আবার দেখা
সুব্রত সূত্র ধর
এরকম যে ঘটবে তা কখনো ভাবি নি। আমি আর মামুন অফিসের মিটিং শেষ করে প্যারাডাইস পাড়ার মোড়ের চা স্টলে বসেছি। তখনি চোখ পড়ল সুতপার দিকে। অন্যরকম লাগে ওকে। লাগবে না? এরকম সাজে এর আগে দেখিনি তো। কপালে সিঁদুর হাতে শাখা........। সুতপা কি আমাকে দেখেছে। না দেখলেই ভাল, আবার কোন পাগলামী করে বসে।
- তাহলে, তুই নিরাপত্তাহীনতাকেই বাল্য বিবাহের অন্যতম কারণ বলে মনে করছিস? মামুন জিজ্ঞেস করল।
- হ্যা, তোর কি ধারনা? আমি বললাম।
মামুন যেন কি বলছে ....... আর এদিকে আমার মাথায় শুধু সুতপার কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। যে কথা, ঘটনা, আশা এত কাল চাপা পড়েছিল, আজ কিভাবে যেন তা শতদলের মতো বিকশিত হচ্ছে।
২
তখন আমি অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। আমার একটা বই বিনয়ের কাছে ছিল। বইটা দরকার হয়ে পড়ল পরীক্ষার জন্য। আমি ওর বাড়িতে ফোন দিলাম। প্রথম বার রিং বাজল, কিন্তু কেউ ধরল না। মোবাইলের স্কিনে ভেসে উঠল নো আনসার। আমি আবার ডায়াল করলাম, ফোনটা বাজছে এবং ফোন ধরার শব্দ পেলাম।
আমি হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে নারী কণ্ঠে উত্তর এল - কে?
- আমি অর্ক, বিনয়ের বন্ধু। আপনি?
উত্তর এল - ভাবী। মনে খটকা লাগল। তাই আমি আবার বললাম -ভাবী!
- আরে ভাবী না ববি। কানে কম শুনেন নাকি? তব্র স্বরে উত্তর এল।
- আপনি কি পেয়াজ বেশি খান ? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
- কি! কেন?
- না, আপনার কথা খুব ঝাঝালো কিনা?
- একটা সুন্দর হাসির শব্দ শুনলাম।
- রাগ করলেন? ও পাশ থেকে উত্তর এল।
- এখন আর রাগের কথা নয়। রাগ তোলা থাক অন্য কারো জন্য, অন্য কোন সময়ের জন্য।
- কেন?
- সুন্দর হাসি শুনার পর রাগ যে মাটি হয়ে যায়।
- তাই নাকি! আমার হাসি সুন্দর- জানতাম না তো! আচ্ছা বলেন কি জন্য ফোন করেছেন?
- বিনয়ের কাছে আমার একটা বই ছিল ..........
- ও হ্যা, দাদা বইটা আমার কাছে দিয়ে গেছে। দাদা রুনুদিদির বাড়িতে গেছে। ফিরতে দেরি হবে। আপনি বইটা নিয়ে যাবেন।
- সে কি! ও ক্লাস টেষ্ট দিবে না?
- দেবে না মনে হয়। একটু দরকার ছিল বলেই গেছে।
- কাল এসে নিয়ে যাব। কিন্তু, আপনার পরিচয় টা তো পেলাম না।
- পরিচয়! মানুষ কি আদৌ নিজেকে, নিজের পরিচয় জানে? কি পরিচয় দিব বলেন?
- তারপরও তো সবারই একটা নিজস্ব আত্মচিহ্ন থাকে যার দরুন সে স্বাধীন হয়েও কোন কিছুর অধীন।
- ও রকম পরিচয় , আমি সুতপা, বিনয়ের মাস্তুত বোন। আর ডাক নামটা আপনি জানেন -ববি।
- ও আচ্ছা, ঠিক আছে। রাখি। - আমি বললাম।
৩
পরদিন আমি বিনয়ের বাড়িতে গেলাম। দেখি, বিনয়ের ভাই অনয় একটা মেয়ের সাথে খেলছে। ও আমাকে দেখে দৌড়ে ছুটে এল। আমি এসে ঘরের ভিতর গিয়েবসলাম। এরপর মাসীমা এসে তার কথার বস্তা খুলতে আরম্ভ করলেন।
আমার ভাগ্নি পুচুর নিউমোনিয়া হয়েছিল, তার কি অবস্থা? মার কোমড়ের ব্যাথার কি হল? ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর, কোমড়ের ব্যাথার জন্য একটা কবিরাজি টোটকা বলা শুরু করলেন।
আর আমি মনে মনে মাসীমার উপর যথেষ্ট বিরক্ত হচ্ছি। মেয়েটি পাশে বসে আছে, অথচ পরিচয় করিয়ে দিবার কোন নাম নেই।
-ওসব অনেক করেছি, কোন লাভ হচ্ছে না। আমি বললাম। মাসী, ইনি কে?
-ও ......
- আমিই সুতপা। সুতপা হেসে বলল।
- কেমন আছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম।
- এইতো ভাল। কিন্তু, আপনি আমাকে আপনি করে বলছেন কেন?
