somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নকল বনাম আসল

২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ রাত ১০:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নিক পিরোগের "হেনরি বিনস" সিরিজের বড় ভক্ত আমি। সেই সিরিজের বইগুলোর বাংলাদেশের একটি বিখ্যাত প্রকাশনালয় থেকে নিয়মিত বিরতিতে অনুবাদও বের হচ্ছে। অনুবাদের মানও যথেষ্ট ভালো। পড়ছি শুরু থেকেই, হেনরি বিনস আর ল্যাসির ভক্ত হতেও খুব বেশি সময় লাগেনি।

বেশ কয়েকদিন আগে নিক পিরোগ তার ফেসবুক আইডি থেকে মোটামুটি একটু অপমানই করলেন আমাদের। তার "হেনরি বিনস" সিরিজের বইগুলো নাকি তাঁর অনুমতি ছাড়াই বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে। দেখে একটু অবাকই লাগলো। যে প্রকাশনী থেকে বইগুলো বের হয়েছে, সে প্রকাশনী তুমুল জনপ্রিয় বাংলাদেশের পাঠকশ্রেণির কাছে।
তারা এরকম কাজ কীভাবে করলো? সত্য-মিথ্যা কিছুই জানিনা। শুধু নিক পিরোগের ফেসবুকের লেখাটাই দেখেছি। পাইরেসির এ অভিযোগের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রকাশনীর কর্তাব্যক্তিদের অফিশিয়াল মন্তব্য এখনো পাইনি। তবে, বিষয়টা যদি সত্য হয়, দুঃখজনক হবে।

এবার আসি আরেক প্রসঙ্গে। বেশ কিছুদিন আগে বাদল বসুর আত্মজীবনী "পিওন থেকে প্রকাশক" পড়লাম। প্রয়াত বাদল বসু, পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত প্রকাশনী প্রতিষ্ঠান আনন্দ পাবলিশার্স এর প্রকাশক ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের অনেক খ্যাতনামা লেখকের বিখ্যাত বিখ্যাত বই তার আমলেই প্রকাশিত হয়েছে। সত্যজিৎ, সুনীল, সমরেশ, প্রতিভা, নীরোদ সি চৌধুরী, তসলিমা নাসরীন... অনেকের জনপ্রিয় বইয়ের প্রকাশক তিনি। তাঁর এ আত্মজৈবনিক ঢাউস সাইজের বইটির এক অংশে আমাদের নীলক্ষেতের কথা ছিলো। বইয়ের সে অংশটুকু পড়ে বিষাদে মনটা ভরে গেলো। আমাদের নীলক্ষেতে তথাকথিত "নীলক্ষেত প্রিন্ট" নামের বইগুলো যে পাইরেটেড বই, সে সম্পর্কেই তিনি লিখেছেন। পশ্চিমবঙ্গের লেখক, প্রকাশক, প্রকাশনী প্রতিষ্ঠান... কাউকে না জানিয়েই এ দেশের বই ব্যবসায়ীরা দেদারসে বইগুলোর ফটোকপি করছেন। আনন্দ, পত্রভারতী, মিত্র এন্ড ঘোষ, দে'জ... সবার বইয়ের ওপরেই এদেশের ব্যবসায়ীরা করালগ্রাসী থাবা বিস্তার করেছেন।

এতে পাঠকদেরও বেশ লাভ। ভারতের বই বাংলাদেশে এলে ১ রুপি= ১.৮ টাকা হয়ে যায়। অর্থাৎ, যে বইয়ের দাম ১০০ রুপি, সে বইয়ের জন্যে ১৮০ টাকা খরচ করতে হয়। প্রায় দ্বিগুণ মূল্য হয়ে যায় বইগুলোর। একটা বইয়ের জন্যে প্রায় দ্বিগুণ দাম খরচ করতে অনেকেই চাইলেও পারেননা। এদেশের পাঠকশ্রেণির সিংহভাগই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রছাত্রী। তাদের আয়ের উৎস হয়তো টিউশনি কিংবা হাতখরচ থেলে বাঁচানো টাকা। যেখানে ৫০০ টাকায় এক ছাত্রের এক সপ্তাহের মেসের খাবার হয়ে যায়, সে টাকায় একখন্ড নীললোহিত কেনা শুধু বাড়াবাড়িই না, অমোচনীয় পাপ, আকাশসমান ধৃষ্টতা।

নীলক্ষেত প্রিন্ট থাকায় বইগুলো পাওয়া যায় স্বল্পমূল্যে। হয়তো বাইন্ডিং এর অবস্থা থাকে নড়বড়ে পুলসিরাতের মতন, পৃষ্ঠা বিবর্ণ, নিউজপ্রিন্টের, অক্ষরগুলো ষাটোর্ধ বুড়োর ছানিপড়া চোখের মতন ঘোলাটে, তাতে কী? দাম যে খুবই কম। এই একটা দিক বিবেচনা করে, অনেকগুলো দিককে উপেক্ষা করে যাওয়াই যায়। কিন্তু...

আমরা নাহয় অল্পদামে বই পাচ্ছি। কিন্তু, আমরা যা করছি, সেটা তো চুরি। সাদা চোখে, সোজা বাংলায়, চুরি করছি। লেখক- প্রকাশকের অনুমতি না নিয়ে লেখকের লেখা, প্রকাশনীর লোগো ব্যবহার করছি বইয়ে। পাইরেটেড বই ছাপিয়ে অন্যদেশের সামনে নিজের দেশকে অপদস্থ করছি। বাদল বসুও ঠিক একই কাজ করলেন, আমাদের অপদস্থ করলেন আরেকবার।

তাকে দোষ দেবোনা। তারা কষ্ট করে একটা বই বের করেন, আমরা সে বই না বলেকয়ে মেরে দিচ্ছি, সামান্য জানানোর ভদ্রতাটাও দেখাচ্ছি না। এ কেমন সভ্যতা?

