Click This Link
অপ্রকাশিত চিঠি ২
Click This Link
অপ্রকাশিত চিঠি ৩
Click This Link
তোমাকে রাজর্ষি নামে ডাকার নানান কারন বলেছিলাম ।তবে আসলটা বলা হয়নি।
আসলটা হলো বুদ্ধদেবগুহ।
উনার সবিনয় নিবেদন পড়ে এত ভালো লেগেছিলো।
মনে হয়েছিলো খুব প্রিয় একজনকে এই নাম এ ডাকবো। যে একটা বাদুর হ্যাট পড়ে বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াবে।
ধরা যাক একবার বুদ্ধদেবগুহর সাথে কোথাও দেখা হয়ে গেলো। আমি উনার সামনে যেয়ে দাঁড়াবো। বলবো ,আপনার কল্পনার চরিত্রের মত, আপনার স্বপ্ন দিয়ে গড়া সেই যে সবিনয় নিবেদন এর রাজর্ষি আমি তাকে খুঁজে পেয়েছি।
উনি হয়তো অবাক হয়ে যাবেন। ভাববেন মাথায় গোলমাল আছে।
ভেবে দেখোতো রাজর্ষি তোমার আমার অদ্ভুত সেই দেখা হওয়া......
তোমার সাথে আমার কতকাল ধরে যেনো জানাশোনা।এক আকাশের দুইটা তারা আমরা পাশাপাশি থাকতে থাকতে হঠাৎ যেনো ছিটকে পড়েছিলাম..........
কত দুরে এসে আবার আমাদের দেখা হয়ে গেলো।
তোমার সাথে পুরান শহরটা দেখতে বের হলাম যেদিন.........আকাশটা কি দারুণ নীল সাদা মেঘে ভরে ছিলো। সকাল সকাল রাস্তায় যেমন থাকে তেমন ট্রাফিক নেই।
সিডিতে বাজছিলো ,"আমার নিখিল ভূবন হারালেম আমি যে" ।
সুবিনয় রায়ের গাওয়া সব গান আমার কাছে আছে...মায়ের সুত্রে পাওয়া। আমার মা খুব ভালো রবীন্দ্র সংগীত গাইতেন।
কি অসাধারণ সব লাইন...........
"আমার নয়নে সন্ধ্যাতারার আলো
তোমার পথের অন্ধকারে জ্বালো জ্বালো।"
এমন করে কি করে লিখে গেছেন রবীন্দ্রনাথ................এত ত্যাগ।এত অনুভব।
বুকের মধ্যে কেমন এক বেদনার ক্ষরণ!
দুঃখ না থাকলেও দুঃখ পেয়ে বসে..............
তোমার পাশে বসে আমার ভালোলাগা গান গুলো শুনলাম।গাড়ি পার্কিং করে হাঁটছি ,অনেক্ষন পর কথা বললে।
মা কোথায়?
বললাম দেশে।
তুমি জানতে না চাইতেই বললাম বাবা নেই দু'বছর।
এরপর আর এই নিয়ে কথা বলিনি।
হাঁটতে থাকলাম।
জানো রাজর্ষি মা বাবা আলাদা হয়ে যান আমার যখন পনেরো।
দুজনেই হায়ার স্টাডিজ এর জন্য বাইরে এসেছিলেন। পড়ালেখা শেষ করে মা মোটামুটি ভালো কাজ পান ঠিকই।
বাবা মনমতঃ কাজ পাননি কখনো। সেখান থেকেই শুরু। একসময় বাবা প্রচুর ড্রিংক করা শুরু করলেন। একসময় তা এত বেশী মাত্রায় হয়ে যায়.........নিজেকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারতেন না বাবা। দুর্ব্যবহার করতেন......গালাগালি করতেন। সকাল হলেই আবার ঠিক হয়ে যেতেন।
মা অনেক দিন চেস্টা করেছিলেন।
পারেন নি।
মায়ের মত একজন অসাধারন মানুষ যিনি বাবাকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন মনে করি আমি। তাকে ছেড়ে আলাদা থাকা শুরু করেন ।
আমি দুজনের কাছে থেকেছি।
দুজনে আলাদা থাকলেও কেউই নতুন কোন জীবনের কথা ভাবেন নি।
বছরে দুয়েক আগে বাবা হঠাৎই চলে গেলেন......অতিরিক্ত পানীয়ই কারন।
কি অদ্ভুত ব্যাপার জানো মা বাবা আলাদা ছিলেন ঠিকই। কিন্তু বাবাকে অসম্ভব ভালোবাসতেন। বেশ কয়েক বছরে একসাথে থাকেননি ঠিকই অথচ বাবা চলে যাওয়ায় মা কেমন যেনো হয়ে গেলেন।
আমি মায়ের জীবন থেকে দেখেছি শুধু একই ছাদের নীচে থাকলেই কাছে থাকা নয়......কাছে না থাকা মানুষ ও বুকের গভীরে থাক....কেযে কিভাবে ধারণ করে যার যার নিজস্ব অনুভব। কেউ কি বুঝতে পারে তা?
