
সলিমুল্লাহ খানের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান: প্রশ্ন, বিতর্ক ও সমালোচনার প্রেক্ষিত
বাংলাদেশের সমকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে সলিমুল্লাহ খান একটি বহুল আলোচিত নাম। তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে প্রচলিত চিন্তার বাইরে গিয়ে প্রশ্ন তোলা একজন সাহসী চিন্তাবিদ হিসেবে মূল্যায়ন করেন। অন্যদিকে তাঁর সমালোচকদের মতে, তিনি প্রায়ই এমনসব বক্তব্য ও ইতিহাস-ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন, যা তথ্যভিত্তিক গবেষণার তুলনায় বিতর্ক সৃষ্টি এবং জনমনে বিভ্রান্তি তৈরিতেই বেশি ভূমিকা রাখে। ফলে তাঁকে ঘিরে আলোচনা যেমন প্রবল, তেমনি তাঁর বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন কম নয়।
সমালোচকদের অন্যতম অভিযোগ হলো, সলিমুল্লাহ খান ভিন্নমতকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের পরিবর্তে অনেক সময় অবজ্ঞা বা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেন। একজন জনবুদ্ধিজীবীর কাছ থেকে প্রত্যাশা থাকে, তিনি যুক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষের অবস্থানকে খণ্ডন করবেন। কিন্তু যখন মতভিন্নতাকে ব্যক্তিগতভাবে খাটো করা হয় বা আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহৃত হয়, তখন তা সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ককে দুর্বল করে। এতে অনুসারীদের মধ্যে যুক্তির বদলে ব্যক্তি-আক্রমণের সংস্কৃতি উৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তাঁর আলোচনায় মার্কসবাদ, লাকান, দেরিদা কিংবা উত্তর-আধুনিক তত্ত্বের ব্যবহারও সমালোচনার বিষয়। তাত্ত্বিক ভাষা ব্যবহার অবশ্যই দোষের নয়; কিন্তু যখন সেই ভাষা সাধারণ পাঠকের কাছে বিষয়কে পরিষ্কার করার বদলে আরও দুর্বোধ্য করে তোলে, তখন প্রশ্ন ওঠে- এটি কি সত্যিই জ্ঞানকে সহজলভ্য করছে, নাকি অপ্রয়োজনীয় জটিলতার আড়ালে বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা? একজন জনবুদ্ধিজীবীর অন্যতম দায়িত্ব হলো জটিল ধারণাকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে পৌঁছে দেওয়া। সমালোচকদের মতে, এই জায়গায় সলিমুল্লাহ খান প্রায়ই ব্যর্থ হন।
২০১৭ সালে কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনার সময় তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে সাধারণ শিক্ষকদের তুলনায় মাদ্রাসার শিক্ষকরা বেশি মেধাবী এবং দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর খুব কম অধ্যাপকই তাঁদের সঙ্গে যুক্তিতর্কে টিকতে পারবেন। এই বক্তব্য ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল, এমন বিস্তৃত দাবি করার পেছনে তাঁর গবেষণালব্ধ তথ্য বা পরিমাপযোগ্য প্রমাণ কোথায়? বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও চিকিৎসা শিক্ষার হাজারো শিক্ষক-গবেষকের অবদানকে এক বাক্যে খাটো করে দেখানো অনেকের কাছেই দায়িত্বজ্ঞানহীন সাধারণীকরণ বলে মনে হয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষা ব্যবস্থার তুলনামূলক মূল্যায়ন করতে হলে গবেষণা, শিক্ষার মান, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, জ্ঞান উৎপাদন এবং সমাজে অবদান- এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। একটি আবেগনির্ভর বা অতিরঞ্জিত মন্তব্য জনপরিসরে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু তা বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের বিকল্প হতে পারে না।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জাতীয় ইতিহাস সম্পর্কেও তাঁর বিভিন্ন বক্তব্য তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইতিহাসচর্চায় ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ অবশ্যই আছে; কিন্তু সেই ব্যাখ্যা অবশ্যই নির্ভরযোগ্য দলিল, প্রমাণ এবং গবেষণার ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। সমালোচকদের মতে, সলিমুল্লাহ খানের কিছু বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক তথ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সে কারণে তরুণদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরির ঝুঁকি সৃষ্টি করে। ইতিহাসকে নতুনভাবে পড়ার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি ইতিহাসকে রাজনৈতিক অবস্থান প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করাও সমানভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
জনবুদ্ধিজীবীদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো নৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। সমাজের এক ধরনের অন্যায় নিয়ে সোচ্চার হলেও অন্য ধরনের অন্যায় সম্পর্কে নীরব থাকা অনেকের কাছে দ্বৈত মানদণ্ডের পরিচয় বলে মনে হয়। সমালোচকেরা তাই প্রশ্ন তোলেন- একজন বুদ্ধিজীবীর অবস্থান কি সর্বজনীন মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের পক্ষে হবে, নাকি তা নির্বাচিত কিছু বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে?
সবশেষে বলা যায়, একজন চিন্তাবিদের মূল্যায়ন তাঁর জনপ্রিয়তা দিয়ে নয়, বরং তাঁর যুক্তির দৃঢ়তা, তথ্যের প্রতি সততা এবং সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা দিয়ে হওয়া উচিত। সলিমুল্লাহ খানের বক্তব্য নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু তাঁর প্রতিটি দাবিকে গবেষণা, তথ্য এবং যুক্তির আলোকে যাচাই করাই একটি সচেতন সমাজের কাজ। প্রশ্ন তোলা যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অপরিহার্য অংশ, তেমনি প্রশ্নের উত্তরও হতে হবে তথ্যসমৃদ্ধ, যাচাইযোগ্য এবং দায়িত্বশীল। একজন জনবুদ্ধিজীবীর প্রকৃত শক্তি চটকদার বক্তব্যে নয়; বরং সত্যের প্রতি নিষ্ঠা, যুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভিন্নমতকে সম্মান করার মধ্যেই নিহিত।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


