somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ডেডবডি

১৪ ই মার্চ, ২০১৪ রাত ৯:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

লাশটা রাখা হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মূল প্রবেশপথটার একদম সামনে। সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে বডিটা। চারদিকে অসংখ্য মানুষ গিজগিজ করছে। এরা নাকি দেখতে এসেছে লাশটাকে।

মেজাজ খারাপ করে তাকিয়ে আছি আগাগোড়া সাদা কাপড়ে পেঁচানো লাশটার দিকে। এটাকে এখানে রাখা হয়েছে কেন? আর এত মানুষই বা আসার কি দরকার? মৃত মানুষকে দেখার কি আছে? মরছে তো আপদ সাফ হয়েছে।

অল্পতেই মেজাজ বিশ্রী রকমের খারাপ হয়ে যাওয়ার রেকর্ড আমার বহুদিনের। আজ সবচেয়ে বেশি মেজাজ খারাপ আমার। কে মরবে না মরবে তার জন্য এত বড় একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল গেট বন্ধ করে রাখতে হবে কেন?

সারা দিনে একটা সিগারেটও খাইনি। সিগারেট না খেলে এমনিতেই মেজাজ খারাপ থাকে আমার। সিগারেট কেনার মত টাকা আমার হাতে নেই আপাতত। চারপাশে বার বার তাকাচ্ছি। সিগারেটখোর কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। নাকি লাশ দেখতে এসে সবাই হাজি হয়ে গেছে তাও বোঝা যাচ্ছে না।

সিগারেট খুঁজতে গিয়ে একটা জিনিস আবিস্কার করলাম। যারা এখানে এসেছে তাদের মোটামুটি সবাইকেই আমি চিনি। কিন্তু কোন এক অদ্ভুত কারণে ওরা কেউ আমাকে চিনছে না। এরা সবাই আমার ব্যাচমেট। আজ থেকে দশ বছর আগে আমরা সবাই একসাথে ভর্তি হয়েছিলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজে।
এরা সবাই এখন দেশে অথবা দেশের বাইরে মোটামুটি ভাবে প্রতিষ্ঠিত। আমিই শুধু এখানে পড়ে আছি।

আমার ক্লাশ রোল ছিল ১৩৮। বিন্দু নামের মেয়েটার রোল ছিল ১৩৯। পাশাপাশি রোল হিসেবে একধরণের ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল আমাদের মাঝে। প্রথমে বন্ধুত্বতেই সীমাবদ্ধ ছিল ব্যাপারটা। এরপর কিভাবে কিভাবে যেন প্রেম হয়ে যায় আমাদের মাঝে।
বিকেলে একসাথে ঘুরতাম, রাতের খাবারটা প্রতিদিন একসাথে বাইরে খেতাম..................
ও কখনও আমাকে নিজের হাতে খেতে দিত না। তুলে খাওয়াত আমাকে। একদম ছোট বাচ্চাদের মত।

সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার সময় ওর কোন এক বান্ধবীর বিয়েতে গিয়ে ওর সাথে ভরা পূর্ণিমা রাতে নদীর ধারে সারারাত বসে ছিলাম। ও আমার কাঁধে মাথা ফিসফিস করে বলছিল আমি যেন ওকে কখনও ভুলে না যাই। আমার কাছ থেকে ওয়াদা নিয়েছিল ও।

আমি আজও বিন্দুকে ভুলিনি। সত্যিই ভুলিনি। কিন্তু বিন্দু আমাকে ভুলে গেছে। বেমালুম ভুলে গেছে। থার্ড ইয়ারে উঠে হঠাৎ করেই একদিন শুনি ওর বিয়ে হয়ে গেছে। আমি কিছুই জানতে পারিনি।
পরে বিন্দু আমাকে বলেছিল ওর বাবার ইচ্ছেতেই নাকি ইঞ্জিনিয়ার এক ছেলের সাথে ওর বিয়ে হয়ে গেছে। আর ও ওর বাবার কথার উপর আর কোন কথা বলতে পারেনি। আমি যেন ওকে ক্ষমা করে দেই।

