আমার এন্টার্কটিকা দর্শন
০৬/১০/২০১২
সেদিন ছিল শনিবার। ক্যান্টিনের অখাদ্যে অরুচি ধরায় স্বাদে ভিন্নতা আনতে রাত প্রায় ৮ টার দিকে গিয়েছিলাম চানখাঁর পুল। যদি ভাল- মন্দ কিছু খাবার পাওয়া যায়- উদ্দেশ্য এটাই। ঝাল- ঝাল আলুভর্তা, মুরগী ও খিচুড়ি উদরে চালান করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বের হলাম আফতাব হোটেল থেকে। এই জাম্বো পেটটাকে নিয়ে তো আর হেঁটে যাওয়া যায়না! তাই একটা রিক্সা নিলাম। আর এই ছোট্র সিদ্ধান্তটিই যে আমার আজীবনের স্বপ্ন এভাবে পূরণ করবে, আমাকে পৌঁছে দিবে আমার স্বপ্নের রাজ্যে তা আমার এখনো বিশ্বাস হয়না।
আমরা বিমান থেকে নেমেছিলাম দক্ষিন আফ্রিকায়। ওখানে ৩ দিন থাকতে হয়েছিল এন্টার্কটিকা সম্বন্ধে প্রাথমিক জ্ঞান সংগ্রহের জন্য। এরপর ৪র্থ দিনে আমি সহ অন্যান্য পর্যঠক যারা ছিল তাদের নিয়ে টাইটানিক সাইজের একটি জাহাজ দক্ষিণ মহাসাগরের বুক চিরে যাত্রা করেছিল এন্টার্কটিকার উদ্দেশ্যে। ৬ অক্টোবর শনিবার পৌঁছে গেলাম আমার স্বপ্ন রাজ্য, দক্ষিণ মেরুর প্রতিবেশী এন্টার্কটিকায়।
ফ্রিতে যাওয়ায় আমার সাথে না ছিল কোন গাইড, না ছিল ভাল প্রতিরোধ ব্যাবস্থা। আমি নজরুল পড়ি, আমি সুকান্ত পড়ি, আমি অনন্ত জলিলের মুভি দেখি। আমাকে রুখতে পারবেনা কোন প্রতিবন্ধকতা। শিতে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে হাঁটছি আর লেহন করছি এন্টার্কটিকার ভয়ংকর সৌন্দর্য।
দুইপাশে দুটো বড় বড় বরফের চাঁই। মাঝ বরাবর চিকন রাস্তা। শঙ্কিত মনে হাঁটছি। হঠাৎ কে যেন বলে উঠল
-টাকা দে।
আপদ তো! ঢাকার ফকির আবার এন্টার্কটিকায় আসল কিভাবে? ঘটনা কি জানার জন্য বিরক্ত হয়ে সামনে তাকাতেই দেখতে পেলাম, আলখেল্লা পরা অদ্ভুত আকারের দুজন ব্যাক্তি পোটলা হাতে আমার সামনে দাঁড়িয়ে। সামান্য বিনয়ের ভাব ধরে বললাম
-আপনারা কে জনাব?
-ওরে পাপী, তুই আমাদের চিনতে পারলিনা? কেয়ামতে জবাব দিবি কি?
-গোস্তাকি মাফ করবেন জনাব। ইদানিং আমার স্মরণ শক্তি একটু কমে গেছে। আপনাদের পরিচয়টা দিলে প্রিত হতাম জনাব।
-ওরে নেমক হারাম, আমি মাক্কু শাহ্ আর ও হচ্ছে তেল শাহ্। এখন চিনেছিস?
-আর বলতে হবেনা বাবা। এবার চিনতে পেরেছি। আপনারা আল্লাহ্র অতি প্রিয় বান্দা। আপনারা যা বলেন আল্লাহ্ তাই করেন। কিন্তু আপনারা এখানে কি করছেন বাবা?
-কলি যুগে পাপ বেড়ে গেছে অনেক। তাই আমরা এখানে এসেছি। ঘাপটি মেরে থাকি। আর তোর মত ভক্তদের থেকে কিছু খসানোর টিরাই করি।
আমি একটা ৫০ টাকার নোট দিয়ে কোন রকমে সটকে পড়লাম ওখান থেকে। আমি আবার হাঁটছি। আমাকে পেঙ্গুইন দেখতে হবে। এই জোকার টাইপ প্রাণীটার জন্যই এন্টার্কটিকা আমার কাছে এত প্রিয়।
হাঁটছি। অদুরে একটা তাবুর মত কিছু দেখতে পেয়ে থমকে দাঁড়ালাম। শুনেছি অনেক বড় বড় বিজ্ঞানি এখানে আসে গবেষণা করতে। হয়ত এটা বিজ্ঞানিদের তাবু। কৌতূহল বসত তাবুর কাছাকাছি গেলাম। ভেতরে উকি দিয়ে দেখি দুজন মহিলা সামনা-সামনি বসে আছে। একজনের হাতে আর একজনের গাল ধরা। চোখের কাছে চোখ, নাকের কাছে নাক, ঠোঁটের কাছে ঠোঁট। চমকে উঠলাম। লেসবিয়ান বিজ্ঞানী নাকি? হঠাৎ করে ভিতর থেকে চিৎকার ভেসে আসল- কে? কে ওখানে? ভিতরে আয়। আমার আদেশ।
বাংলাদেশী বিজ্ঞানী নাকি? ভয়ে জড়সড় হয়ে ভিতরে ঢুকলাম। এরপর যা দেখলাম তাতে আমার চোখ ছাবনাবড়া। আপনারা হয়ত আমাকে গাঁজাখোর ভাববেন। আমি আমার দুচোখে স্পষ্ট দেখেছি (বড় পীরের কসম)। ওখানে বাংলাদেশের দুই কাণ্ডারি, সবার নয়নের মনি শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়া বসে ছিলেন। শেখ হাসিনার চোখে চুল ভেঙ্গে পড়েছিল। আর তাই তুলে দিচ্ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। আর আমি কিনা কি ভাবছিলাম! ছিঃ ছিঃ।
আমি লম্বা এক সালাম দিলাম। জিগ্যেস করলাম- আপনারা এখানে? বুঝেছি; ঘুরতে এসেছেন।
তখন খালেদা আপা বললেন- গর্ধব, মহিলাদের সালাম দিতে নেই। আর আমরা খানে ঘুরতে আসিনি।
-তো কি জন্যে এসেছেন? গবেষণা করতে?
