই দু দিনে!!! পরবর্তীতে মুখার্জী কমিশনে আর কে মিশ্র বলেছিলেন, যো বডি হামকো মিলি অ উনকি নেহি থা।
- মুখাগ্নি করার সময়ে ঝির ঝির করে বৃষ্টি হচ্ছিল। আর ঘাটের অনতিদুরে আর্মিদের একটা ফায়ারিং রেঞ্জ ছিল। কাকতলীয়ভাবে তখন সেখানে ফায়ারিং হচ্ছিল- মনে হচ্ছিল তোপধ্বনি!!
এক বছর আগে রীতা ব্যানার্জীর নেয়া 'কুনাল বোসের' শেষ সাক্ষাৎকার। অনেক প্রশ্নের উত্তর পাবেন এখানে;
'গুমনামী' ফিল্মের পরিচালক সৃজিত তাঁর টিম নিয়ে ভিজিট করছেন রীতা ব্যানার্জীর বাড়িতে।
***
এবার এই সাক্ষাৎকারটি দেখুন; মুখার্জী কমিশনের এক বিচারক কিভাবে নিশ্চিত হয়েছিলেন গুমনামী বাবাই আসলে নেতাজী?
গুমনামী বাবার ট্রাঙ্কে একটা বিশেষ ম্যাপ পাওয়া গিয়েছিল- কি ছিল সেই ম্যাপে? সাহায় কমিশনের বিচারককে তিনি গুমনামী বাবার কামরায় পাওয়া সব বইয়ের তাঁর হ্যান্ড নোট পড়তে বলেছিলেন। সেই হ্যান্ড নোটগুলোতে এমন কিছু কথা ছিল, যা নেতাজী ছাড়া অন্য কারো কল্পনা করা অসম্ভব ছিল।
নেতাজীর নাতনী জয়ন্তি রক্ষিত(ভাইয়ের মেয়ে -অশোকনাথ বসুর কন্যা)- যিনি বলেছেন; ওই সাধুজীই ছিলেন তাঁর দাদা সুভাষ চন্দ্র বোস।
* বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে ৩৩ মিনিট থেকে শুনুন।
** গুমনামী বাবা নিয়ে আলোচনা ৩৯।৩০ মিনিট থেকে। (৪৫ঃ৩০ মিনিট থেকে গুমনামী বাবাকে নিয়ে সিরিয়াস আলোচনা। বিশ্বাস করুন আর না-ই বা করুন, অবশ্যই সাক্ষাৎকারের এই অংশটুকু দেখার অনুরোধ রইল।)
****
গুমনামি বাবা আসলে কে! নেতাজিকে ঘিরে সহায় কমিটির তোলপাড় করা রিপোর্ট পেশ
ডিসেম্বর ২১, ২০১৯ সাল
শোনা যায়, তাঁর শেষকৃত্যের সময় উত্তর প্রদেশের সরযূ নদীর তীরে ছিলেন তাঁর ১৩ জন শিষ্য। বহু রিপোর্ট বলছে, উত্তর প্রদেশের তাবড় মন্ত্রী থেকে দেশের নামী দামী ভিভিআইপিরা উত্তরপ্রদেশের 'ভগবানজি' বা 'গুমনামী বাবা'র আশ্রমে যেতেন। কেউ বলতেন তাঁর সঙ্গে নেতাজি সুভাষ বসুর হুবহু মিল রয়েছে, কারোর মতে তিনিই স্বয়ং নেতাজি আবার কেউ বলতেন গুমনামী একজন ঠগ! গুমনামী বাবাই কি দেশনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু? এমন প্রশ্নের উত্তর ঘিরে একাধিক রহস্যের জাল বিছানো রয়েছে। এবার সেই সন্দেহের জাল ঘিরে তথ্য পেশ করল বিষ্ণু সহায় কমিশনের রিপোর্ট।
গুমনামী বাবা কে? উত্তরে কমিটির রিপোর্ট যা বলছে সাহায় কমিটির সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, উত্তরপ্রদেশের গুমনামী বাবা আসলে নেতজি নন। তিনি ছিলেন নেতাজির 'শিষ্য'। শুধুমাত্র দু'জনের কণ্ঠস্বর একই রকম ছিল। রিপোর্ট বলছে, 'ফৈজাবাদের (অযোধ্যা) রামভবনে যেখানে গুমনামী বাবা থাকতেন,সেখান থেকে পাওয়া জিনিসপত্র থেকে কিছুতেই এই উপসংহার টানা যায় না যে গুমনামী বাবাই নেতাজি ছিলেন।'
প্রসঙ্গত, এর আগে গুমনামী বাবার আশ্রম থেকে পাওয়া বহুবিধ জিনিসের সঙ্গে নেতাজির পছন্দ অপছন্দের মিল পাওয়া গিয়েছে। অসমর্থিত সূত্র বলে , নেতাজির লেখা বহু নথির সঙ্গে গুমনামী বাবার লেখা বহু চিঠিতে হাতের লেখার মিল পাওয়া যায়।
গুমনামী বাবা কি বাঙালি ছিলেন!
