ঢাকার পরিচিত রাস্তায় হাঁটছিল ও। কেমন মনে হচ্ছে, চলে যাবে সব ছেড়ে কিছুদিনের মধ্যেই। বুক ভরা হাহাকার নিয়ে ঢাকার রাস্তায় হেঁটে চলছে ও একা। একটু আগেই শর্মায় খেয়ে এল বন্ধুদের সাথে। মনে হচ্ছে ঢাকায় এটাই ওর শেষ শর্মা খাওয়া। সিএনজির ভটভটি শব্দটাও বেশ লাগছে, আরও কতদিন পরে শুনতে পাবে? সিএনজিটা সরে যেতেও ভটভট শব্দটা মিলিয়ে যাচ্ছে না। পাশ দিয়ে গিয়ে আবার ঘুরে এসেছে যেন, ঠিক একই ভাবে আবার গেল পাশ দিয়ে। এবং আবার, এবং আবারও...
আরে, ব্যাটা কি ফাইজলামি পেয়েছে নাকি? ভাল করে তাকাতেই চোখের সামনে নিকষ অন্ধকার। সুজন শুয়ে আছে ওর ঘরে। পাশের সাইড টেবিলে ভাইব্রেশনে রাখা ফোনটা সিএনজির মত বিদঘুটে শব্দ করে বেজেই চলছে। ধাতস্থ হয়ে হাত বাড়াতেই শব্দ বন্ধ হয়ে গেল। এত রাতে কে ফোন করল? ফোন হাতে নিয়ে চমকে উঠল সুজন। '১৩ মিসড কলস'। কোন নাম্বার নেই। 'নো কলার আই ডি'। আশ্চর্য! দেশ থেকে ফোন আসল নাকি? চট করে সময় দেখল--রাত ২.৪০। এত রাতে এত বার ফোন করেছে যখন, খুব জরুরি কিছু নিশ্চয়ই। তাড়াতাড়ি টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে ফোর্ড কাজ খুঁজতে লাগল সুজন। আব্বুর কিছু হয় নি তো? কয়েকদিন ধরে শরীর ভাল যাচ্ছে না। আম্মুকে তো বলেও ডাক্তারের কাছে নেয়া যায় না। আম্মু ঠিক আছে? ভাইয়া বিজনেস নিয়ে কি সমস্যায় ছিল বলছিল। পাড়ার ছেলেরা ঝামেলা করছে। শেষ মেষ ঝামেলা হয়েই গেল না তো? ছি ছি, এগুলো কি ভাবছে ও? তাড়াতাড়ি আঙ্গুল চালায় সুজন।
ওপাশে হ্যালো শুনতেই উদ্বেগ ঢেলে দিল সুজন, 'আম্মু, তোমরা ফোন করেছিলা?'
জবাব শুনে মিইয়ে গেল। উহু, বাসা থেকে কেউ না। তাহলে কে হবে? বন্ধুদের কারও তো প্রশ্নই আসে না। সবাই জানে ওকে কখন পাওয়া যায়। তাছাড়া ওরা কখনই তেমন ফোন করে না। করলে ও-ই করে। এখন কার এমন দরদ পড়বে এই মধ্যরাতের ফোন করবে। তাও একবার না, দু'বার না, তের বার? অদ্ভূত। ভাবতে ভাবতে চোখ লেগে এসেছিল মোটে, তখনই ফোন বিকট শব্দে বেজে উঠল আবার। এবার দেরি না করেই ফোন তুলল। 'হ্যালো'।
কোন কথা নেই।
'হ্যালো?' গলা তুলল সুজন।
এবারও কোন কথা নেই।
'হ্যালো, শুনতে পাচ্ছি না।' একটু জোরেই বলল।
তখনই কিশোরী গলার রিনরিনে ছোট্ট কণ্ঠটা ভেসে আসল--'হ্যালো।'
এবার থতমত খেল সুজন। কি আশ্চর্য, এই রাতের বেলা, কোন কিশোরী ওকে ফোন করবে? 'হ্যালো, কে বলছেন?'
কিছুক্ষন কোন কথা নেই, তারপরেই কিশোরী কণ্ঠের গলায় উত্তাপ ঝরে পড়ল--'এতক্ষন ধরে ফোন করছি, ফোন ধরছিলেন না কেন শুনি?'
মিলি! সেদিনের পরে আর কোন খোঁজ খবর নেই। সপ্তাহ দু'য়েক তো হবেই। প্রথমে কয়েক দিন মেয়েটার সেদিনের ব্যবহারের অর্থ খুঁজে বের করার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়েছিল। মিলি নিজেই চেয়ে ফোন নাম্বার নিয়ে গিয়েছিল সেদিন। ভেবেছিল ফোন করবে। করে নি। তিন চার দিন অপেক্ষায় থেকে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল। এতদিন পরে, এত রাতে?
১৩টা মিসড কল!
'আছেন নাকি ফোন রেখে দিব?' কান্না মেশানো ঝাঁঝে বলে উঠে কিশোরী কণ্ঠ।
'কি আশ্চর্য, ফোন রাখবেন কেন। চিনার চেষ্টা করছিলাম। কেমন আছেন? এত রাতে?'
'আপনি ধরতে এত দেরি করলেন কেন?' মিলির কণ্ঠ শুনে চমকে উঠল সুজন। এত অভিমান কাকে দেখাচ্ছে?
'স্যরি। ভাইব্রেশনে ছিল। খুব টায়ার্ড ছিলাম। ঘুম ভাঙতে সময় লেগেছে।' সাবধানে বলল সুজন।
'তাও, এত দেরি হবে কেন? আমি খুঁজছিলাম না আপনাকে?'
'স্যরি মিলি। বললাম তো শুনতে পাই নি। কেমন আছেন আপনি?'
'ভাল না। আমার মন খুব খারাপ। খুব। মনটা একটু ভাল করে দিবেন প্লীজ?'
পুরাই হতভম্ব হয়ে গেল সুজন। এ কি পাগলামি, রাত পোনে তিনটায় তের বার ফোন করে একদিনের চেনা একজনের কাছে এ কি আবদার? হতভম্ব ভাব কাটার আগেই টের পেয়েছিল কাঁদছে মিলি। ওই যে, শ্বাসটা নিয়েছিল, সেটা অনেক গভীর থেকে নেয়া। শ্বাস ছাড়ছিল খুব সাবধানে, হু হু করছিল প্রায় নি:শব্দে। কিন্তু সে কান্নায় অনেক কষ্ট। দেশ থেকে এসে হঠাৎ হঠাৎ মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গিয়ে যেভাবে নি:শব্দে বুক উজার করে কাঁদতে ইচ্ছা করতো, সেরকম।
বুঝতে দেয় নি সুজন ও বুঝেছে। 'এই রে, মন খারাপ কেন? শোনেনই না কি স্বপ্ন দেখছিলাম...' এভাবেই শুরু করে দিল সুজন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মিলি একটু একটু হাসা শুরু করল। কথা বলতে বলতেই মনে মনে হিসাব চালায় সুজন, আজ রাতের ঘুম না থাকা মানে আগামী কাল কাজে গিয়ে মরণ। সন্ধ্যার ক্লাসে ঘুমাবে ঠিক নাক ডেকে। কি জ্বালায় পড়া গেল রে বাবা!
(চলবে)
আলোচিত ব্লগ
গাজীপুর থেকে কক্সবাজার: চার বাইকে ছয় সহকর্মীর ১৪ ঘণ্টার নাইট রাইড অ্যাডভেঞ্চার

