প্রদোষের আকাশ- রক্তাক্ত মেঘের নিচে নদীর ধারে দখিনা বাতাসে গা এলিয়ে বসে আছি। ঝির ঝির বাতাসে পূর্ব গগনে ত্রয়োদশী ইন্দ্র আগমন করেছে। হঠাত্ বাঁদুর বা পাখির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ। পশ্চিম আকাশে কালো, লাল আর ঈষত্ নীল রঙের মিলন মেলা। বসন্তের এমন মধুর ক্ষণেই মনে পড়ে, মনে পড়ে সেই ছেলে বেলার দুরন্তপনা, কত হাসি কত বেদনা। নিশিথের অন্ধকারে সূর্য যেমন বিলীন হয়ে মিষ্টি মধুর চন্দ্রের আগমন ঘটায়, তেমনি জীবনের পথে সেই সোনালী শৈশবকে ফেলে আজ কৈশর আর যৌবনের দাড় প্রান্তে দাড়িয়ে আছি। সেই শৈশবের হাজার স্মৃতি মনে পড়ে যায়, মনে পড়ে শ্রাবন ধারায় জলের ছোঁয়ায় শিশু হৃদয়ের চির আনন্দ। মনে পড়ে কত অভিমানী সুর কত অবুঝ আবদারের না পাওয়ার ব্যথা। আজ এই নদীর ধারে এমনই মনে পড়ছে না বলা এক অবলার কথা।
হঠাত্ খেয়াল করলাম পশ্চিম আকাশে আর সেই লাল আভা নেই। কোন পাষাণ হৃদয়ের অন্ধকার যেন গ্রাস করে দিল রবির অস্তিত্ব। আবার চোখ পড়ল পূর্বাকাশে, চাঁদের দিকে। শুকনো নদীতে কল কল জলের ধ্বনি নেই, নেই পাখির ডাক, লোককলরব। জন মানবহীন একলা আমি আর সেই মিষ্টি চাঁদ। চাঁদের দিকে তাকিয়েই মনে হলো অন্ধকারটা যেন পাষাণ নয়, চাঁদের বন্ধু। কারণ রাতের সাথেই চাঁদের দেখা। নিশুর মাঝেই চাঁদ যেন খুজে পায় আপন ঠিকানা
এর মাঝে কয়েকটা নিশাচর শিয়াল দৌড়ে গেল। দূরে এমন নিশীথে জোনাকীরা জ্বলছে আর নিভছে।
এমন সময়ে হৃদয়ের মাঝে এক কোণে ব্যথা অনুভব করলাম। মনে হলো জীবনের সুখের দ্বীপের সেই কল্পনায় গড়া প্রাসাদ কোন বিশাল সমুদ্র ঢেউ এসে ভেঙে দিয়ে গেল।ভেঙে দিয়ে গেল কত শত রঙীন আশা, দিয়ে গেল নিস্তব্ধ অসহ্য এক মহা বেদনা। যে কল্পনার কিশোর মনের ছোট্ট দ্বীপের মাঝে একরাশ আশা নিয়ে স্বপন বুনছিলাম, হঠাত্ নিয়তির জলোচ্ছাস এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল তার ভিটা, মাটি, গাছপালা সব। শুধু রেখে গেল পাঁজর ভাঙা এই আমাকে। লক্ষ করলাম দুই চোখ ছাপিয়ে অশ্রু ঝড়ে পড়তে চাইছে। কী চায় অশ্রুরা? আমার নয়ন বন্ধন থেকে মুক্তি? নাকি আমায় শান্তনা দিতে চায়? তা যাই চাক না কেন ধরে রেখে লাভ নেই। ছেড়ে দিলাম বাধ ভাঙা অশ্রু। আমার গন্ডদেশ বেয়ে পড়তে লাগল ঠিক বৃষ্টির পর যেমনটা কোন বৃক্ষের নিচ দিয়ে উচু থেকে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ে।
মনে মনে পোষা প্রিয় টিয়া পাখিটাকে যখন আমার সামনে থেকে কেউ ছিনিয়ে গেল, তখন আমার কিছুই করার ছিলনা। ছিল শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবার। আর হৃদয়ে কষ্ট পাবার। আমি যেই একা ছিলাম সেই একাই হয়ে গেলাম।
