somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পলাতক

২৩ শে মে, ২০১৪ সন্ধ্যা ৬:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

টানা দ্বিতীয় বারের মতো মেয়ে নিয়ে পালানোয় জয়নালের বাবা। হতাশের চাইতেও হতাশ। যদিও তার ছেলে দুইবার একই মেয়ে নিয়ে পালিয়েছে, তাকে চরিত্রবান বলা চলে কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে এই সামান্য যুক্তিতে স্বস্তি বা হাসি কিছুই আসে না। জয়নালের বাবা আবদুল মিঞা হাতে একটা লাঠি নিয়ে খাটের একপ্রান্তে বসে পা নাচাচ্ছেন আর ভাবছেন, ছেলে কি নাকটাই না কাটালো! আবদুল মিঞা রসিক লোক, বেশী চাপ বা অশান্তি তার ভালো লাগে না। ঘরের অপর প্রান্তে মেঝেতে বসে দেয়ালে হেলান দিয়ে মাথায় হাত দিয়ে নিশব্দে কাঁদছে জয়নালের মা রহিমা খাতুন। থেকে থেকে সে বলে উঠছে, তুমার আহ্লাদের কারনে ছেলের এই অবস্তা, পাড়ার লোক এখন আমাদের দেখলে হাসে। আবদুল মিঞা ভ্রু কুঁচকে একবার করে তার দিকে তাকায় আর চোখ নামিয়ে নেয়। আবদুল মিঞার হতাশ না হওয়ার তেমন কারন নেই। সে খুব ধনী না হলেও তার দুটি বড়ো মুদি দোকান আছে একটা সে সামলায় অন্যটা তার ভাই মহসিন। তার মুল সংশয় তার একমাত্র মেয়েকে নিয়ে, মেয়ের বিয়ের সময় তাকে কি বিপদেই না পড়তে হবে! এইসব ভাবতে ভাবতে সে বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে পড়ে। এর মাস চারেক আগে একবার পালিয়েছিলো জয়নাল। সেবার অনভিজ্ঞ থাকায় তাকে খুজে পেতে বেগ পেতে হয়নি। সেবার থানা পুলিশও হয়েছিলো। নিন্দুকেরা ফিসফিস করতো, পালাবি তো পালা এক জেলের মেয়ে নিয়ে পালালি! ছি ছি ছি। আর রহিমা খাতুন তো গো ধরে বসে ছিলেন যে ছেলেকে মৃত বলে মানতেও রাজি কিন্তু অমন মেয়ে বাড়ির বৌ! কিছুতেই নয়। কিন্তু ব্যাটা এবার অভিজ্ঞ হয়ে পালিয়েছে তাই দুদিনেও তার হদিস মিলল না। কে কার সাথে পালালো তা নিয়ে আমরা বিশেষ বেতিব্যাস্ত ছিলাম না, বন্ধুকে খোজার নাম করে আবদুল মিয়ার কাছ থেকে টাকা নিয়ে সারাদিন ঘুরে এসে সন্ধ্যায় একমুঠো হতাশা তার দোকানে দিয়ে বাসায় আসতাম। এভাবে সপ্তাহখানেক চলার পর তারা সন্তানের দুঃখ ভোলাতে সক্ষম হলেন। সন্তানের অপকর্মের দায় নেয়ার চাইতে সমাজের কাছে তাকে মৃত দেখানোই বোধ হয় শ্রেয়। আমাদের আঠারো বৎসরের অপরিপক্ক মগজে এটা না ঢুকলেও এটা বুঝতাম, সে পাপ করেছে, মহাপাপ। সমাজ আমাদের তাই শেখায়।