- হ্যা বাবা, ও তো বিনয়ের অনেক ছোট, ওকে তুমি করেই বলেছি। মাসী বললেন।
- কি করছ? আমি সুতপাকে জিজ্ঞেস করলাম।
- এই তো, এবার HSC শেষ
-মাসী, বিনয় কবে আসবে?
- কি জানি, কবে আসে? তুমি বস, আমি আসছি।
আমি চুপ করে বসে আছি। কি বলব বুঝতে পারছি না।এমন সময় সুতপা বলল,
- রেগে আছেন বুঝি?
- কেন?
- কালকের ঐ ঘটনার জন্য। সত্যিই কি আপনি ভাবী শুনেছিলেন।
- নেট ওয়াকে একটু ঝামেলা হচ্ছিল। প্রথম দিকে কথাগুলো কেটে কেটে আসছিল তো।
- ওমা, তাই! তখন কিছু বললেন যে?
- বুঝি না, কখন কি বলতে হয়। সত্যি এক অজানা সংকোচে নিজেকে সম্পূর্ণ প্রকাশ করতে পারি না।
- এত বড় হলেন এখনো বুঝে না।
- হ্যা,বড় হয়েছি বলেই তো এত জ্বালা।
- আপনি তো বেশ সুন্দর করে কথা বলেন।
- বলি বটে, তবে কথাগুলো যে ধরা করা।
- কার থেকে, বুদ্ধদেব গুহ?
- না এখন বুঝতে আর ভুল হচ্ছে না। বুদ্ধদেব তোমার প্রিয় লেখক!
- জাদুকর! কি করে বুঝলেন।
- বুঝতে পারি।
- আমিও পারি।
- কি?
- বলব না।
- ঠিক আছে বইটা দাও। আমি যাব।
- বসুন, দিচ্ছি।
সুতপা একটা খামে ভরে বইটা এনে দিল। বিষয় টা আমাকে মুগ্ধ করল।
বই নিয়ে আমি মাসীর থেকে বিদায় নিলাম।
যাবার সময় সুতপা হেসে বলল - আবার আসবেন কিন্তু।
৪
বাড়িতে এসে খামটা খুলে একটা ধাক্কা খেলাম। খামে ভিতরে এটা থাকবে আমার কল্পনাতেও ছিল কল্পনাতেও ছিল না। ভিতরে একটা বই আছে ঠিকই কিন্তু আমার টা না। নানান ঢঙ্গে চলা বলা মনে হয় ওর একটা সহজাত বেশিষ্ট্য। কিন্তু, এ রকম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মজা করতে পারে, ভেবেই আমার অন্য রকম লাগছে। আর, ও কেমন করেছেন আমার মাথায় বসে গেল। সরাতেই পারছি না।
ঢঙ্গী মেয়েরা যে আকর্ষণীয় হয় তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
বইটা ফেরত নিতে গেলাম দুদিন পর। সুতপা বলল আপনি যে আবার আসবেন আমি অনয়কে বলেছি।
-কি করে বুঝলে।
-ঐ দিন বললাম না, বুঝতে পারি!
- কচু বুঝছ। এটা আমার না, আসি বইটা সুতপাকে দিলাম। বিনয় আসে নি?
- দাদা আসে নি। ইস কি ভুল হয়ে গেল।
- এরকম ভুল করাটা কি তোমার বিলাসীতা?
- খুব ........ রাগ করেছেন?
- রাগ না করাটাই তো বিচিত্র, তাই না?
- আহারে .... অন্যায় হয়েছে। শাস্তি দেন। সুতপা হেসে বলল।
- চাইলেই কি শাস্তি দেওয়া যায়। এতই সহজ!
- কঠিন কেন?
- শাস্তিদাতাকেও যে শাস্তি দেবার মতো নিষ্ঠুর হতে হয়।
- শাস্তিদাতা নিষ্ঠুর নয় কেন?
- কিভাবে হবে? সবার উপর যে নিষ্ঠুর হতে পারে না।
- কেন?
- সুন্দর অপমান সহ্য করতে পারি না বলেই তো এত জ্বালা।
- বাহ্, বেশ বললেন তো।
- বলি যে ধার করে, সে তুমি জানো।
- তা কথাটি কার?
- এই মুহূর্তে যা বললাম তা শুধু আমারই, শুধু বাক্যটি নজরুলের।
- সত্যিই আপনি চমৎকার বলেন ।
৫
বইটা নিয়ে আসার পর থেকেই, সুতপা কেমন করে যেন আমার চিন্তার, চেতনে মিশে গেল। ওর কথা ভাবলে অদ্ভুত একটা ভালো লাগা কাজ করে। আর ওর কথা ভাবতেই আমার মনে অদ্ভুত সিরসিরানি লেগে যাচ্ছে।
বিনয়টা এতদিন ওর বোনের বাড়িতে কি করছে যে, আসতে পারছে না। ও আসলে ওর সাথে ওদের বাসায় যাওয়া যেত, সুতপার সাথে দেখা হত।
কিন্তু আমার এমন হচ্ছে কেন? বিনয়দের বাসায় যেতে আমার কখনো কোন কারণের প্রয়োজন হয় নি। তবে আজ কেন এত সংশয় হচ্ছে। আমি কি প্রেমে পড়েছি।
“প্রেম / ভালবাসা বোকাদের সাহসী করে” কোথায় যেন পড়ে চিলাম। আমি বোকা বা বুদ্ধিমান কোনটাই তো নই। আমি তো খুব সাধারণ, তবে কি, প্রেম সাধারণদের সংশয়ী করে। এসব ভাবতেই মোবাইলের রিং বেজে উঠল। দেখি সুতপা, ও বলল।
-অর্কদা, একটু বাসায় আসতে পারবেন?