-ফাজলামি করবিনা। তোর হাসিনা ম্যাডামকে জিগ্যেস কর কি হয়েছে।
-কি হয়েছে ম্যাডাম?
-ভ্যাজর ভ্যাজর করিসনা। দূর হ এখান থেকে।
-আহ বলনা হাসিনা আপা ঘটনাটা। ও ছোট মানুষ। আর এভাবে কারো সাথে শেয়ার না করলে তো দম বন্ধ হয়ে মারা যাব এখানে।
- কি শুনবি? পদ্মা সেতুর অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে আমাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে জনগণ। আচ্ছা তুই বল, আমি কি কখনো কারো অর্থ আত্মসাৎ করেছি?
-আলবৎ না। যা করেছে আপনার চামচারা করেছে। আপনারটা নাহয় বুঝলাম কিন্তু খালেদা আপা, আপানি এখানে কেন?
-আর বলিসনা। আমাকেও নির্বাসিত করেছে হারামজাদারা।
-আপনি আবার কি করলেন? আপনি তো ভাল মানুষ।
-তা তো আমিও জানি। আমাকে বিতাড়িত করেছে কারণ, আমার ছেলেরা নাকি বিদেশে অর্থ পাচার করেছে। তুই বল আমার ইনোসেন্ট সেলেরা কি কখনো এমন কাজ করতে পারে?
- কক্ষনো না। সবই নাহয় বুঝলাম কিন্তু দেশটা চালাচ্ছে কে এখন? এরশাদ মামা নিশ্চয়ই?
-হিঃ হিঃ। এরশাদের অবস্থা আরও করুন। পাবলিক ওর পশ্চাৎদেশে বেম্বু (bamboo) প্রদান করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে।
-সাংঘাতিক তো। দেশটা তাহলে কে চালাচ্ছে? ভুতে?
-না। ভুতে চালাচ্ছেনা। দেশের সকল মানুষ মিলে আবুল টাইপ একজনকে রাষ্ট্র প্রধান বানিয়েছে। ওর হাতে সমস্ত ক্ষমতা দেয়া হয়নি। কোন বাজেট, আইন প্রনয়ন করতে গেলে দেশের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয়। দেশে এখন কোন ধনী- গরিব ভেদাভেদ নেই। সবাই একই খাবার খায়, একই কাপড় পরে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে কোন ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র শিবিরের তাণ্ডব নেই। এক কথায় সবাই সমান হয়ে গেছে। বল এটা কি ঠিক হয়েছে? আমার স্বামী, হাসিনা আপার আব্বা দেশটা স্বাধীন করল এজন্য আমরা কি একটুও ফ্যাসিলিটিজ পাবনা?
আমার কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। আমিও তো ছাত্রলীগ করি। হলের আমার আরামদায়ক রুমটা কি হাত ছাড়া হয়ে গেল? আমি ভোঁ- দৌড় দিলাম। আমাকে দেশে যেতে হবে। হলে আমার একটা সিট অন্তত কনফার্ম করতে হবে। অনেকদূর দৌড়ানোর ফলে হাপিয়ে উঠেছিলাম। একটা বরফের ফলার উপর বসতেই ওটা কাঁপতে শুরু করল। কাঁপুনিটা ক্রমেই বাড়ছে।
হঠাৎ চারদিক একসাথে ঝাপসা হয়ে গেল। চারদিক কাঁপছে। প্রচণ্ড চিৎকার-চেঁচামেচি, ঠাণ্ডা বাতাস। বড়-বড় বরফের পাহাড়গুলো পরিবর্তিত হচ্ছে। হ্যাঁ, ওগুলো জ্যামিতিক আকার প্রাপ্ত হচ্ছে। ঠিক বড়-বড় বিল্ডিঙের মত। প্রচণ্ড কাঁপছে রিক্সাটা। আর আমি শক্ত করে ধরে বসে আছি হুডটা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