জয়নাল আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু না হলেও বন্ধু ছিলো। ছোটোবেলা আমাদের প্রধান কাজ ছিলো সারাদিন এপাড়া ওপাড়ায় ঘোরা আর যত শত অকাজ। কাজের মধ্যে স্কুল কলেজটাই ছিলো, জয়নালের অবশ্য এ বিরক্তিকর কাজটি আরো বিরক্তিকর লাগতো তাই সে অষ্টম শ্রেনীর পর বিদ্যালয়কে ছুটি দিয়ে দেয়। তখন তার প্রধান কাজ ছিলো কাচের মার্বেল খেলা, লাটিম খেলা, ক্রিকেট আর ঘুড়ি উড়ানো। তার আরো প্রিয় ছিলো ঘোষালের পুকুর থেকে চুরি করে মাছ ধরা আর তার বাগান থেকে আম আর খৈ চুরি করা। জন্মের পর থেকে সে ঘোষালের যে ক্ষতি করেছে তাতে ঘোষাল বেচে থাকলে জয়নালের পালানোর খুশিতে সে ফকির খাওয়াতো। এর বাইরে জয়নাল কিছুই করতো না। মেয়েদের ব্যাপারে জয়নালের মানসিকতা, বিরিয়ানির পাশে রাখা পান্তা ভাতের মতই অখাদ্য ছিলো। রাস্তার ঐ পারের মেয়েদের বাতাস যদিও আমরা গায়ে লাগানোর চেষ্টা করতাম, সে ব্যাপারগুলোকে "বাল ছাল" বলে সম্বোধন করতো। তার সকল কাজ আর চেহারায় যৌক্তিকতার ছাপ ছিলো যাকে আমরা কখনোই খন্ডন করতে পারতাম না। কলেজে ভর্তির পর তার সাথে খুব একটা মেশা হয়নি,তার পালানোর খবরে স্বান্তনা দিতে তার পরিবারে যাই। শুধু এইটাই ভেবে পাচ্ছিলাম না যে, জয়নালের মতো নারীবিদ্বেষি মানুষ কি করে একাজ ঘটালো? তাও আবার জেলের মেয়ে! ভাবলাম হয়তো তার কাছে এর উপযুত্ত কারন আছে। শুনলাম বেশ কিছুদিন থেকেই সে জেলেপাড়ায় যাতায়াত করছিলো, সেখানেই নাকি মেয়েটা স্কুলে পড়তো, সেখানেই পরিচয়। জয়নাল জেলেপাড়ার সেই স্কুলে ভর্তিও হয়েছিলো এবং ভালো লেখাপড়াও করছিলো। তার বাসায় শোনা প্রথম উক্তি ছিলো, জানতাম! বুড়োকালে ভিমরতি হয়েছিলো, স্কুলে ভর্তি হয়! জানতাম -তার চাচির মুখে।
প্রায় পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেছি হয়তো চাকরিও পেয়ে যাবো, সিগারেটের ব্রান্ড পরিবর্তন হয়েছে, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেই, রাস্তায় রমনী দেখলে বিভিন্ন প্রকার শব্দ করি যার কোনোটার অর্থই তারা জানে না। ইতিমদ্ধ্যে একটা প্রেমিকাও অদৃষ্টে জুটে গেছে, তার নাম আয়েশা। রমনীর চাহিদা অপ্রতিরোধ্য, বায়না ধরলো মধুমেলায় যাবে। পরদিন সারাদিন মধুমেলায় ভ্রমনেরর পর বিকালে বের হয়ে আসছিলাম। হটাৎ একটা লোককে খুব চেনা মনে হলো। গুরুত্ব না দিয়ে বের হয়ে আসছিলাম, এমন সময় পিছন থেকে আমার নাম ধরে কেউ ডাকলো। তার দিকে তাকাতেই একেবারে মুর্তি হয়ে গেলাম। ৩০ সেকেন্ড নির্বাক দাড়িয়ে রইলাম। সে বল্ল, চিনতে পারিসনি? আমি জয়নাল ;বলে মুচকি হাসলো। একটা মেহগনি গাছের নিচে খেজুরের পাটি পেতে আসন করে বসে আছে সে। ময়লা কাপড় আর শুষ্ক চুল প্রমান করে সে ভালো নেই। সামনে একটা চাদরের উপর হরেক রকম খেলনা দেখে বোঝা যায় যে, সে খেলনা বেচে। তারপরও নির্বোধের মতো জিজ্ঞেস করলাম, তুই এখানে কি করচিস? সে ইশারায় বোঝালো খেলনা বেচে। মুখ থেকে সিগারেটটা বের করে বল্ল খাবি?
না। তুই থাকিস কনে? তোর বাড়ির লোকেরা তোরে অনেক খুজেছে।
যাকগে, আমি ভালোই আছি। আমি কাছেই থাকি, আমিও এখন বাড়ি যাবো আমার বাড়ি চল্ বলে সে তার পুটলি বাঁধতে শুরু করলো।
