কাল একটা মুভ্যি দেখছিলাম, নাম ভুলে গিয়েছি। মুভ্যিটা করা হয়েছে আমেরিকার একটা ইহুদী স্কুলকে কেন্দ্র করে। সব ধার্মিক ইহুদী। মাথায় ছোট্ট গোল টুপি। বাইরের লোকের প্রতি তীব্র সন্দেহ। বড় বড় মানুষদের, টিচার, বাবা মায়ের ইহুদী ছাড়া আর কারো প্রতি বিন্দুমাত্র বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। এক ধরনের নাক উঁচু মনোভাব।
এরই মধ্যে একদল ছেলে বাস্কেটবল খেলতে চায়। ছোট ছোট ইহুদী শরীর, যেখানে ভীষণ বুদ্ধিমান মাথা আছে, কিন্তু খেলোয়ার শরীর নেই, বাস্কেটবলের জন্য খুব ভালোবাসা আছে, কিন্তু আশে পাশে কেউ বাস্কেটবলকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে জানে না। ছোট্ট পরিসরে ওদের ছোট্ট সংগ্রাম দেখায়। বড় ভালো লাগে দেখতে। গায়ে শিহরন লাগে। চরিত্রের সাথে সাথে চোখে পানি আসে, গর্বে বুক ভরে যায়, হতাশা হয়, ভালো লাগে।
আমরা নিজেদের গল্প পড়তে, শুনতে বেশি ভালোবাসি। ধার্মিক ইহুদী স্কুলের বাস্কেটবল পাগল ছেলেদের গল্প কি করে আমার গল্প হলো, সেটা বুঝা একটু সমস্যাই। একে তো ইহুদী, তার উপর বাস্কেটবল পাগল, তার উপর একদল টিনেজ ছেলে! কোন ভাবেই তো হিসাব মিলে না!
তবু, আমার গল্প। আপনারা দেখলে হয়তো আপনাদেরও গল্প হতো।
কারণ, এই গল্পটা মানুষের গল্প।
যতই দূরের মনে হোক মানুষগুলোকে, মানুষগুলোর সংগ্রাম আসলে একই। "বিশাল এই পৃথিবীতে নিজের একটু জায়গা করে নেয়া। হিসাব মিলানো, পৃথিবীকে কোন পথে দিলে সবচেয়ে বেশি দেয়া যাবে।"
এবার চারিদিকে তাকান। কিছু গুটিকতক মানুষ ছাড়া আসলে সব মানুষের মধ্যেই এই একটা ব্যাপার দেখতে পাবেন। তার দৃষ্টিভঙ্গিকে যতই ঘৃনা করেন, একটু ভিতরে ঢুকে তাকে বুঝার চেষ্টা করুন। আপনি যেই তীব্র আকুতি নিয়ে পৃথিবীর জঞ্জাল পরিষ্কারে নেমেছেন, সেও তাই। হয়তো আপনি যাকে জঞ্জাল ভাবছেন, সে সেটাকে তা ভাবতে পারছে না। আপনি যেভাবে জঞ্জাল পরিষ্কার করতে চাইছেন, সে সেই পথকে নিজের পথ ভাবতে পারছে না।
আবার নিজের দিকে তাকান। আপনি জীবনে যত মানুষের সাথে মিশেছেন, যেই পরিস্থিতিতে থেকেছেন, প্রতিটা মানুষ, প্রতিটা পরিস্থিতি থেকে একটু একটু করে নিজের মধ্যে নিয়ে নিয়েছেন। কখনও ইচ্ছায়, কখনও অনিচ্ছায়। কখনও ছিনতাইকারীর হাতে পড়ে থাকলে, তার থেকেও কিছু নিয়েছেন, শিখেছেন। হয়তো এখন সব ছিনতাইকারীদের তীব্র ঘৃণা আর ভয় করেন। কখনও কোন ছিনতাইকারীর পাল্লায় না পড়লে ঠিক এতটা ঘৃণা আর ভয় করতে পারতেন না। অথবা হয়তো আগে যতটা ভয় আর ঘৃণা করতেন, সেটা দূর হয়ে এখন সেখানে সহমর্মিতা ভর করেছে। এটাও তাকে সামনা সামনি দেখার ফল।
এভাবে প্রতিটা মানুষ। প্রতিটা টিভি শো। প্রতিটা গান। প্রতিটা নাটক। প্রতিটা বই। প্রতিটা ঘটনা আপনাকে একটু একটু করে গড়ে তুলেছে।
দুই যমজ, যাদের জিন সব একই, তাদের শুধু এই অভিজ্ঞতার পার্থক্যের কারণেই দু'জন ভিন্ন মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে দেখা যায়।
শুধু মাত্র এই কারণটায় আপনার সাথে তর্ক করতে থাকা মানুষটার চিন্তা চেতনা আপনার থেকে এতো আলাদা। আপনি হাজার চেষ্টা করলেও 'ঠিক' আপনার মত করে কখনও তাকে ভাবাতে পারবেন না। খুব কাছাকাছি আসতে পারে, কিন্তু কখনই একদম এক রকম হবে না। মানুষ হওয়ার আনন্দ বোধ হয় এখানেই!
আমাদের যারা নিয়ন্ত্রন করে, রাজনীতিবিদগণেরা, পয়সাওয়ালারা, মিডিয়ার নিয়ন্ত্রকেরা, এই সব 'বড় বড় মানুষদের' জন্য 'শত্রু' থাকা লাভজনক। তাতে নিজের ব্যর্থতার দোষ চাপানো যায় অন্যের ঘাড়ে।
"শত্রুর ষড়যন্ত্র আমাদের সামনে এগুতে দিচ্ছে না। ওদের ঘৃণা করা আমাদের কর্তব্য। ওরা আস্তিনের সাপ। আমাদের অস্তিত্ব গুড়িয়ে দিতে যায়। ষড়যন্ত্র নস্যাত করে দিতে হবে..."
জনমনে 'শত্রুর' প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করা যায়। তাদের কথা বাড়িয়ে বলে ভয় সৃষ্টি করা যায়।
মানুষের মধ্যে 'অনেক কিছু করার ক্ষমতাকে' ধ্বংসাত্মক রূপ দেয়া যায়। ধ্বংস করতে ব্যস্ত থাকা মানুষেরা যারা আখের গুছাচ্ছে, তাদের দিকে খেয়াল দিবে কম।
এভাবে মানুষগুলোকে নিয়ন্তনে রাখা যায়। যদি পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ প্রতিটা মানুষকে বুঝতে চাইতো, তাহলে হয়তো এতসব হতো না। এই 'বুঝতে চাওয়া'টাই বন্ধ করতে চান আমাদের নিয়ন্ত্রকেরা।
নতুন বছরের প্রথম দিনে, এই উপলব্ধিটাকেই ছড়িয়ে দিতে চাই আমার পাঠকদের প্রতি। স্রষ্টা আপনাকে অনেক বুঝার যেই অপরিসীম, অসাধারন ক্ষমতা দিয়েছেন, সেটা আর হেলায় ফেলে রাখবেন না।
ক্রমপরিবর্তনীয়, ক্রমবর্ধমান, কনফিউজিং এই পৃথিবীতে বুঝতে চেষ্টা করুন, সবাইকে। মানুষের অপরিসীম ক্ষমতা আর চরম দুর্বলতার অনন্য সমন্বয়ের চরম মানুষ রূপটা খুঁজে বের করে তাকে ভালোবাসতে শিখুন এই নতুন বছরে!
শুভ নববর্ষ!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