মা দেশে ফিরে গেছেন।
একটা প্রাইভেট কলেজে শিক্ষকতা করেন।
আত্মীয় স্বজনদের নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।
সবই আমার বাবার পক্ষের মানুষ। মায়ের আপন বলতে একটা ভাই ।উনি আমেরিকাতে থাকেন।
তুমি অবাক হবে হবে শুনে বাবামার ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু ছিলাম আমি। উনারা একসাথে থাকেন নি ,সেটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। তবে মা আমাকে বাবাকে নিয়ে কখনো কোন খারাপ কথা বলেন নি। ছোট করেননি।শুধু বলেছেন মানুষের জীবনে সব কিছুর নিয়ন্ত্রন থাকা দরকার...একসাথে থাকার জন্য শ্রদ্ধাবোধ থাকা দরকার।
বাবার একটা খারাপ অভ্যাস মায়ের কাছে থেকে দুরের করে দিলো.....
আমি সবসময় দুজনকে পেয়েছি তাই অভাববোধটা নেই সত্যিকারভাবে।
শুধু ভাবি যা হারানোর সবচেয়ে বেশী হারিয়েছেন তো বাবাই...........
আর মা তো সেই হারানোটা বুকে চেপে ধরেই আজোবধি কেমন মন্ত্রবলে বেঁচে আছেন।
পোর্ট এর কাছে হাঁটতে হাঁটতে আমরা নদী দেখছিলাম সেদিন।
জাহাজগুলো ভীড় করে ছিলো। এই নদীপথে ক্রুজে যাওয়া যায়।
আমরা একঘন্টার একটা ক্রুজে যাবার টিকিট কাটলাম। তখনো দুই ঘন্টা দেরী।
তুমি বলছিলে এমন জনারণ্যে এলে তোমার অবাক লাগে.....
এত মানুষ ........কত রকম তাদের ভাষা.....
কত রকম তাদের চেহারা। আমার ও একই রকম ব্যাপার হয়।
যখনই কোন ভীড়ের জায়গায় যাই..........একলা আমি আরো বেশি একা হয়ে যাই।
অনেক মানুষের মাঝে থেকে একা হওয়া অনুভবটা আমাদের জীবনানন্দ খুব ভালো বলেছেন..............
সকল লোকের মাঝে ব'সে
আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা
তুমি বললে স্বপ্ন নয় সত্যি নয়
কোন এক বোধ কাজ করে?
আমি অপার বিষ্ময়ে তোমার দিকে তাকিয়ে থাকলাম........এও কি সম্ভব?
আমি তারে পারিনা এড়াতে
সে আমার হাত রাখে হাতে......
রাজর্ষি তুমি জানোনা আমার ভিতর কিযে হয়েছিলো।
আমি তোমার পাশে বসে শুধু কাঁদছিলাম............ভালোলাগায় যে মানুষ মরে যেতে পারে। আমার মনে হচ্ছিল আমি মরে যাচ্ছি।
একটা কবিতা............একটা কবিতার কি অসম্ভব যাদুময়তা।
তা যদি হয় এমন কারো কাছ থেকে । আলাদিনের আশ্চর্য্যপ্রদীপের মত সেই অদ্ভুত অবাক করা ভালোলাগা নিয়ে বসে আমি কাঁদলাম আর কাঁদলাম.....
তুমি অস্হির হচ্ছিলে ভীষন।
বারবার জানতে চাইছিলে কিসের কারন!
কিচ্ছু বলতে পারিনি।
আমি তো সেই মেয়ে যে Before Sunrise ছবিটা দেখে কাঁদতে কাঁদতে আকুল হয়েছি...........
বারবার কত অজস্রবার সেই ছবি দেখেছি..........
