ভাট কবিতা বা হাঁটুরে কবিতা
বিষয়টির সাথে আমার শৈশব স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এটি ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রাচীন লোকজ সংস্কৃতির অংশ বিশেষ। আমার শৈশব কাল কেটেছে ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল থানাধীন শেরপুর গ্রামের মামাবাড়িতে। তখন দেখতাম আমার মামাত/খালাত ভাইয়েরা হাট থেকে আসার সময় দুই/তিন টাকা দিয়ে চটি কবিতার বই/পুস্তিকা কিনে আনত। একটি বড় কাগজকে বিশেষভাবে ভাঁজ করে আট/দশ পৃষ্ঠার একটি দীর্ঘ কবিতা ছাপানো থাকত এতে। কবিতাটি লেখা হতো কোন এক বিশেষ ঘটনা বা কাহিনিকে ঘিরে। যেমন প্রেমের কারণে কোন মেয়ের আত্মহত্যা বা গোপনে ঘর ছেড়ে যাওয়া, শ্বশুর বাড়ির নির্যাতনে কোন বধূর আত্মহত্যা কিংবা কোন পরকীয়া প্রেম ইত্যাদি কাহিনি উপজীব্য হয়ে উঠত এসব কবিতায়। যারা এই কবিতাগুলো রচনা করতেন তাদেরকে বলা হতো ভাট কবি কিংবা হাঁটুরে কবি।
তখনকার দিনে গ্রামাঞ্চলের হাটে-বাজারে-গঞ্জে কিংবা রেল ষ্টেশনে এসব হাঁটুরে কবিদের দেখা মিলত। হাট বা ষ্টেশনের কোন একটা জায়গায় আসর বসিয়ে কিংবা হেঁটে হেঁটে তারা নিজেদের রচিত কবিতা সুর করে পড়ত। তাদের পড়ার ভঙ্গিমায় সাধারণ কাহিনি অসামান্য হয়ে উঠত। কিছুটা লেখাপড়া জানা গ্রামের লোকেরা এসব কবিতার বই কিনে আনত বাড়িতে। আমার এখনও মনে আছে আমার খালাত/মামাত ভাইয়েরা প্রায়ই হাট থেকে এসব বই কিনে এনে আমাকে দিত সবাইকে পড়ে শুনানোর জন্য। আমি তখন ক্লাস ফোর কিংবা ফাইভে পড়ি। যদিও রচয়িতা কবিদের মতো সুর করে আবেগ মিশিয়ে কবিতাগুলো পড়তে পারতাম না, তবু দেখতাম আমার সামনে বসা শ্রোতারা বিশেষ করে মহিলারা কোন বিশেষ সখিনা কিংবা জরিনার দুঃখে হা-পিত্যেশ করত অথবা ঘৃণায় ছি ছি করত। আর একটু লেখাপড়া জানা বউ-ঝিদের দেখতাম কবিতার বইটি বালিশের নিচে রেখে অবসর সময়ে সেটা বের করে পড়ত।
বাংলা একাডিমী কর্তৃক প্রকাশিত “বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা-ময়মনসিংহ” থেকে সংগৃহীত ভাট কবিতার বই এর একটি নমুনা ও কয়েকটি চরণ এখানে পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো।
আল্লাহু আকবার
বাংলাদেশে জিন্দাবাদ
আয়না বানুর প্রেমের হাসি
পিতার ফাঁসির কবিতা।
দশজন ডাকাত ঘরে করে বন্দি নারী লোকের ফন্দি
প্রণেতা -----------
ঠিকানা ----------
মূল্য ঃ ২/- (দুই) টাকা।
কবিতা ঃ
প্রথমে আল্লা নবী (২) মনে ভাবি লিখি যে কবিতা
আয়না বানুর প্রেমের হাসি শুনেন ভদ্র শ্রোতা।
ÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑ
ÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑÑ
বয়স ষোল বৎসর (২) শুনেন খবর আমি যাই লিখিয়া
প্রাইমারী পাশ করেছে আয়না প্রমোশন পাইয়া।
গীতি কবিতার আদলে দুই শ কিংবা আড়াই শ কিংবা আরও বেশী লাইনে ছন্দ মিলে লেখা হতো এসব কবিতা। পড়ার সময় রচয়িতা যেমন এক ধরনের গভীর আবগে ডুবে যেত তেমনি উপস্থিত শ্রোতারাও আত্মমগ্ন হয়ে শুনত সেসব কবিতা।
বর্তমানে এই ভাট কবিতা বা হাঁটুরে কবিতা বাংলাদেশের বিলুপ্তপ্রায় লোকজ সংস্কৃতির অংশ। ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল থানার যে গ্রামটিতে আমার শৈশব কেটেছে সেই গ্রামে এখনও আমার যাতায়াত আছে। কিন্তু এখন আর কারও মুখে ভাট কবিতা শুনতে পাইনা। আধুনিক সংস্কৃতির ছোঁয়া এখন সুদূর গ্রাম অবধি পৌঁছে গেছে। তাই আজকাল আর ভাট কবিদের দেখা মিলেনা গ্রামের হাটে-বাজারে কিংবা রেল ষ্টেশনে। তবু এক সময় এই হাঁটুরে কবিরা আমাদের দেশের লোকজ সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছিল তাদের রচনার মাধ্যমে একথা আমরা কেউ অস্বীকার করতে পারবনা।
কৃতজ্ঞতা - বাংলা একাডেমী।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



