somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

" বিশ্বকাপ ও রেফারি রঙ্গ "

২৬ শে জুলাই, ২০১০ সকাল ১১:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গল্প আছে, একদা একটি বাচ্চা ছেলে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আচ্ছা বাবা, ফুটবল খেলোয়াড়দের দৃষ্টিশক্তি কমে গেলে ওঁরা কী হন?’
‘ওঁরা রেফারি হয়ে যান।’ এই ছিল বাপের সংক্ষিপ্ত উত্তর।
ছেলেটির বাবা ঠাট্টাচ্ছলে বললেও কথাটা যে মন্দ বলেননি, সদ্য সমাপ্ত এবারের বিশ্বকাপই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। বিশ্বকাপের নক-আউট পর্বে জার্মানি ৪-১ গোলে ইংল্যান্ডকে হারায়; কিন্তু রেফারি ইংল্যান্ডকে একটি গোল থেকে বঞ্চিত না করলে ফল ভিন্ন হতেও পারতো—বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক টেলিভিশনের পর্দায় দেখল বল গোল পোস্টে লেগে জার্মানির গোললাইন অতিক্রম করেছে; অথচ রেফারির কিংবা লাইনসম্যানের চোখে তা পড়ল না। তৎপূর্বে ১৯৯০-এর বিশ্বকাপে রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্তের জন্যই আর্জেন্টিনা সেবারের বিশ্বকাপ ঘরে তুলতে পারেনি। আর ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড-অব-গড’ রেফারির দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা তো সবারই জানা।
প্রসঙ্গত, এবারের বিশ্বকাপ জয়ী স্পেনে একবার সংঘটিত একটি মজার ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। সে দেশের একটি ফুটবল ম্যাচ অমীমাংসিতভাবে শেষ হওয়ার পর ভয়ে মুষড়ে পড়া রেফারিকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন উভয় দলের খেলোয়াড়েরা। কেননা সেই খেলায় খেলোয়াড়দের সঙ্গে সঙ্গে রেফারি নিজেও দুখানা গোল করেন—প্রথম গোলটি হয় রেফারির গায়ে লেগে আর দ্বিতীয়টি হয় মাথায় লেগে। তবে সুখের বিষয়, গোল দুটি হয় দুপক্ষের গোল পোস্টে।
সে যা হোক। এবারের বিশ্বকাপ আমাদের দুটো শব্দ উপহার দিয়েছে—‘জাবুলানি’ ও ‘ভুভুজেলা’। ‘জাবুলানি’ শব্দটা এসেছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক স্থানীয় ভাষা থেকে, যার অর্থ হচ্ছে উৎসব করা। এডিডাস কোম্পানি সেই ১৯৭০ সাল থেকে বিশ্বকাপের জন্য বল তৈরি করে আসছে। কখনো কোনো বিশেষ নাম দিয়েছে বলে শুনিনি। এবারই প্রথম বলের নামকরণ করে ওরা এটাকে এ যাবৎ শ্রেষ্ঠ ও নিখুঁত গোলক আকৃতির বল বলে আখ্যায়িত করেছে। তা নিখুঁত বলের এমনই গুণ যে বড় বড় খেলোয়াড় আর গোলরক্ষকেরা সেটা ধরে রাখতে হিমশিম খেয়ে গেলেন। স্পেনের গোলরক্ষক ক্যাসিয়াস তো বলেছেন, ওটা ‘পচা’ (rotten)।
‘ভুভুজেলা’ শব্দটিও এসেছে দক্ষিন আফ্রিকার জুলু ভাষা থেকে; আর এটা আমাদের দেশের শিঙা-জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের মতো ও একসময় আমাদের দেশের মতোই গ্রামবাসীকে ডাকার জন্য ব্যবহূত হতো। তফাৎটা শুধু এই যে আমাদের দেশে এটা তৈরি হয় গরু কিংবা মহিষের শিং দিয়ে, আর ওটা মূলত প্লাস্টিকের তৈরি। ছোটবেলায় গ্রামে বাসকালে দেখতাম, গ্রামের লোক দলবেঁধে মাছ মারা কিংবা পশু শিকারের উদ্দেশ্যে শিঙায় ফুঁ দিয়ে একত্র হতো।