কমিশনের রিপোর্ট বলছে, গুমনামী বাবা বাঙালি ছিলেন। তিনি বাংলা ছাড়াও হিন্দি ও ইংরেজিতে দারুন পারদর্শী ছিলেন। কমিশনের মনে হয়েছে, নেতাদির মতো কথাবলার ধরন গুমনামী বাবার থাকলেও তিনি নেতাজি নন। রিপোর্ট বলছে, নেতাজির মতো গুমনামী বাবারও বিশ্বরাজনীতি ও যুদ্ধ সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান ছিল। ভারতের সরকার পরিচালনা নিয়ে তাঁর অগাধ আগ্রহ ছিল বলেও দাবি করছে সাহায় কমিশনের রিপোর্ট। কেন গুমনামী বাবা নেতাজি নন? সাহায় কমিটির রিপোর্ট বলছে, ১৯৮০ সালের ১৬ অক্টোবর একটি চিঠি পাঠানো হয় গুমনামীবাবাকে। সেই চিঠি কলকাতা থেকে বুলবুল নামের জনৈক কেউ পাঠিয়েছিলেন। আর সেখানে লেখা ছিল যে ' আমার বাড়ি আপনি কবে আসবেন?নেতাজির জন্মদিনের দিন আপনি আসলে খুবই খুশি হব।' আর এই চিঠিই বলে দিচ্ছে যে গুমনামী বাবা নেতাজি নন। এমনই দাবি করেছে সাহায় কমিশন।
রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী এক বাঙালি যুবকের আনাগোনা ফৈজাবাদের আশ্রমে গুমনামী বাবার শিষ্যদের দাবি ছিল , উত্তর প্রদেশের আশ্রমে যখন তাঁদের 'ভগবানজি' ছিলেন তখন সেখানে আশ্রমে তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতেন। তাঁকে পোশাক, ফলমূল কিনে দেওয়ার জন্য আসতেন তখৎকালীন এক তরুণ বাঙালি কংগ্রেস নেতা। যিনি পরবর্তী কালে দেশের তাবড় 'নাম' হয়ে ওঠেন। পরবর্তীকালে দেশের সম্মানীয় এক পদে ওই বাঙালি রাজনীতিবিদকে দেখা যায়।
শোনা যায়, যখন ভিয়েৎনাম যুদ্ধ চলছে তখন হোচিমিনের চিঠি আসত গুমনামীর কাছে। চিঠি আসত দেশবিদেশের আরও জায়গা থেকে। প্রশ্ন উঠতে থাকে গুমনামী আসলে কে? কেনইবা তাঁর কাছে এমন তাবড় আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক নেতাদের চিঠি আসে? সাহায় কমিশনের রিপোর্ট কী বলছে?
