গ্রামের একটা স্কুল। ঠিক একটা ছবির মত দেখতে। দুপাশে সবুজে ভরপুর বিশালাকৃতির দুটো মাঠ, পাশে একটা পুকুর। পুকুরটা দেখে মনে হবে, যেন কোন এক শিল্পী পরম যত্নে এঁকেছেন তার রুপ! পুকুরের দু'পাশ যেন দু'রকম করে সাজানো। একপাশ কচুরিপানার বেগুনী রংয়ের ফুলে ঢাকা। অন্যপাশগুলোতে শাপলা-শালুকের হাসাহাসি। পাড় ঘেষে আম,জাম,লিচু সহ নানান ফলারি গাছের সারি। কিছু বাঁশঝাড়ও ছিল। বর্ষার মৌসুমে স্কুলটা জেগে থাকত আর মাঠদুটো স্বচ্ছ পানির বুকে হাবুডুবু খেত।
শীতের মাঝামাঝি সময়ে সেই স্কুলটাতে আমাকে ভর্তি করা হল। স্কুলের পরিবেশ আমার দুর্দান্ত লাগল। বিশেষ করে ফলগাছগুলোর কথা ভেবে। সেই এত্তটুকুন বয়সেই সুপারি গাছ থেকে শুরু করে যেকোন গাছের মগডালে ওঠাটা আমার কাছে একটা বিশেষ খেলার মত ছিল। নতুন স্কুলে সবার সাথেই পরিচয় পর্ব হল। মনির,শিরিন,বুলবুল সহ আরো অনেকেই বেশ আন্তরিকভাবে কথা বলা শুরু করল। এদের মাঝেই একটা ছেলে ছিল, নাম তার কালাম। বেশ শান্তশিষ্ট। কথা বলে কম। হাতের লেখাও চকচকে এবং নির্ভুল। সবগুলোর মাঝে আমিই ছিলাম একটু বেশী চঞ্চলপ্রকৃতির।
আমার শৈশবের চাঞ্চল্যের একটা ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি। আমি তখন স্কুলের গন্ডিতে পা রাখিনি। ছোটমানুষ, সারাদিন এই বাড়ির ফল ঐ বাড়ির ফুল সহ নানান কিছু সংগ্রহ করতাম আর খেলাধুলার সরঞ্জাম তৈরীতে ব্যস্ত রাখতাম নিজেকে। আমার আম্মা স্কুল শিক্ষিকা ছিলেন। স্কুলে বাচ্চাদের পরীক্ষা চলছে। আম্মার তাড়াহুড়ো বেড়েছে। বাথরুমে গেছেন গোসল করতে, ভুলে গামছা নিয়ে যাননি। আমি পাশেই উঠোনে বসে আপনমনে বালু দিয়ে ঘর বানানোর কাজে ব্যস্ত ছিলাম। পুতুলের জন্য বিছানা সাজাচ্ছি। এমন সময় আম্মার ডাক এল, গামছাটা তাকে দেয়ার জন্য। আমি ঘর থেকে ওটা নিয়ে যাচ্ছিলাম বাথরুমের দিকে, তখন দেখি একটা কুকুর উঠোন দিয়ে যাচ্ছে। মাথার ভেতর কী যে উদয় হল আমার! আমি সেই গামছাটা কুকুরের লেজে ছেড়ে দিলাম আর কুকুর দিল দৌড়। আমিও ওর সাথে সাথে দৌড়। জীবনের প্রথম আঘাতটা বোধ করি আম্মার কাছ থেকে সেদিনই পেয়েছিলাম। সেই ব্যাথাটা আজও আমি অনুভব করতে পারি। দু গালে পাঁচ আঙ্গুলের রেখাগুলো অনেকদিন স্পষ্ট ছিল।
