
নিমজ্জিত অদ্ভুত রঙে- আলো আলো, ধোঁয়া ধোঁয়া। আলো ও আঁধারের মাঝখানে কীসের অবস্থান ? আদৌ কী কেউ ব্যাখ্যা করেছে ? অথচ ওতে বসবাস ! তবে একাকি একজন বন্দি তার হৃদয়ে অকপটে সম্পূর্ণরূপে অনুভব করে এর সুদৃঢ় ব্যাখ্যা, সে অনুভব করে এই আলো এবং আঁধারের ভয়ংকর ধাঁধাঁ । শিকলগুলো আলতোভাবে কেঁপে উঠলো, মৃদু রিনিঝিনি শব্দগুলো যেন শিকলদের স্পষ্ট কথোপকথন । এলোমেলোভাবে ঝুলে থাকা শিকলগুলোর গাঁয়ে ছোট্ট ছোট্ট কাঁটা আছে, কাঁটাগুলোর সম্মুখভাগ চিকচিক করছে যেন তারা আড় চোখে তাকিয়ে আছে একে অপরের দিকে । কেউ একজন আসছে এদিকে, শিকল পরা হাত নিয়ে, স্থির চোখ নিয়ে । তার হাতের শিকলগুলো মেঝে কাঁপিয়ে আসছে, মাঝে মাঝে শিকলের ভারে সে নুয়ে পড়ছে, আবার উঠছে । সে যেন দৃঢ প্রতিজ্ঞ, এদিকে আসবেই । তার চোয়াল দেখে মনে হচ্ছে সে মানুষখেকো, আসছে হয়তো আমাকেই খেতে । এ কথা ভাবতেই আমার দেহ শিরশির করে উঠলো। শেকলে বাঁধা দেহ নিয়ে আমি ছটফট করছি, যেকোন ভাবে বাঁচতে, অন্তত আমার মত কেউ আমাকে খাবলে খাবলে খেয়ে ফেলুক তা আমি চাই না ।
আমি জানি না আমার ইতিহাস কী, কীভাবে এসেছি এই অজ্ঞাত সঙ্কুল কক্ষে? কোথায় ছিলাম আমি ? কারা আমার মায়ার একান্ত শৃঙ্খল ? অন্তত এ প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে আমাকে বেঁচে থাকতে হবে । এগিয়ে আসা এই মানবরূপী শিকলবন্দি জন্তুটা হয়তো আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে । সে ধীরলয়ে এগিয়ে আসছে ডুবন্ত সূর্যের মত, যেন প্রতি পদক্ষেপে তার মৃত্যু সম্ভাব্য । আমিও খুব করে কামনা করছি তার মৃত্যু, এটুকু পথ আসার আগেই সে মৃত্যুশয্যায় পতিত হোক, প্রয়োজন হলে আমিই তার সমাধির পূর্ণাঙ্গ আয়োজন করবো! আচ্ছা, লোকটার হাত তো শিকল দিয়ে বাঁধা, সে আমাকে ভক্ষণ করবে কীভাবে ? এ ব্যাপারটা ভেবে আমি পুলকিত অনুভব করছি ।, কিন্তু পরক্ষণে মনে পড়লো সে তো আমাকে খাবে, তবে তার হাতের কী দরকার, আমার হাত তো খোলা নেই যে তাকে আমি বাঁধা দেব ! সে দাঁত বসিয়ে বসিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে আমার মাংস খুলে নেবে, তৃষ্ণা মেটানোর জন্য রক্তগুলোকে চুষে নেবে। এভাবে আমি কল্পনা করছি আমার মলিন ভবিষ্যত, সেখানে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি ঝুলে থাকা পরিচ্ছন্ন কঙ্কাল !
আমি মনের ভেতর তীব্র কামনায় ছটফট করছি- কেউ আসুক আমার ত্রাণকর্তা হয়ে, শিকলগুলো ভেঙ্গেচুরে নিয়ে যাক আমাকে। কিন্তু ততক্ষণে লোকটা আমার চোখ বরাবর তার চোখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । আমি চোখ মেলতেই চমকে উঠি তার এই ভয়ানক স্থির চোখ দেখে । সে তাকিয়ে আছে আমার চোখের গভীরে, আমি তার চোখের অন্ধকার স্পষ্ট দেখতে পারছি । হঠাৎ আমার চোখেও এক অন্ধকার ক্যানভাস ভেসে উঠলো । আমি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি তার চোখগুলোর দিকে, এ যেন তীব্র কোন নেশা আমার হৃদয়কে গ্রাস করে নিয়েছে। ধীরে ধীরে আমার চোখও স্থির হতে লাগলো । সে হঠাৎ চোখ ফিরিয়ে আমার পেছন দিকে পাশ কেটে চলে যাচ্ছে যেন আমার চোখের গহীনে সে কিছু একটা সম্পন্ন করে ফেলেছে । কিছুক্ষণের জন্য যেন আমি সেই ভয়ংকর মৃত্যু কামনা থেকে রেহাই পেলাম । কিন্তু সামনে তাকিয়ে দেখি তার মত আরো একজন আসছে, সেও আমাকে পাশ কেটে পেছনের দিকে চলে গেল । এভাবে আরো অনেকজন চলে গেল ।
অজস্র কৌতুহল নিয়ে মাথা ঘুরিয়ে আমি পেঁছনের দিকে তাকালাম । আমি দেখতে পেলাম সেদিকে এক বিশাল পৃথিবী আছে যার জমিন মাড়িয়ে ব্যাখ্যাতীত সংখ্যায় এভাবে শিকল নিয়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে সারি সারি লোক , শিকলের ভারে তারা নুয়ে পড়ছে, আবার উঠছে । এমন বিরহী অদ্ভুত দৃশ্যে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর আমি অনুভব করলাম আমার শিকল খুলে গেছে । তবে হাত থেকে নয় উপর থেকে, যেখানে শিকলটা আটকে ছিলো, যেন উপরে কোথাও থেকে আমি এখানে পড়েছি কিন্তু পড়ার মুহূর্তে আটকে গেছি । এখন আমিও শিকলের ভারে নুয়ে পড়ছি, আবার উঠছি, হাঁটছি... এভাবে এগিয়ে যাচ্ছি তাদের একজন হয়ে তাদের পিঁছু পিঁছু....
ছবি কৃতজ্ঞতা - নেট ।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই এপ্রিল, ২০১৭ রাত ১:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