সাহায় কমিশনের রিপোর্ট অবশ্য শেষে বলছে, 'এ লজ্জাজনক যে তাঁর শেষকৃত্যে মাত্র ১৩ জন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তাঁর শেষযাত্রায় আরও সম্নান প্রাপ্য ছিল।
যে মানুষটিকে শেষ বিদায় জানাতে ১৩ লাখ মানুষের উপস্থিত থাকার কথা, আজ তাঁর পাশে মাত্র ১৩ জন।
'মৃত' নেতাজির যে ছবিগুলি দেখে চমকে উঠেছিল বাঙালি
গত দু-তিনটি নেতাজির মৃত্যু-সংক্রান্ত যত আলোচনা হয়েছে, তার সিংহভাগ জুড়েই আছে একটি প্রশ্ন – গুমনামী বাবাই কি নেতাজি? কমবেশি প্রায় সব গবেষকই একটি সিদ্ধান্তে নিশ্চিত হয়েছেন যে, বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়নি। তার পরবর্তীকালে সুভাষের গতিবিধি সম্পর্কে উঠে এসেছে একাধিক তথ্য, হয়েছে বিস্তৃত আলোচনাও। বিভিন্ন সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করে, মোটামুটি দুটি সমাধানে আসা যায় –
• রাশিয়াতেই বন্দিদশায় থাকাকালীন নেতাজির মৃত্যু হয়।
• রাশিয়া থেকে তিনি ভারতে ফিরে এসেছিলেন এবং আত্মগোপন করেছিলেন গুমনামী বাবার ছদ্মবেশে। উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদে আশির দশকে মৃত্যু হয় তাঁর।
এখনও পর্যন্ত যত প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং যাচ্ছে, তাতে গুমনামী বাবাই যে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু – এ-ধারণা দৃঢ় হচ্ছে দিনকেদিন। শুধুমাত্র এই প্রমাণ ও তর্ক নিয়েই আলোচনা করা যায় পাতার পর পাতা। উৎসাহী পাঠক নিশ্চয়ই সেগুলি সম্পর্কে ওয়াকিবহালও। একাধিক বই, প্রবন্ধ ও অডিও-ভিস্যুয়াল মাধ্যমে আলোচনাও পাওয়া যায় একটু খুঁজলেই। সেই প্রমাণগুলি সম্পর্কে তুল্যমূল্য আলোচনার পরিসর এটি নয়। তবে অনেক বছর ধরে নেতাজির মৃত্যু রহস্য সম্পর্কে পড়াশুনা করার পর, এবং এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত যাবতীয় যুক্তি ও প্রমাণ বিশ্লেষণ করে আমার মনে হয়, হ্যাঁ, গুমনামী বাবাই নেতাজি ছিলেন। অবশ্য এ-মত একান্তই ব্যক্তিগত।
ব্যক্তিগত ধারণা ছেড়ে এবার একটু নৈর্ব্যক্তিকতায় আসা যাক। সংক্ষেপে বললে, গুমনামী বাবার হস্তাক্ষরের সঙ্গে মিলে গেছে নেতাজির হস্তাক্ষর। এমনকি, গুমনামী বাবার গলা যাঁরা শুনেছেন, নেতাজির কণ্ঠের সঙ্গে মিলও পেয়েছেন অনেকেই। তাঁর ঘর থেকে এমন অনেক জিনিস পাওয়া গেছে, যা দেখে নেতাজির সঙ্গে স্পষ্ট যোগসূত্র স্থাপন করা যায়। এমনকি, সুভাষ-ঘনিষ্ঠ অনেকের সঙ্গেই গুমনামী বাবার ব্যক্তিগত পত্রবিনময় হত।
গুমনামী বাবার মৃত্যুর তারিখ ১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৫। মৃত্যুর কারণ বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা। ১৯৮২ সাল থেকে তিনি বসবাস করছিলেন উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদে, ‘রামভবন’ নামের একটি বাড়িতে। অবশ্য ছয়ের দশক থেকেই হদিশ পাওয়া যায় গুমনামী বাবার। সারা উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় দীর্ঘ দু-দশক কাটিয়েছেন তিনি। সাক্ষীরা বলেছেন, মাঝেমধ্যেই অন্তর্হিত হয়ে যেতেন তিনি। অর্থাৎ উত্তরপ্রদেশ ছেড়ে বাইরে কোথাও যেতেন। কিছুদিন পর আবার ফিরে আসতেন ওই রাজ্যে।
***
গুপ্তার ঘাটে সরযূ নদীর তীরে সম্পন্ন হয় শেষকৃত্য। তারপর, গুমনামী বাবার স্মৃতিতে সেখানে তৈরি করা হয় একটি সমাধি। সমাধিটি তৈরি করিয়েছিলেন রামভবনের মালিক শক্তি সিং। সমাধিতে গুমনামী বাবার জন্মতারিখ লেখা – ২৩ জানুয়ারি, ১৮৯৭। মৃত্যুর তারিখের পাশের জায়গায় জিজ্ঞাসাচিহ্ন। কেন? গুমনামী বাবার তো ১৬ সেপ্টেম্বর মৃত্যু হয়েছিল!