মাস ছয়েক আগের কথা। স্কুলের কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাড়িয়ে স্বপ্ন দেখছিলাম জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার। ভাবছিলাম একটা ছোট বটগাছের কথা, যেটা কিনা হাজার বিপদ, প্রতিকূলতা পাড় হয়ে বিশাল বটবৃক্ষে পরিণত হয়। পাখির বিষ্ঠা থেকে যার জন্ম, তার ছায়ায় কত জনের প্রাণ জুড়ায়, কত পক্ষি তার ডালে বসে বিশ্রাম নেয়। অথচ এই গাছটাই যখন চারা ছিল তখন কেউ ওর দাম দেয় নাই।
এমন সময়ে সূর্য পূর্বাকাশে লাল অবাস্থায় ছিল। সামান্য কিরণ পড়েছিল ঘাসের ডগায় শিশির কণায়। জ্বল জ্বল করে জ্বলছিল মুক্তার ন্যায়।।
মাঠের বিপরীত পাশে চোখ পড়ল। এক জন কিশোরী হেটে যাচ্ছে....................
এরপর থেকে কি হল জানি না, প্রতিদিন ঐখানে দাড়িয়ে থাকতাম। তার দেখা পাবার জন্য মনটা ছটফট করত। একদিন বাঁকা নজরে আমার দিকে একবার তাকায়েছিল। এরপর আমার কত যে আনন্দ হয়েছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমি নিরালায় বসে ভাবতাম তার ঐ কালো চোখের ঢুলুঢুলু চাহনী, তার মুখশ্রী। অথচ তাকে বলিনি। কারণ ঐ বয়সে এসব ঠিক নয়। আশা ছিল একটু বড় হলে ওকে বলব সব কিছু। কিন্তু আমার আর সময় কই? দুই মাস না পেরুতেই দেখি আর তার দেখা নেই। আমি পাগল হয়ে গেলাম। অনেক চেষ্টার পর জানতে পারলাম ২৭ তারিখে তার বিয়ে।� আমি যথারীতি ঘোরের মদ্ধে পড়লাম। বুঝতে পারছিলাম না কি করব। আমি তার সাথে কখনও কথা না বললেও বুঝতাম আমার প্রতিও তার টান ছিল। সে মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকাত, পাশ দিয়ে হেটে যেতঃ এটা কি জন্য করত তা আমি সঠিক জানি না।
এরপর যখন বহু কষ্টে তার বাসার ঠিকানাটা পেলাম, সাইকেলটায় চেপে তার বাসায় রওনা হলাম। গিয়ে দেখেছিলাম সেই করুণ দৃশ্য।
"সন্ধার আকাশে রক্তিম অস্তগামী রবি, আমার সামনে দাড়িয়ে আমার সেই টিয়া পাখি।
অথচ আমার জন্য নয়, তার বরের জন্য।
সূর্য যখন ধরণীর বুক থেকে বিদায় নিল, চার দিকে তিমির নামল। আর আমার প্রিয়া আমার থেকে দূরে সরে গেল আর দিয়ে গেল একরাশ অসহ্য যন্ত্রনা। আমার সামনে সে গাড়ীতে তার স্বামীর পাশে গিয়ে বসল। পরক্ষণেই চলে গেল শ্বশুরবাড়ী।"
আমি আর দাড়ালাম না। আবার বাড়ীর পথে এগোতে লাগলাম। রাস্তায় সাইকেল চালাতে চালাতে ভাবলাম,"আমি আজ একবুক কষ্ট নিয়ে বাড়ীতে ফিরছি, আর সে আজ বাসর যাত্রী।"
এই আমার সেই হৃদয় ভাঙা স্মৃতি। আজ এই চাঁদনী রাতে এই নদীর মাঝখানে আমি দাড়িয়ে যন্ত্রনায় অশ্রু ঝাড়ছি আর সে হয়তো তার স্বামীর সাথে সুখেই আছে। �

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



