মানুষের জীবনটা নাকি একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন শুধু। কথাটা পুরপুরি বিশ্বাষ হয় না আমার। সব অনিশ্চিয়তার মাঝেও তো মানুষের জীবনে কিছু স্বাভাবিক সত্য আছে। মানুষ জন্মে । কৈশোর, তারুণ্য, যৌবন, বার্ধক্য মৃত্যু এসব তো সব মানুষের জীবনেই সমান। তাহলে জীবনটা শুধু প্রশ্নবোধক চিহ্ন হতে যাবে কেন? তবুও অদৃষ্ট বলে একটা কথা সবসময় থেকেই যায়। আমাদের জীবনে আগামীকাল ঘটবে সেটা আমরা জানি না। এই সব অদৃষ্টের মাঝেই পথ চলতে গিয়ে একজন মানুষ সান্যিধ্য আসে অনেক মানুষের । তাদের কেউ কেউ বন্ধু হয়। জীবনের সাথে জড়িয়ে যায় তারা।
আমার বন্ধু সানি। যার সাথে আমার পরিচয় ফেইসবুকে। আমারই সমবয়েসী। পরিচয়ের এক পর্যায়ে জানা গেল তার ও জন্ম রাজশাহীতে। আর একটু ঘনিষ্ট হওয়ার পর জানা গেল লতায় পাতায় সে আমার আত্মীয়। দিনে দিনে আমার বন্ধুটি আমার জন্যে অপরিহার্য হয়ে উঠছিল। তখন সবে মাত্র আমার ভার্সিটির এডমিশন টেষ্ট শেষ হয়েছে। হাতে অজস্র অবসর। রেজাল্ট আর ভর্তির জন্য অপেক্ষা। তার দশাও তথৈবচ। কলেজ জীবনের বন্ধুরাও দূরের হয়ে গেছে। কারো কারো সাথে যোগাযোগ থাকলেও সম্পর্কটা আগের মত উষ্ষ নেই। আসলে দূরত্ব মনের দূরত্বকে ও বাড়িয়ে দেয়। সেই সময়ে আমার মনের শূন্যতার সবটুকুই মুছে দিল সানি। সারাদিন বসে আড্ডা মারতাম দুজনে। এমন ও হয়েছে টানা ষোল-সতের ঘন্টা ইয়াহু ম্যাসেন্জারে বসে তার সাথে আড্ডা দিয়েছি। মনের সুখ-দুঃখের ভাগাভাগি হত। অদল বদল করতাম দুজনের অনুভূতি গুলো। সানি কবিতা লিখত। ভালবাসত কবিতাকে । কবিতা আমারো প্রচণ্ড পছন্দের বিষয়। সমস্যায় পড়লে সর্বপ্রথমেই দারস্থ হতাম তার। ভাবতাম, একটা মানুষকে দেখিনি অথচ কতইনা জড়িয়ে গেছে জীবনের সাথে। কি অদ্ভুদ! নিজেকে আমি যতটুকু বুঝি না তার চেয়েও বেশী বুঝি সানির ভেতারটাকে । বন্ধু হিসেবে সানি ছিল স্বাতন্ত্র। মনের মাঝে কোন লুকচুরি নেই। কোন কুটিলতা নেই। অদ্ভুদ খোলামেলা।
এর মাঝে আমার ভার্সিটির ক্লাস শুরু হল। স্বপ্নের ভার্সিটি, বর্ণিল জীবন। প্রতিদিনের নানা অভিজ্ঞতা, ঘটনাগুলো সানি কে বলতে না পারলে আমার সবচে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি ই যেন অপূরণ রয়ে গেল। ভার্সিটিতে অনেক নতুন বন্ধু পেলেও সানির গুরুত্ব আমার জীবনে একটুও কমেনি। এরই মাঝে এক সকালে সানির ফোন পেয়ে অবাক হলাম। ফোন ধরার পর চমকের পর চমক। সে নাকি আমার ভার্সিটিতে এসে বসে আছে, আমি যেন তাড়াতাড়ি ভার্সিটিতে গিয়ে হাজির হই। আনন্দে আর চমকে আমি দিশেহারা। ভার্সিটিতে গিয়ে ষ্টেশনের বাইরে বেরুতেই সানির ডাক। আমি বেশ অবাক হলাম আমাকে চিনল কি করে। ফেইসবুকে শুধু ছবি দেখে মানুষকে দূর থেকে চেনা সম্ভব? সানি তার পুরো পরিবার সমেত চত্বরে দাঁড়িয়ে। আমি তার বাব-মাকে সালাম দিলাম। সানি তার ছোট ভাই-বোনদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। কোকরা চুল ওয়ালা মাঝারি গড়নের একটা মেয়ে। তাদের নিয়ে সারা ভার্সিটি ঘুরলাম। আসার পথে নামল ঝুম ঝুম বৃষ্টি। সবাই ভিজলাম একসাথে। আমার নিজেকে পৃথিবীর সবচে সূখী মানুষ মনে হচ্ছিল তখন।
সানির সাথে আমার চলছিল বেশ। তবুও একটা রাতের ঘটনায় সানির সাথে আমার সম্পর্কটা পাল্টে গেল। সানি আমার কাছে বন্ধুত্বের চেয়ে বেশী কিছু চেয়েছিল। গেল। প্রেম ভালবাসার প্রতি বিশ্বাষ আমার কখনোই ছিল না। আমার দৃঢ় বিশ্বাষ ছিল প্রেমের সম্পর্কের চেয়েও বন্ধুত্বের সম্পর্ক অনেক দীর্ঘস্থায়ী। আমার চারপাশের পরিবেশই আমার মাঝে এমন বদ্ধ ধারণা সৃষ্টি করেছিল। জানতাম, গুণাগুণের দৃষ্টিকোণে সানি আমার চেয়ে অনেক উপরে। তবুও সানিকে আমি শুধু নিখাদ বন্ধু হিসেবে দেখেছি। ছেলে কিংবা মেয়ে সেটা কখনো ফরক করি নি। সানি আমার এমন বন্ধু যাকে আমি কখনোই হারাতে চাই নি। অথচ সানি আমাকে বুঝল না। আমাদের সম্পর্কটা ঠান্ডা হতে শুরু করল। সানিকে আমি ফেরতে চেয়েছি অনেক। পারিনি। জীবনে এই প্রথম নিজেকে বন্ধু হিসেবে ব্যর্থ মনে হল।
সানির চলে যাওয়া আমার জীবনে রাঘব প্রভাব ফেলে গেল। মানুষের বন্ধুত্ব কি এতই টুনকু? এতদিনের সম্পর্ক কি নিমেষেই শেষ করা যায়? বন্ধুত্ব শব্দের প্রতি আমার যে নিবিষ্টতা তা শেষ হয়ে গেছে। অনেকের সাথেই চলাফেরা করি, অথচ অর্থহীন মনে হয়। আমার অভিধানে বন্ধুত্ব শব্দের অস্তিত্ব নেই। নিজেই নিজের মত চলার চেষ্টা করি। একলা পথ চলতে শিখি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