প্রসঙ্গত, ভক্ত ও অনুগামীরা তাঁকে 'ভগবানজী' নামেই ডাকতেন। তাঁর আসল নাম অজানা হওয়ায়, পরবর্তীকালে সংবাদ মাধ্যম তাঁকে 'গুমনামী বাবা' নামে অভিহিত করে।

প্রতিবছর, ২৩ জানুয়ারি তাঁর কাছে জন্মদিনের শুভেচ্ছাবার্তা-সহ প্রচুর চিঠি আসত। লিখতেন নেতাজি-ঘনিষ্ঠ অনেকেই। রামভবনের ঘর থেকে পরবর্তীকালে পাওয়া গেছে সেসব চিঠি। নেতাজির জন্মসালও কিন্তু ১৮৯৭-ই।
নেতাজীর অতিভক্তরা অবশ্য বলে;
গুমনামী বাবার মৃত্যু হয়নি। অন্য কারও লাশকে মৃতদেহ সাজিয়ে দাহ করা হয়, এবং রামভবন থেকে অন্তর্ধান করেন তিনি।
তারা আরো বলে যে গুমনামী বাবার দাহকার্যে দেরি হল দুদিন, মৃতদেহ ব্যান্ডেজে ঢাকা ছিল পুরো, সৎকারে উপস্থি ছিলেন মাত্র ১৩ জন – এসবের সঙ্গে কি অন্য কোনো ঘটনার মিল পাচ্ছেন? তাইহোকুর তথাকথিত বিমান দুর্ঘটনা ও তার পরবর্তী ঘটনাবলির সঙ্গে কি মিল নেই এই চিত্রনাট্যের? মিল পাওয়া যায় তাইহোকুতে নেতাজির সৎকার-জনিত ঘটনার সঙ্গেও। সবচেয়ে বড় যে প্রশ্ন উঠে আসে, তা হল, গুমনামী বাবার কি ওই দিন আদৌ মৃত্যু হয়েছিল, না ফৈজাবাদ থেকে আবার অন্তর্ধান করেছিলেন তিনি?

গুমনামী বাবার কোনো ডেথ সার্টিফিকেট ছিল না। ছিল না সৎকারের অনুমতিপত্রও। খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছাড়া মৃত্যুর কথা জানেওনি কেউ, যতক্ষণ না সৎকার হচ্ছে। জীবিতাবস্থায় গুমনামী বাবার মুখ দেখেননি প্রায় কেউই। মৃত্যুর পরেও না। সত্যিই কি মৃত্যু হয়েছিল?