সন্ধ্যা নামছে কিন্তু তার সাথে যেতে খুব ইচ্ছে হলো, শুধু এই দেখার জন্যে, সে কোন যুক্তিতে বাপের সচ্ছল হোটেল ছেড়ে এই অবস্থায় আছে। আমি আয়েশা আর জয়নাল মাটির কুড়ে ঘরটিতে ঢুকতেই এক শীর্ণকায় মেয়ে সালাম দিলো। বসতে বলেই চৌকিটা গামছা দিয়ে ঝাড়তে আরম্ভ করলো। আতিথেয়তার কোনো কমতি দেখালো না। আব্বা মা কেমন আছে রে? ভালো ;বলে জিজ্ঞাসা করলাম, তোরা এটা করলি ক্যান? একবার কি বাড়ি গেলে হতো না? এই প্রথম যুক্তিবাদী লোকটা কোন যুক্তি না দিয়ে শুধু হাসলো, ভাবলাম এরও হয়তো কোনো যুক্তি আছে যা বোঝার ক্ষমতা আমার নেই । মেয়েটা কোত্থেকে কতগুলো জামরুল আনলো। চিবোতে চিবোতে বল্লাম, আমি তোর আব্বার সাথে কথা বলবো, তোরা বাসায় উঠবি।
সে আমার সামনে হাতজোড় করে বল্লো, ভাই আমি অনেক ভালো আছি, কোনো অভাব নেই আমার, দয়া করে একাজ করিসনা।
মেয়েটার দিকে তাকাতে সেও মাথা নিচু করে বল্ল আমরা ভালো আছি।
সেদিন ফেরার পরে শুধুই ভাবছি, কিভাবে মানুষ নিজের সাথে মিথ্যা বলে? এমন পাগোল কি আছে যে সেচ্ছায় কষ্টে থাকতে চায়? বুঝলাম, অনেক কিছু থাকলেই ধনী হওয়া যায় না,ধনী সেই যার অভাব নেই। অনেক সময় কিছু একটা অনেক কিছুর অভাব দুর করতে পারে। তারা মনের দিক দিয়ে সৎ, সাহসী। অন্তত এযুগের টেলিফোন, মোবাইল আর রেস্তোরার সস্তা প্রেমের মতো দুর্বল নয়। জয়নালের বাবার কাছে কথাটা বলা উচিত কিনা বুঝলাম না, কিন্তু এতটুকু তো আগেই বুঝে এসেছি যে, তারা সুখে আছে।
নাইবা বল্লাম, না হয় আর কিছুদিন তারা এভাবেই সুখে থাকলো!
___________________________________
ঘটনা ও সকল চরিত্র কাল্পনিক নয়।
বানানের ভুল মার্জনীয় ।
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তোমার মুখের রেখা আঁকতে চেয়েছি।

লিখেছেন জায়েদ হোসাইন লাকী, ০৬ ই নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫০



রাতটি ছিল নিকোটিনে ভেজা
ধোঁয়ার ভেতরে তোমার অবয়ব হঠাৎ উধাও হয়ে গেল
চাঁদ তখন লাল আর ঠিক আমার ফুসফুসের মতোই ক্লান্ত।
তুমি আলো হয়ে রইলে, আমি অবাধ্য আলোর ফসিল

আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ - ছোঁয়া

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০৬ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৭

আজ বৃষ্টি তাকে প্রথম ছুঁয়েছে। ওর স্পর্শে তার সমস্ত সত্তা যেন হীরের মত স্বচ্ছ স্ফটিকে ছেয়ে গেছে। বৃষ্টি বলেছে, সে আকাশের কাছে গিয়েছিল। মেঘের কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনা কেন কওমী জননী হয়েছিলেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:২৯


আওয়ামী লীগ করেন এমন অনেক মানুষ বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি বোধ করেন। শেখ হাসিনা কেন কওমি জননী উপাধি গ্রহণ করলেন? আসলে সবাই যা বলতে চান,আওয়ামী লীগের রাজনীতি তো এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

×