ট্রান্সজেন্ডার শব্দটা অনেকের কাছে অপরিচিত মনে হতে পারে। কিন্তুপ্রকৃত পক্ষে এটা নতুন কোন শব্দ নয়। আমরা সকলেই তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়াদের কথা জানি। এরাই হলো ট্রান্সজেন্ডার। বলা যায় আমাদের সমাজের অবহেলিতএকটি অংশ। অবহেলিত বলছি এ কারণে যে সমাজের আর সবার মতো হিজড়াদের শিক্ষালাভ বা কর্মযোগের তেমন কোন সুযোগনেই আমাতদর দেশে। তাহলে এদের জীবিকা অর্জনের উপায় কি ? ওদেরও তো আমাদের মতো ক্ষুধা-তৃষ্ণা আছে বা সমাজে মানুষের মতো বেঁচে থাকার অধিকার আছে।
সত্যিকার অর্থে এ নিয়ে আমরা কেউ ভাবিনা। তাই নিজেদের অন্ন-বস্ত্রের সংস্থানের জন্য এরা ভিন্নমাত্রিক উপায় বা কৌশলের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। হিজড়ারা সব সময় দল বেধে চলাফেরা করে এটা আমরা সকলেই জানি। এ দৃশ্য আজকাল আমাদের অতিপরিচিত যেহিজড়ার দল কোন দোকানে ঢুকে পড়েছে এবং যার যা দরকার তুলে নিয়ে চলে যাচ্ছে মূল্য না দিয়েই। দোকানদারের এমন অবস্থায় করার কিছুই থাকেনা অসহায়ের মতো তাকিয়ে দেখা ছাড়া। কারণ, বাধা দিতেগেলেই ওরা দোকানদারের সাথে এমন আচরণ করবে, গায়ে এমনভাবে হাত দিবে যে বেচারা দোকানদারের জন্য পুরো ব্যাপারটা অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়াবে। কাজেই ভালোয় ভালোয় যা ইচ্ছে হয় নিয়ে চলে যাক, এতেই মঙ্গল।
শুধু কি তাই ? রাস্তা-ঘাটে চলতে ফিরতে কোন ভদ্রলোক যদিকোন হিজড়াদলের খপ্পরে পড়ে তাহলে তারও একই অবস্থা দাঁড়াবে। পকেটে যা থাকে সাবাড় করে নিয়ে চলে যাবে ওরা। কিন্তু বলার বা করার কিছু থাকেনা কারও। আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা কিছু এ প্রসঙ্গে এখানে শেয়ার করতে চাই। আমার এক কলিগের গাড়ি জ্যামে পড়ে একদিন। জানালা ছিল খোলা। দুই হিজড়া দুই জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে ড্রাইভারের শরীরে বুলাতে লাগল। ড্রাইভারের পকেটে যা ছিল মোবাইলসহ নিয়েও তাদের চাহিদা মিটলনা। শেষে আমার কলিগ তার ব্যাগ থেকে আরও কিছু টাকা দিয়ে ওদেরকে বিদায় করল। এই ঘটনা ঘটার পর থেকে রাস্তায় কোন মতেই গাড়ির গ্লাস খোলা রাখিনা আমি।
ভারতে একবার ট্রেনে করে শেয়ালদাহ থেকে ট্রেনে করে জয়পুর যাচ্ছিলাম। এটা ২০০২ সালের কথা। দুইজন হিজড়া এসে সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে দিল আমার স্বামীর দিকে। আমার হাজব্যান্ড পকেট থেকে টাকা বের করে দেয়ার আগেই এক হিজড়া ওর শরীরে হাত বুলাতে লাগল। দেখে আমার গা যেন ঘিনঘিন করে উঠছিল। আমার হাজব্যান্ড তাড়াতাড়ি একটা দশ রুপীর নোট বের করে ওর হাতে দিল। কিন্তুমোটেও খুশী হলনা সে। বরং আমাদেরকে ভাতেমরা বাঙালী বলে টাকাটা ছুড়ে মেরে চলে গেল।
এই হলো সমস্যা। কোন হিজড়া আপনার কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতলে আপনি তাকে সাধারণ ফকির মনে করে সামান্য কিছু দিয়ে বিদায় করতে পারবেন না। ওকেখুশীকরে দিতে হবে। নতুবা আপনার শরীরের নানা জায়গায় হাত বুলাতে শুরু করবে কিংবা নানা আপত্তিকর মন্তব্য ছুঁড়ে দিবে আপনার দিকে, যাতে করে আপনি একটি বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যাবেন। এটাই ওদের বড় অস্ত্র। এই অস্ত্রটা পুরুষদের উপর প্রয়োগ করে বেশী লাভবান হতে পারে বলে সাধরণত দেখা যায় হিজড়ারা সাহায্যের জন্য পুরুষদের কাছে বেশী যায়।