যদি ১৮৯৭ সালেই জন্ম হয়, ১৯৮৫ সালে তাঁর বয়স ৮৮। এই বয়সে সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে আবার অন্তর্ধানের কথা ভাবাটা খানিক অবাস্তব। যদি তা সত্যি হয়ও, তারপর কোথায় গেলেন তিনি? কী করেই বা শেষ পর্যন্ত মৃত্যু হল তাঁর? বেশ কয়েকজন গবেষক, সাংবাদিকের অভিমত – ১৬ সেপ্টেম্বর গুমনামী বাবার মৃত্যু হয়নি। অন্য কারও লাশকে মৃতদেহ সাজিয়ে দাহ করা হয়, এবং রামভবন থেকে অন্তর্ধান করেন তিনি। যাবতীয় জিনিসপত্র রেখেই যান, যাতে লোকের মনে বিশ্বাস জন্মায় যে তিনি সত্যিই মারা গেছেন। কিন্তু ওই বয়সে আবার অন্তর্ধানের প্রয়োজন হল কেন তাঁর? কেউ কেউ বলেন, ফৈজাবাদে দ্রুত এই কথা ছড়িয়ে পড়ছিল যে, গুমনামী বাবাই নেতাজি। তাঁর প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ্যে আসছিল একে একে। বাংলার নেতাজি-ঘনিষ্ঠরাও কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে, নিজের পরিচয় শেষ বয়সে আর প্রকাশ্যে আনতে চাননি বলেই রামভবন তথা ফৈজাবাদ ছেড়ে চলে যান।
যদি ১৬ সেপ্টেম্বর মৃত্যু না-ই হয়, তাহলে কোথায় গেলেন গুমনামী বাবা? উত্তর আজও অজানা।
আর ব্যক্তিগত বিশ্বাসের কথা আগেই বলেছি। এখন অবধি প্রাপ্ত যাবতীয় তথ্য ও প্রমাণ পড়ে, আমার বিশ্বাস, তিনিই নেতাজি। আর, কিছু গোপন ও নির্ভরযোগ্য সূত্র মারফত এ-বিষয়ে নিশ্চয়তাও পেয়েছি। কিন্তু ব্যক্তিগত বিশ্বাস দিয়ে ইতিহাসের বিশ্লেষণ হয় না। কাজেই সেটা সরিয়ে যুক্তি দিয়েই ভবিষ্যতের ভাবনাচিন্তা এগোক।
সবকিছুর পরেও, গুমনামী বাবার মৃত্যুর সঙ্গেও মিশে রইল রহস্য। নেতাজির মতোই। জেগে রইল সেই প্রশ্নও – গুমনামী বাবাই যদি নেতাজি হন, শেষ পর্যন্ত কী হল তাঁর?
***
~ পাকিস্থান থেকে ছাড়া পেয়ে ৭২ সালে এক ভাষনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বাঙ্গালীরা যুদ্ধে জিতেছে সেটাই প্রমাণ হয় যে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র এখনো বেঁচে আছেন।
আসুন আগে ডাঃ পবিত্র মোহন রায় সন্মন্ধে একটু জেনে নিই;
ডাঃ পবিত্র মোহন রায়; তিনি ডাক্তার হিসাবে প্রশিক্ষিত হয়েছিলেন কিন্তু পরে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেন এবং ছিলেন আইএনএ-এর গোপন সেবায় কর্মরত (সিক্রেট সার্ভিস)। নেতাজি তাকে অত্যন্ত বিশ্বাস করতেন। পরে পবিত্র মোহন রায় যখন ভগবানজি (গুমনামি বাবা) এর সাথে দেখা করেন, ভগবানজি তাকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করেন এবং পরীক্ষার পরে তার সাথে সাক্ষাৎ করেন।
গুমনামী বাবা তার এক চিঠিতে লিখেছিলেন যে "পবিত্র আমার গোয়েন্দা কর্মকর্তা" এবং পবিত্র মোহন রায়ের কাছে নেতাজি এবং ভগবানজি সম্পর্কে সমস্ত তথ্য ছিল এবং তার ডায়েরিতে ভগবানজির সাথে সম্পর্কিত সবকিছু ছিল।
পবিত্র মোহন রায় তার আত্মজীবনীতে "নেতাজির সঙ্গে সাক্ষাৎকার" শিরোনামে লিখেছিলেন, যেখানে তিনি ভগবানজির সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করেছিলেন।