তো, যেই ছেলেটির কথা বলছিলাম- শান্তশিষ্ট ছেলে কালাম। আমার তাকে একদম ভাল লাগতোনা। স্কুলে বসে শুধু কবিতা মুখস্থ করত আর বোর্ডের মাঝে চক দিয়ে টুকটুক করে অংকের সমাধান বের করত। কোন খেলাধুলা বা গাছে ওঠার সাথে ওর কোন সম্পর্ক ছিলনা। একবার টিফিন পিরিয়ডে তেঁতুল গাছ থেকে ধুম করে পড়ে গেলাম,সবাই আহারে করতে করতে দৌড়ে গেল আর বালক কালামের কোন পাত্তাই নেই। সবাই ওকে অসামাজিক ভাবত। তবে স্কুল শিক্ষকরা ওকে ভীষণ পছন্দ করত। বিশিষ্ট ভদ্র এবং ভাল ছাত্র হিসেবে। একবার যেচে গিয়ে ওর সাথে কথা বললাম। কথা বলে জানতে পারলাম- ওর বাবা একজন কৃষক। বাড়ির বড় ছেলে ও। চারটা বোন আছে ওর। তিনটা বোন বড় আর একটা তার ছোট। বাড়িতে পড়ার অবসর হয়না। বাবার সাথে ক্ষেতে যেতে হয়। বাড়িতেও কাজ থাকে নানানধরনের। তাই এই স্কুলের সময়টা সবটুকুই কাজে লাগায় সে। কেমন যেন মায়া লাগল ওর জন্য। কীই বা বয়স ওর! এই বয়সেই যেন জীবন-যুদ্ধে নেমেছে। কেন জানিনা ওকে আমার বেশ ভাল লেগে গেল। ধীরে -ধীরে ও আমার বেশ ভাল একটা বন্ধু হয়ে গেল।
তারপর, তরতর করে বয়ে গেছে অনেকটা সময়। আমরা সবাই একেকপ্রান্তে চলে গিয়েছি। কারও সাথে কোন যোগাযোগ নেই। সেই বাল্যকালে আমার সাথে যারা পড়ত তাদের কথা আমার খুউব মনে পড়ত। একবার ঢাকা থেকে আমাদের 'ধল্যা'বাসস্ট্যান্ডে নেমেছি। সাথে তিন বছর বয়সী কন্যা। স্ট্যান্ড থেকে বাড়ির দুরত্ব ঠিক দশ মিনিট। হুট করে খালি একটা রিক্সায় উঠে পড়ি। চালক বলল 'আপা, কোথায় যাবেন?' আমি বললাম 'ডাক্তার বাড়ি'( আমার দাদা ছিলেন ডাক্তার, তার কথা বললে সবাই চিনতে পারে)। আমার একটা অভ্যাস আছে সেটা হল রিক্সায় কোথাও গেলে চালকের সাথে আলাপ করতে করতে যাই। এটা আমি আমার ব্যাক্তিগত গাড়ির ড্রাইভাবের সাথেও করি, যদিও এটা করা ঠিকনা। যেকোন সময় দূঘর্টনা ঘটতে পারে। তো, কথা বলতে বলতে যাচ্ছি। লোকটার বাবা নেই, দশ বছর আগে মারা গেছেন। একাই সংসারের হাল ধরেছেন। বাড়িতে বৃদ্ধা মা আর দুটো বিধবা বোন। তাদের বাচ্চাকাচ্চা সব একার উপার্জনে সামলাতে হয়।পড়াশুনা হয়েছে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত। পারিবারিক নানান ঝামেলায় আর বাড়েনি পড়াশুনার ধাপ।
আলাপ করতে করতে বাড়ি পর্যন্ত চলে এলাম। এবার ভাড়া দেব। অস্ফুট স্বরে বলল- আপনি, মানে তুমি যুথি না? ভালভাবে তাকালাম। সেই কত বছর আগের চেনা মুখটা দেখছি! এক মুহূর্তে সেই সময়গুলো আমার সামনে এসে পড়ল। আমি পলকহীন তাকিয়ে রইলাম কালামের দিকে। ক্লাসের সেই শান্তশিষ্ট ভদ্র আর দারুণ মেধাবী ছাত্রের পেশা আজ এই! ভেতরটা কেমন যেন হয়ে গেল। চোখের লোনা জলের স্বাদটা সেদিন নিয়েছিলাম অবিরাম। কতটা সময় আমি থমকে দাঁড়িয়েছিলাম ঠিক মনে নেই। আমি যেন দাঁড়িয়েছিলাম কোন এক শিল্পীর নিপুন হাতে আঁকা সেই পুকুরঘাটে, সেই বর্ষার স্বচ্ছ জলে অথবা হইহুল্লোড়ে মেতে থাকা শ্রেণীকক্ষে.......

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