আর আমার জীবনে আজ তার চেয়েও সত্যি কিছু এসে দাঁড়িয়েছে।
ছোটবেলায় হারিয়ে ফেলা বিড়ালের জন্য এখনো যেই আমি ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদি......সে তোমার মত একজনকে সামনে পেয়ে যখন প্রতিনিয়ত চমকে যাচ্ছি।
মনের সেই বিশ্বাস ..............একজন তো আছেই কোথাও।
যে আমার সামনে এসে দাঁড়াবে একদিন।
জীবনে সেই সুর কেটে গেছিলো............
বেদনার নীল ছবি হয়ে অনেক দিন পার করেছি......আর সেই আমি তোমার সাথে দেখা হয়ে বুঝছি মানুষের সম্পর্কের একটা বিশাল দিক হলো .....অনুভব।
একজনের জন্য অন্যজনের অনুভব।
যে কাছে থাকলে মনে হবে ম্যাজিক।
টুংটাং জলতরঙ্গের মত সুর বেজে যাবে........।
আমার মেঘলা মুখ তোমার সইছে না............ফট করে দেখি তুমি হাওয়া।
একটা মাস্ক কিনে আনলে।
আর আমাকে নানান রকম ভয় দেখালে..........না হেসে কোন উপায় নেই।
এমনই তুমি ।
নদীতে ক্রুজে গিয়ে আমরা ছাদে বসলাম।
নদীতে ঢেউ তেমন ছিলোনা.....একপাশে শহর অন্যপাশে গাছপালা........পাহাড়। আমি এর আগে কখনো ক্রুজে আসিনি।
মুগ্ধতার কোন সীমা ছিলোনা.......
এক ঘন্টা কেমন পলকে পার হয়ে গেলো।
একটা স্মোক মিট এর দোকানের সামনে থামলাম দুজনে। নদীর হাওয়ায় পেটের মধ্যে ক্ষুধার নাচন। দুপুর গড়িয়ে বিকেল ছায়া মেলতে শুরু করছে.....
মানুষ আরো বেশী। সামার এর সময় বলেই ।বেশীর ভাগই ট্যুরিস্ট।
ইটবিছানো পথটায় এক এক জায়গায় কেউ বসে ছবি আঁকছিলো।
কেউ গিটার বাজিয়ে গান গাইছিলো...কেউবা ম্যাজিক দেখাচ্ছিলো।
হুট করে একটা মেয়ের সামনে বসে গেলে তুমি......ফ্রেন্চ এক শিল্পী।
বেশ ভালোই তো ফ্রেন্চ বলো তুমিও......
তাকিয়েছিলাম।
মেয়েটা সাধরনতঃ একজনের ছবি আঁকে একবারে। তুমি বললে আমাদের দুজনেরই আঁকতে হবে...........
আমি চেয়ারে বসলাম।
আর তুমি মাটিতে।
মেয়েটা দেখিয়ে দিলো কিভাবে বসতে হবে............আমি না করবো তার কোন সুযোগই নেই।
ছবিটা শেষ হলে দেখলাম তোমার ঝকঝকে দুটো চোখ।
তুমি সামনে তাকিয়ে হাসছো।
আর আমি তোমার দিকে তাকিয়ে আছি.............এর আগে আমি কখনো কাউকে দিয়ে ছবি আঁকাইনি।
মেয়েটা কোন যাদুবলে আমাকে আমার কৈশোর এর মুখ ফিরিয়ে দিয়েছে।
দু'চোখে সন্মোহন!
এখনো সেই ছবি আমার সামনে........
তুমি ছবিটার ছবি তুলে নিয়ে গেছো।
আমি তোমার দু'চোখে তাকাতে পারিনা........ফরাসী সেই মেয়েটা কি করে আঁকলো তোমার চোখের আগুন?
আমি হলে পারতাম না....কিছুতেই না।
তোমাকে লিখতে বসলে কথারা পাখামেলে ধরে।
মনে হয়ে পাতার পর পাতা লিখে যেতে পারি । আমাদের সেই কটা দিন যেনো কয়েক জীবনের ইতিহাস।
আমাদের শুরু নেই শেষ নেই শেষ গল্পর আগামী অধিবেশনে আবার কথা হবে।
রাজর্ষি আজ তাহলে যাই?
একটা খবর জানাই।
আমার এ্যাডমিশনটা হয়ে গেছে........কাজটা ছেড়ে দিতে হবে।
তখন শুধু থিসিস এর কাজ আর চিঠিলেখা।
আর অপেক্ষা।
কোন সুদুরের.........
প্রার্থনায় সব হয়।
আমি প্রার্থনায় আছি.................
যা মঙ্গলকর তাই যেনো হয়।
তটিনী
চলবে.....

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