পবিত্র মোহন রায়কে গুমনামী বাবা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে ফিল্ড মার্শাল এস।এফ।জে মানকেশের সাথে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন। ব্যাপারটা টপ সিক্রেট ছিল ( ফিল্ড মার্শাল এস.এফ.জে. মানেকশ ছিলেন ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান।এই যুদ্ধ ছিল ভারতের জন্য একটি অভূতপূর্ব বিজয়, যা বাংলাদেশকে পাকিস্তানি শাসন থেকে মুক্ত করেছিল এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজির অধীনে ৯০,০০০ পাকিস্তানি সৈন্যদের পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। এই বিজয়ে তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ইন্দিরা গান্ধী মানেকশকে জীবনের জন্য ফিল্ড মার্শালের মর্যাদা প্রদান করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীতে তিনিই প্রথম ফিল্ড মার্শাল। ফিল্ড মার্শাল কারিয়াপ্পা এবং এয়ার মার্শাল অর্জন সিং, যদিও মানেকশের সিনিয়র ছিলেন, তবে মানেকশের আগে অবসর গ্রহণ করেছিলেন। মানেকশ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সময় বীরত্বের জন্য মিলিটারি ক্রস পুরস্কারও অর্জন করেছিলেন।)

***
শেষ কথাঃ
কুনাল বোসের আড্ডায়
• কেশব ভট্টাচার্য-নেতাজী এখনো বেঁচে আছেন!
- দ্বীতিয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীর প্রথম আইন ছিল ২৫ বছর মানে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত যাদের আটক করা হবে তাদের বিচার হবে। ১৯৭১ সালের পরে আরেকটা আইন হল ১০০ বছর পরেও যদি কাউকে ধরা হয় তাহলে তাকে মুল মিত্র দেশ আমেরিকা বা বৃটিশদের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।দ্বীতিয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছিল ২রা সেপ্টেম্বর ১৯৪৬। তিনি ছিলেন সেই হিসেবে ওয়ার ক্রিমিনাল। মাউন্ট ব্যটন ও ম্যাক আর্থার( ইউ এস এ) এর বাহিনী তাকে খুঁজেছে। গুমনামী বাবার কাছে বাংলাদেশের সংবিধান ও ছিল!! লোকনাথ বাবা ১৬৫ বছর বেঁচে ছিলেন! ( জিনলুইস কালমেন্ট, ফ্রান্স- ১২২ ব। ১৬৪ দিন)। ১৯৫৬ সালে(১০ আগষ্ট) তাইওয়ান গভমেন্ট রিপোর্ট – নেতাজী মারা যাননি।
রাশিয়া আজাদ-হিন্দ সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। বিমান দুর্ঘটনার চারদিন পর প্রথম নিউজ করেছিল রয়টার্স। কোন দেশের সরকারই অফিসিয়ালি ঘোষনা দেয়নি।
১৫ই আগষ্ট জাপান ডিক্লেয়ার করল তারা আত্ম সমর্পন করবে। ২ রা সেপ্টেম্বর তারা অফিসিয়ালি ডিক্লেয়ার দেয়।
১৮ই আগষ্ট বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ৪ মাস পরে তিনি ২৬ ডিসেম্বর ৪৫ সাল, ০১লা জানুয়ারি ৪৬ সাল ও ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ান রেডিওতে মোট তিনটি ভাষন দিয়েছিলেন। সুত্র ইন্ডিয়ান গভমেন্ট ফাইল
- আমি এখন বিশ্বের বড় একটা শক্তির আশ্রয়ে আছি। আমার হৃদয় পুড়ছে ভারতবর্ষের জন্য। দ্বীতিয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে সত্য –কিন্তু তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাগত।