আমি শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, থাকি সাভার এলাকায়। ভ্রমণের নেশা আর মোটরসাইকেলের প্রতি ভালোবাসা আমার দীর্ঘদিনের। আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করব গাজীপুর থেকে কক্সবাজার হয়ে টেকনাফ ও শাহপরীর দ্বীপের দিকে... ...বাকিটুকু পড়ুন
Personal Cancer Vaccine: আশার আলো দেখাচ্ছে

আপনি কি কখনও চিন্তা করে দেখেছেন যে ক্যান্সার টিউমারকে কেন শরীর এর রোগ প্রতিরোগ করা ইমিউন সেল (যেমন টি সেল) একেবারে ধ্বংস করতে পারে না!!! যেখানে টি সেল... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের শাহেদ জামাল- ১০০

মাঝে মাঝে খুব অবিশ্বাস্য ব্যাপার সহজ ভাবে ঘটে যায়।
এই যে আমি শাহেদ। শাহেদ জামাল। রমিজ উদ্দীনের ছেলে। আমাকে একটা ঘরে বন্ধী করে রাখা হয়েছে। ছোট ঘর। ঘরে... ...বাকিটুকু পড়ুন
শিশুর নিরাপত্তা কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে বড়

শিশুর নিরাপত্তা কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে বড়
গতকাল এক বাবার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। অভিযোগ, তাঁর মেয়েকে একটি মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল যৌন নিপীড়ন করেছেন। বাবার প্রতিক্রিয়া সঠিক ছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন
দেশটাতো এখন রাজাকারদের....

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বাদী ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী (৮৭)। মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার প্রস্তুতি চলার সময় জামাতের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।