তাঁর বই পড়েই জানলাম, তিনি সমরেশ মজুমদারসহ একবার বাংলাদেশে এসে সেসময়ের প্রধানমন্ত্রী (বর্তমানেরও প্রধানমন্ত্রী) শেখ হাসিনার কাছে এ বিষয়ের একটি সমাধান চেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীও বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। কতটুকু দেখেছেন, সে তো নীলক্ষেতে গেলেই বোঝা যায়। বলার প্রয়োজন মনে করছিনা।

"পিওন থেকে প্রকাশক" পড়ে আরো জানা গেলো, বাংলাদেশেও আনন্দ পাবলিশার্সের আরেকটি শাখা খোলার পরিকল্পনা ছিলো বাদল বসুদের। সেটা হলে, ভারতের বই যেমন এদেশে সহজলভ্য হতো, তেমনি তাদের ইচ্ছে ছিলো, তারাও এদেশের লেখকদের বই প্রকাশ করবেন, সে বইগুলো ভারতেও সহজলভ্য হবে। কিন্তু, সে পরিকল্পনার বাড়াভাতে ছাই ঢেলে দিলেন এদেশের প্রকাশকেরাই। তারা রীতিমত আন্দোলনে নামলেন, যাতে এদেশে আনন্দ প্রকাশনীর শাখা খোলা না হয়। এতে নাকি, এদেশের প্রকাশকেরা মাঠে মারা যাবেন!!!

আনন্দের দ্বিতীয় শাখা বাংলাদেশে আর খোলা হয়নি, হবেওনা বোধহয় কোনোদিন।

সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত গোয়েন্দাচরিত্র "ফেলুদা" যে বাংলাদেশ ব্যাপক জনপ্রিয় তা তিনি (সত্যজিৎ রায়) জানতেন না। একবার একজন এসে তাকে জানালেন যে, তাঁর ফেলুদা বাংলাদেশের পাঠকদের ব্যাপক পছন্দ। শুনে তিনি খুশিই হয়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে পাশে থাকা আরেকজন ফোঁড়ন কাটলেন, "ওরা চুরি করে ছাপাচ্ছে।" সত্যজিৎ রায়ের উৎসাহ দমে গিয়েছিলো। এখনো বাংলাদেশের একটি প্রকাশনী প্রতিষ্ঠান সত্যজিৎ রায় এর বইগুলো নিজেদের প্রচ্ছদ, নিজেদের মলাট ব্যবহার করে ছেপে যাচ্ছেন। অথচ, সত্যজিৎ রায় এর বইগুলো বের করার অধিকার একমাত্র আনন্দ পাবলিশার্স এর। আর কাউকেই সে অধিকার দেয়া হয়নি। তবুও, এদেশে সে নিয়মের তোয়াক্কা না করেই চলছে সবকিছু।

আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ মধ্যবিত্ত শ্রেণির। তলাবিহীন ঝুড়ির এ দেশটি আস্তে আস্তে তলা খুঁজে পাচ্ছে। অধিকাংশ মধ্যবিত্তের এদেশে দ্বিগুণ দামের বই কেনা যেমন বিলাসিতা, তেমনি নকল করা বই কিনলে ওপাশ থেকে লেখক, প্রকাশক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এমনিতেই, উপমহাদেশের লেখকশ্রেণিকে রাখা হয় নগণ্য অবস্থানে। লোকজনের কটাক্ষ আর ভ্রুকুটির মাঝখানে লেখককে কাটাতে হয় মানবেতর জীবনযাপন। অনিশ্চিত জীবনের আলোকবর্তিকা হয়ে তাকে পেরোতে হয় কুয়াশায় ভেজা ধূসর জমিন। তাদের মস্তিষ্কজাত বইগুলো যখন অন্যদেশে নকলে নকলে সয়লাব হয়, তাদের জন্যে আক্ষেপ লাগে। আবার, নিজে যখন বই কিনি, তখন কষ্টে জমানো ঘামেভেজা নোটগুলোর জন্যে আক্ষেপ লাগে। তখন হাত চলে যায় পাইরেটেড বইগুলোর দুর্বল পৃষ্ঠার দিকে। অল্প দামে অধিক বই কেনার নীতিতে বিশ্বাসী হতে চায় মন, তীব্র দংশন করে বিবেক।

সরলদোলকের মত দুলতে থাকি এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। কোনদিকে যাবো বুঝে উঠতে পারিনা। কোনপ্রান্তে সমর্থন জানানো উচিত, বোধগম্য হয়না। সরলদোলকের মত একবার লেখকের দিকে, অন্যবার পাঠকের দিকে চলে যায় সমর্থন। বিবেক আর অ-বিবেক এর দুষ্টচক্রে ঘুরপাক পায় সবকিছু।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ রাত ১০:৫০
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৭

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

মঙ্গলবার রাত ১০টা ২৭ মিনিট। গুলশানের একটি হাসপাতালে থেমে গেল ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের হৃদয়- দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর।

আর ঠিক তখন, শহরের অন্য প্রান্তে, মুন্সিগঞ্জ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ট্রাম্পের উপর ওভার ট্রাম্প!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৫৫

ট্রাম্পের উপর ওভার ট্রাম্প!

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন একটি সমীকরণ তৈরি হয়েছ- সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র হামলাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×