- ~ প্রভা জগন্নাথ্ন নামে সাংবাদিক লিখেছিলেনঃ নেতাজি ভিয়েতনাম যুদ্ধের অনেক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত ছিলেন।
- স্বাধীনতা যুদ্ধের সব ডকুমেন্ট বা গোপন দলিলগুলো ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে পুড়িয়ে ফেলা হয়।
- ঝিকরগাছা, নীলগঞ্জ বারাসাত অঞ্চলে ১৯৪৫ এর ২৫শে সেপ্টেম্বর ইংরেজ বাহিনী আটককৃত আজাদ ফৌজের(আই এন এ- ইন্ডীয়ান ন্যাশনাল আর্মি) শেল্টার ক্যাম্পে গুলি চালিয়ে কয়েক হাজার স্বাধীনতাকামী সেনাকে হত্যা করেছিল। ইতিহাসে যা বিস্মৃত হয়েছে। বেশ কিছুদিন বাদে নেহেরু বলেছিলেন সেখানে ৫ জন মাত্র লোক মারা গেছে, কিন্তু সরকারি দলিল ঘেঁটে জানা গেছে ১৫৭০ জন আই এন সৈন্যকে হত্যা করা হয়েছিল। আসল সংখ্যা ছিল এর কয়েক গুন।
- অপুর্ব চন্দ ঘোষ, সিসিকান্ত শর্মা ও দুর্গা প্রসাদ পান্ডে; এদের প্রত্যেকেরই বয়স তখন নব্বুই এর উপরে। তারা মুখার্জী কমিশোনের কাছে দৃঢ় গলায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন যে, ৪১ শের আগে তারা সুভাষের কাছের মানুষ ছিলেন- তাকে একান্ত ঘনিষ্ঠভাবে চিনতেন। এরা সবাই গুমনামী বাবার সাথে প্রত্যক্ষ সাক্ষাত করেছেন এবং উনার নিশ্চিত ছিলেন যে, গুমনামী বাবাই প্রকৃত সুভাষ চন্দ্র বোস।
- সেকেন্ডারি এভিডেন্সঃ ততকালীন শূধু ভারতবর্ষ নয় সারা বিশ্বের স্বনামধন্য হ্যান্ড রাইটিং এক্সপার্ট পি লাল দীর্ঘ গবেষনা করে বলেছিলেন, বয়সের কারনে কিংবা ইচ্ছাকৃত চেষ্টার ফলে হাতের লেখার কিছু পরিবর্তন হয়েছে সত্য কিন্তু আমি হলফ করে বলতে পারি দুটো হাতের লেখাই নেতাজীর।
- আর সরকারের নিয়োগকৃত হ্যান্ড রাইটিং এক্সপার্টদ্বয় যারা মুলত পি লাল এর ছাত্র। তাঁরাই ভাল করে যাচাই-বাছাই না করে কয়েক ছত্রে লিখে দিলেন গুমনামী বাবার সেই হাতের লেখার সাথে নেতাজীর হাতের লেখার কোন মিল নেই। এ নিয়ে ততকালীন আদালত তাদের চরম তিরস্কার করেছিল। তবে সরকারি এভিডেন্সকে আদালত অবজ্ঞা করতে পারেনি। পি লাল পরবর্তিতে তার এর গবেষনার বিষয়বস্তু ইন্ডিয়া টাইমসকে দিয়েছিলেন। ইন্ডীয়া টাইমস সেই আর্টিকেল বেশ গুরুত্বের সাথে প্রচার করেছিল।
- দাঁতের ডি এন এ টেষ্ট। এটা চরম ভুয়া একটা বিষয়। সেটা কি আদৌ গুমনামী বাবার দাঁত নাকি অন্যকারো দাত ছিল এটা কেউ হলফ করে বলতে পারে না। তার কামরায় একটা ম্যাচবাক্সের মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল বলে সেটা তার দাঁত-ই ছিল তার কোন প্রমান নেই।
কোট অফ গুমনামী বাবাঃ তোমরা জাননা তোমরা ভাবতেও পারবে না, কিভাবে ও কি শক্তি নিয়ে তোমাদের মৃত মানুষটি কাজ করে যাচ্ছে। তোমরা কল্পনাও করতে পর্যন্ত ভয় পাবে- তোমাদের মাথা ঘুরে যাবে যদি হঠাৎ করে তার কাজের কিছুটাও জানতে পার।
সমাপ্ত
প্রথম পর্বঃ
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুলাই, ২০২৪ বিকাল ৫:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