- কেন?
- না, এমনি একটু কাজ ছিল।
- কি কাজ?
- আসেন না, তারপর বলি।
আমি তো এরই অপেক্ষা করছিলাম।
- ঠিক আছে, বিকেলে আসব।
- আসেন তবে, রাখছি।
কি জন্য ডাকল বুঝতে পারছি না। ওর কি আমাকে দেখতে ইচ্ছে করতে। তবে কি আমাদের প্রেম হয়েই যাবে। হঠাৎ করেই নাকি প্রেম আসে, তাই বলে এভাবেই।
বিনয় বাসায় ঢুকতেই মাসী বললেন, তুমি এসেছ। বিনয়ের আসতে দু’দিন দেরি হবে। তাই তোমাকে ডেকে পাঠালাম। সুতপাকে নিয়ে একটু পাঁচআনী বাজারে যাও না, বাবা। মনে একটা খুশি ভাব এসে গেল। সুতপাকে নিয়ে ঘুরব। ভাবতেই ভাল লাগছে। আমি বললাম, ও কোথায়?
এমন সময় সুতপা এসে বলল-চলেন যাই। আমরা বের হলাম। রিক্সায় পাশাপাশি বসে আছি। কীযে ভাল লাগছে। ভাবছি কথাটি বলেই পেলি। ছেলেদেরই নাকি আগে বলতে হয়।
- কি সুন্দর কমলা রঙ্গের রোদ, কোন ঝাঝ নেই, দেখছেন। সুতপা বলল।
- না, দেখতে পাচ্ছি না তবে অনুভব করছি। সুতপা হাসল আমার কথা শুনে।
এরপর দুজন চুপচাপ, নিরবতা ভেঙ্গে আমি বললাম।
- সুতপা শোন।
- কথা বলে এই মুহুর্ত নষ্ট করা যাবে না, অর্কদা, শুধু অনুভব করতে হবে।
এরপর আর কোন কথা চলে না।
পাঁচআনী বাজারে এসে সুতপা বলল,
- বিয়ের কার্ডের দোকানে নিয়ে চলুন।
- বিয়ের কার্ড! কার?
- কেন, আমার।
- নানান ঢঙ্গে কথা বলা ওর স্বভাব। কোনটা যে সত্য বুঝা দায়।
দোকানে কার্ড দেখতে দেখতে আবার জিজ্ঞেস করলাম- কার বিয়ে?
সুতপা বলল, আমার। বিশ্বাস হচ্ছে না, এই দেখুন। এ বলে ব্যাগ থেকে একটা কাগজ বের করে দেখাল। যেটাতে বর-কনের ঠিকানা বিয়ের তারিখ, লগ্ন সহ বিস্তারিত লেখা ছিল। পড়ে আমার মাথায় সৌরজগৎ ভেঙ্গে পড়ল।
সুতপা বলল - দেখুন তো এটা, কেমন।
আমি কিছু একটা বলতে চাইলাম, কিন্তু কোন স্বর বের হল না।
সুতপা আবার বলল - অর্কদা কী হলো।
সেদিন কিভাবে কার্ড কিনে বের হলাম মনে নেই।
ঘোরের মধ্যে ছিলাম। ঐ দিন ছিল আমাদের শেষ দেখা।
৬
-এই অর্ক, তোকে ডাকছে। মামুন ধাক্কা দিয়ে বলল।মামুনের ধাক্কায় ধরা ধামে ফিরলাম! পিছন ফিরে দেখি, রাস্তার ও পাড় থেকে সুতপা ডাকছে।
- তাহলে যেতে হবে। আমি মামুনকে বললাম।
- মেয়েটি কে? মামুন জিজ্ঞেস
- সুতপা।
- ও, সেই সুতপা। মামুন বলল।
- মামুন সুতপার কথা জানে। ওকে বলেছি।
- তাহলে যাই।
- ঠিক আছে, সাবধানে যাস। মামুন হেসে বলল।
- আমি সুতপার কাছে গেলাম। ও বলল,
- কখন থেকে ডাকছি।
-শুনতে পাইনি। আমি বললাম।
- কেমন আছেন?
- এইতো চলছে।
- আমার সাথে একটু চলেন।
একসময় এ কথা বললে বর্তে যেতাম। কিন্তু আজ ভয় করতে লাগল, আবার কোন ধাক্কা খায়।
-কোথায়, কি জন্য? আমি বললাম
-চলেন, গেলেই দেখতে পারেন।
- বেশ চল। আমি বললাম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