আজকাল ওরা সুযোগ বুেজ কোন কোন বাড়িতে ঢুকে পড়ে ছোট্ট শিশুদের জিম্মি করে অর্থ আদায় করছে। এই কিছুদিন আগের ঘটনা। চারজন হিজড়া কলিংবেল টিপে আমার ভাস্তির বাসায় ঢুকে পড়ে। কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই ওর পাঁচ মাসের মেয়েকে কোলে তোলে নেয় একজন। তারপর দশ হাজার টাকা দাবী করে। না দিলে মেয়েকে নিয়ে চলে যাবে। আমার ভাস্তি বাড়িওয়ালাকে ডেকে এনে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে ওদেরকে বিদায় করে। আজকাল ঢাকা শহরে এসব ঘটনা অহরহই ঘটছে। এলাকার কোন বাসায় ছোট্ট্ বাচ্চা আছে, কোন বাসায় ঢুকলে টাকা পাওয়া যাবে, কিভাবে ঢুকতে হবে এসব খবর নাকি কেউ কেউ ওদের কাছে পৌঁছে দেয়। অর্থাৎ হিজড়াদের মাধ্যমে কেউ কেউ নিজেও কিছু কামিয়ে নিচ্ছে।
যেহেতু হিজড়াদের বিরুদ্ধে আইনের শাসন কিংবা বিচার ব্যবস্থার কোন খবরদারিত্ব নেই সেহেতু ওরা যে কোন উপায়ে নিজেদের অন্নবস্ত্রের ব্যবস্থা করতে মরিয়া। দিন যতই যাচ্ছে নতুন নতুন কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে ওরা। মানুষের ভদ্রতা ও সম্মানবোধকে জিম্মি করে হিজড়াদের জীবিকা অর্জনের এসব কৌশল আজকাল যেভাবে বেড়ে চলছে তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। তাই আমার মনে হয় হিজড়াদের কার্যকলাপ নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। কিছুটা হলেও এদের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা উচিত। আর সেটা করতে গেলেই যে ইস্যূটা বড় হয়ে দেখা দিবে সেটা হলো এদের জীবিকা অর্জনের কিহবে ? হ্যাঁ, এটা একটা বড় সমস্যা অবশ্যই এবং মূল সমস্যা। সেজন্যই আমি বলব যারা সমাজ সংস্কারক আছেন, সমাজের উন্নয়নে কাজ করেন, সমাজের অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার নিয়ে ভাবেন, তারা একটু হিজড়াদের নিয়ে ভাবুন। এদের জন্য বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করে দিয়ে এদের সামনে সম্মানজনক উপায়ে জীবিকা অর্জনের একটি উপায় আপনারা করে দিতে পারেন।
আমাদের পাশবতী দেশ ভারত এক্ষেত্রে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। তার একটি ছোট্ট উদাহরণ এখানে দেয়ার প্রয়োজন বোধ করছি। ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যের রায়গড় করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন একজন হিজড়া। তার নাম মধু কিন্নর ওরফে নরেশ চৌহান। মেয়র নির্বাচিতহবার আগেসেট্রেনে গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করত। সেতার নির্বাচনী প্রচারণাও চালিয়েছে গান গেয়ে এবং বিজেপি সমর্থিত প্রার্থীকে পরাজিত করে মেয়র পদে জয়লাভকরেছে। মধু কিন্নরের এই জয় দেশ-কালভেদে অবহেলিত হিজড়া সম্প্রদায়ের সামাজিক স্বীকৃতি ও প্রতিষ্ঠা অর্জনের পথে একধাপ অগ্রগতি। অবশ্য এর আগে গত বছর এপ্রিল মাসে ভারতীয় সুপ্রীমকোর্ট কিজড়াদের স্বতন্ত্র লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে।
হিজড়াদের সামাজিক স্বীকৃতিও প্রতিষ্ঠা দানের ব্যাপারে ভারত যতদূর এগিয়েছে আমরা এই মুহূর্তে ততটুকু হয়তো পারবনা। কিন্তু সেপথে অগ্রসর হলে কিছুটা হলেও অর্জন আসবে। এ অর্জন শুধু হিজড়াদের নয়, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অর্জন হবে এটা। কারণ,সমাজের অবহেলিত এই অংশটাকে একটা বিধিবদ্ধ কর্মশৃংখলার মধ্যে আনতে পারলে আমরা বহু অনাকাংখিত ঘটনার হাত থেকে নিস্কৃতি পাব।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জানুয়ারি, ২০১৫ বিকাল ৪:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