এরপর থেকে কেন যেন পড়ালেখাটা আর আমার দ্বারা হয়ে ওঠেনি। আমার বন্ধুরা সবাই পাশ করল, বড় বড় ডাক্তার হল আর আমি এখনও পড়ে আছি থার্ড ইয়ারেই।
অনেকেই অনেক ভাবে বোঝাতে চেয়েছে আমাকে। এমনকি একদিন বিন্দু নিজে এসে আমার হাত ধরে কেঁদে কেঁদে বলেছিল আমি যেন আমার ভবিষ্যতটা এভাবে শেষ করে না দেই।
কিন্তু তারপরও কেন জানি এক সেকেন্ডের জন্যও পড়ালেখাতে মন বসাতে পারিনি আমি। এখন প্রতিদিন বিকেলে ক্যান্টিনে বসি। চা-সিগারেট খাই আর তাকিয়ে থাকি জুনিয়রগুলোর মুখের দিকে। ওদের মুখে নিজের শৈশবটাকে খোঁজার চেষ্টা করি।

ঢাকা মেডিকেলের কোন ছাত্র মারা গেলে তার লাশটা কিছু সময়ের জন্য কলেজ গেইটে রাখা হয় ব্যাচমেট এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের শেষবারের মত দেখাবার জন্য।
কার লাশ এটা এখনও জানতে পারিনি। এখন নাকি লাশের মুখ থেকে কাপড় সারানো হবে।
কে যেন লাশের মুখ থেকে কাপড়টা সরাচ্ছে। আমার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসছে। জোর করে তাকিয়ে থাকার চেষ্টা করছি। আর পারছি না। মনে হচ্ছে আমি যেন শুন্যে মিলিয়ে যাচ্ছি, বাতাসে ভেসে যাচ্ছি, চলে যাচ্ছি পৃথিবীর বাইরে অনেক অনেক দূরে কোথাও।

শেষ বিকেলের আলো এসে পড়েছে লাশটার মুখে। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে লাশটাকে দেখার জন্য। কারও মুখে কোন কথা নেই।
শুধু বিন্দু নামের একটা মেয়ে লাশটাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছে। কারণ ওদের ক্লাশ রোল ছিল পাশাপাশি। ১৩৮ এবং ১৩৯।

ফেসবুকেঃ https://www.facebook.com/humayundmc
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মুভি রিভিউ - ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা : দেশ ভাগের ট্র্যাজেডি আর হারিয়ে ফেলা প্রেমের অসাধারণ এক মেলবন্ধন 

লিখেছেন আলভী রহমান শোভন, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



একটা সময় হিন্দি মুভির বেশ ভক্ত ছিলাম। ভালো কোন হিন্দি মুভি রিলিজ পেলেই দেখে ফেলার চেষ্টা করতাম। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে হিন্দি মুভি তেমন দেখা হয়ে ওঠে না। বছরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছায়াঘর: কেস ফাইল #১৯৯৬ (দ্য লাস্ট রিল)

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২২


লেখকের নোট:
এই গল্পটি ৯০-এর দশকের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহর রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে জনমনে দীর্ঘদিনের স্মৃতি, নস্টালজিয়া ও আলোচনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ইনভেস্টিগেটিভ থ্রিলার । গল্পে উল্লেখিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

কারখানা বাঁচাতে পারিনি, তাই মানুষকে অটো চালাতে হচ্ছে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৩৪


বাংলাদেশে এখন এমন এক অদ্ভুত অর্থনৈতিক সংকট চলছে, যেখানে একজন শ্রমিক কারখানায় বিদ্যুৎ না পেয়ে চাকরি হারিয়ে অটো রিকশা চালাচ্ছেন। সেই অটো আবার চার্জ দিতে বিদ্যুৎ খাচ্ছে। যে বিদ্যুৎ... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাসিনা কে রাখলে এমনি হবে...দাদা, যতদিন পারেন রাখেন

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:৩২



২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে বাংলাদেশ ছাড়ার পর শেখ হাসিনাকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বিশেষ বিমানটি ভারতের দিল্লির উপকণ্ঠে উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদের হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে (Hindon Air... ...বাকিটুকু পড়ুন

খারাপটা কোথায়

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৩৪


বিশ্বখাতায় নাম লিখিলাম পাগল
কবিতারা হেসেই মাঠে হয়ে যায় ছাগল;
ঘাস খাওয়া আনন্দটা অন্যরকম
তবু পাগল বলে কথা, পূর্ণিমায় যুগল;
আজ কাল হাঁটবাজারে হিংসাটা
কম মূ্ল্যেই বিক্রয় হচ্ছে! যোগোপযোগি
সময়টা পাগল ছাড়া চলেই না
লেখার খাতার দামটাও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×