আর জার্মানির একুরিয়ামে বসবাসরত গণকঠাকুর অক্টোপাস পল-এর খাতির-তোয়াজের বহর দেখে আমার মনে পড়ে গিয়েছিল সেই বিখ্যাত বাংলা প্রবচনটি। ঝড়ে বক মরে, আর পীরের পীরাকি জাহির হয়। তা আমিও তো চার বছর আগে বিগত বিশ্বকাপে স্পেনের ক্রীড়ানৈপুণ্য দেখে এই কলামেই মন্তব্য করেছিলাম: স্পেনিশরা স্পষ্টতই বেশ ভালো প্রস্তুতি নিয়েই এবারের বিশ্বকাপে নেমেছিল। কেবল ভাগ্য বৈরী ছিল বিধায়ই বোধকরি ওরা ফাইনাল পর্যন্ত যেতে পারেনি, তাই বিশ্বকাপ ঘরে তুলতে পারল না (রম্যলেখকের বিশ্ব পরিক্রমা দ্র.)। এবার ওরা সেটা ঘরে তুলতে পারায় আমিও নিজেকে ভবিষ্যদ্বক্তা বলে ভাবতে শুরু করে দিয়েছি।
এবারের বিশ্বকাপ সুপারস্টারদের সবাই কিন্তু ফ্লপ। ইংল্যান্ডের ওয়েইন রুনির কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে। টেলিভিশনের পর্দায় ইংল্যান্ডের ক্লাব পর্যায়ে ওঁর খেলা আমি দেখেছি—১০ মিনিটের মধ্যে দুই গোল দিয়ে মাঠ ছেড়ে এলেন, গোল দেওয়াটাই যেন ওঁর একমাত্র কাজ; অথচ এবারের বিশ্বকাপে রুনি ছিলেন গোলশূন্য। তাই তো ওঁকে নিয়ে মজার গল্প বেরিয়েছে—
অনুশীলন করতে গিয়ে পায়ে আঘাত পেয়ে ওয়েইন রুনি গিয়েছিলেন চিকিৎসকের কাছে। চিকিৎসকের কাছ থেকে ফেরার পর তাঁর বাবা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, কিরে, চিকিৎসক কী বললেন?
‘চিকিৎসক খেলতে নিষেধ করলেন’, রুনি উত্তর দিলেন।
‘ওহ্, তিনিও তাহলে তোর খেলা দেখেছেন’, রুনির বাবা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন।
রেফারিদের ব্যাপারে বর্ণিত সেই জোকটিও যখন প্রসঙ্গক্রমে মনে পড়ে গেল, এ স্থলে বলেই ফেলি: একজন লোককে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ফুটবলের রেফারির কি উচিত ঘুষ হিসেবে উপার্জিত টাকার ট্যাক্স দেওয়া? উত্তর এল, উচিত, যদি রেফারি সৎ ও নীতিবান হন।
পরিশেষে ফুটবলসংক্রান্ত সেই মজার গল্পটি, যেটি টেলিভিশন সম্পর্কিত বলেও চালিয়ে দেওয়া যায়। বিশ্বকাপের কোনো এক আসরে স্বাগতিক দেশের খেলা হচ্ছিল স্থানীয় সময় বিকেলে। তো স্বাগতিক টিমের এক ফুটবলারকে তুলে নেওয়া হয় হাফ টাইমের ঠিক পূর্বক্ষণে। তিনি তখন খেলার জার্সি পরেই অবশিষ্ট খেলাটি টেলিভিশনের পর্দায় দেখা ও সেই সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার উদ্দেশে স্টেডিয়ামসংলগ্ন তাঁর এক সাবেক গার্লফ্রেন্ডের বাড়িতে উপস্থিত হলেন। তিনি জানতেন যে এ সময় গার্লফ্রেন্ডের স্বামী বাড়িতে থাকেন না, সেথায় তিনি ড্রয়িংরুমে খেলা দেখা ও খোশগল্পে মত্ত। এমন সময় বাসার কলবেল বাজতেই গৃহকত্রী বলে উঠলেন, নিশ্চয়ই আমার স্বামী। তুমি জানো, তিনি তোমাকে পছন্দ করেন না। তুমি টেলিভিশন সেটের পেছনে লুকিয়ে যাও, উনি এসে আমাদের বেডরুমে চলে গেলেই বেরিয়ে পালাবে কিন্তু। ফুটবলার অগত্যা তা-ই করলেন। কিন্তু স্বামী প্রবর গৃহে প্রবেশ করে বেডরুমে যাওয়ার পরিবর্তে টেলিভিশনে খেলা দেখতে লেগে গেলেন। এদিকে ফুটবলার আড়ষ্ট হয়ে বসে থেকে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। এক পর্যায়ে তিনি সটান দাঁড়িয়ে বিনা বাক্যব্যয়ে হেঁটে টিভি সেট থেকে দরজা পর্যন্ত গিয়ে বেরিয়ে যেতেই মহিলার স্বামী বিস্ময় বিস্ফোরিত নয়নে বলে উঠলেন, আরে! এই প্লেয়ারটাকে রেফারি কখন লাল কার্ড দেখিয়ে বের করে দিল, সেটা তো লক্ষ করিনি।
পাদটীকা: আমেরিকান রাজনীতিবিদ ইউজিন ম্যাকার্থি যথার্থই বলেছেন, একজন রাজনীতিবিদ হওয়া অনেকটাই ফুটবল কোচ হওয়ার মতো। উভয় ক্ষেত্রেই আপনাকে খেলাটা ভালোভাবে বোঝার মতো স্মার্ট এবং সেটাকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবার মতো বোকা হতে হবে।

সূত্র: প্রথম আলো, ২৬-০৭-২০১০
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×